Welcome to my website!

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ  

শুরু করছি আল্লাহর নামে যিনি পরম করুণাময়, অতি দয়ালু।

 আল্লাহর জন্য সমস্ত প্রশংসা, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।

MD. RAHAMAT  KHAN

প্রশ্ন (01) : শীত থেকে বাঁচতে টাখনুর নিচে পায়জামা পরা যাবে কি?

উত্তর : সর্বাবস্থায় টাখনুর উপর কাপড় পরতে হবে। কারণ টাখনুর নীচে কাপড় পরিধান করা নিষিদ্ধ। বরং শীত নিবারণের জন্য লম্বা মোযা পরিধান করবে (তিরমিযী হা/২৮২০; মিশকাত হা/৪৪১৮)। অহংকারবশে টাখনুর নীচে কাপড় ঝুলিয়ে পরলে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না, তার সাথে কথা বলবেন না এবং তাকে (গোনাহ থেকে) পবিত্রও করবেন না (মুসলিম, মিশকাত হা/২৭৯৫, ‘ক্রয়-বিক্রয়অধ্যায়)। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন টাখনুর নীচে কাপড় যতটুকু যাবে, ততটুকু জাহান্নামে পুড়বে’ (বুখারী, মিশকাত হা/৪৩১৪)। তিনি বলেন, লুঙ্গি বা পায়জামার পায়ের গোছা স্পর্শ করার কোন অধিকার নেই (তিরমিযী হা/১৭৮৩)।  




আস-সালামু আলাইকুম..........

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ'র যিনি আমাকে তাউফিক দিয়েছেন এই ওয়েবে কাজ করার জন্য ।

আমার দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল যদি কোন ভাবে একটি ওয়েব পেজ তৈরি করতে পারি, তা হলে ইসলাম প্রচার ব্যাবহার করবো...

আমার দীর্ঘদিনের এই লালিত স্বপ্ন আল্লাহ পুরন করেছেন , আর তারই ইচ্ছায় আমি এই ওয়েব পেজ  ইনশাআল্লাহ আপনাদের সকলের জন্য উৎসর্গ করতে চাই..

যাতে এর উসিলায় আমি  পরকালে নাজাত পেতে পারি।  আমার জন্য আপনারা দোয়া করবেন যেন সফল ভাবে এই ওয়েব পেজ আল্লাহ  আমার দ্বারা শেষ করান।

আমিন। 

আপনাদের মতামত বা অন্য যে কোন বিষয়ে  জানাতে পারেন সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমে.... 

rahamatkhan1984@gmail.com

রহমত হোসেন খাঁন..। 

আসসালামু আলাইকুম পবিত্র রমজান মাসে সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাচ্ছি,

সবাই পবিত্র রমজান মাসের মর্যাদা সমুন্নত ধন্যবাদ .

আজকে কিছু লাইভ টিভি চ্যানেলের ঠিকানা নিচে এড করছি আপনারা সবাই লাইভ টিভি দেখতে পারবেন .

DBC ;-   https://www.youtube.com/watch?v=NsvLpT1sfcE

Ekattor TV ;- https://www.youtube.com/watch?v=GYm1ymOkRfk

Rtv ;- https://www.youtube.com/watch?v=TOHHXlLrJXE

Somoy TV ;- https://www.youtube.com/watch?v=8xO7H8a4TXU

Jamuna TV ;- https://www.youtube.com/watch?v=SChKVKXUBSk










                             

About Me..

HI...  


I AM  

MD RAHAMAT KHAN 

WELCOM TO MY WEBSITE..

mobile:- 008801963619074,

                      01715280004

R KHAN.

MD ABDULLAH KHAN....

MD GOLAM RAHAMAN KHAN {FATHER} 

 

Photo: এই মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে তৈরি করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিবো এবং পুনরায় এই মাটি থেকেই আমি তোমাদেরকে উত্থিত করবো।
[আল কুরআন: সূরা ত্বোয়া-হা, আয়াত ৫৫]

From the earth Allah created human being, into this earth all shall be returnnand and Allah will bring you out once again from this earth. 
[Al Quran: Surah Taha, Verse 55]

 মার এবং আপনার সর্বশেষ ঠিকানা ..

আপনার কি মনে আছে.....

একটু চিন্তা করুন.....

 

সালাতের শর্তাবলী


সালাতের শর্তাবলী মোট ৯টি। যথাঃ

  1. ইসলাম
  2. বুদ্ধিমত্তা
  3. ভাল-মন্দ পার্থক্যের জ্ঞান হওয়া
  4. নাপাকি দূর করা
  5. ওজু করা
  6. সতরে আওরাত অর্থাৎ লজ্জাস্থানসহ শরীরের নির্ধারিত অঙ্গগুলো আবৃত রাখা
  7. সালাতের সময় উপস্থিত হওয়া
  8. কিবলামুখী হওয়া এবং
  9. নিয়ত করা, নিয়ত পড়া নয়

ওজুর ফরজসমূহ

এগুলো মোট ৬টি। যথাঃ

  1. মুখমণ্ডল ধৌত করা; পানি দিয়ে নাক ঝাড়া ও কুলি করা এর অন্তর্ভুক্ত,
  2. কনুই পর্যন্ত উভয় হাত ধৌত করা,
  3. সম্পূর্ণ মাথা মসেহ করা; উভয় কান উহার অন্তর্ভুক্ত,
  4. গোড়ালী পর্যন্ত উভয় পা ধৌত করা,
  5. ওজুর কার্যাবলী পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা এবং
  6. এগুলো পরপর সম্পাদন করা

উল্লেখ থাকে যে, মুখমণ্ডল, উভয় হাত ও পা তিনবার করে ধৌত করা মুস্তাহাব। একইভাবে কুলি করা ও নাকে পানি দিয়ে তিনবার ঝাড়া মুস্তাহাব। ফরজ মাত্র একবারই। তবে, মাথা মসেহ একাধিকবার করা মুস্তাহাব নয়। এই ব্যাপারে কতিপয় সহীহ হাদীস বর্ণিত আছে।

 

সালাতের রুকন (ফরজ)সমূহ

সালাতের রুকন ১৪টি। যথাঃ

  1. সমর্থ হলে সালাতে দণ্ডায়মান হওয়া,
  2. ইহরামের তাকবীর বলা,
  3. সূরা ফাতিহা পড়া,
  4. রুকুতে যাওয়া,
  5. রুকু হতে উঠে সোজা দণ্ডায়মান হওয়া,
  6. সপ্তাঙ্গের উপর ভর করে সিজদা করা,
  7. সিজদা থেকে উঠা,
  8. উভয় সিজদান মধ্যে বসা,
  9. সালাতের সকল কর্ম সম্পাদনে স্থিরতা অবলম্বন করা,
  10.  সকল রুকন ধারাবাহিকভাবে তরতীবের সাথে সম্পাদন করা,
  11.  শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদ পড়া,
  12.  তাশাহহুদ পড়ার জন্য শেষ বারে বসা,
  13.  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদ পড়া এবং
  14.  ডানে-বামে দুই সালাম প্রদান করা।

 

সালাতের ওয়াজিবসমূহ

এগুলোর সংখ্যা হলো মোট ৮টি। যথাঃ

  1. ইহরামের তাকবীর ব্যতীত অন্যান্য তাকবীরগুলো বলা,
  2. ইমাম ও একা নামাজীর পক্ষে ‘সামি‘আল্লাহু লিমান হামিদাহ্’ বলা,
  3. সকলের পক্ষে ‘রববানা ওয়া লাকাল হামদ’ বলা,
  4. রুকুতে ‘সুবহানা রব্বিয়াল ‘আজীম’ বলা,
  5. সিজদায় ‘সুবহানা রব্বিয়াল আ‘লা’ বলা,
  6. উভয় সিজদার মধ্যে ‘রাব্বিগফিরলী’ বলা,
  7. প্রথম তাশাহ্হুদ পড়া
  8. দ্বিতীয় রাকা‘আতে প্রথম তাশাহ্হুদ পড়ার জন্য বসা।[1]


[1] বি.দ্র.: এখানে ওজুর শর্তাবলীসহ সালাতের শর্ত, রুকন ও ওয়াজিবগুলো মাননীয় মুফতী প্রধান শায়খ আব্দুল আযীয ইবন বায কর্তৃক লিখিত কিতাব ‘গুরুত্বপূর্ণ দরসসমূহ’ থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। — অনুবাদক

শুধু ‘আল্লাহু’ ’আল্লাহু’ বলে জিকির করা কি শরীয়ত সম্মত?


আজকাল আমাদের সমাজের অনেক কথিত ‘হাক্কানি পীর’ এবং ‘আল্লামা’ দের কিতাবে দেখা যায় যে, তাঁরা তাঁদের ভক্ত-আশেকানদের কে অসম্পূর্ণ বাক্য “আল্লাহ্‌-আল্লাহ্‌” শব্দ দ্বারা জিকির করতে বলেন! এ-ব্যাপারে সৌদি আরবের বর্তমানে অদ্বিতীয় আলেমে দ্বীন “শাইখ সালিহ আল ফাওযান” যাকে পুরো আরব বিশ্বের তালেবে এলেম তথা ইসলাম চর্চাকারী’রা চেনেন না এমন কোন আরব নেই! তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এইভাবে, ‘আল্লাহ-আল্লাহ” অসম্পূর্ণ বাক্য দ্বারা জিকিরের হুকুম কি! এর জবাবে উনি যা বলেন, তা নিন্মে পেশ করছিঃ

 __________(১)___________

প্রশ্নঃ আল্লাহর বিশেষ কোন নাম ধরে কি তাঁর যিকির করা জায়েয আছে। যেমন মানুষ বলে, ‘আল্লাহ আল্লাহ’ অথবা ‘ইয়া গাফূরু, ইয়া গাফূরু’ ইত্যাদি বলে যিকির করা। আমি জানি ‘আল্লাহ আল্লাহ’ বলা বিদআত। কিন্তু ‘হা’ অক্ষরে পেশ দিয়ে ‘আল্লাহু আল্লাহু’ বলার হুকুম কি?

উত্তরঃ সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্যে। ‘আল্লাহ’ শব্দ দ্বারা যিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করতে চাইলে এই ইবাদতে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হেদায়াত কি ছিল তা আমাদের জানা দরকার। যেমনটি অন্যান্য ইবাদতের নিয়মও জানা দরকার। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নাতে যিকির ও দুয়ার ক্ষেত্রে শুধু ‘আল্লাহ’ শব্দ ব্যবহারের কোন প্রমাণ নেই। চাই আল্লাহ শব্দের ‘হা’ অক্ষরে পেশ দিয়ে হোক বা জযম দিয়ে হোক- কোন প্রমাণ নেই। অনুরূপভাবে শুধু আল্লাহর সুন্দর নামগুলো ধরে তাঁকে ডাকারও কোন দলীল নেই। যেমন মানুষ বলে থাকে, ইয়া লাতীফু ইয়া লাতীফু, অথবা ইয়া গারফূরু ইয়া গাফূরু.. ইত্যাদি।

তাছাড়া এ ধরণের যিকিরগুলোকে অর্থবোধক বাক্য বা কথা বলা হয় না। আর এতে উপকারী কোন অর্থও প্রকাশ পায় না। এটা একক শব্দ যাতে কোন উপকার পাওয়া যায় না। কেননা এই নামগুলো উল্লেখ করে ডেকে যদি কোন আবেদন বা প্রার্থনা পেশ না করা হয়, তবে এই ডাকটাই অনর্থক হয়ে যায়।

শাইখ সালেহ ফাওযান বলেন, এটা বিদআত। নামাযের পর বা বিশেষ কোন সময়ে আল্লাহর নাম সমূহ যিকির করা এবং তার অভ্যাস গড়ে তোলা বিদআত। যেমন ইয়া লাতীফু,ইয়া লাতীফু, বা এরকম কোন নাম বিশেষ সংখ্যা ও বিশেষ পদ্ধতিতে যিকির করা। এগুলো ইসলামে সবই নতুন সৃষ্টি তথা বিদআত। উত্তম হেদায়াত হচ্ছে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর হেদায়াত। আর নিকৃষ্ট বিষয় হচ্ছে এই দ্বীনের মাঝে নতুন কিছু সৃষ্টি করা। প্রত্যেক বিদআতই হচ্ছে ভ্রষ্টতা।
(আল মুনতাকা মিন ফাতাওয়া ফাওযান ২/৮)

তাই যখন বলবে ‘ইয়া আল্লাহ ইরহামনী’ অর্থাৎ হে আল্লাহ আমাকে দয়া কর। ‘ইয়া গাফূরু ইগফির লী’ অর্থাৎ হে ক্ষমাশীল আমাকে ক্ষমা কর, ‘ইয়া রাজ্জাকু উরযুকনী’ হে রিযিকদাতা আমাকে রিযিকদান কর, তখন তা হবে অর্থবোধক বাক্য এবং সেটা বৈধ যিকির।

অনুবাদক: শেইখ আব্দুল্লাহ আল কাফী মাদানী

___________(২)_______________

শুধু “আল্লাহ” শব্দের যিকর:

যিকর শব্দের বাংলা আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, স্মরণ। আল্লাহর স্মরণে যে সব শব্দ বা বাক্য মুখে উচ্চারণ করে বলতে হয়, সাধারণতঃ শরীয়ার পরিভাষায় তাহাই যিক্ র। অবশ্য আন্তরিক স্মরণকেও যিকির বলা যায়। আল্লাহ বলেনঃ (এবং তোমার প্রতিপালককে অধিক স্মরণ করবে এবং সকালে ও সন্ধায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করবে।) [আল ইমরান/৪১]

  •  সর্ব্বোত্তম যিক্ রঃ জ্ঞানীগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে, সব চেয়ে উত্তম যিকির হচ্ছে, কুরআনুল কারীম। ইমাম নবভী বলেনঃ ‘জেনে রাখো, কুরআনের তিলাওয়াত সর্ব শ্রেষ্ঠ যিকর আর তা হচ্ছে, চিন্তা-ভাবনার সাথে তিলাওয়াত করা। অতঃপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  হতে প্রমাণিত যিকর সমূহ(দুআই মাসূরাহ)। আর তা অনেক তন্মধ্যে উত্তম হচ্ছে, [সুব্হানাল্লাহ, ওয়াল্ হামদু লিল্লাহ্ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আক্ বার।]
  •  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বলেনঃ আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় বাক্য চারটি, [সুব্হানাল্লাহ, ওয়াল্ হামদু লিল্লাহ্ ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়াল্লাহু আক্ বার। এর মধ্যে যার দ্বারায় শুরু কর না কেন কোন অসুবিধা নেই।[মুসলিম]
  •  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  আরো বলেনঃ ‘সব্বোর্ত্তম যিকর হচ্ছে, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। [ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন এবং ইবনু হিব্বান ও হাকেম সহীহ বলেছেন।]
  •  নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেনঃ ‘আমি ও আমার পূর্বের নবীগণ সব্বোর্ত্তম যা বলেছি, [তা হল,] ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা-শারীকা লাহু’। [মালেক তাঁর মুআত্তায় বর্ণনা করেন এবং তাববারানীও বর্ণনা করেন। সনদ হাসান]

উপরোক্ত হাদীসগুলির আলোকে একথা প্রমাণিত যে, শুধু আল্লাহ শব্দের মাধ্যমে যিকির করা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে প্রমাণিত নয় আর না তাঁর কোন সাহাবা হতে এটা প্রমাণিত।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তায়মিয়াহ (রহঃ) বলেনঃ ‘শুধু (আল্লাহর) নাম তা গোপনে হোক কিংবা প্রকাশ্যে তা একটি পূর্ণ কথা নয় আর না একটি পূর্ণ বাক্য। আর না এর সম্পর্ক কুফর বা ঈমানের সাথে আছে, না আদেশ কিংবা নিষেধের সাথে সম্পর্কিত। আর না সালাফ (পূর্বসুরী) থেকে প্রমাণিত আর না নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  বৈধ করেছেন। [মাজমুউল ফাতাওয়া/১০/৫৫৬]
একারণে উক্ত যিক্ র কে অনেক উলামা বিদআত বলেছেন। দেখুন, সাইখ মুহাম্মদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ হাফেযাহুল্লাহের ওয়েব সাইট। www.islam-qa.com

সংকলনে: শেইখ আব্দুর রাকীব মাদানী

____________(৩)   _____________

প্রশ্ন: শুধু ’আল্লাহু’ ’আল্লাহু’ বলে জিকির করা কি শরীয়ত সম্মত?

উত্তর: আল হামদুলিল্লাহ ওয়াস সালাতু ওয়া সালামু আলা রাসূলিল্লাহ। আম্মা বাদ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে দুয়া ও জিকিরের ব্যাপারে যতগুলো হাদীস পাওয়া যায় সবগুলোই পূর্ণাঙ্গ বাক্য। যেমন, সুবাহান আল্লাহ, আল হামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লাইলাহা ইল্লাল্লাহ ইত্যাদি। কতবার পড়তে হবে সংখ্যা সহ হাদীসগুলোতে উল্লেখ আছে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

أفضل ما قلت أنا والنبيون قبلي: لا إله إلا الله وحده لا شريك له له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير.

“আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণের বলা শ্রেষ্ঠ জিকির হল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর।”

তিনি আরও বলেন:

أفضل الذكر لا إله إلا الله

“শ্রেষ্ট জিকির হল, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” 

তিনি আরও বলেন:

أفضل الدعاء الحمد الله

“শ্রেষ্ঠ দুয়া হল, আল হমদুলিল্লাহ।” এভাবে বহু হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে জিকিরের শব্দাবলী শিক্ষা প্রদান করেছেন।
কিন্তু আল্লাহ তায়ালার একটি মাত্র নাম নিয়ে একক শব্দে, (যেমন, আল্লাহু আল্লাহু… বা আর রাহমানু আর রাহমানু… ইত্যাদি) জিকির করার ব্যাপারে একটি হাদীস পাওয়া যায় না। সাহাবী তাবেঈদের নিকট থেকেও এমন নজির খুঁজে পাওয়া যায় না।

একক শব্দে জিকির করা যদি শরীয়ত সম্মত হত তবে অবশ্যই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের জন্য উল্লেখ করতেন। সাহাবীগণও তা পালন করতে পিছুপা হতেন না।
ভ্রান্ত আকীদার পীর-ফকীর ও সূফীগণ এভাবে জিকির করে থাকেন। তাদের কেউ কেউ তো আল্লাহ শব্দ বাদ দিয়ে কেবল হু হু বলে জিকির করে থাকে। এভাবে তারা দীনের মধ্যে বিদআত আবিষ্কার করেছে। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী।

একটি হাদীস ও তার জবাব:

আল্লাহ আল্লাহ শব্দে জিকির করার ব্যাপারে নিম্নোক্ত হাদীসটি দ্বারা দলীল পেশ করা হয়:

« لاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لاَ يُقَالَ فِى الأَرْضِ اللَّهُ اللَّهُ »

“কিয়ামত ততদিন পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যত দিন না ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলা বন্ধ হয়। (সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ: শেষ যমানায় ঈমান চলে যাওয়া।)
এর উত্তরে বলব: উক্ত হাদীসটি অন্য শব্দে এভাবে বর্ণিত হয়েছে:

لا تقوم الساعة حتى لا يقال لا إله إلا الله

“কিয়ামত ততদিন পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যত দিন না লা ‘ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা বন্ধ হয়।”
(দ্র: মাজমাঊয যাওয়ায়েদ ওয়া মামবাউল ফাওয়ায়েদ, অধ্যায়: কিতাবুল ফিতান, অনুচ্ছেদ: “কিয়ামত ততদিন পর্যন্ত সংঘটিত হবে না যত দিন না লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা বন্ধ হয়।)

এ হাদীসেগুলো অর্থ অত্যন্ত স্পষ্ট যে, কিয়ামত এমন এক সময় সংঘটিত হবে যখন পৃথিবীর বুকে এমন একজন মানুষও বিদ্যমান থাকবে না যে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বা ‘আল্লাহ’ শব্দটি মুখে উচ্চারণ করে। সব মানুষ যখন আল্লাহকে ভুলে শিরক, কুফুরী, নোংরামি, ও নানা পাপাচারে ডুবে যাবে তখন এ সকল নিকৃষ্ট মানুষদের উপর কিয়ামত সংঘটিত হবে।

উক্ত হাদীস থেকে ১০০, ২০০, ৫০০, ১০০০ বা এক লক্ষবার… আল্লাহু আল্লাহু জিকির করার বৈধতা আদৌ প্রমাণিত হয় না।
সুতরাং মুসলমানদের কর্তব্য, ইবাদত-বন্দেগী এখলাসের সাথে এমনভাবে করা যেভাবে দ্বীনের নবী শিখিয়ে দিয়ে গেছেন। তার দেখানো পন্থাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আল্লাহ সবচেয়ে ভাল জানোন।

কতিপয় কথোপকথন/ প্রশ্নোত্তর:

উক্ত বিষয়ে আমার লেখাটা ফেসবুকে ছাড়ার পর কিছু ভায়ের সাথে কথোপকথন হয়েছে। এগুলোর মধ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নিচে তুলে দেয়া হল:

জনৈক প্রশ্নকারী:আল্লাহ তাআলা তাঁর কালামে ইরশাদ করেছেন:

وَلِلّهِ الأَسْمَاء الْحُسْنَى فَادْعُوهُ بِهَا

“নিশ্চয়ই আল্লাহর জন্য সুন্দর নামসমূহ রয়েছে। তোমরা আল্লাহকে ঐ সমস্ত নামে ডাক।” (সুরা আ’রাফ) সুতরাং, যেখানে আল্লাহ স্বয়ং তাঁর কালামে তাঁকে এ সমস্ত নামে ডাকতে আদেশ দিচ্ছেন, সেখানে এ সমস্ত নামে ডাকা কিংবা বারবার জপা বা উচ্চারণ করা (অর্থাৎ যিকির করা) কে আপনি বিদআত কিভাবে বলেন?

আমার উত্তর: উক্ত আয়াতে আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে আদেশ করছেন, আমরা যেন তার নামের ওসীলায় তাঁর নিকট দুয়া করি। কোন কিছু চাইতে হলে তার নাম ধরে যেন চাই। তাঁকে যেন তাঁর সুন্দর সুন্দর নাম ধরে তাকে ডাকি। যেমন, রাসূল সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ডাকার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছেন এভাবে:

(১) কোন ব্যক্তির জীবনে যখন বিপদ-আপদ, দু:শ্চিন্তা বা পেরেশানী নেমে আসে তখন সে যেন বলে:

لا إله إلا الله العظيم الحليم ، لا إله إلا الله رب العرش العظيم ، لا إله إلا الله رب السماوات والأرض ورب العرش الكريم رواه الشيخان والترمذي والنسائي

(২) তিনি ফাতিমা রা.কে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তুমি সকাল সন্ধায় এ দুয়াটি পাঠ করবে: : يا حي يا قيوم برحمتك أستغيث, হে চিরঞ্চিব, হে সব কিছুর সংরক্ষক, তোমার রহমতের ওসিলায় তোমার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করছি। (তিরমিযী, সহীহ)।

(৩) অনুরূপভাবে সূরা হাশরেরর ২২, ২৩ ও ২৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়াল অনেকগুলো নাম বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উক্ত তিনটি আয়াত পাঠ করে আল্লাহর নিকট দুয়া করতে বলেছেন, (দারেমী, মাকাল ইবনে ইয়াসার রা. হতে বর্ণিত)

প্রশ্নকারী: আল্লাহ তাঁকে তাঁর সুন্দর নামে ডাকতে আদেশ দিয়েছেন। তাই আমি আল্লাহকে আল্লাহ, আর রাহমান, আর রাহিম নামে ডাকলাম এবং অনেক্ষণ ধরে ডাকলাম। এতে সমস্যাটা কোথায়? আপনার আলোচনা হতে পারে, নির্দিষ্ট সংখ্যাকে জরুরী মনে করা ঠিক না বেঠিক, আল্লাহ, আল্লাহ না বলে কেবল হু হু যিকির করা ঠিক না বেঠিক। কিন্তু একাধিকবার আল্লাহ আল্লাহ ডাকলেই সেটা বেদআত হবে কেন? 

উত্তর: আল্লাহর নাম ধরে ডাকার ব্যাপারে তো আপত্তি করা হয় নি। ইয়া আল্লাহ, ইয়া রাহমান, ইয়া হাইউ, ইয়া কাইয়ুমু, অথবা আল্লাহুম্মা.. এভাবে ডাকলে তো তখন সেটা আর অপূর্ণ বাক্য থাকল না। তবে কথা হল, এভাবে ডাকার পর নিজের চাহিদা তুলে ধরতে হবে। যেমন, ইয়া গাফুর, ইগফির লী অর্থাৎ হে ক্ষমাশীল, আমাকে ক্ষমা করুন। ইয়া রাযযাক, উরযুক নী..হে রিজিক দাতা, আপনি আমাকে রিজিক দিন। ডাকার পর যদি কোন কিছু না চাওয়া হয় তবে এই ডাকার কোন অর্থই থাকল না। আপত্তি হল, শুধু আল্লাহু আল্লাহু আল্লাহু বলে অপুর্ণ বাক্য দ্বারা জিকির করার ব্যাপারে।

প্রশ্নকারী:  রাসুল সাল্লা্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: إن لله تسعة وتسعين اسماً من حفظها دخل الجنة رواه البخاري লক্ষ্য করুন এখানে حفظها বলা হয়েছে। তো হিফয করার জন্য কি এক শব্দ বারবার পড়তে হয় না। বারবার পড়া বেদআত হলে এগুলোকে হিফয করতে কেন বললেন? 

আমার উত্তর:  আমাদের আলোচনা একক শব্দে জিকির করা প্রসঙ্গে। আল্লাহর নাম মুখস্ত করার উদ্দেশ্যে বার বার পড়া আর জিকির করা এক কথা নয়।

আরেক জন প্রশ্নকারী: বিলাল রা. কে যখন তার মনীব পাথর চাপা দিয়ে নির্যাতন করছিলো তখন তিনি কেবল ‘আহাদ’ ‘আহাদ’ বলেছিলেন? এ থেকে কি একক শব্দে আল্লাহর জিকির প্রমাণিত হয় না?

আমার উত্তর: খেয়াল করুন, বেলার রা. কে যখন উত্তপ্ত বালির উপর ফেলে বুকের উপর বিরাট পাথর চাপা দিয়ে এক আল্লাহর দাসত্ব পরিহার করার জন্য নির্যাতন করা হচ্ছিল তিনি তখন আল্লাহ আল্লাহ বলে জিকির করেন নি। তিনি আহাদ আহাদ বলেছেন। অর্থাৎ তিনি বুঝাতে চাচ্ছেন আহাদ মানে একক..আল্লাহ এককভাবে ইবাদতের যোগ্য। অন্য কেউ নয়। কারণ, তিনি জানতেন আরবের মুশরেকরা আল্লাহ অস্বীকার করত না। কিন্তু এককভাবে আল্লাহর ইবাদত করাকে অস্বীকার করত। তাই তিনি এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তাদেরকে এই একত্তবাদের স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। তিনি সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার পর কোন দিন আহাদ আহাদ বা আল্লাহ আল্লাহ বলে জিকির করেছেন মর্মে কি কোন প্রমাণ পাওয়া যায়?

- শেইখ আব্দুল্লাহিল হাদী



একজন মুসলিমের প্রাত্যহিক জীবন যেমন হওয়া উচিৎ


بسم الله الرحمن الرحيم

আল্লাহ তাআলার আদেশ মেনে চলা ও তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে বেঁচে থাকতে চাইলে একজন মুসলিমকে যে বিষয়ে বিশেষভাবে মনোযোগী হওয়া উচিৎ, তা হল তার প্রাত্যহিক রুটিন৷ একজন মুসলিম কখন ঘুম থেকে উঠবে, রাতে কখন বিছানায় যাবে - এ সকল বিষয়ে ইসলামের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে৷

হাদীসে বর্ণিত:

عَنْ صَخْرٍ الْغَامِدِىِّ عَنِ النَّبِىِّ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ « اللَّهُمَّ بَارِكْ لأُمَّتِى فِى بُكُورِهَا ». وَكَانَ إِذَا بَعَثَ سَرِيَّةً أَوْ جَيْشًا بَعَثَهُمْ فِى أَوَّلِ النَّهَارِ. وَكَانَ صَخْرٌ رَجُلاً تَاجِرًا وَكَانَ يَبْعَثُ تِجَارَتَهُ مِنْ أَوَّلِ النَّهَارِ فَأَثْرَى وَكَثُرَ مَالُهُ. قَالَ أَبُو دَاوُدَ وَهُوَ صَخْرُ بْنُ وَدَاعَةَ

সাখর আল গামিদী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেন: হে আল্লাহ আপনি দিনের অগ্রভাগে আমার উম্মাতের জন্য বরকত দিন৷ এবং তিনি যখন কোন ছোট বাহিনী কিংবা বড় দলকে অভিযানে পাঠাতেন, তাদের দিনের অগ্রভাগে পাঠাতেন৷ আর সাখর একজন ব্যবসায়ী ব্যক্তি ছিলেন৷ তিনি দিনের প্রথমভাগ থেকেই ব্যবসা পরিচালনা করতেন, ফলে তিনি ধনাঢ্য হয়ে ওঠেন এবং তার সম্পদ বৃদ্ধি পায়৷১

এই হাদীস থেকে জানা যায় যে এই উম্মাতের মধ্যে কল্যাণ রয়েছে দিনের অগ্রভাগে৷ অতএব ফজরের সালাতের পর না ঘুমিয়ে যিকরে মশগুল থাকা এবং সূর্যোদয়ের কিছুক্ষণ পর দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করে এরপর কাজে নেমে পড়া মুসলিমদের জন্য বরকত তথা কল্যাণ বৃদ্ধি ও স্থায়ীত্বের কারণ হবে৷ আর যে ফজরের সালাতের সাথে সাথেই দিনের শুরু করতে চায়, তাকে রাতে আগেভাগেই বিছানায় যেতে হবে৷ এজন্য আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এশার সালাতের পর কথাবার্তা বলা পছন্দ করতেন না৷ তিনি ও তাঁর সাহাবীগণ এশার পরপর রাত্রির অগ্রভাগেই বিছানায় যেতেন, যেন শেষরাত্রিতে জেগে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করতে পারেন; অথবা অন্ততপক্ষে যেন ফজরের সালাতের সময় সতেজ দেহমন নিয়ে জেগে উঠতে পারেন৷ হাদীসে বর্ণিত:

وَكَانَ يَسْتَحِبُّ أَنْ يُؤَخِّرَ الْعِشَاءَ... وَكَانَ يَكْرَهُ النَّوْمَ قَبْلَهَا وَالْحَدِيثَ بَعْدَهَا

আর তিনি [রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] এশা বিলম্বিত করাকে পছন্দ করতেন,...আর তিনি এর পূর্বে ঘুমকে এবং এর পরে কথাবার্তাকে অপছন্দ করতেন৷২

আজ বহু মুসলিম পরিবারেই এর বিপরীত অভ্যাস দেখতে পাওয়া যায়৷ অনেকেই গভীর রাত পর্যন্ত রাত্রিজাগরণে অভ্যস্ত। তাদের অনেকেই ফজরের সালাত ঘুমিয়ে পার করে দেন৷ অনেকে রাত জেগে টেলিভিশন দেখে, ইন্টারনেটে ব্রাউজ করে কিংবা গল্পগুজব করে সময় কাটান, আর এগুলোর মাধ্যমে তারা বিভিন্ন ধরনের গুনাহে লিপ্ত হন৷

অনেক ছাত্রদের ধারণা যে রাত জেগে লেখাপড়া করলে ভাল ফল পাওয়া যায়৷ কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত৷ কেউ রাত্রিতে যথেষ্ট ঘুমিয়ে ভোরে উঠে সতেজ দেহ-মন নিয়ে দু-ঘন্টায় যতটুকু পড়া করতে পারবে, তা হয়ত রাত জেগে চার ঘন্টা লেখাপড়ার সমান৷

অনেকে অভিযোগ করেন যে রাত্রি জাগরণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে, আর এ অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে না৷ এই অভ্যাস পরিবর্তনের সহজ উপায় আছে৷ কষ্ট করে কয়েকদিন ফজরের সময় ঘুম থেকে জেগে ওঠা এবং ফজরের সালাতের পর আর বিছানায় না যাওয়ার অনুশীলন করলে প্রথমে কষ্ট হলেও শীঘ্রই এটা অভ্যাসে পরিণত হবে৷ ফজরের পর ঘুম তাড়িয়ে রাখার জন্য প্রথমদিকে কিছু খেলাধূলা বা শারীরিক পরিশ্রম করা যেতে পারে৷ প্রয়োজনে অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য ছুটির সময়কে বেছে নেয়া যেতে পারে, যেন তা করতে গিয়ে কাজের ক্ষতি না হয়৷ মোটকথা ঘুমের অভ্যাস পরিবর্তন করা সম্ভব - এটি পরীক্ষিত৷

দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে আরও থাকতে পারে দিনের শেষভাগে খেলাধূলা ও শরীরচর্চা৷ সাহাবীগণ দিনের শেষভাগে, এমনকি মাগরিবের সালাত আদায় করেও তীর-নিক্ষেপ চর্চা করতেন৷ দিনের শেষভাগে কিছুটা শরীরচর্চা, হাঁটা বা খেলাধূলা করা রাত্রিতে ঘুমকে গভীর করতে সহায়ক হবে৷ এছাড়া দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত তো আছেই - যার প্রতি বিশেষ যত্নবান হওয়া প্রত্যেক মুসলিমের অবশ্য-কর্তব্য৷

দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে আরও থাকা দরকার নিয়মিত দ্বীন-শিক্ষা ও কুরআন চর্চা৷ হঠাৎ বেশি পরিমাণে কোন আমল করার চেয়ে অল্প হলেও নিয়মিত আমল করাটা অধিক উপকারী এবং আল্লাহর কাছে বেশি পছন্দনীয়৷ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

« أَحَبُّ الأَعْمَالِ إِلَى اللَّهِ تَعَالَى أَدْوَمُهَا وَإِنْ قَلَّ »

আল্লাহর কাছে সবচেয়ে পছন্দনীয় সে সমস্ত আমল, যা অল্প হলেও নিয়মিত করা হয়৷৩

তেমনি দৈনন্দিন রুটিনের মধ্যে থাকা উচিৎ নিকটাত্মীয়, বিশেষভাবে মা-বাবার খোঁজখবর নেয়া, তাঁদের প্রয়োজন পূরণ করা৷ এছাড়া স্ত্রী এবং সন্তানদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণে সময় বরাদ্দ থাকা দরকার৷

এই সমস্ত দিকনির্দেশনা মেনে প্রাত্যহিক রুটিন ঠিক করে নিয়ে তা অনুসরণ করলে একজন মুসলিম সহজেই যাবতীয় পাপাচার থেকে বেঁচে থাকতে পারবে এবং আল্লাহ তাআলার আনুগত্য করা তার জন্য সহজতর হবে ইনশা আল্লাহ৷

১ আহমদ ও সুনান গ্রন্থসমূহের প্রণেতাগণ কর্তৃক বর্ণিত৷
২ বুখারী, মুসলিম৷
৩ বুখারী, মুসলিম৷


মৃত্যুর পরের জীবন...

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

মুসলিমরা বিশ্বাস করে এই পার্থিব জীবনটি আখিরাতের অনন্ত জীবনের প্রস্তুতি কাল। যখন কোন মুসলমান মারা যায় তখন তাকে সাদা কাপড় পড়িয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাহিত করা হয়। মুসলিমরা এটিকে মৃতের প্রতি শেষ কর্তব্য এবং এই পার্থিব জীবনের ক্ষনস্থায়িত্বের ব্যাপারে পুনরায় স্মরণ করার একটি সুযোগ মনে করে।

মৃত্যুর পরবর্তীতে নতুন কোন জীবন আছে কি না — এ বিষয়টি বিজ্ঞানের আওতায় পড়ে না, কেননা বিজ্ঞান ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য তথ্য নিয়ে কাজ করে। একটি উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান এবং গবেষণা-এর বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক রূপে চালু হয়েছে মাত্র কয়েক শতাব্দী আগে। কিন্তু মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের ধারণার সাথে মানুষ স্মরণাতীত কাল থেকেই পরিচিত।

স্রষ্টা কর্তৃক প্রেরিত সকল রাসূলই মানুষকে আল্লাহর দাসত্ব করা এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। তারা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসের ব্যাপারে এতটাই গুরুত্ব আরোপ করেন যে এ ব্যাপারে সামান্যতম সন্দেহকে স্রষ্টাকে অস্বীকার করার সমতুল্য বলে গণ্য করা হত এবং এই সন্দেহ তাদের ‘বিশ্বাসের’ ব্যাপারটিকে ব্যর্থ করে দেয়। পৃথিবীতে নবীগণের আগমনের সময় ও স্থানের মধ্যে বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে তাঁদের বক্তব্যের দৃঢ়তা এবং মিল একথাই প্রমাণ করে যে তাঁরা এ সংক্রান্ত জ্ঞানলাভ করেছিলেন একই উৎস থেকে — যা কিনা ওহী। আমরা আরও জানি যে আল্লাহর নবীগণ আখিরাতের ব্যাপারেই লোকদের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশী বাধা ও কষ্টের সম্মুখীন হয়েছিলেন, কেননা এ বিষয়টি তাদের কাছে অসম্ভব ব্যাপার বলে মনে হত। কিন্তু এত প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও নবীগণকে অনুসরণ করেছেন বহু সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তি।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে : কেন নবীগণের অনুসারীরা তাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রচলিত তাদের পূর্বপুরুষগণের বিশ্বাস ও প্রথার বিরুদ্ধাচরণ করে সমাজ থেকে বিতাড়িত হওয়ার ঝুঁকি পর্যন্ত নিলেন?

এর উত্তর সহজ : তাঁরা তাঁদের মন এবং হৃদয়কে কাজে লাগিয়ে ‘সত্য’ কে উপলব্ধি করেছিলেন। তাঁরা কি তাঁদের ইন্দ্রিয়সমূহের অনুভূতির দ্বারা সত্যকে জানতে পেরেছিলেন? না, কারণ ইন্দ্রিয় দিয়ে মৃত্যুর পরবর্তী জীবনকে উপলব্ধি করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে স্রষ্টা মানুষকে ইন্দ্রিয়লব্ধ অনুভূতির পাশাপাশি আরও দান করেছেন যৌক্তিক চিন্তাভাবনার ক্ষমতা, সৌন্দর্যবোধ এবং নৈতিক সচেতনতা। এবং মানুষের এই বোধশক্তিই মানুষকে এমন সব বাস্তবতার প্রতি সচেতন করে তোলে, যার জ্ঞান ইন্দ্রিয়ের দ্বারা লাভ করা যায় না। এজন্য সকল নবীগণ মানুষকে আল্লাহ এবং আখিরাতে বিশ্বাস স্থাপন করার জন্য আহ্বান জানানোর সময় তাদের যৌক্তিক চিন্তাশক্তি, সৌন্দর্যবোধ এবং নৈতিক সচেতনতাকে নাড়া দিতেন। উদাহরণস্বরূপ যখন মক্কার মূর্তিপূজারীরা মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সম্ভাবনাকে অস্বীকার করল, কুরআনে তাদের এই অবস্থানের অসারতাকে তুলে ধরা হল এই যৌক্তিক বক্তব্যের দ্বারা :

সে আমার সম্পর্কে এক অদ্ভুত কথা বর্ণনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, কে জীবিত করবে অস্থিসমূহকে, যখন সেগুলো পচে গলে যাবে? বলুন, যিনি প্রথমবার সেগুলোকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জীবিত করবেন। তিনি সর্বপ্রকার সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবগত। যিনি নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে সক্ষম নন? হ্যাঁ, তিনি মহাস্রষ্টা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা ইয়াসীন, ৩৬ : ৭৮-৮১)

কুরআনের অন্যত্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে অবিশ্বাসীদের আখিরাতকে অস্বীকার করার পেছনে কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই। তারা শুধুমাত্র অনুমানের ওপর ধারণা করছে :

তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ ; আমরা মরি ও বাঁচি, সময়ই আমাদেরকে ধংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোন জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে। তাদের কাছে যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ পাঠ করা হয় তখন এ কথা বলা ছাড়া তাদের কোন যুক্তিই থাকে না যে, তোমরা সত্যবাদী হলে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে এস।” (সূরা জাসিয়া, ৪৫ : ২৪-২৫)

নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল মৃতকে পুনরুত্থিত করবেন। কিন্তু তাঁর প্রতিটি কাজের নিজস্ব পরিকল্পনা রয়েছে। একটি দিন আসবে যখন সমগ্র মহাবিশ্ব ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং তারপর মৃতদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে তাদের পালনকর্তার সামনে দাঁড়ানোর জন্য। সেদিনটি হবে এমন জীবনের শুরু, যার শেষ নেই এবং সেদিন সকলকে তার কৃত ভাল ও মন্দ কাজ অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া হবে। কুরআন মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের সেই ব্যাখ্যাই দেয়, যা মানুষের নৈতিক বোধ দাবী করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে মৃত্যুর পরবর্তীতে কোন জীবন না থাকলে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাসের ব্যাপারটির কোন প্রাসঙ্গিকতা থাকে না, অথবা বলা যায় সে ক্ষেত্রে স্রষ্টা এমন একজন হবেন, যিনি মানুষের ব্যাপারে উদাসীন এবং যিনি সুবিচারক নন, যিনি মানুষকে সৃষ্টি করে ছেড়ে দিয়েছেন এবং তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে বেখেয়াল। কিন্তু স্রষ্টা এমন সত্তা যিনি ন্যায়বিচারক, তিনি সেসব স্বৈরাচারীদেরকে শাস্তি দেবেন, যারা পাপাচারী, যারা শত শত মানুষকে হত্যা করেছে এবং সমাজে অশান্তির জন্ম দিয়েছে, যারা বহু মানুষকে তার খেয়ালখুশীর অনুসরণে বাধ্য করেছে। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের আয়ুষ্কাল ক্ষণস্থায়ী তাই এখানে তাদের প্রাপ্য পাপকাজের শাস্তি কিংবা পুণ্যের পুরস্কার প্রদান সম্ভব নয়। কুরআন অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা দিচ্ছে যে বিচার দিবস অবশ্যই আসবে এবং স্রষ্টা প্রতিটি আত্মার গন্তব্য নির্ধারণ করবেন তার কৃত কর্ম অনুযায়ী :

কাফিররা বলে, আমাদের ওপর কেয়ামত আসবে না। বলুন, কেন আসবে না? আমার পালনকর্তার শপথ — অবশ্যই আসবে। তিনি অদৃশ্য সম্পর্কে জ্ঞাত। নভোমণ্ডলে এবং ভূমণ্ডলে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু। না তদপেক্ষা ক্ষুদ্র এবং না বৃহৎ — সমস্তই লিপিবদ্ধ আছে সুস্পষ্ট কিতাবে। তিনি পরিণামে যারা মুমিন ও সৎকর্মপরায়ণ তাদেরকে প্রতিদান দেবেন। তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও সম্মানজনক রিযিক। আর যারা আমার আয়াতসমূহকে ব্যর্থ করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যায়, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। (সূরা সাবা, ৩৪ : ৩-৫)

শেষ বিচারের দিন হল সেই দিন যখন রবের ন্যায়পরায়ণতা ও রহমত পূর্ণধারায় প্রতিভাত হবে। রব তাদের প্রতি রহমত বর্ষণ করবেন যারা ইহলৌকিক জীবনে তাঁর পথে ক্লেশ স্বীকার করেছে শুধু চূড়ান্ত পারলৌকিক সাফল্য লাভের আশায়। কিন্তু যারা তাঁদের রবের নেয়ামতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয় এবং চূড়ান্ত সফলতাকে অগ্রাহ্য করে, তারা সেদিন চরম অবর্ণনীয় দুর্দশায় নিপতিত হবে। এতদুভয়ের পার্থক্য নির্দেশ পূর্বক কুরআন বলে :

“যাকে আমি উত্তম প্রতিশ্র“তি দিয়েছি, যা সে পাবে, সে কি ঐ ব্যক্তির সমান, যাকে আমি পার্থিব জীবনের ভোগ-সম্ভার দিয়েছি, অতঃপর তাকে কেয়ামতের দিন অপরাধী রূপে হাজির করা হবে।” (২৮ : ৬১)

কুরআন আরও তাগাদা দেয় যে, পার্থিব জীবন মূলত মৃত্যুপরবর্তী জীবনেরই শস্যক্ষেত্র মাত্র। তথাপি যারা এই অমোঘ সত্যকে অস্বীকার করে তারা নিজেদের স্বীয় প্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয় এবং অহংকারবশত সৎপরায়ণ, খোদাভীরুদের নিয়ে উপহাসে মত্ত হয়। এ ধরনের লোকেরা কেবল মৃত্যুর সম্মুখীন হলেই সম্বিত ফিরে পায়, কিন্তু সে সময় তারা পুনরায় পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনের আশা করলেও তাদের আর সুযোগ দেয়া হবে না। মৃত্যুকালীন দুর্দশাময় অবস্থা, বিচার দিবসের বিভীষিকা এবং নিষ্ঠাবান ঈমানদারদের চূড়ান্ত সফলতার নিশ্চয়তা খুব সুন্দরভাবে আলোচ্য আয়াতে ব্যক্ত হয়েছে :

যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলে: ‘হে আমার পালনকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে) প্রেরণ করুন, যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি।’ কখনই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। অতঃপর যখন শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে, সেদিন তাদের পারস্পরিক আত্মীয়তার বন্ধন থাকবে না এবং একে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে না। যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই হবে সফলকাম, এবং যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতিসাধন করেছে, তারা দোযখেই চিরকাল বসবাস করবে। আগুন তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে এবং তারা তাতে বীভৎস আকার ধারণ করবে।” (সূরা আল মুমিনুন, ২৩ : ৯৯-১০৪)

মৃত্যু পরবর্তী জীবনের উপর ইয়াকিন বা দৃঢ় বিশ্বাস শুধু পরকালীন সফলতার নিশ্চয়তা দেয় না উপরন্তু ব্যক্তিকে কর্তব্যপরায়ণ ও দায়িত্ববানরূপে গড়ে তুলে তার পার্থিব জীবনকেও শান্তি ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে সুষমামণ্ডিত করে। ভেবে দেখুন তৎকালীন আরবদের কথা যারা একসময় পরকাল সম্পর্কে গাফেল ছিল। তখন জুয়া, মদ, গোত্র-কোন্দল, রাহাজানি, হত্যাকাণ্ড ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। কিন্তু তারা এক রব ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস আনয়ন করা মাত্র পৃথিবীর সর্বোৎকৃষ্ট সুশৃঙ্খল জাতিতে পরিণত হয়। তারা সকল প্রকার অনাচার ত্যাগ করল, প্রয়োজনে পরস্পরকে সহায়তা করল এবং আভ্যন্তরীণ সকল মতবিরোধ তারা ন্যায়পরায়ণতা ও সমতার সাথে সুরাহা করল। অন্যথায় মৃত্যু পরবর্তী জীবনের প্রতি অবিশ্বাসের পরিণতি শুধু পরকাল নয় ইহলোকেও ভোগ করতে হয়। যখন গোটা জাতি এ ব্যাপারে বিস্মৃত হয় তখন তাবৎ অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, ফ্যাসাদ সমাজদেহকে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত করে এবং পরিশেষে একে ধ্বংস করে। কুরআন বিস্তারিতভাবে আদ, ছামুদ ও ফেরাউন এর ভয়ানক পরিণতির কথা এভাবে তুলে ধরে :

আদ ও ছামুদ গোত্র মহাপ্রলয়কে মিথ্যা বলেছিল। অতঃপর ছামুদ গোত্রকে ধবংস করা হয়েছিল এক প্রলয়ংকর বিপর্যয় দ্বারা এবং আদ গোত্রকে ধ্বংস করা হয়েছিল এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝাবায়ু দ্বারা যা তিনি প্রবাহিত করেছিলেন তাদের উপর সাত রাত্রি এবং আট দিবস পর্যন্ত অবিরাম। আপনি তাদেরকে দেখতেন যে, তারা অসার খেজুর কাণ্ডের ন্যায় ভূপাতিত হয়ে রয়েছে। আপনি তাদের কোন অস্তিত্ব দেখতে পান কি? ফেরাউন, তার পূর্ববর্তীরা এবং উল্টে যাওয়া বস্তিবাসীরা গুরুতর পাপ করেছিল। তারা তাদের পালনকর্তার রাসূলকে অমান্য করেছিল। ফলে তিনি তাদেরকে কঠোর হস্তে পাকড়াও করলেন। যখন জলোচ্ছ্বাস হয়েছিল, তখন আমি তোমাদেরকে চলন্ত নৌযানে আরোহণ করিয়েছিলাম, যাতে এ ঘটনা তোমাদের জন্য স্মৃতির বিষয় এবং কান এটাকে উপদেশ গ্রহণের উপযোগী রূপে গ্রহণ করে। যখন শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে — একটি মাত্র ফুৎকার এবং পৃথিবী ও পর্বতমালা উত্তোলিত হবে ও চূর্ণ বিচুর্ণ করো দেয়া হবে, সেদিন কেয়ামত সংঘটিত হবে। সেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে ও বিক্ষিপ্ত হবে এবং ফেরেশতাগণ আকাশের প্রান্তদেশে থাকবে ও আটজন ফেরেশতা আপনার পালনকর্তার আরশকে তাদের উর্ধ্বে বহন করবে। সেদিন তোমাদের উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোন কিছু গোপন থাকবে না। অতঃপর যার আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে ; ‘নাও তোমরাও আমলনামা পড়ে দেখ। আমি জানতাম যে, আমাকে হিসাবের সম্মুখীন হতে হবে।’ অতঃপর সে সুখী জীবন যাপন করবে, সুউচ্চ জান্নাতে। তার ফলসমূহ অবনমিত থাকবে। বিগত দিনে তোমরা যা প্রেরণ করেছিলে, তার প্রতিদানে তোমরা খাও এবং পান কর তৃপ্তি সহকারে। যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে : ‘হায় যদি আমার আমলনামা না দেয়া হত!’ আমি যদি না জানতাম আমার হিসাব! হায়, আমার মৃত্যুই যদি শেষ হত। আমার ধন সম্পদ আমার কোন উপকারে আসল না। আমার ক্ষমতাও বরবাদ হয়ে গেল। ফেরেশতাদেরকে বলা হবে : ধর একে, গলায় বেড়ি পরিয়ে দাও, অতঃপর নিক্ষেপ কর জাহান্নামে, অতঃপর তাকে শৃংখলিত কর সত্তর গজ দীর্ঘ এক শিকলে। নিশ্চয়ই সে মহান আল্লাহতে বিশ্বাসী ছিল না এবং মিসকীনকে আহার্য দিতে উৎসাহিত করত না। অতএব, আজকের দিন এখানে তার কোন সুহৃদ নেই এবং কোন খাদ্যও নেই, ক্ষত-নিঃসৃত পুঁজ ব্যতীত, গোনাহ্গার ব্যতীত এটা কেউ খাবে না।” (৬৯ : ৪-৩৯)

তাহলে মৃত্যু পরবর্তী জীবনে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য বেশ কিছু যুক্তিপূর্ণ কারণ রয়েছেঃ

  • প্রথমত, আল্লাহর প্রত্যেক নবীই তাদের কওমকে এ বিশ্বাসের প্রতি আহ্বান করেছিলেন।
  • দ্বিতীয়ত, যখনই কোন মানবজাতি এ বিশ্বাসের ভিত্তিমূলে গড়ে উঠেছিল, তারা সবচেয়ে আদর্শবান, শান্তিপূর্ণ জাতি হিসেবে প্রমাণিত হয়েছিল এবং সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় হতে মুক্ত-বিশুদ্ধ ছিল।
  • তৃতীয়ত, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, নবীগণের পৌনঃপুনিক সতর্কতা বাণী সত্ত্বেও যখনই কওমের লোকেরা এ বিশ্বাস অগ্রাহ্য করেছে তারা সকলেই এই পৃথিবীতে কঠিন শাস্তির সম্মুখীন হয়েছে।
  • চতুর্থত, নৈতিকতা, সুন্দর জীবন জিজ্ঞাসা ও যুক্তিবাদিতার ও দাবী এটাই যে, মৃত্যুর পরবর্তী একটি জীবন থাকা বাঞ্ছনীয়।
  • পঞ্চমত, যদি মৃত্যু পরবর্তী জীবন নাই থাকত তবে রবের ন্যায়পরায়ণতা ও রহমতের কোন মানে হত না।

বিষয়/প্রশ্নঃ যে মসজিদে কবর আছে, সে মসজিদে নামায শুদ্ধ কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

যে মসজিদে কবর আছে, সে মসজিদে নামায শুদ্ধ নয়, চাহে সে কবর নামাযীদের পিছনে বা সামনে, ডানে বা বামে হোক। যেহেতু নবী (সঃ) বলেছেন,  “ইয়াহুদী খ্রিস্টানদের উপর আল্লাহ্‌র অভিশাপ, কারণ তাঁরা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।” ১৫১
তিনি আরো বলেছেন, “সাবধান! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেক লোকেদের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিত। সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়ো না। এরূপ করতে আমি তোমাদেরকে নিষেধ করেছি।” ১৫২

আর যেহেতু কবরের ধারে পাশে নামায পড়া শিরকের অন্যতম অসীলা এবং তাতে থাকে কবরস্থ ব্যক্তিকে নিয়ে অতিরঞ্জন, সেহেতু উক্ত হাদীসদ্বয় এবং অনুরূপ আরো অন্যান্য হাদীসের উপর আমল করে শিরকের ছিদ্রপথ বন্ধ করার লক্ষ্যে কবরযুক্ত মসজিদে নামায নিষিদ্ধ হওয়া আবশ্যক। ১৫৩


ফুটনোটঃ১৫১ (বুখারী ১৩৩০, মুসলিম ৫২৯ নং), ১৫২ (মুসলিম ৫৩২নং), ১৫৩ (ইবন বায) 


বিষয়/প্রশ্নঃ অনেক নামাযী ঘরে নামায পড়ে, মসজিদে আসে না। তাদের ব্যাপারে বিধান কী?

  • বিবরণ/উত্তর

তাদের জন্য বৈধ নয় ঘরে নামায পড়া। বরং তাদের জন্য ওয়াজেব হল, মসজিদে উপস্থিত হয়ে জামাআত সহকারে নামায আদায় করা। যেহেতু মহানবী (সঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি আযান শোনা সত্ত্বেও মসজিদে জামাআতে এসে নামায আদায় করে না, কোন ওজর না থাকলে সে ব্যক্তির নামায কবুল হয় না।” ১৫৪

একটি অন্ধ লোক নবী (সঃ)এর নিকট এসে নিবেদন করল, “হে আল্লাহ্‌র রাসুল! আমার কোন পরিচালক নেই, যে আমাকে মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে যাবে।” সুতরাং সে নিজে বাড়িতে নামায পড়ার জন্য আল্লাহ্‌র রাসুল (সঃ) এর নিকট অনুমতি চাইল। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। কিন্তু যখন সে পিঠ ঘুরিয়ে রওনা দিল, তখন তিনি তাকে ডেকে বললেন, “তুমি কি আহবান (আযান)শুনতে পাও?” সে বলল, ‘জি হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, “ তাহলে তুমি সাড়া দাও।” (অর্থাৎ মসজিদেই এসে নামায পড়।) ১৫৫

রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “সেই মহান সত্তার শপথ! যার হাতে আমার জীবন আছে। আমার ইচ্ছা হচ্ছে যে, জ্বালানী কাঠ জমা করার আদেশ দিই। তারপর নামাযের জন্য আযান দেওয়ার আদেশ দিই। তারপর কোন লোককে লোকেদের ইমামতি করতে আদেশ দিই। তারপর আমি স্বয়ং সেই সব (পুরুষ) লোকদের কাছে যাই (যারা মসজিদে নামায পড়তে আসেনি)এবং তাঁদেরকে সহ তাদের ঘর বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিই।”১৫৬

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রঃ) বলেন, “ যাকে এ কথা আনন্দ দেয় যে, সে কাল কিয়ামতের দিন আল্লাহ্‌র সঙ্গে মুসলিম হয়ে সাক্ষাৎ করবে, তাঁর উচিত, সে যেন এই নামাযসমূহ আদায়ের প্রতি যত্ন রাখে, যেখানে তাঁর জন্য আযান দেওয়া হয় (অর্থাৎ মসজিদে)। কেননা, মহান আল্লাহ তোমাদের নবী (সঃ) এর নিমিত্তে হিদায়াতের পন্থা নির্ধারণ করেছেন। আর নিশ্চয় এই নামাযসমূহ হিদায়েতের অন্যতম পন্থা ও উপায়। যদি তোমরা (ফরয) নামায নিজেদের ঘরেই পর, যেমন এই পিছিয়ে থাকা লোক নিজ ঘরে নামায পড়ে, তাহলে তোমরা তোমাদের নবীর তরীকা পরিহার করবে। আর (মনে রেখো) যদি তোমরা তোমাদের নবীর তরীকা পরিহার কর, তাহলে নিঃসন্দেহে তোমরা পথহারা হয়ে যাবে। আমি তোমাদের লোকেদের এই পরিস্থিতি দেখেছি যে, নামায (জামাতসহ পড়া) থেকে কেবল সেই মুনাফিক (কপট মুসলিম) পিছিয়ে থাকে, যে প্রকাশ্য মুনাফিক। আর (দেখেছি যে, পীড়িত)ব্যক্তিকে দুজনের (কাঁধের) উপর ভর দিয়ে নিয়ে এসে (নামাযের) সারিতে দাঁড় করানো হতো।” ১৫৭

বিষয়/প্রশ্নঃ ‘বিদআত’ কাকে বলে? কখন কোন কাজকে ‘বিদআত’ বলে আখ্যায়ন করা হবে?

বিবরণ/উত্তরঃ


বিদআত বলা হয় দ্বীন ও ইবাদতে নব আবিষ্কৃত কাজকে। অর্থাৎ দ্বীন বা ইবাদত মনে করে করা এমন কাজকে বিদআত বলা হবে, যে কাজের কুরআন ও সহীহ সুন্নাহর কোন দলীল নেই। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন,
“তোমরা (দ্বীন) নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” ৮১ (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)
“যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কিছু উদ্ভাবন করল--- যা তাঁর মধ্যে নেই, তা প্রত্যাখ্যানযোগ্য।” ৮২ (বুখারী ও মুসলিম)
মুসলিমের অন্য এক বর্ণনায় আছে, “যে ব্যাক্তি এমন কাজ করল, যে ব্যপারে আমাদের নির্দেশ নেই, তা বর্জনীয়।”
বলা বাহুল্য, নব আবিষ্কৃত পার্থিব কোন বিষয়কে বিদআত বলা যাবে না। যেমন শরীয়াতে নিষিদ্ধ কোন কাজকে বিদআত বলা হয় না। বরং তাকে অবৈধ, হারাম বা মাকরূহ বলা হয়।


ফুটনোটঃ১৫৪ (আবূ দাঊদ ৫৫১, ইবনে মাজাহ, ইবনে হিব্বান, হাকেম, সঃ জামে ৬৩০০ নং), ১৫৫ (মুসলিম), ১৫৬ (বুখারী ও মুসলিম) , ১৫৭ (মুসলিম) 


বিষয়/প্রশ্নঃ ‘বিদআতে হাসনাহ’ নামক কোন বিদআত আছে কি, যা করলে সওয়াব হয়? যেহেতু হাদিসে আছে, “যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তাঁর নিজের এবং সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তাঁর (মৃত্যুর) পর তাঁর উপর আমল করবে। তাঁদের সওয়াবের কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। ৮৪ (মুসলিম)

বিবরণ/উত্তরঃ


‘বিদআতে হাসানাহ’ (ভাল বিদআত) বলে কোন বিদআত নেই। বরং প্রত্যেক বিদআতই ‘সাইয়্যিআহ’ (মন্দ)। মহানবী (সঃ) বলেছেন,
“প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।” ৮৫ (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)
আর হাদীসে যে ভাল রীতি চালু করার কথা বলা হয়েছে, তা নতুন কোন রীতি নয়। বরং যে রীতি শরীয়ত সম্মত কিন্তু কোন জায়গায় তা চালু ছিল না। কোন ব্যক্তি তা চালু করলে তাঁর ঐ সওয়াব হয়। পূর্ণ হাদিসটি পড়লে আপনি নিজেই বুঝতে পারবেন, কোন শ্রেণীর রীতির কথা বলা হয়েছে।

জারীর ইবনে আব্দুল্লাহ (রঃ) বলেন, “একদা আমরা দিনের প্রথম ভাগে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর নিকটে ছিলাম। অতঃপর তাঁর নিকট কিছু লোক এল, যাঁদের দেহ বিবস্ত্র ছিল, পশমের ডোরা কাটা চাদর (মাথা প্রবেশের মত জায়গা মাঝে কেটে) পরে ছিল অথবা ‘আবা’ (আংরাখা) পরে ছিল, তরবারি তাঁরা নিজেদের গর্দানে ঝুলিয়ে রেখেছিল। তাঁদের অধিকাংশ মুযার গোত্রের (লোক) ছিল; বরং তাঁরা সকলেই মুযার গোত্রের ছিল। তাঁদের দারিদ্রতা দেখে রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেল। সুতরাং তিনি (বাড়ীর ভেতরে) প্রবেশ করলেন এবং পুনরায় বের হলেন। তারপর তিনি বেলালকে (আযান দেওয়ার) আদেশ করলেন। ফলে তিনি আযান দিলেন এবং ইকামত দিলেন। অতঃপর তিনি নামায পরে লোকেদেরকে (সম্বোধন করে) ভাষণ দিলেন। তিনি বললেন, “হে মানব সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি হতে সৃষ্টি করেছেন ও তা হতে তাঁর সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যিনি তাঁদের দুজন থেকে বহু নরনারী (পৃথিবীতে) বিস্তার করেছেন। সেই আল্লাহকে ভয় কর, যার নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচঞা কর এবং জ্ঞাতি-বন্ধন ছিন্ন করারকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের উপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন।” (সূরা নিসা ১ আয়াত) অতঃপর দ্বিতীয় আয়াত যেটি সূরা হাশর এর শেষে আছে সেটি পাঠ করলেন, “যে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর, আর প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক যে, আগামিকালের (কিয়ামতের) জন্য সে অগ্রিম কি পাঠিয়েছে। তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবহিত।” (সূরা হাশর ১৮ নং আয়াত)
“সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন নিজ দীনার (স্বর্ণমুদ্রা), দিরহাম (রৌপ্যমুদ্রা), কাপড়, এক সা’ গম ও এক সা’ খেজুর থেকে সাদকাহ করে।” এমনকি তিনি বললেন, “খেজুরের আধা টুকরা হলেও (তা যেন দান করে।)” সুতরাং আনসারদের একটি লোক (চাঁদির) একটি থলে নিয়ে এল, লোকটির করতল যেন তা ধারণ করতে পারছিল না; বরং তা ধারণ করতে অক্ষমই ছিল। অতঃপর (তা দেখে) লোকেরা পরস্পর দান আনতে আরম্ভ করল। এমনকি খাদ্য সামগ্রী ও কাপড়ের দুটি স্তূপ দেখলাম। পরিশেষে আমি দেখলাম যে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর চেহারা যেন সোনার মতো ঝলমল করছে। অতঃপর রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেন, “যে ব্যক্তি ইসলামে ভাল রীতি চালু করবে, সে তাঁর নিজের এবং ঐ সমস্ত লোকের সওয়াব পাবে, যারা তাঁর (মৃত্যুর) পর তাঁর উপর আমল করবে। তাঁদের সওয়াব কিছু পরিমাণও কম করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলামে কোন মন্দ রীতির প্রচলন করবে, তাঁর উপর তাঁর নিজের এবং ঐ লোকেদের গোনাহ বর্তাবে, যারা তাঁর (মৃত্যুর) পর তাঁর উপর আমল করবে। তাঁদের গোনাহর কিছু পরিমাণও কম করা হবে না।”৮৬ (মুসলিম)

লক্ষণীয় যে, দান করা একটি ভাল রীতি। কিন্তু অনেকের মধ্যে যে প্রথম শুরু করবে, তাঁর হবে উক্ত সওয়াব। কোন নতুন রীতি আবিষ্কার করা উদ্দেশ্য নয়। হাদীসের শব্দে ঐ রীতিকে ‘সুন্নাহ’ বলা হয়েছে, যা বিদআতের বিপরীত। সুতরাং ‘বিদআতে হাসনার’ দলীল তাতে নেই।
বলা বাহুল্য, উক্ত হাদীসে নতুন রীতি চালু করার পর্যায়ভুক্ত তিন প্রকার কাজঃ-

(ক) শরিয়তসম্মত ভাল কাজ। কিন্তু অনেকের মধ্যে সর্বপ্রথম করা।
(খ) কোন সুন্নত কাজ, যা উঠে গিয়েছিল বা লোকমাঝে প্রচলিত করা অথবা জানিয়ে তাঁর প্রচলন করা।
(গ) কোন এমন কাজ করা, যা কোন শরীয়তসম্মত ভাল কাজের মাধ্যম। যেমন দ্বীনী মাদ্রাসা নির্মাণ করা, দ্বীনী বই-পত্র ছাপা ইত্যাদি।৮৭ (ইবনে উষাইমীন)

বিষয়/প্রশ্নঃ ঈদে মীলাদুন নাবী বিদআত কেন?

বিবরণ/উত্তরঃ


যেহেতু শরীয়তে তাঁর কোন দলীল নেই। খোদ নবী (সঃ) বা তাঁর কোন সাহাবী, কোন তাবেঈ বা ইমাম তা পালন করে যাননি, করার নির্দেশও দেননি।
সর্বপ্রথম ঈদে মীলাদ (নাবীদিবস) আবিষ্কার করেন ইরাকের ইরবিল শহরের আমীর (গভর্নর) মুযাফফারুদ্দীন কূকুবুরী ঠিক হিজরী সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিকে ৬০৪ (মতান্তরে ৬২৫) হিজরীতে। মিসরে সর্বপ্রথম চালু করে ফাতেমীরা; যাঁদের প্রসঙ্গে ইবনে কাসীর বলেন, “(ফাতেমী শাসকগোষ্ঠী) কাফের, ফাসেক, পাপাচার, ধর্মধ্বজী, ধর্মদ্রোহী, আল্লাহ্‌র সিফাত (গুণাবলী) অস্বীকারকারী ও ইসলাম অস্বীকারকারী মাজূসী ধর্ম-বিশ্বাসী ছিল।” ৮৮ (আল-বিদায়াহ অন-নিহায়াহ ১১/৩৪৬)
অনেকে বলেছেন, মীলাদে মোস্তফা একটি নব্য আবিষ্কার; যা আজ থেকে প্রায় বারো শত বছর পূর্বে হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর শেষভাগে শায়খ উমার বিন মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেন। মাওসেলের অধিবাসী উক্ত উমার বিন মুহাম্মাদ নাকি খুবই আশেকে রাসুল ও আল্লাহ্‌র অলী ছিলেন। তিনি রাসুল (সঃ)এর ভালবাসায় একান্ত অনুরাগের বশে এ মীলাদ তথা রাসুল (সঃ) এর জন্ম-বৃত্তান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় ব্রতী হন। বিখ্যাত সীরাতে শামী গ্রন্থে এ কথা স্বীকার করা হয়েছে। ৮৯ (দেখুনঃ ছহীহ মাকছূদে মুমেনীন ৩৬৯ পৃঃ)
তাছাড়া এতে রয়েছে বিজাতির অনুকরণ এবং শরীয়ত-বিরোধী বহু কর্মকাণ্ড। ৯০ (‘বারো মাসে তেরো পরব’ দ্রঃ)

বিষয়/প্রশ্নঃ ‘ঈদে মীলাদুন নাবী’ (নবী দিবস) পালন করা বৈধ নয় কেন?

বিবরণ/উত্তরঃ


মহান আল্লাহ আমাদের দ্বীন ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ করে দিয়েছেন তাঁর নবীর জীবদ্দশাতেই। মহান আল্লাহ বলেন, “আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ (নেয়ামত) সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের ধর্মরূপে মনোনীত করলাম।(সূরা মায়েদাহ ৩ আয়াত)
আর মহানবী (সঃ) বলেন, “ যে ব্যক্তি আমাদের এ (দ্বীন) ব্যপারে নতুন কিছু আবিষ্কার করে, সে ব্যাক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” ৯১ (বুখারী ও মুসলিম)  “যে ব্যক্তি এমন কোন কাজ করে, যার উপর আমাদের কোন নির্দেশ নেই, সে ব্যক্তির সে কাজ প্রত্যাখ্যাত।” ৯২ (মুসলিম)

ইসলামে পালনীয় ঈদ হল মাত্র দুটি; ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। তৃতীয় কোন ঈদ ইসলামে নেই। মহানবী (সঃ) নবুয়তের ২৩ বছর কাল নিজের জীবনে কোন বছর নিজের জন্মদিন পালন করে যাননি। কোন সাহাবীকে তা পালন করার নির্দেশও দেননি। তাঁর পূর্ববর্তী নবীদের জন্ম মৃত্যু উপলক্ষে কোন আনন্দ অথবা শোকপালন করে যাননি।
তাঁর পরবর্তীকালে তাঁর চারজন খলীফা তাদের খেলাফতকালে রাষ্ট্রীয়ভাবে অথবা একেকভাবে নাবীদিবস পালন করে যাননি। অন্য কোন সাহাবী বা আত্মীয়ও তাঁর প্রতি এত ভালবাসা ও শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁর জন্মদিন উপলক্ষে শোক পালন করেননি। তাঁদের পরেও কোন তাবেঈ অথবা তাঁদের কোন একনিষ্ঠ অনুসারী অথবা কোন ইমাম তাঁর জন্ম কিংবা মৃত্যুদিন পালন করার ইঙ্গিত দিয়ে যাননি। সুতরাং তা যে নব আবিষ্কৃত বিদআত, তা বলাই বাহুল্য।
খ্রিস্টানরা আন্দাজে ২৫ শে ডিসেম্বর যীশু খ্রিস্টের জন্মোৎসব (মীলাদ, বড়দিন বা ক্রিসমাস ডে) এবং তাঁদের পরিবারের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্মদিন (বার্থডে) বড় আনন্দের সাথে পালন করে থাকে। মুসলিমরা তাঁদের মত আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার উদ্দেশ্য এই বিদআত ওদের নিকট হতেই গ্রহণ করে নিয়েছে। তাই এরাও ওদের মত নবীদিবস (ঈদে-মীলাদুন-নাবী) এবং পরিবারের সভ্যদের (বিশেষ করে শিশুদের) ‘হ্যাপি বার্থ ডে’র অনুষ্ঠান উদযাপন করে থাকে। অথচ তাঁদের রাসুল (সঃ) তাঁদেরকে সাবধান করে বলেন, “ যে ব্যক্তি কোন সম্প্রদায়ের সাদৃশ্য অবলম্বন করে সে তাদেরই একজন।” ৯৩ (আবুদাঊদ

বিষয়/প্রশ্নঃ তসবীহ গুনতে তাসবীহ-মালা ব্যবহার করা কি বিদআত?

বিবরণ/উত্তরঃ


অনেকে বিদআত বলেছেন। তা না হলেও তা ব্যবহার না করাই উত্তম। কারণঃ
১। মহানবী (সঃ) আঙ্গুল দ্বারা তাসবীহ করেছেন এবং বলেছেন, “আঙ্গুলগুলোকে (তাঁর দ্বারা কৃত কর্মের ব্যপারে) জিজ্ঞাসা করা হবে, কথা বলানো হবে।৯৬ (আহমাদ ৬/৩৭১, আবূ দাঊদ ১৫০১, তিরমিযী ৩৫৮৩ নং)
সুতরাং কিয়ামতে আঙ্গুলগুলো তাসবীহ পড়ার সাক্ষ্য দেবে, মালা সাক্ষ্য দেবে না।
২। মালা ব্যবহার করে তাসবীহ পড়লে সাধারনতঃ মনোযোগ ও একাগ্রতা বিচ্ছিন্ন হতে পারে। আঙ্গুল গুনলে তা হয় না।
৩। তাসবীহ-মালা ব্যবহার লোক-দেখানি বা ‘রিয়া’ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। রং-বেরঙের মালা ও তাঁর খটখট শব্দ মানুষের দৃষ্টি ও মন আকর্ষণ করে। আর আমলে ‘রিয়া’ ঢুকলে সওয়াবের জায়গায় শিরক ঘটে বসবে।
বলা বাহুল্য, তাসবীহ-দানার চাইতে আঙ্গুল গোনাই শরীয়তসম্মত। ৯৭ (ইবনে ঊষাইমীন)

বিষয়/প্রশ্নঃ মুর্দার নামে কুরআনখানি, ফাতেহাখানি, কুলখানি শরীয়তসম্মত কি?

বিবরণ/উত্তরঃ


না। বরং তা বিদআত। এ কাজে মহানবী (সঃ) এবং তা পরে তাঁর সাহাবাগণ, তাবেঈন ও সফলগণ করে যাননি। আর আল্লাহ্‌র রাসুল (সঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীন বিষয়ে অভিনব কিছু রচনা করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয় তা প্রত্যাখ্যাত।” ৯৮(বুখারী ২৬৯৭, মুসলিম ১৭১৮ নং)
মুসলিম শরীফের এক বর্ণনায় তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি এমন কোন কর্ম করে, যাতে আমাদের কোন নির্দেশ নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” ৯৯ (মুসলিম ১৭১৮ নং)

বিষয়/প্রশ্নঃ মাতৃ-দিবস পালন করা কি বৈধ?

বিবরণ/উত্তরঃ


এটি আসলে অমুসলিমদের আবিষ্কৃত একটি ঈদ। সুতরাং মুসলমানদের তা পালন করা বিদআত এবং সেই সাথে কাফেরদের সাদৃশ্য অবলম্বন ও অন্ধঅনুকরণও। মুসলিমদের বাৎসরিক ঈদ দুটি এবং সাপ্তাহিক ঈদ একটি। এ ছাড়া র কোন ঈদ বা পালনীয় “দিবস” নেই। বলা বাহুল্য কাফেরদের অনুকরণে অনুরূপ সকল ঈদ বর্জনীয়। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেন, “যে ব্যক্তি আমার এই দ্বীনে (নিজের পক্ষ থেকে) কোন নতুন কথা উদ্ভাবন করল---যা তাঁর মধ্যে নেই, তা প্রতাখ্যানযোগ্য।” ১০৪ (বুখারী ও মুসলিম)
মায়ের যে হোক আছে, তা বাৎসরিক একটি দিবসকে তাঁর নামে পালন করে, দু চারটি উপহার উপঢৌকন পেশ করে, পান ভোজনের অনুষ্ঠান করে আদায় হয়ে যায় না। মায়ের প্রতি কর্তব্য আছে প্রত্যহিক। মায়ের পদতলে আছে সন্তানের বেহেশত। মায়ের কথার অবাধ্য হয়ে মাতৃ দিবস পালন করে পার্থিব আনুষ্ঠানিক আনন্দোপভোগ ছাড়া আর কী হতে পারে? ১০৫(ইবনে ঊষাইমীন)

বিষয়/প্রশ্নঃ হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সঃ) কে সোমবার দিন রোযা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, “ ওটি এমন একটি দিন, যেদিন আমার জন্ম হয়েছে।”(মুসলিম)এ হাদিস থেকে কি প্রমাণ হয় না যে, মহানবী (সঃ) নিজের জন্মদিন পালন করতেন?

বিবরণ/উত্তরঃ

এ হাদিস থেকে জন্মদিন পালন করার কথা প্রমাণিত হয় না। যদি হয়েও থাকে, তাহলে প্রত্যেক সোমবারকে তাঁর জন্মদিন হিসেবে পালন করতে হবে এবং কেবল রোযা রাখার মাধ্যমে। নচেৎ তা কামার-পুকুরের দলীল দেখিয়ে কুমোর-পুকুর দখল করার মত ব্যপার হবে।


DT:-- 31-03-2014

মূল প্রশ্ন/বিষয়ঃ(১৮৯) যে ব্যক্তি ফজরের ছালাত বিলম্ব করে আদায় করে, এমনকি তার সময় পার হয়ে যায়। তার বিধান কি?

উত্তর / বিবরণঃ

যারা ফজর ছালাত বিলম্ব করে আদায় করে এমনকি তার সময় পার হয়ে যায়- যদি বিশ্বাস করে যে, এরূপ করা বৈধ, তবে তা আল্লাহ্‌র সাথে কুফরী হল। কেননা বিনা কারণে ছালাতের নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত করা হালাল বা জায়েয, যে ব্যক্তি একথা অন্তর থেকে বিশ্বাস করবে সে কাফের। এই কারণে যে, সে কুরআন, সুন্নাহ্‌ ও মুসলমানদের ইজমার বিরোধীতা করেছে।

কিন্তু যদি তা হালাল না ভেবে বিশ্বাস করে যে, দেরী করে ছালাত আদায় করলে গোনাহ্‌গার হতে হবে। তারপরও প্রবৃত্তির তাড়নায় বা ঘুমের কারণে ইচ্ছাকৃতভাবে সময় পার করে দেয়। তবে সে সাধারণ পাপী বলে গণ্য হবে। তাকে আল্লাহ্‌র কাছে তওবা করতে হবে। অন্যায় থেকে বিরত হতে হবে। বড় বড় কাফেরের জন্যও তওবার দরজা উন্মুক্ত। আল্লাহ্‌ বলেন,

]قُلْ يَاعِبَادِي الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ[

“বলুন, হে আমার বান্দাগণ যারা নিজেদের উপর যুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহ্‌র রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ সমস্ত গোনাহ্‌ ক্ষমা করেন। তিনি ক্ষমাশীল, অতিব দয়ালু।” (সূরা যুমার- ৫৩)

এদের ব্যাপারে যারা জানবে তারা তাদেরকে নসীহত করবে, তাদেরকে কল্যাণের নির্দেশ দিবে। যদি তারা তওবা না করে, তবে তাদের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করতে হবে। যাতে করে তারা যিম্মামুক্ত হতে পারে। আর কর্তৃপক্ষও তাদের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিয়ে তাদেরকে সংশোধন করতে পারে।

পরিচ্ছদঃ আল্লাহর ভয়ের ফযিলত 

২১. হুযায়ফা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেছেন: “তোমাদের পূর্বে এক ব্যক্তি ছিল, সে তার নিজের (যে সকল খারাপ কাজ করেছে সে সকল) আমলের ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করত (যে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে), তাই সে তার পরিবারকে বলল: আমি যখন মারা যাব আমাকে গ্রহণ করবে, (এবং আমাকে পুড়িয়ে ছাই করে নিবে) অতঃপর প্রবল ঝড়ের দিন আমাকে সমুদ্রে ছিটিয়ে দিবে, তারা তার সাথে অনুরূপ করল। আল্লাহ তাকে (মৃত্যুর পর) একত্র করলেন, অতঃপর বললেন: কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে যা তুমি করেছে? সে বলল: তোমার ভয় ব্যতীত কোন বস্তু আমাকে উদ্বুদ্ধ করে নি, ফলে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন”। [বুখারি ও নাসায়ি] হাদিসটি সহিহ।

DT-03-04-2014

শায়খ মুহাম্মদ ইবন সালেহ আল-উসাইমীন (রহিমাহুল্লাহ)

অনুবাদ : মোহাম্মদ রকীবুদ্দীন আহমাদ হুসাইন |  সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

রোগী কিভাবে পবিত্রতা অর্জন করবে

  1. রোগীর উপর ওয়াজিব হলো পানির দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করা। সুতরাং সে ছোট নাপাকি থেকে অজু করবে এবং বড় নাপাকি থেকে গোসল করবে।
  2. আর যদি পানির দ্বারা পবিত্রতা অর্জন করতে সে সামর্থ না হয়, তা অপারগতা, রোগবৃদ্ধির ভয় অথবা আরোগ্য লাভে দেরী হওয়ার আশঙ্কায় হোক, সে তখন তায়াম্মুম করতে পারে।
  3. তায়াম্মুমের পদ্ধতি হলোঃ সে তার উভয় হাত মাটির উপর মেরে তার দ্বারা প্রথমে সম্পূর্ণ চেহারা মসেহ করবে, তারপর উভয় পাঞ্জা একটি দিয়ে অপরটি মসেহ করবে।
  4. যদি রোগী নিজে নিজে পবিত্রতা অর্জন করতে না পারে তাহলে অপর কোনো ব্যক্তি তাকে ওজু বা তায়াম্মুম করাবে।
  5. যদি রোগীর পবিত্রতা অর্জনের (ওজুর) কোনো অঙ্গে জখম থেকে থাকে তাহলে সে তা ধৌত করে নিবে। আর যদি ধুইলে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা হয় তাহলে ভাল করে মসেহ করে নিবে অর্থাৎ পানির দ্বারা হাত সিক্ত করে জখমের উপর বুলিয়ে নিবে। আর মসেহ দ্বারাও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা হলে সে তায়াম্মুম করে নিবে।
  6. পবিত্রতা অর্জনের কোনো অঙ্গে যদি ভাঙ্গন থাকে এবং নেকড়া অথবা জিব্স জাতীয় কিছুর দ্বারা পট্টি দেওয়া থাকে তা হলে সেই অঙ্গ না ধুয়ে তার উপর দিয়ে মসেহ করে নিবে। তায়াম্মুম করার কোনো প্রয়োজন নেই; কেননা, মসেহ ধোয়ার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেছে।
  7. দেয়াল অথবা অন্য কোনো ধুলাযুক্ত পবিত্র বস্তুর উপর হাত মেরে তায়াম্মুম করা জায়েয আছে। যদি দেয়াল মাটি জাতীয় নয় এমন কোনো বস্তু দ্বারা প্রলেপ করা হয়, যেমন রং এর আস্তরণ, তাহলে তার দ্বারা তায়াম্মুম করা যাবে না।
  8. মাটির উপর অথবা ধুলাযুক্ত দেয়াল অথবা অন্যকিছুর উপর তায়াম্মুম করা সম্ভব না হলে একটি পাত্র বা রুমালের মধ্যে মাটি রেখে তা থেকে রোগী তায়াম্মুম করে নিতে পারে।
  9. যদি কোনো এক সালাতের জন্য রোগী তায়াম্মুম করে এবং অপর সালাত পর্যন্ত তার পবিত্র বহাল থাকে তা হলে সে প্রথম তায়াম্মুম দিযে পরবর্তী সালাত পড়ে নিতে পারে, দ্বিতীয় সালাতের জন্য তাকে আবার তায়াম্মুম করতে হবে না। কেননা, সে পবিত্র অবস্থায় বহাল রয়েছে এবং তা বাতিল হয়নি।
  10. রোগীর পক্ষে ওয়াজিব হলো, তার সম্পূর্ণ শরীর নাজাসাত (অপবিত্র বিষয়) থেকে পবিত্র করা। আর যদি তা সম্ভব না হয় তা হলে সেই অবস্থায়ই সালাত পড়ে নিবে, পুনরায় তা পড়তে হবে না।
  11. রোগীর পক্ষে ওয়াজিব হলো, পবিত্র কাপড়ে সালাত পড়া। যদি কাপড় নাপাক হয়ে যায় তাহলে উহা ধুয়ে নিবে অথবা উহার পরিবর্তে অন্য পবিত্র কাপড় বদলে নিবে। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে ঐ অবস্থায়ই সালাত পড়লে তার সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে; পুনরায় সালাত পড়তে হবে না।
  12. রোগীর পক্ষে ওয়াজিব হলো, পবিত্র স্থান ও বস্তুর উপর সালাত পড়া। যদি স্থান অপবিত্র হয় তা হলে তা ধৌত করে নিবে অথবা পবিত্র কোনো বস্তু দিয়ে বদলে নিবে অথবা এর উপর পবিত্র কোনো কিছু বিছিয়ে নিবে। তাও যদি সম্ভব না হয় তা হলে যে অবস্থায় থাকে সে অবস্থায়ই সালাত পড়ে নিবে। সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে এবং পুনরায় সালাত পড়তে হবে না।
  13. পবিত্রতা অর্জনে অপারগ হওয়ার কারণে রোগীর পক্ষে নির্ধারিত সময়ের পর দেরী করে সালাত পড়া জায়েয নয়; বরং সাধ্যমত পবিত্রতা অর্জন করে সময়মত সালাত পড়ে নিবে; যদিও তার শরীরে বা কাপড়ে অথবা সালাতের স্থানে এমন নাজাসাত থেকে যায় যা দূর করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি।

রোগী কিভাবে সালাত পড়বে

  1. রোগীর উপর ওয়াজিব হলো সে ফরজ সালাত দাঁড়িয়ে পড়বে; তা নত হয়ে হোক আর প্রয়োজনে লাঠির উপর অথবা দেয়ালের উপর ভর দিয়ে হোক।
  2. রোগী দাঁড়াতে সক্ষম না হলে বসে সালাত পড়বে। তবে উত্তম হলো দাঁড়ানো ও রুকুর ক্ষেত্রে চার জানু হয়ে বসা।
  3. যদি রোগীর পক্ষে বসে সালাত পড়া সম্ভব না হয় তাহলে সে ক্বিবলামূখী হয়ে পার্শ্বের উপর কাত অবস্থায় সালাত আদায় করবে। ডান পার্শ্বে কাত হওয়া ভাল। আর যদি ক্বিবলামূখী হওয়া সম্ভব না হয় তা হলে যে দিকে আছে সে দিকেই মুখ করে সালাত পড়ে নিলে তার সালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে এবং পুনরায় সেই সালাত পড়তে হবে না।
  4. রোগী যদি পার্শ্বের উপর কাত হয়ে সালাত পড়তে অপারগ হয় তা হলে ক্বিবলার দিকে পা রেখে চিত হয়ে সালাত পড়ে নিবে। তবে উত্তম হবে মাথাটি একটু উপরে তুলে রাখা, যাতে করে সে ক্বিবলামূখী হতে পারে। যদি পা ক্বিবলার দিকে রাখতে না পারে তা হলে যেভাবেই থাকে সেভাবেই রেখে সালাত পড়ে নিবে এবং পুনরায় সেই সালাত তাকে পড়তে হবে না।
  5. রোগীর উপর ওয়াজিব হলো, সালাতে সঠিকভাবে রুকু ও সিজদাহ সম্পাদন করা। আর যদি সম্ভব না হয় তা হলে ইশারায় রুকু ও সিজদাহ আদায় করবে। তবে রুকুর চেয়ে সিজদায় মস্তক অধিকতর নত করবে। যদি রোগী রুকু আদায় করতে সমর্থ হয় এবং সিজদা করতে না পারে তা হলে সে সঠিক ভাবে রুকু আদায় করবে এবং ইশারার মাধ্যমে সিজদাহ আদায় করবে আর যদি সে সিজদাহ করতে পারে এবং রুকু করতে না পারে না তা হলে সে সঠিক অবস্থায় সিজদাহ আদায় করবে এবং ইশারার মাধ্যমে রুকু সম্পাদন করবে।
  6. রোগী যদি রুকু ও সিজদাহ মাথার ইশারায় আদায় করতে সমর্থ না হয় তা হলে তা চোখের ইশারায় আদায় করবে এবং রুকুর বেলায় সামান্য এবং সিজদাহর বেলায় একটু বেশী পরিমাণে চোখ দাবাইবে। হাতের দ্বারা ইশারা করা, যেমন - কোনো কোন রোগী করে থাকে, শরীয়ত সম্মত নয়। এর কোনো আসল না কুরআন বা সুন্নাতে আছে, না বিশ্বস্ত আলেমবর্গের কোনো বক্তব্যে রয়েছে।
  7. যদি রোগীর পক্ষে মাথার দ্বারা বা চোখের দ্বারা ইশারা করা সম্ভব না হয় তাহলে অন্তর দিয়ে সালাত পড়বে, এরপর অন্তর দিয়ে রুকু, সিজদাহ, ক্বিয়াম ও উপবেশনের নিয়ত করবে। কারণ, প্রত্যেক লোকের নিয়তানুসারে তার কাজের মূল্যায়ন করা হয়।
  8. রোগীর উপর ওয়াজিব হলো: প্রত্যেক সালাত তার নির্ধারিত সময়ে আদায় করা এবং সাধ্যমত ওয়াজিবসমূহ সঠিকভাবে সম্পাদন করা। যদি প্রত্যেক সালাত তার নির্ধারিত সময়ে পড়া তার পক্ষে কঠিন হয় তাহলে যোহর ও আসর একত্রে এবং মাগরিব ও এশা একত্র করে পড়বে। সে পরবর্তী সালাত অর্থাৎ যোহরের সাথে আসর এবং মাগরিবের সাথে এশার সালাত আগেই একত্র করে পড়তে পারে। তবে ফজরের সালাত তার পূর্ববর্তী অথবা পরবর্তী কোনো সালাতের সাথে কোনো অবস্থায় একত্র করে পড়া জায়েয নয়।
  9. যদি কোনো রোগী চিকিৎসার জন্য বিদেশে মুসাফির অবস্থায় থাকে তখন সে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত চার রাকা‘আতের সালাত অর্থাৎ যোহর, আছর ও এশার সালাত দু’রাকাআত করে পড়তে পারে। তার সফর দীর্ঘ মেয়াদী হোক অথবা স্বল্পমেয়াদী তাতে কোনো পার্থক্য হবে না।

আল্লাহই আমাদের তাওফীকদাতা  

পাঠিয়েছেনঃবাংলা হাদিস

গ্রন্থের বিবরণঃগ্রন্থঃ জাল হাদীছের কবলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর ছালাত | অধ্যায়ঃ মসজিদ সমূহ | রচয়িতা / সঙ্কলকঃ মুযাফফর বিন মুহসিন  

মূল প্রশ্ন/বিষয়ঃ(৫) মসজিদের দেওয়ালে ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ লেখা, কা‘বা ও মসজিদে নববীর নকশা আকা বা ছবি স্থাপন করা কিংবা চাঁদ, তারা ও যোগ চিহ্ন সহ বিভিন্ন রকমের নকশা করা

উত্তর / বিবরণঃ

(৫) মসজিদের দেওয়ালে ‘আল্লাহ’ ও ‘মুহাম্মাদ’ লেখা, কা‘বা ও মসজিদে নববীর নকশা আকা বা ছবি স্থাপন করা কিংবা চাঁদ, তারা ও যোগ চিহ্ন সহ বিভিন্ন রকমের নকশা করা : 

‘আল্লাহু’ ও ‘মুহাম্মাদ’ লেখা প্রায় মসজিদে দেখা যায়। এটা শিরকী আক্বীদার কারণে সমাজে চালু আছে। এর দ্বারা আল্লাহ ও মুহাম্মাদ (ছাঃ)-কে সমমর্যাদার অধিকারী সাব্যস্ত করা হয়েছে। পথভ্রষ্ট পীর-ফকীরদের আক্বীদা হল, ‘আহাদ হয়ে যিনি আরশে ছিলেন তিনিই আহমাদ হয়ে মদীনায় অবতরণ করেন’। কারণ যিনি আহমাদ তিনিই আহাদ। শুধু মাঝের মীমের পার্থক্য (নাঊযুবিল্লাহ)। তাছাড়া আরবীতে ‘আল্লাহ মুহাম্মাদ’ এক সংগে লিখলে অর্থ হয়- আল্লাহই মুহাম্মাদ, মুহাম্মাদই আল্লাহ। যা পরিষ্কার শিরক। অতএব এ সমস্ত বাক্য লেখা থেকে বিরত থাকতে হবে। বহু মসজিদের চারপাশে আল্লাহর ৯৯ নাম লেখা আছে, কোন মসজিদে ‘আয়াতুল কুরসী’, সূরা ইয়াসীন ইত্যাদি লেখা থাকে। এগুলো সবই বাড়াবাড়ি এবং লৌকিকতার শামিল।

عَنْ عُمَرَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  لاَ تُطْرُوْنِىْ كَمَا أَطْرَتِ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُوْلُوْا عَبْدُ اللهِ وَرَسُوْلُهُ .

ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘তোমরা আমাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমন খ্রীস্টানরা ঈসা ইবনু মারইয়ামকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি কেবল তাঁর বান্দা। সুতরাং তোমরা বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল (ছাঃ)’।[1]

কা‘বা কিংবা মসজিদে নববীর নকশা অাঁকা বা ছবি স্থাপন করা কুরআন-সুন্নাহ্র পরিপন্থী কাজ। মুছল্লী সিজদা করে আল্লাহকে কা‘বা ঘরের পাথরকে নয়। কা‘বা শুধু মুসলিমদের ক্বিবলা। পূর্বের অনেক মসজিদে বিভিন্ন প্রাণীরও নকশা দেখা যায়। এগুলো ছালাতের জন্য ক্ষতিকর। এছাড়া এমন সব ক্যালেন্ডার ঝুলানো হচ্ছে, যেখানে কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে মাছ বা কোন জীবের ক্যলিগ্রাফী তৈরি করা হয়েছে, যা মানুষ সহজে বুঝতে পারে না। এগুলো সবই ছালাতের একাগ্রতা বিনষ্ট করে।

عَنْ عَائِشَةَ أَنَّ النَّبِىَّ  صَلَّى فِىْ خَمِيْصَةٍ لَهَا أَعْلاَمٌ فَنَظَرَ إِلَى أَعْلاَمِهَا نَظْرَةً فَلَمَّا انْصَرَفَ قَالَ اذْهَبُوْا بِخَمِيْصَتِىْ هَذِهِ إِلَى أَبِى جَهْمٍ وَائْتُوْنِىْ بِأَنْبِجَانِيَّةِ أَبِى جَهْمٍ فَإِنَّهَا أَلْهَتْنِىْ آنِفًا عَنْ صَلاَتِىْ.

আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) একদা একটি চাদরে ছালাত আদায় করেন, যাতে নকশা ছিল। তিনি উক্ত নকশার দিকে একবার দৃষ্টি দেন। যখন তিনি ছালাত শেষ করলেন তখন বললেন, তোমরা আমার এই চাদরটি আবু জাহামের নিকট নিয়ে যাও এবং আম্বেজানিয়াহ কাপড়টি নিয়ে এসো। কারণ এটা এখনই আমাকে আমার ছালাত থেকে বিরত রেখেছিল। অন্য বর্ণনায় এসেছে,  كُنْتُ أَنْظُرُ إِلَى عَلَمِهَا وَأَنَا فِى الصَّلاَةِ فَأَخَافُ أَنْتَفْتِنَنِىْ ‘আমি ছালাত অবস্থায় এর নকশার দিকে তাকাচ্ছিলাম। কারণ উহা আমাকে ফেৎনার মধ্যে ফেলে দিবে বলে আশংকা করছিলাম’।[2] অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَنَسٍ كَانَ قِرَامٌ لِعَائِشَةَ سَتَرَتْ بِهِ جَانِبَ بَيْتِهَا فَقَالَ النَّبِىُّ  أَمِيْطِىْ عَنَّا قِرَامَكِ هَذَا فَإِنَّهُ لاَ تَزَالُ تَصَاوِيْرُهُ تَعْرِضُ فِى صَلاَتِىْ.

আনাস (রাঃ) বলেন, আয়েশা (রাঃ)-এর একটি পর্দা ছিল। তিনি সেটা দ্বারা  তার ঘরের এক পার্শ্ব ঢেকে রেখেছিলেন। নবী করীম (ছাঃ) তাকে বলেন, আমার সামনে থেকে তোমার এই পর্দাটা সরিয়ে নাও। কারণ ছালাতের মধ্যে এই ছবিগুলো আমার সামনে বারবার আসছে।[3]

নকশা দেখে রাসূল (ছাঃ) যদি ফেতনার আশংকা করেন, তাহলে আমাদের ছালাতের অবস্থা কী হবে? আমরা কি তাঁর চেয়ে বেশী তাক্বওয়াশীল? বিভিন্ন বস্ত্তকে যদি সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া জায়েয হত, তবে সবচেয়ে সম্মানের অধিকারী হত হাজারে আসওয়াদ বা কালো পাথর। কিন্তু ওমর (রাঃ) তাকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন,

عَنْ عَابِسِ بْنِ رَبِيْعَةَ عَنْ عُمَرَ أَنَّهُ جَاءَ إِلَى الْحَجَرِ الأَسْوَدِ فَقَبَّلَهُ فَقَالَ إِنِّىْ أَعْلَمُ أَنَّكَ حَجَرٌ لاَ تَضُرُّ وَلاَ تَنْفَعُ وَلَوْلاَ أَنِّىْ رَأَيْتُ النَّبِىَّ  يُقَبِّلُكَ مَا قَبَّلْتُكَ .

‘আবেস ইবনু রাবী‘আহ ওমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি একদা কালো পাথরের (হাজরে আসওয়াদ) নিকট আসেন এবং তাকে চুম্বন করেন। অতঃপর বলেন, নিশ্চয়ই আমি জানি তুমি একটি পাথর মাত্র। তুমি কোন ক্ষতিও করতে পারো না কোন উপকারও করতে পারো না। আমি যদি রাসূল (ছাঃ)-কে চুম্বন করতে না দেখতাম, তাহলে আমি তোমাকে চুম্বন করতাম না’।[4]

চাঁদ-তারাকে ইসলামের নিশান মনে করে মসজিদের দেওয়ালে খোদাই করা হয়। অথচ উক্ত ধারণা সঠিক নয়। এগুলো আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং আল্লাহকেই ভক্তি করতে হবে এবং তাঁর প্রশংসা করতে হবে। কোন কোন মসজিদে যোগ চিহ্ন দেওয়া থাকে নিদর্শন স্বরূপ। অথচ এটা খ্রীস্টানদের প্রতীক।[5] আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ لاَ تَسْجُدُوْا لِلشَّمْسِ وَلاَ لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوْا لِلَّهِ الَّذِيْ خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُوْنَ.

‘আর রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র তাঁর নিদর্শন সমূহের অন্যতম। তোমরা সূর্য ও চন্দ্রকে সিজদা করো না। বরং তোমরা সিজদা করো আল্লাহকে, যিনি এগুলোকে সৃষ্টি করেছেন। যদি তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করে থাকো’ (হামীম সাজদাহ/ফুচ্ছিলাত ৩৭)। সুতরাং চন্দ্র-সূর্য ও তারকা নিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়। এর দ্বারা নকশা করে মসজিদকে অতিরঞ্জিত করার পক্ষে শরী‘আতের অনুমোদ নেই।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ  أُمِرْتُ بِتَشْيِيْدِ الْمَسَاجِدِ قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ لَتُزَخْرِفُنَّهَا كَمَا زَخْرَفَتِ الْيَهُوْدُ وَالنَّصَارَى.

ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘মসজিদ সমূহকে উচ্চ ও চাকচিক্যময় করে নির্মাণ করার জন্য আমি আদিষ্ট হইনি। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, অবশ্যই তোমরা মসজিদগুলোকে চাকচিক্যময় করবে যেভাবে ইহুদী-খ্রীস্টানরা (গীর্জাকে) চাকচিক্যময় করেছে’।[6]

বর্তমানে মানুষ মসজিদের নকশা করতে অহংকারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অথচ এটাকে রাসূল (ছাঃ) ক্বিয়ামতের আলামত হিসাবে অভিহিত করেছেন।

عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِىَّ  قَالَ مِنْ أَشْرَاطِ السَّاعَةِ أَنْ يَتَبَاهَى النَّاسُ فِى الْمَسَاجِدِ.

আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মসজিদ নিয়ে পরস্পরে গর্ব প্রকাশ করা ক্বিয়ামতের আলামত’।[7]

রাসূল (ছাঃ) ছালাতের স্থানকে যাবতীয় ত্রুটিমুক্ত রাখতে কা‘বা চত্বর থেকে সমস্ত মূর্তি ও ছবি অপসারণ করেছিলেন। [8] মুসলিম উম্মাহ্র দুর্ভাগ্য হল, তারা আজ সেই ছালাতের স্থানকে বিভিন্নরূপে সাজিয়ে ছালাতের অনুপোযোগী করে তুলছে। পূর্বের মসজিদগুলো ছিল কাঁচা কিন্তু মানুষের ঈমান ছিল পাকা, হৃদয় ছিল তাক্বওয়ায় পরিপূর্ণ। বর্তমানে মসজিদগুলো অত্যাধুনিক টাইলস, গ্লাস, এসি, দামী পাথর দ্বারা সজ্জিত করা হচ্ছে, মুছল্লীর পোশাক ও জায়নামায হচ্ছে ঝকঝকে উজ্জ্বল। কিন্তু দেহের শ্রেষ্ঠ অংশ অন্তরটা কলুষিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত। তাক্বওয়া ও ঈমানের পরিচর্যা না হয়ে চলছে কেবল বস্ত্তর পরিচর্যা এবং লৌকিকতার প্রতিযোগিতা। অতএব সর্বাগ্রে নিজের হৃদয়কে ঈমান ও তাক্বওয়ার টাইলস দ্বারা উজ্জ্বল করতে হবে, একনিষ্ঠতা ও একাগ্রতার মাধ্যমে স্বচ্ছ ও সুন্দর করতে হবে।

ফুটনোটঃ[1]. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, ছহীহ বুখারী হা/৩৪৪৫, ১/৪৯০ পৃঃ, ‘নবীদের ঘটনাবলী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৮; মিশকাত হা/৪৮৯৭, পৃঃ ৪১৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৪৬৮০, ৯/১০৭ পৃঃ। [2]. ছহীহ বুখারী হা/৩৭৩, ১/৫৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৩৬৬, ২/২১৩ পৃঃ), ‘ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৪; ছহীহ মুসলিম হা/১২৬৭; মিশকাত হা/৭৫৭, পৃঃ ৭২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৭০১, ২/২৩৮, ‘সতর ঢাকা’ অনুচ্ছেদ। [3]. ছহীহ বুখারী হা/৩৭৪, ১/৫৪ পৃঃ, (ইফাবা হা/৩৬৭, ২/২১৩ পৃঃ), ‘ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৪; মিশকাত হা/৭৫৮, পৃঃ ৭২; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৭০২, ২/২৩৮, ‘সতর ঢাকা’ অনুচ্ছেদ।। [4]. ছহীহ বুখারী হা/১৫৯৭, ১/২১৭ পৃঃ, ‘হজ্জ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৫০; ছহীহ মুসলিম হা/৩১২৬; মিশকাত হা/২৫৮৯, পৃঃ ২২৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/২৪৭৩, ৫/২১৪ পৃঃ। [5]. ছহীহ মুসলিম হা/৪০৮, ১/৮৭ পৃঃ, (ইফাবা হা/২৮৬ ও ২৮৭), ‘ঈমান’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৭৩; মিশকাত হা/৫৫০৬। [6]. ছহীহ আবুদাঊদ হা/৪৪৮, ১/৬৫ পৃঃ, ‘ছালাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১২, সনদ ছহীহ; মিশকাত হা/৭১৮, পৃঃ ৬৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৬৬৫, ২/২২২। [7]. আবুদাঊদ হা/৪৪৯, ১/৬৫ পৃঃ; নাসাঈ হা/৬৮৯; সনদ ছহীহ, মিশকাত হা/৭১৯, পৃঃ ৬৯। [8]. ছহীহ বুখারী হা/২৪৭৮, ১/৩৩৬ পৃঃ, ‘মাযালেম’ অধ্যায়; ছহীহ মুসলিম হা/৪৭২৫, ২/১০৩ পৃঃ, ‘জিহাদ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৩২।

DT--05-04-2014

আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  বলেছেনঃ মুনাফিকের চিহ্ন হল তিনটিঃ

১। যখন কথা বলে মিথ্যা বলে;
২। যখন ওয়াদা করে ভঙ্গ করে; এবং
৩। আমানত  রাখা হলে খেয়ানত করে।

   আহনাফ ইব্‌নু কায়স (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমি (সিফ্‌ফীনের যুদ্ধে) এ ব্যক্তিকে [আলী (রাঃ) - কে] সাহায্য করতে যাচ্ছিলাম। আবূ বাক্‌রাহ্‌ (রাঃ) - এর সাথে আমার দেখা হলে বললেনঃ ‘তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ আমি বললাম,  ‘আমি এ ব্যক্তিকে সাহায্য করতে যাচ্ছি।’ তিনি বললেনঃ  ‘ফিরে যাও। কারণ আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম - কে বলতে শুনেছি যে,  দু’জন মুসলিম তাঁদের তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হলে হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তি উভয়ে জাহান্নামে যাবে।’ আমি বললাম,  ‘হে আল্লাহর রাসূল! এ তো হত্যাকারী (অপরাধী),  কিন্তু নিহত ব্যক্তির কী অপরাধ? তিনি বললেনঃ (নিশ্চয়ই) সেও তার সাথিকে হত্যা করার জন্য উদগ্রীব ছিল।

আবূ মূসা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : আল্লাহ তা’আলা আমাকে যে হিদায়াত ও ‘ইল্‌ম দিয়ে পাঠিয়েছেন তার দৃষ্টান্ত হল যমীনের উপর পতিত প্রবল বর্ষণের ন্যায়। কোন কোন ভূমি থাকে উর্বর যা সে পানি শুষে নিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঘাসপাতা এবং সবুজ তরুলতা উৎপাদন করে। আর কোন কোন ভূমি থাকে কঠিন যা পানি আটকে রাখে। পরে আল্লাহ তা’আলা তা দিয়ে মানুষের উপকার করেন; তারা নিজেরা পান করে ও (পশুপালকে) পান করায় এবং তা দ্বারা চাষাবাদ করে। আবার কোন কোন জমি রয়েছে যা একেবারে মসৃণ ও সমতল; তা না পানি আটকে রাখে, আর না কোন ঘাসপাতা উৎপাদন করে। এই হল সে ব্যক্তির দৃষ্টান্ত যে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করে এবং আল্লাহ তা’আলা আমাকে যা দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাতে সে উপকৃত হয়। ফলে সে নিজে শিক্ষা করে এবং অপরকে শিখায়। আর সে ব্যক্তিরও দৃষ্টান্ত- যে সে দিকে মাথা তুলে দেখে না এবং আল্লাহর যে হিদায়াত নিয়ে আমি প্রেরিত হয়েছি, তা গ্রহণও করে না। আবূ ‘আবদুল্লাহ (বুখারী) (রহঃ) বলেনঃ ইসহাক (রহঃ) আবূ উসামা (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেছেনঃ তিনি قَبِلت এর স্থলে قَيَّلَت (আটকিয়ে রাখে) ব্যবহার করেছেন। قَاعَا হল এমন ভূমি যার উপর পানি জমে থাকে। আর الصَّفصفُ হল সমতল ভূমি।


আবু সাইদখুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিত রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ-

মৃত ব্যক্তিকে খাটিয়ায় রেখে লোকেরা যখন কাঁধে বহন করে নিয়ে যায় তখন সে নেককার হলে বলতে থাকে,(আমাকে এগিয়ে নিয়ে চল,আমাকে এগিয়ে নিয়ে চল) , আর সে নেককার যদি না হয় তাহলে সে বলতে থাকে (হায় আফসোস,হায় আফসোস) এটাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? মানুষ ও জ্বীন ব্যতিত সব কিছুই তার আওয়াজ শুনতে পায়। মানুষ তা শুনতে পেলে অবশ্যই বেহুশ হয়ে যেত। [সহীহ বুখারী/৯৪৩]

ইয়া রব্বুল আলামিন, ইয়া আল্লাহ, দয়াকরে তুমি আমাদেরকে ঈমানের সাথে, আমলের সাথে মৃত্যু দান করিও। আমীন। সুম্মা আমীন।

খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিত রাসুল (সাঃ) বলেছেনঃ-

মৃত ব্যক্তিকে খাটিয়ায় রেখে লোকেরা যখন কাঁধে বহন করে নিয়ে যায় তখন সে নেককার হলে বলতে থাকে,(আমাকে এগিয়ে নিয়ে চল,আমাকে এগিয়ে নিয়ে চল) , আর সে নেককার যদি না হয় তাহলে সে বলতে থাকে (হায় আফসোস,হায় আফসোস) এটাকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? মানুষ ও জ্বীন ব্যতিত সব কিছুই তার আওয়াজ শুনতে পায়। মানুষ তা শুনতে পেলে অবশ্যই বেহুশ হয়ে যেত। [সহীহ বুখারী/৯৪৩]

ইয়া রব্বুল আলামিন, ইয়া আল্লাহ, দয়াকরে তুমি আমাদেরকে ঈমানের সাথে, আমলের সাথে মৃত্যু দান করিও। আমীন। সুম্মা আমীন।


DT--06-04-2014

আসুন, কিছু মূল্যবান কথা জানি........

***************************

১. কোন কিছু আরম্ভ করার পূর্বে.......... বিসমিল্লাহ বলুন।
২. কোন কিছু করার উদ্দেশ্যে বলুন........ ইনশাআল্লাহ  ।
৩. কোন বিস্ময়কর বিষয় কিছু দেখলে..... সুবহানাল্লাহ বলুন।
৪. কষ্টে ও যন্ত্রণায় ...................... ইয়া আল্লাহ বলুন।
৫. প্রশংসার বহিঃপ্রকাশে................. মাশাআল্লাহ বলুন।
৬. ধন্যবাদ জানাতে..................... যাজাকাল্লাহ খায়ের বলুন।
৭. হাঁচি দিলে............................ আলহামদুলিল্লাহ বলুন।
৮. কেহ হাঁচি দিলে বলুন ................ ইয়ারহামুকাল্লাহ  ।
৯. ঘুমুতে গেলে......................... আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওআহইয়া বলুন।
১০. ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে............আলহামদু লিল্লাহিল্লাযি আহইয়ানা বা’দা মা আমাতানা অইলাইহিন নুশুর বলুন।
১১. সালাম দিতে......................... আসসালামু আলাইকুম বলুন।
১২. সালাম নিতে ........................ ওয়ালাইকুম আস সালাম বলুন।
১৩. উপরে উঠতে ....................... আল্লাহু আকবার পড়ুন।
১৪. নিচে নামতে ........................ সুবহানাল্লাহ পড়ুন। 
১৫. সমান জায়গায় চলতে ............... লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ুন।

*******************************************
## সর্বোপরি বেশী বেশী দরুদ শরীফ পাঠ করুন##


Way to Jannah Offiicial Page's photo.



Intelligent । বুদ্ধিমান's photo.


সুবাহানাল্লাহ !!!

সুবাহানাল্লাহ !!!


 

❑ সুবাহানাল্লাহ'' আলহামদুলিল্লাহ্‌!! 

একটি ঈমানী মৃত্যু দেখুন। ইন্দোনেশীয়ায় আমাদের এক বোন এভাবেই হাঁসি মুখে ইন্তেকাল করেছেন। ছবিটি দেখে চোখে পানি চলে আসে। হে প্রভু, দয়াকরে তুমি আমাদের সকলকে এভাবে হাঁসি মুখে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করিও। আমিন, সুম্মা আমিন। 

ছবিটা শেয়ার করে সকল কে দেখার সুযোগ করে দিবেন প্লিজ।

❑ সুবাহানাল্লাহ''

Way to Jannah Offiicial Page's photo.


সুফীদের বিরাট একটি অংশ নবী-রাসূল এবং জীবিত ও মৃত অলী-আওলীয়াদের কাছে দুআ করে থাকে। তারা বলে থাকেঃ ইয়া জিলানী, ইয়া রিফাঈ, ইয়া রাসূলুল্লাহ ইত্যাদি। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁকে ছাড়া অন্যেকে আহবান করতে নিষেধ করেছেন। সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দুআ করবে, সে মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ

وَلا تَدْعُ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لا يَنْفَعُكَ وَلا يَضُرُّكَ فَإِنْ فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِنَ الظَّالِمِين

‘‘তুমি আল্লাহ ব্যতীত এমন বস্ত্তকে ডাকবে না যে তোমার উপকার কিংবা ক্ষতি কোনটিই করতে পারে না। যদি তুমি তাই কর তবে তুমি নিশ্চিত ভাবেই জালেমদের মধ্যে গন্য হবে। (সূরা ইউনুসঃ ১০৬)।

আল্লাহ তাআলা আরও বলেনঃ

وَمَنْ أَضَلُّ مِمَّنْ يَدْعُو مِنْ دُونِ اللَّهِ مَنْ لا يَسْتَجِيبُ لَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَهُمْ عَنْ دُعَائِهِمْ غَافِلُونَ

‘‘এবং ঐ ব্যক্তির চেয়ে আর কে বেশী পথভ্রষ্ট যে আল্লাহ ব্যতীত এমন ব্যক্তিদেরকে আহবান করে যারা কিয়ামত পর্যন্ত তার ডাকে সাড়া দিবে না এবং তারা তাদের ঐ আহবান থেকে সম্পূর্ণ বেখবর রয়েছে? (সূরা আহকাফঃ ৫)

ভারতকে কাঁদিয়ে লঙ্কানদের শিরোপা জয়........

ভারতকে কাঁদিয়ে লঙ্কানদের শিরোপা জয়

Photo: কমেন্ট করে বলুনঃ সুবাহানাআল্লাহ !

শেয়ার করে সকল কে দেখানোর সুযোগ করে দিন ।



Photo: প্লিজ কমেন্টস করুন- “আমিন”

শেয়ার করতে ভুলবেন না মুসলিম ভাই ও বোনেরা !!!

DT--07-04-2014


ঘুষের ভয়াবহতা ও তা থেকে উত্তরণের উপায়


money-bribe-1

ঘুষ একটি সামাজিক ব্যাধি। ঘুষ হচ্ছে স্বাভাবিক ও বৈধ উপায়ে যা কিছু পাওয়া যায় তার উপর অবৈধ পন্থায় অতিরিক্ত কিছু গ্রহণ করা। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার দায়িত্ব পালনের জন্য নিয়মিত বেতন/ভাতা পাওয়া সত্ত্বেও যদি বাড়তি কিছু অবৈধ পন্থায় গ্রহণ করে তাহলে তা ঘুষ হিসাবে বিবেচিত। অনেক সময় স্বীয় অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য ঘুষ দেওয়া হয়। আবার অনেক সময় টাকা-পয়সা ছাড়াও উপহারের নামে নানা সমগ্রী প্রদান করা হয়। সুতরাং যেভাবেই হোক, আর যে নামেই হোক তা ঘুষের অন্তর্ভুক্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الرَّاشِي وَالْمُرْتَشِي»

“ঘুষ প্রদানকারী ও গ্রহণকারী উভয়ের উপরই আল্লাহর লা‘নত[1]।”

সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল পদে থেকে হারাম অর্থ গ্রহণই হচ্ছে ঘুষ। এই ঘুষ যারা দেয় তারাও সমান অপরাধী। বেআইনী ফায়দা হাসিলের জন্য যারা কর্তাব্যক্তিদেরকে বিভিন্ন সুবিধা বা টাকা পয়সা দিয়ে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করে তারাই এই গুনাহ সংঘটনের অন্যতম শরীক। যারা ঘুষকে একটি অঘোষিত ব্যবস্থা হিসেবে প্রশ্রয় দেয় তারাই অপরাধী। দেখা যায় মাঝে মধ্যে বেড়াই ক্ষেত খায়, রক্ষকই হয় ভক্ষক। ন্যায়কে যাদের লালন করার কথা তারাই অন্যায়কে ধারণ করছে। এভাবে দুর্নীতির ডালপালা সারা দেশে বিস্তার লাভ করে।

ঘুষ বা উৎকোচ আসে নজরানার রূপ ধরে। “নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সাহাবীকে কর্মচারী নিয়োগ করে যাকাত আদায়ের জন্য পাঠালেন। সে ফিরে এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, এটা যাকাতের মাল আর এটা আমাকে উপঢৌকনস্বরূপ দেওয়া হয়েছে। এতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল। তিনি মসজিদের মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন- সরকারী কর্মচারীর কি হলো! আমরা যখন তাকে কোনো দায়িত্ব দিয়ে কোথায়ও প্রেরণ করি তখন সে ফিরে এসে বলে এই মাল আপনাদের (সরকারের) এবং এটা আমাকে প্রদত্ত উপহার। সে তার বাড়িতে বসে থেকে দেখুক তাকে উপহার দেওয়া হয় কি-না[2]।”

একবার এক সরকারী উর্ধ্বতন কর্মকর্তা উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-কে কিছু উপহার দিলেন। উপহারগুলো দেখে উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেছিলেন- তুমি যে বললে এগুলো বায়তুলমালের আর এগুলো আমার উপহার! তুমি এই পদ ছেড়ে বাপের ঘরে বসে থাক, দেখ তো কে তোমার জন্য উপহার নিয়ে আসে।” সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার এই জ্ঞান ও সাহসের জন্যই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আল-ফারুক উপাধি দিয়েছিলেন। কবি ফররুখ বলেছেন-

“আজকে উমর পন্থী পথিক দিকে দিকে প্রয়োজন

পিঠে বোঝা নিয়ে পাড়ি দেবে যারা প্রান্তর প্রাণপণ।”

কিন্তু হায়! এখন মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের এই সমাজের চিত্র দেখলে প্রশ্ন জাগে ইসলামের সেই মহান শিক্ষার প্রতিফলন কোথায়? এ জন্যেই কবি নজরুল বলেছেন:

ইসলাম সে তো পরশ মানিক তারে কে পেরেছে খুঁজি,

পরশে তাহার ধন্য যারা তাদেরই আমরা বুঝি।

ইসলামের পরশ আমাদের কলবে পৌঁছেনি বলেই আজ আমরা ঘুষকে উপহার ভাবি। অফিসের ফাইল ঘুষ না পেলে সামনে চলে না। যার ফলে দেশ ও জাতির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয় না। কর্মকর্তা কর্মচারীদের মধ্যে মেধাহীনদের রাজত্ব চলে। ঘুষ দিয়ে যে চাকুরী পেতে হয় সেই চাকুরীকে সেবা মনে করার কোনো কারণ নেই। আর তাই ঘুষ দিয়ে শিক্ষকের চাকুরী পাওয়া লোকটির কাছ থেকে তার ছাত্ররা কতটুকু এলেমদার হবে তা নিয়ে মনে অনেক সংশয় থেকে যায়।

এই ঘুষের জামানায় পাকা দড়িবাজরা তরতর করে উপরে উঠে যাচ্ছে দেখে আল্লাহর নেক বান্দারা মাঝে মাঝে ভাবে, যে কি নেক নিয়তের কি কোনো দাম নেই? এটা কি বোকামি? কিন্তু তিতা ফলের চারা লাগিয়ে যেমন সুমিষ্ট ফলের আশা করা যায় না তেমনি দুর্নীতির মাধ্যমে গড়ে উঠা ব্যবস্থাপনার কাছে কোনো কল্যাণ আশা করা যায় না। তাই ঘুষ সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন:

﴿فَبَدَّلَ ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ قَوۡلًا غَيۡرَ ٱلَّذِي قِيلَ لَهُمۡ فَأَنزَلۡنَا عَلَى ٱلَّذِينَ ظَلَمُواْ رِجۡزٗا مِّنَ ٱلسَّمَآءِ بِمَا كَانُواْ يَفۡسُقُونَ ﴾ [البقرة: ٥٩]

“এরপর যালিমরা বদলে দিল যা তাদের বলা হয়েছিল। তার পরিবর্তে অন্য কথা। এ কারণে যারা যুলুম করল তাদের উপর নাযিল করলাম আকাশ হতে এক মহাশাস্তি। কারণ, তারা অধর্ম-অন্যায় কাজ করেছিলো।” (আল-কুরআন, ২:৫৯)

এ আয়াতে সত্যকে বদলে দেওয়ার শাস্তির উল্লেখ আছে। ঘুষও সত্যকে বদলে দেয়। পাসকে ফেল দেখিয়ে দেয়। একজন হকদারের হক বদলে দিয়ে অন্যকে অন্যায়ভাবে দেওয়া হয়।

অতীত যামানায়  যারা ঘুষ গ্রহণ করত, দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে ধর্মের বাণীতে জালিয়াতি করত তাদের সম্পর্কে আল-কুরআনে বলা হয়েছে:

﴿ فَوَيۡلٞ لِّلَّذِينَ يَكۡتُبُونَ ٱلۡكِتَٰبَ بِأَيۡدِيهِمۡ ثُمَّ يَقُولُونَ هَٰذَا مِنۡ عِندِ ٱللَّهِ لِيَشۡتَرُواْ بِهِۦ ثَمَنٗا قَلِيلٗاۖ فَوَيۡلٞ لَّهُم مِّمَّا كَتَبَتۡ أَيۡدِيهِمۡ وَوَيۡلٞ لَّهُم مِّمَّا يَكۡسِبُونَ ٧٩ ﴾ [البقرة: ٧٩]

সুতরাং দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে এবং তুচ্ছ মূল্য প্রাপ্তির জন্য বলে- এটি আল্লাহর নিকট হতে এসেছে। তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য শাস্তি তাদের এবং যা তরা উপার্জন করে তার জন্যও শাস্তি তাদের।” (আল-কুরআন, ২:৭৯)

ঘুষ হচ্ছে একটি হারাম জিনিস। যদিও ঘুষখোর এটাকে হারাম মনে করে না। আয়াতে ঘুষ খেয়ে ধর্মের বাণী বদলে দেওয়ার কথা বলা হলেও সকল জালিয়াতির জন্যই শাস্তি প্রযোজ্য।

ঘুষ সব সময় টাকা-পয়সা হয় না। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নানান বস্তু ও বিষয় হতে পারে। এ জন্যই হাদীসের ভাষায় এটিকে বলে ‘রিশওয়াহ’ বা দড়ি। দড়ি দিয়ে কুপের ভেতর থেকে বালতি টেনে উঠাবার মত ঘুষ অন্যের হক নিজের ঘরে নিয়ে আসে। এজন্য এই প্রক্রিয়ায় তিনটি পক্ষ থাকে। ১. রাশী راشى যে ঘুষ প্রদান করে, ২. মুরতাশী مرتشى যে ঘুষ গ্রহণ করে এবং ৩. রায়েশ رائش যে অনুঘটক হয়ে কাজ করে। আল্লামা সান‘আনী তার বিখ্যাত গ্রন্থ সুবুলুস সালাম শারহু বুলুগিল মারাম গ্রন্থে বলেন- রায়েশ বা ঘুষের ঘটক হচ্ছে্ ওই ব্যক্তি যে ঘুষখোর ও ঘুষদাতার মধ্যে যোগাযোগ ঘটিয়ে থাকে।[3] তবে মূলপক্ষ হচ্ছে দুটি: যে ঘুষ দেয় ও যে ঘুষ খায়।

আব্দুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

«لعنة الله االراشي والمرتشي في الحكم »

“ঘুষদাতা ও গ্রহীতা উভয়ের ওপর আল্লাহর লা’নত।”[4]

ইমাম তাবারানী তার আল-মু‘জামুস সগীর গ্রন্থে একটি হাদীস সংকলন করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

 « الرشوة في الحكم كفر وهى بين الناس سحت»

‘রিশওয়াহ বিচারের ক্ষেত্রে কুফরি। লোকেরা নিজেদের মধ্যে এ কাজ করা সুহত।” আগেই বলা হয়েছে রিশওয়াহ অর্থ ঘুষ। তাহলে সুহত অর্থ কি? এ প্রশ্নের উত্তর পাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীসে:

«كل لحم أنبتته السحت فالنار أولى به، قيل ما السحت ؟ قال الرشوة في الحكم»

“যে গোশত উদগত হয়েছে সুহত থেকে, তার জন্য জাহান্নামের আগুনই বেশি উপযোগী। একজন জিজ্ঞেস করলো, সুহত কী? তিনি বললেন, বিচার বা শাসনকার্যে ঘুষ গ্রহণ।”[5]

তাহলে দেখা যায় যে, ঘুষের অর্থে যে নিজে পানাহার করে এবং তার পোষ্যদের পানাহার করায় সকলের জন্যই তা খুবই মন্দ কাজ। এই ঘুষ-লালিত দেহের ইবাদত আল্লাহ কবুল তো করবেনই না বরং তাদের জন্য লাঞ্ছনা, আখিরাতের আগুণ অপেক্ষা করছে।

ইয়াহূদীদের দুর্গতির কারণ হিসেবে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ سَمَّٰعُونَ لِلۡكَذِبِ أَكَّٰلُونَ لِلسُّحۡتِ ﴾ [المائ‍دة: ٤٢]

“তারা মিথ্যা শ্রবণে অত্যন্ত আগ্রহশীল এবং অবৈধ (ঘুষ) ভক্ষণে অত্যন্ত আসক্ত।” (আল-কুরআন, ৫:৪২)

অপর একটি আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿ وَتَرَىٰ كَثِيرٗا مِّنۡهُمۡ يُسَٰرِعُونَ فِي ٱلۡإِثۡمِ وَٱلۡعُدۡوَٰنِ وَأَكۡلِهِمُ ٱلسُّحۡتَۚ لَبِئۡسَ مَا كَانُواْ يَعۡمَلُونَ ٦٢ ﴾ [المائ‍دة: ٦٢]

“হে নবী! আপনি (আহলে কিতাবদের) অনেককেই দেখবেন পাপে, সীমালঙ্ঘনে ও অবৈধ ভক্ষণে (ঘুষ খাওয়াতে) তৎপর। তারা যা করে নিশ্চয় তা নিকৃষ্ট।” (আল-কুরআন, ৫:৬২)

আয়াতে ‘অবৈধ ভক্ষণ’ তরজমা করা হলেও হাদীসে এই ‘সুহত’ বা অবৈধ আয়কে ঘুষ হিসেবে তাফসীর করে দেওয়া হয়েছে। তবে সকল প্রকার দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত আয়ও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

এই ঘুষের বিষয়টি পবিত্র কুরআনের একটি আয়াতে স্পষ্টতই এসেছে। বিচারের রায়কে প্রভাবিত করা এবং প্রশাসকদেরকে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা থেকে আলাদা করাই যে ঘুষের মূখ্য উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তা প্রতিফলিত হয়েছে এই আয়াতে:

﴿ وَلَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَكُم بَيۡنَكُم بِٱلۡبَٰطِلِ وَتُدۡلُواْ بِهَآ إِلَى ٱلۡحُكَّامِ لِتَأۡكُلُواْ فَرِيقٗا مِّنۡ أَمۡوَٰلِ ٱلنَّاسِ بِٱلۡإِثۡمِ وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ ١٨٨ ﴾ [البقرة: ١٨٨]

“তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না এবং মানুষের ধন-সম্পত্তির কিছু অংশ জেনেশুনে অন্যায়ভাবে গ্রাস করার উদ্দেশ্যে তা বিচারকদের বা প্রশাসকদের কাছে পেশ করো না।” (আল-কুরআন, ২: ১৮৮)

এ আয়াতে ‘হুক্কাম’ অর্থ শাসকগণ, প্রশাসনগণ, বিচারকগণ হতে পারে। আরবী ভাষায় হাকিম বা বহুবচনে হুক্কাম শব্দটি এইসব অর্থে সমানভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কথা বুঝানো হয়েছে যাদের সিদ্ধান্তে একজনের সম্পদে অন্য কেউ অন্যায়ভাবে ভাগ বসাতে পারবে। উপর্যুক্ত আয়াতে وتدلوا بها শব্দটি বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। এর অর্থ হচ্ছে ‘বালতি কুপে ফেলে তা টেনে উঠানো।’ ঠিক তেমনি ঘুষের রশিতে নিজের প্রত্যাশিত বস্তু টেনে আনা হয়। এটি রুপক অর্থে এসেছে।

এজন্যই আল্লামা আলুসী তার তাফসীর রুহুল মা‘আনীতে বলেন: “তোমাদের সম্পদের কিছু অংশ অসাধু বিচারক বা প্রশাসকদেরকে ঘুষ হিসেবে দিও না।”

তাফসীরে মাদারেকেও এ আয়াতের ‘বাতেল’ শব্দ দ্বারা ঘুষ বা রিশওয়াহ বুঝানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।[6] এতে প্রমাণিত হলো যে, পবিত্র কুরআনে ঘুষের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

আজ আমাদের দেশ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে তালিকার প্রথম দিকে রয়েছে। এই দুর্নীতির নানা রকমের রয়েছে। তবে ঘুষ হচ্ছে প্রধান ও সবচেয়ে ব্যাপক দুর্নীতি। ঘুষের এই ব্যাপকতা কেবল আখিরাতের জন্যই ভয়াবহ নয়; বরং আমাদের এই সামাজিক জীবনেও দুর্ভোগের কারণ।

ঘুষের বিষয়টি এখন আর লুকোছাপা নেই; তা এখন সবারই জানা। বাসে, লঞ্চে, পথে-ঘাটে মানুষ ঘুষের আলাপ করছে। আমাদের আশপাশের লোকজন তা শুনেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না। এ রকম অবস্থার কারণেই আমরা জাতি হিসেবে ক্রমশ বোধহীন হয়ে পড়েছি এবং ভবিষ্যতের অজানা লা‘নত অথবা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি অথবা সন্ত্রাসের আরও প্রকোপ দেখে এক বিরাট ভয় আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু ধর্মের বাণী আজ আমাদের জীবনে বাস্তব রূপ ধরে আসলেও আল্লাহর হুকুম পালন করার প্রতি আমাদের আগ্রহ নেই, যা দুঃখজনক হলেও সত্য। এ হচ্ছে এক ভয়াবহ অবস্থা।

ঘুষ আমাদের জাতীয় উন্নয়নকে ব্যাহত করছে। ঘুষের কারণে মানুষ যোগ্যতার মূল্যায়ণ পাচ্ছে না। ঘুষের চিন্তায় যখন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাথা ঘুরতে থাকে তখন হাতের কলম সিরাতুল মুস্তাকীমে চলে না। ঘুষ হচ্ছে সমাজদেহে নীরব মরণ ব্যাধি। সকল নীতি-নৈতিকতা, সমস্ত আইন-কানুন, বিধি-বিধানকে বিধ্বস্ত করে দেওয়ার জন্য ঘুষ নামক এই নমরুদই দায়ী। এ হচ্ছে এক মরণ ভাইরাস যা আমাদের সমাজের সকল ব্যবস্থাপনাকে নাজেহাল করে দিচ্ছে। এই অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে না পারলে আমাদের উপর আল্লাহর রহমত নাযিল হবে না এবং আমরাও একটি সময় অতীতের নমরূদ, ফিরাউনদের ন্যায় অভিশপ্ত জাতিতে পরিণত হব ও আল্লাহর গজবে ধ্বংস হয়ে যাব। কালব- এর পরিশুদ্ধির জন্য দেহ পরিশুদ্ধ থাকতে হয়। হালাল রুজি বা সৎ উপার্জনকারী আল্লাহর বন্ধু বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন। পক্ষান্তরে অসৎ উপার্জন করে অতি তাড়াতাড়ি সুখের সন্ধান করা আসলে বৃথা। অনেকেই অর্থ উপার্জনে সুবিধাজনক বিষয়ে লেখাপড়া শেষ করেই তার পেশায় এমনভাবে মগ্ন হয় যেন সে পারে তো দু দিনেই বিশাল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়ে যায়। লোকের সেবা করা এবং এজন্য ত্যাগী মনোভাব নিয়ে কাজ করার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক হাদীসে এই তাড়াহুড়া করে অসৎভাবে উপার্জন করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন:

«إن نفسا لا تموت حتى تستكمل رزقها فاتقوا الله وأجملوا في الطلب، ولا يحملنكم استبطاء الرزق أن تطلبوه بمعاصي الله، فإن الله لا يدرك ما عنده إلا بطاعته».

“কোনো প্রাণী তার রিযিক পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত কখনও মরবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় করো এবং আবেদনে সৌন্দর্য বজায় রাখো। তোমার রিযিক ধীরগতিতে আসার কারণে তা আল্লাহর নাফরমানির মাধ্যমে চেয়ো না। কারণ তাঁর নিকট যা আছে তা লাভ করতে হলে তাঁর আনুগত্যের মাধ্যমেই করতে হবে।” (বাযযার, ইবন মাসউদ রা. হতে)

তবে কেউ যদি অন্যের সম্পদ গ্রাস করে তবে তার পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

﴿  فَبِظُلۡمٖ مِّنَ ٱلَّذِينَ هَادُواْ حَرَّمۡنَا عَلَيۡهِمۡ طَيِّبَٰتٍ أُحِلَّتۡ لَهُمۡ وَبِصَدِّهِمۡ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ كَثِيرٗا ١٦٠ وَأَخۡذِهِمُ ٱلرِّبَوٰاْ وَقَدۡ نُهُواْ عَنۡهُ وَأَكۡلِهِمۡ أَمۡوَٰلَ ٱلنَّاسِ بِٱلۡبَٰطِلِۚ وَأَعۡتَدۡنَا لِلۡكَٰفِرِينَ مِنۡهُمۡ عَذَابًا أَلِيمٗا ١٦١ ﴾ [النساء: ١٥٩،  ١٦١]

“যারা ইয়াহূদী ছিল, তাদের যুলুমের কারণে আমরা তাদের ওপর এমন সব পবিত্র বস্তু হারাম করে দিয়েছি, যা ছিল তাদের জন্য হালাল। এছাড়াও আল্লাহর পথে অনেক বাধা দেওয়ার জন্য তা করেছিলাম এবং তারা সুদ গ্রহণের কারণে- যা তাদেরকে নিষেধ করা হয়েছিল এবং অন্যায়ভাবে লোকের ধনসম্পদ গ্রাস করার জন্য। কাফিরদের মর্মন্তুদ শান্তি প্রস্তুত রেখেছি।” (আল-কুরআন, ৪:১৬০-১৬১)

এমনিভাবে অসৎ উপার্জন করে গাড়ি-বাড়ি, বিত্ত-বৈভব, প্রভাব-প্রতিপত্তি লাভ করার যে তীব্র আকাঙ্খা মানুষের মনে জাগে এবং শয়তান এইসব অপকর্মকে আকর্ষণীয় ও লোভনীয় করে সামনে তুলে ধরে, এর পরিণতি দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ!

ইসলামে ঘুষ সম্পূর্ণরূপে হারাম। ঘুষদাতা ও ঘুষগ্রহিতা উভয়ে জাহান্নামী।

তাই আসুন, আমরা তওবা করে ঘুষকে পরিত্যাগ করি, এর বিরুদ্ধাচরণ করি। একে ঘৃণা করি, একে প্রতিরোধ করি। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দিন। আমীন।

বাঁচার উপায়: 

রোগের চিকিৎসার চেয়ে তার প্রতিরোধই হচ্ছে উত্তম ব্যবস্থা। এ জন্য  ঘুষ লেনদেন সংঘটনের পূর্বেই তার সুযোগ ও সম্ভাবনাকে চিরতরে বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ, শিক্ষা -প্রশিক্ষণ  ও বাস্তব ভিত্তিক সর্মসূচীর মাধ্যমে জনগণকে সচেতন করার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়াও নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

ক.আখিরাতের চেতনা জাগ্রতকরণ:

দুনিয়ার জীবনই মানুষের শেষ নয় বরং মৃত্যুর পর মানুষকে আখিরাতের অনন্ত জীবনে প্রবেশ করতে হবে। সেদিন আল্লাহ তা‘আলার দরবারে দুনিয়ার জীবনের প্রতিটি কর্মের হিসাব দিতে হবে। মূলত আখিরাতের চেতনা মানুষের জীবনে নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা পালন করে থাকে। যে ব্যক্তি আখিরাতে সত্যিকার বিশ্বাস করে সে কখনও ঘুষ গ্রহন করতে পারে না। মানুষের দুনিয়ার জীবন হচ্ছে অতি সংক্ষিপ্ত এবং আখিরাতই হচ্ছে অনন্ত জীবন। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে:

﴿ بَلۡ تُؤۡثِرُونَ ٱلۡحَيَوٰةَ ٱلدُّنۡيَا ١٦ وَٱلۡأٓخِرَةُ خَيۡرٞ وَأَبۡقَىٰٓ ١٨ ﴾ [الاعلا: ١٦،  ١٨]

 “বরং তোমরা দুনিয়ার জীবনকে বেশী প্রধান্য দিচ্ছ। অথচ আখিরাত সর্বোত্তম এবং চিরস্থায়ী” (সূরা আল আ‘লা: ১৬-১৭ )

এ চেতনা যখন মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হবে, তখন সে অবশ্যই এ থেকে বিরত থাকবে।

খ.হালাল হারামের দিক-নির্দেশনা দান:

অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্রে জনগণকে হালাল-হারামের দিক নির্দেশনামূলক শিক্ষা প্রদান করা উচিত। কেননা ইসলাম হালাল বা বৈধ বিষয় উপার্জনের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে এবং হারাম উপার্জন বর্জন করার নির্দেশ দিয়েছে, এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿فَكُلُواْ مِمَّا رَزَقَكُمُ ٱللَّهُ حَلَٰلٗا طَيِّبٗا وَٱشۡكُرُواْ نِعۡمَتَ ٱللَّهِ إِن كُنتُمۡ إِيَّاهُ تَعۡبُدُونَ ١١٤﴾ [النحل:114]

“আল্লাহ তোমাদের হালাল এবং পবিত্র যা দিয়েছেন তা হতে তোমরা আহার কর এবং আল্লাহর অনুগ্রহের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, যদি তোমরা কেবল তারই ইবাদত কর।” (সূরা আন নাহল: ১১৪)

রাজনৈতিক ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ অনেক সময় অর্থ আত্মসাৎ করে থাকেন। অবৈধভাবে যে কোনো প্রকার অর্থ আত্মসাৎকে ইসলাম হারাম  ঘোষণা করেছে।

গ. দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতি মুক্ত হওয়া:

চাকুরি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদি সততা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রদান করা জরুরী। কারণ এ সমস্ত চাকুরি প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গের নিকট আমানত। ইসলাম এ সমস্ত আমানত তার যোগ্য প্রাপকদের নিকট পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ ۞إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا ٥٨ ﴾ [النساء: ٥٨]

“নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানত তার যথার্থ মালিককে প্রত্যার্পণ কর।” (সূরা আন-নিসা: ৫৮)

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:

كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ

“তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নেতা তার অধীনস্থদের জন্য জবাবদিহী করবেন।”[7]

ঘ. উপযুক্ত পারিশ্রমিক প্রদানঃ

প্রয়োজনের তুলনায় স্বল্প বেতনের কারণে মানুষ ঘুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে থাকে। এজন্য ইসলাম প্রত্যেককে এমন মজুরি বা বেতন প্রদানের কথা বলেছে যে তা দ্বারা সে তার ন্যায়ানুগ ও স্বাভাবিক প্রয়োজন মেটাতে পারে। শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

«إِنَّ إِخْوَانَكُمْ خَوَلُكُمْ جَعَلَهُمُ اللَّهُ تَحْتَ أَيْدِيكُمْ، فَمَنْ كَانَ أَخُوهُ تَحْتَ يَدِهِ، فَلْيُطْعِمْهُ مِمَّا يَأْكُلُ، وَلْيُلْبِسْهُ مِمَّا يَلْبَسُ، وَلاَ تُكَلِّفُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ، فَإِنْ كَلَّفْتُمُوهُمْ مَا يَغْلِبُهُمْ فَأَعِينُوهُمْ»

“তারা তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন। কারো ভাই তার অধীনে থাকলে তার উচিত নিজে যা খাবে তাই খাওয়াবে। নিজে যা পরবে তাকেও তা পরতে দিবে এবং তাকে দিয়ে এমন কাজ করাবে না যা তার সাধ্যাতীত। কোনভাবে তার উপর আরোপিত বোঝা বেশি হয়ে গেলে নিজেও সে কাজে তাকে সাহায্য করবে।”[8]

ঙ. যোগ্যঅভিজ্ঞ ও সৎ কর্মচারি নিয়োগ দান:

প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ঘুষ ও উৎকোচ গ্রহণের মাধ্যমে অদক্ষ, অনভিজ্ঞ ও অসৎ কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে এসব কর্মকর্তা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েই তার বিনিয়োগকৃত সমুদয় অর্থ উত্তোলনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অতএব প্রশাসনকে ঘুষের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করার জন্য সৎ, বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ লোক নিয়োগ করতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন,

﴿ إِنَّ خَيۡرَ مَنِ ٱسۡتَ‍ٔۡجَرۡتَ ٱلۡقَوِيُّ ٱلۡأَمِينُ ٢٦ ﴾ [القصص: ٢٦]

“তোমার জন্য সর্বোত্তম কর্মচারী হতে পারে সেই ব্যক্তি, যে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত। (সূরা আল কাসাস: ২৬)

﴿ ۞إِنَّ ٱللَّهَ يَأۡمُرُكُمۡ أَن تُؤَدُّواْ ٱلۡأَمَٰنَٰتِ إِلَىٰٓ أَهۡلِهَا﴾ [آل عمران: 58]

এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা যেন আমানত তার মালিককে প্রত্যার্পণ কর।” (সূরা আন নিসা: ৫৮)

এভাবে ইসলাম সৎ, যোগ্য ও বিশ্বস্ত কর্মচারী নিয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি সংঘটনের সম্ভাবনা বন্ধ করে দিতে চায়।

চ.গণসচেতনতা সৃষ্টি:

ঘুষ গ্রহণ এক ধরণের দুর্নীতি। এ দুর্নীতির ভয়াবহতা এবং এর নেতিবাচক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে সকল স্তরের মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। যাতে সমাজের প্রতিটি মানুষ এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে উদ্যোগী হয়। বিষয়টি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কেননা এদেশের জনগণ ধর্মভীরু এবং সরল প্রকৃতির। তাদেরকে যদি ঘুষের ক্ষতিকর প্রভাব এবং তার ইহকালীন ও পরকালীন পরিণতির বিষয় বুঝিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে তা খুব সহজে  প্রতিরোধ সম্ভব। দেশের সকল প্রচার মাধ্যম জনমত ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। এজন্য রেডিও, টেলিভিশনসহ পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে যদি জনগণকে এর কুফল ও ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতন করা যায়, তাহলে তা ঘুষ প্রতিরোধে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারে।

ছ. প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ:

শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণের জন্য জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সর্বনিম্ন পর্যায় পর্যন্ত জবাবদিহিতার নিশ্চিতকরণ অফিস আদালতে ঘুষের লেনদেন প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল। আর তোমরা প্রত্যেকে স্বীয় দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।”[9]

জ. ঘুষগ্রহীতাদের  উপযুক্ত শাস্তি প্রদানঃ

সমাজ থেকে ঘুষ-বাণিজ্য চিরতরে উচ্ছেদ করতে হলে শুধুমাত্র উপদেশ, সতর্কবাণী ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা করেই তার দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না বরং কোনো ব্যক্তি যদি এ কাজে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে তার জন্য শাস্তির ব্যবস্থা করবে, যেন মানুষ শাস্তির পরিণতির ভয়ে ঘুষের লেনদেন থেকে দূরে থাকে।

ঝ.মানুষের অধিকার আদায়ের ব্যপারে সচেষ্ট হওয়া:

ঘুষের মাধ্যমে যে সমস্ত অপরাধ সংঘটিত হয় তার অধিকাংশই মানুষের অধিকার বিষয়ক। যেমন, যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ প্রদান, প্রমোশন প্রদান, সুযোগ-সুবিধা, স্বজনপ্রীতি ও অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ ইত্যাদি। অধিকারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি ক্ষমা না করলে আল্লাহও ক্ষমা করবেন না।

ঞ. সম্পদ অর্জনে ইসলামী নীতি অবলম্বন:

সম্পদের মোহ এবং উচ্চাভিলাষী জীবন-যাপনই ঘুষের লেনদেনের অন্যতম প্রধান কারণ। মানুষ মৃত্যুর কথা এবং আখিরাতকে ভুলে এসবে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এজন্য আল-কুরআনে বারবার মৃত্যু ও আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে বলা হয়েছে, “প্রত্যেক প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫ )

তাছাড়া হাদীসে এসেছে,

«ازْهَدْ فِي الدُّنْيَا يُحِبَّكَ اللَّهُ، وَازْهَدْ فِيمَا فِي أَيْدِي النَّاسِ يُحِبُّكَ النَّاسُ»

“পার্থিব ভোগ-বিলাস পরিত্যাগ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাকে ভালোবাসবেন। আর লোকের কাছে যা আছে তার লালসা পরিত্যাগ কর। তাহলে অন্যরা তোমাকে ভালবাসবেন।”[10]

তাই অর্থ উপার্জনে হালাল-হারামের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।

ট.মানব মর্যাদার মাপকাঠি তাকওয়া:

মানুষ দ্রুত বিত্তের অধিকারী হওয়ার জন্য সাধারণত ঘুষ গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিত্তশালীর চেয়ে বিত্তহীনের বেশী গুরুত্ব প্রদান করেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে মর্যাদার মাপকাঠি অর্থবিত্ত নয় বরং ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে যে যতবেশী তাকওয়াসম্পন্ন বা আল্লাহভীরু, সে ততবেশী মর্যাদাবান। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে,

﴿إِنَّ أَكۡرَمَكُمۡ عِندَ ٱللَّهِ أَتۡقَىٰكُمۡۚ﴾ [الحجرات: ١٣]

নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে সেই আল্লাহর নিকট অধিক সম্মানিত যে অধিক আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বনকারী।” ( সূরা আল-হুজুরাত:১৩)

 

বর্তমানে ঘুষ বাণিজ্য এ দেশকে ধ্বংস ও অধঃপতনের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করছে। অথচ সরকার নির্বিকার। আগামী দিনের সুস্থ-সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠায় এটি অবশ্যই পরিত্যজ্য। এটি যত আলোচিত হবে জনগণ এ বিষয়ে তত সচেতন হবে এবং তার সুফল ভোগে সমর্থ হবে। এ প্রবন্ধে উল্লেখিত পদক্ষেপসমূহ যদি সমাজে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে সমাজ থেকে ঘুষ-দুর্নীতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে। সরকারের উচিত দুর্নীতি দমন কমিশনকে কার্যকরী ও অর্থবহ করার মাধ্যমে ঘুষ-বাণিজ্য প্রতিরোধে এগিয়ে আসা।


[1] হাদীসটি ইবন মাজাহ সংকলন করেছেন, হাদীস নং ২৩১৩।

[2] আবু দাউদ, সুলাইমান ইবন আশআশ, আস-সুনান, ৩য় খন্ড (সিরিয়া, হিমস: দারুল হাদীস, তা.বি), পৃ. ৩৫৩, হাদীস নং-২৯৪৩।

[3] সুবুলুস সালাম, খ. ৪, পৃ. ১২৪।

[4] আহমদ ইবন হাম্বল, আল-মুসনাদ, ২য় খন্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৮৭।

[5] কানযুল উম্মাল, খ. ৩।

[6] খ. ১, পৃ. ৭৬।

[7] ইমাম বুখারী, সহীহুল বুখারী, ২য় খন্ড, বাবুল জুম‘আ ফিল ক্বুরা ওয়াল মুদুন, পৃ. ৫, হাদীস নং- ৮৯৩।

[8] বুখারী, হাদীস নং ২৫৪৫।

[9] ইমাম বুখারী, সহীহুল বুখারী, ২য় খন্ড, বাবুল জুম‘আ ফিল ক্বুরা ওয়াল মুদুন, পৃ. ৫, হাদীস নং- ৮৯৩।

[10] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪১০২।


একশতটি কবীরা গুনাহ:
-------------------------
1. আল্লাহর সাথে শিরক করা
2. নামায পরিত্যাগ করা
3. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া
4. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা
5. পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করা
6. যাদু-টোনা করা
7. এতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা
8. জিহাদের ময়দান থেকে থেকে পলায়ন
9. সতী-সাধ্বী মু‘মিন নারীর প্রতি অপবাদ
10. রোযা না রাখা
11. যাকাত আদায় না করা
12. ক্ষমতা থাকা সত্যেও হজ্জ আদায় না করা
13. যাদুর বৈধতায় বিশ্বাস করা
14. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া
15. অহংকার করা
16. চুগলখোরি করা (ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা আরেকজনের নিকট লাগোনো)
17. আত্মহত্যা করা
18. আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা
19. অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ ভক্ষণ করা
20. উপকার করে খোটা দান করা
21. মদ বা নেশা দ্রব্য গ্রহণ করা
22. মদ প্রস্তুত ও প্রচারে অংশ গ্রহণ করা
23. জুয়া খেলা
24. তকদীর অস্বীকার করা
25. অদৃশ্যের খবর জানার দাবী করা
26. গণকের কাছে ধর্না দেয়া বা গণকের কাছে অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া
27. পেশাব থেকে পবিত্র না থাকা
28. রাসূল (সা:)এর নামে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করা
29. মিথ্যা স্বপ্ন বর্ণনা করা
30. মিথ্যা কথা বলা
31. মিথ্যা কসম খাওয়া
32. মিথ্যা কসমের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করা
33. জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া
34. সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া
35. মানুষের গোপন কথা চুপিসারে শোনার চেষ্টা করা
36. হিল্লা তথা চুক্তি ভিত্তিক বিয়ে করা।
37. যার জন্যে হিলা করা হয়
38. মানুষের বংশ মর্যাদায় আঘাত হানা
39. মৃতের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা
40. মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা
41. মুসলিমকে গালি দেয়া অথবা তার সাথে লড়ায়ে লিপ্ত হওয়া
42. খেলার ছলে কোন প্রাণীকে নিক্ষেপ যোগ্য অস্ত্রের লক্ষ্য বস্তু বানানো
43. কোন অপরাধীকে আশ্রয় দান করা
44. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু জবেহ করা
45. ওজনে কম দেয়া
46. ঝগড়া-বিবাদে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা
47. ইসলামী আইনানুসারে বিচার বা শাসনকার্য পরিচালনা না করা
48. জমিনের সীমানা পরিবর্তন করা বা পরের জমি জবর দখল করা
49. গীবত তথা অসাক্ষাতে কারো দোষ চর্চা করা
50. দাঁত চিকন করা
51. সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে মুখ মণ্ডলের চুল তুলে ফেলা বা চুল উঠিয়ে ভ্রু চিকন করা
52. অতিরিক্ত চুল সংযোগ করা
53. পুরুষের নারী বেশ ধারণ করা
54. নারীর পুরুষ বেশ ধারণ করা
55. বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকানো
56. কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করা
57. পথিককে নিজের কাছে অতিরিক্ত পানি থাকার পরেও না দেয়া
58. পুরুষের টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পোশাক পরিধান করা
59. মুসলিম শাসকের সাথে কৃত বাইআত বা আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করা
60. ডাকাতি করা
61. চুরি করা
62. সুদ লেন-দেন করা, সুদ লেখা বা তাতে সাক্ষী থাকা
63. ঘুষ লেন-দেন করা
64. গনিমত তথা জিহাদের মাধ্যমে কাফেরদের নিকট থেকে প্রাপ্ত সম্পদ বণ্টনের পূর্বে আত্মসাৎ করা
65. স্ত্রীর পায়ু পথে যৌন ক্রিয়া করা
66. জুলুম-অত্যাচার করা
67. অস্ত্র দ্বারা ভয় দেখানো বা তা দ্বারা কাউকে ইঙ্গিত করা
68. প্রতারণা বা ঠগ বাজী করা
69. রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ আমল করা
70. স্বর্ণ বা রৌপ্যের তৈরি পাত্র ব্যবহার করা
71. পুরুষের রেশমি পোশাক এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য পরিধান করা
72. সাহাবীদের গালি দেয়া
73. নামাযরত অবস্থায় মুসল্লির সামনে দিয়ে গমন করা
74. মনিবের নিকট থেকে কৃতদাসের পলায়ন
75. ভ্রান্ত মতবাদ জাহেলী রীতিনীতি অথবা বিদআতের প্রতি আহবান করা
76. পবিত্র মক্কা ও মদীনায় কোন অপকর্ম বা দুষ্কৃতি করা
77. কোন দুষ্কৃতিকারীকে প্রশ্রয় দেয়া
78. আল্লাহর ব্যাপারে অনধিকার চর্চা করা
79. বিনা প্রয়োজনে তালাক চাওয়া
80. যে নারীর প্রতি তার স্বামী অসন্তুষ্ট
81. স্বামীর অবাধ্য হওয়া
82. স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর অবদান অস্বীকার করা
83. স্বামী-স্ত্রীর মিলনের কথা জনসম্মুখে প্রকাশ করা
84. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করা
85. বেশী বেশী অভিশাপ দেয়া
86. বিশ্বাস ঘাতকতা করা
87. অঙ্গীকার পূরণ না করা
88. আমানতের খিয়ানত করা
89. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া
90. ঋণ পরিশোধ না করা
91. বদ মেজাজি ও এমন অহংকারী যে উপদেশ গ্রহণ করে না
92. তাবিজ-কবজ, রিং, সুতা ইত্যাদি ঝুলানো
93. পরীক্ষায় নকল করা
94. ভেজাল পণ্য বিক্রয় করা
95. ইচ্ছাকৃত ভাবে জেনে শুনে অন্যায় বিচার করা
96. আল্লাহ বিধান ব্যতিরেকে বিচার-ফয়সালা করা
97. দুনিয়া কামানোর উদ্দেশ্যে দীনী ইলম অর্জন করা
98. কোন ইলম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে জানা সত্যেও তা গোপন করা
99. নিজের পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে দাবী করা
100. আল্লাহর রাস্তায় বাধা দেয়া

পোস্টটি আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন ।
যাতে করে আপনার সকল বন্ধুরা আপনার কাছে থেকে শিখতে পারে ও জানতে পারে ।
রাসুল (সাঃ) বলেনঃ “তোমাদের উপরে দায়িত্ব দিচ্ছি-- তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি হাদিস হলেও তা প্রচার কর। তবে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত আমার নামে মিথ্যা বলবে, তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম।”
[বুখারী]

একশতটি কবীরা গুনাহ:
-------------------------
1. আল্লাহর সাথে শিরক করা
2. নামায পরিত্যাগ করা
3. পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া
4. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা
5. পিতা-মাতাকে অভিসম্পাত করা
6. যাদু-টোনা করা
7. এতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা
8. জিহাদের ময়দান থেকে থেকে পলায়ন
9. সতী-সাধ্বী মু‘মিন নারীর প্রতি অপবাদ
10. রোযা না রাখা
11. যাকাত আদায় না করা
12. ক্ষমতা থাকা সত্যেও হজ্জ আদায় না করা
13. যাদুর বৈধতায় বিশ্বাস করা
14. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া
15. অহংকার করা
16. চুগলখোরি করা (ঝগড়া লাগানোর উদ্দেশ্যে একজনের কথা আরেকজনের নিকট লাগোনো)
17. আত্মহত্যা করা
18. আত্মীয়তা সম্পর্ক ছিন্ন করা
19. অবৈধ পথে উপার্জিত অর্থ ভক্ষণ করা
20. উপকার করে খোটা দান করা
21. মদ বা নেশা দ্রব্য গ্রহণ করা
22. মদ প্রস্তুত ও প্রচারে অংশ গ্রহণ করা
23. জুয়া খেলা
24. তকদীর অস্বীকার করা
25. অদৃশ্যের খবর জানার দাবী করা
26. গণকের কাছে ধর্না দেয়া বা গণকের কাছে অদৃশ্যের খবর জানতে চাওয়া
27. পেশাব থেকে পবিত্র না থাকা
28. রাসূল (সা:)এর নামে মিথ্যা হাদীস বর্ণনা করা
29. মিথ্যা স্বপ্ন বর্ণনা করা
30. মিথ্যা কথা বলা
31. মিথ্যা কসম খাওয়া
32. মিথ্যা কসমের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয় করা
33. জিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া
34. সমকামিতায় লিপ্ত হওয়া
35. মানুষের গোপন কথা চুপিসারে শোনার চেষ্টা করা
36. হিল্লা তথা চুক্তি ভিত্তিক বিয়ে করা।
37. যার জন্যে হিলা করা হয়
38. মানুষের বংশ মর্যাদায় আঘাত হানা
39. মৃতের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা
40. মুসলিম সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা
41. মুসলিমকে গালি দেয়া অথবা তার সাথে লড়ায়ে লিপ্ত হওয়া
42. খেলার ছলে কোন প্রাণীকে নিক্ষেপ যোগ্য অস্ত্রের লক্ষ্য বস্তু বানানো
43. কোন অপরাধীকে আশ্রয় দান করা
44. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু জবেহ করা
45. ওজনে কম দেয়া
46. ঝগড়া-বিবাদে অশ্লীল ভাষা প্রয়োগ করা
47. ইসলামী আইনানুসারে বিচার বা শাসনকার্য পরিচালনা না করা
48. জমিনের সীমানা পরিবর্তন করা বা পরের জমি জবর দখল করা
49. গীবত তথা অসাক্ষাতে কারো দোষ চর্চা করা
50. দাঁত চিকন করা
51. সৌন্দর্যের উদ্দেশ্যে মুখ মণ্ডলের চুল তুলে ফেলা বা চুল উঠিয়ে ভ্রু চিকন করা
52. অতিরিক্ত চুল সংযোগ করা
53. পুরুষের নারী বেশ ধারণ করা
54. নারীর পুরুষ বেশ ধারণ করা
55. বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কামনার দৃষ্টিতে তাকানো
56. কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করা
57. পথিককে নিজের কাছে অতিরিক্ত পানি থাকার পরেও না দেয়া
58. পুরুষের টাখনুর নিচে ঝুলিয়ে পোশাক পরিধান করা
59. মুসলিম শাসকের সাথে কৃত বাইআত বা আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করা
60. ডাকাতি করা
61. চুরি করা
62. সুদ লেন-দেন করা, সুদ লেখা বা তাতে সাক্ষী থাকা
63. ঘুষ লেন-দেন করা
64. গনিমত তথা জিহাদের মাধ্যমে কাফেরদের নিকট থেকে প্রাপ্ত সম্পদ বণ্টনের পূর্বে আত্মসাৎ করা
65. স্ত্রীর পায়ু পথে যৌন ক্রিয়া করা
66. জুলুম-অত্যাচার করা
67. অস্ত্র দ্বারা ভয় দেখানো বা তা দ্বারা কাউকে ইঙ্গিত করা
68. প্রতারণা বা ঠগ বাজী করা
69. রিয়া বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে সৎ আমল করা
70. স্বর্ণ বা রৌপ্যের তৈরি পাত্র ব্যবহার করা
71. পুরুষের রেশমি পোশাক এবং স্বর্ণ ও রৌপ্য পরিধান করা
72. সাহাবীদের গালি দেয়া
73. নামাযরত অবস্থায় মুসল্লির সামনে দিয়ে গমন করা
74. মনিবের নিকট থেকে কৃতদাসের পলায়ন
75. ভ্রান্ত মতবাদ জাহেলী রীতিনীতি অথবা বিদআতের প্রতি আহবান করা
76. পবিত্র মক্কা ও মদীনায় কোন অপকর্ম বা দুষ্কৃতি করা
77. কোন দুষ্কৃতিকারীকে প্রশ্রয় দেয়া
78. আল্লাহর ব্যাপারে অনধিকার চর্চা করা
79. বিনা প্রয়োজনে তালাক চাওয়া
80. যে নারীর প্রতি তার স্বামী অসন্তুষ্ট
81. স্বামীর অবাধ্য হওয়া
82. স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর অবদান অস্বীকার করা
83. স্বামী-স্ত্রীর মিলনের কথা জনসম্মুখে প্রকাশ করা
84. স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করা
85. বেশী বেশী অভিশাপ দেয়া
86. বিশ্বাস ঘাতকতা করা
87. অঙ্গীকার পূরণ না করা
88. আমানতের খিয়ানত করা
89. প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া
90. ঋণ পরিশোধ না করা
91. বদ মেজাজি ও এমন অহংকারী যে উপদেশ গ্রহণ করে না
92. তাবিজ-কবজ, রিং, সুতা ইত্যাদি ঝুলানো
93. পরীক্ষায় নকল করা
94. ভেজাল পণ্য বিক্রয় করা
95. ইচ্ছাকৃত ভাবে জেনে শুনে অন্যায় বিচার করা
96. আল্লাহ বিধান ব্যতিরেকে বিচার-ফয়সালা করা
97. দুনিয়া কামানোর উদ্দেশ্যে দীনী ইলম অর্জন করা
98. কোন ইলম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে জানা সত্যেও তা গোপন করা
99. নিজের পিতা ছাড়া অন্যকে পিতা বলে দাবী করা
100. আল্লাহর রাস্তায় বাধা দেয়া

পোস্টটি আপনার বন্ধুদের মাঝে শেয়ার করুন ।
যাতে করে আপনার সকল বন্ধুরা আপনার কাছে থেকে শিখতে পারে ও জানতে পারে ।
রাসুল (সাঃ) বলেনঃ “তোমাদের উপরে দায়িত্ব দিচ্ছি-- তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি হাদিস হলেও তা প্রচার কর। তবে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃত আমার নামে মিথ্যা বলবে, তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম।”
[বুখারী]

মাশাআল্লাহ !! 

খুব সুন্দর একটা বানী 

আশাকরি শেয়ার করবেন সবার সাথে।

শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন।



তাকবীরে তাহরীমার পর ইস্তিফতা বা প্রারম্বিক দো‘আগুলি কি কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

«اللهم باعد بيني وبين خطاياي كما باعدت بين المشرق والمغرب، اللهم نقني من خطاياي كما ينقى الثوب الأبيض من الدنس، اللهم أغسلني من خطاياي بالماء والثلج والبرد» (رواه البخاري ومسلم)

১. উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা বা‘ইদ বাইনী ও বাইনা খাতায়াইয়া কামা বাআদতা বাইনাল মাশরিক্বি ওয়াল মাগরিবিআল্লাহুম্মা নাক্কিনী মিন খাতায়াইয়া কামা ইউনাক্কাস সাওবুল আবয়াদু মিনাদ্দানাসিআল্লাহুম্মাগসিলনী মিন খাতায়াইয়া বিল মা-য়ি ওয়াস সালজি ওয়াল বারাদি।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমার এবং আমার গুনাহ্ খাতার মাঝে এমন দূরত্ব সৃষ্টি কর যেরূপ পশ্চিম ও পূর্বের দূরত্ব সৃষ্টি করেছ। হে আল্লাহ! আমাকে আমার গুনাহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার কর যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ! আমার পাপসমূহকে পানি, বরফ ও শিশিরের মাধ্যমে ধৌত করে দাও। (বুখারী-মুসলিম)

«سبحانك اللهم وبحمدك وتبارك اسمك وتعالى جدك ولا إله غيرك» (رواه مسلم)

২. উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবা-রাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা-ইলাহা গাইরুকা। (মুসলিম)

অর্থ: হে আল্লাহ! সকল দোষ হতে তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করছি এবং তোমারই সকল প্রশংসা, তোমার নাম মহিমান্বিত, তোমার মর্যাদা-বড়ত্ব অতি উচ্চে এবং তুমি ব্যতীত সত্যিকার কোনো মা‘বূদ বা উপাস্য নেই।

«وجهت وجهي للذي فطر السموات والأرش حنيفا وما أنا من المشركين، إن صلاتي، ونسكي، ومحياي، ومماتي لله رب العالمين، لا شريك له وبذلك أمرت وأنا من المسلمين اللهم أنت الملك لا إله إلا انت، أنت ربي وانا عبدك، ظلمت نفسي وأعتفت بذنبي فاغفرلي ذنوبي جميعا إنه لا يغفر الذنوب إلا أنت- وأهدني لأحسن الأخلاق لا يهدي لأحسنها إلا أنت، وأصرف عني سيّئها، لا يصرف عني سيئها إلا أنت لبيك وسعديك، والخير كله بيديك، والشر ليس إليك أنا بي وإليك تباركت وتعاليت أستغفرك وأتوب إليك» (رواه مسلم)

৩. উচ্চারণ: ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাযী ফাত্বারাস সামাওয়াতি ওয়াল আরদা হানীফাউঁ ওমা আনা মিনাল মুশরিকীনইন্না সালাতী ওয়া নুসুকী ওয়া মাহ্ইয়ায়া ওয়া মামাতী লিল্লাহি রাব্বিল আলামীনলা-শারীকালাহু ওয়াবিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা মিনাল মুসলিমীন।

আল্লাহুম্মা আনতাল মালিকু লা-ইলাহা ইল্লা আনতাআনতা রব্বী ওয়া আনা আবদুকাযালামতু নাফসী ওয়াতারাফতু বিযানবী ফাগফিরলী যুনূবী জামীয়ান ইন্নাহু লা-ইয়াগফিরুজ্জুনূবা ইল্লা আন্তাওয়াহদিনী লি আহসানিল আখলাক্বি লা-ইয়াহদী লিআহসানিহা ইল্লা আন্তাওয়াস্রিফ ‘আন্নী সাইয়্যিয়াহা লা-য়াসরিফু আন্নী সাইয়্যিয়াহা ইল্লা আন্তালাব্বাইকা ওয়াসাদাইকা, ওয়াল খাইরু কুল্লুহূ বিইয়াদাইকা ওয়াশ শাররু লাইসা ইলাইকাআনা বিকা ওয়া ইলাইকাতাবারাকতা ওয়া তায়ালাইতাআস্তাগফিরুকা ওয়া আতুবু ইলাইকা। (মুসলিম)

অর্থ: আমি সেই আল্লাহ্ তা‘আলার দিকে একনিষ্ঠভাবে চেহারা ফিরাচ্ছি যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। নিশ্চয় আমার নামায, কুরবানী-হজ্জ, জীবন ও মরণ বিশ্বজগতের রব্ব আল্লাহ্‌র জন্য নিবেদিত। তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আর এই জন্যই আমি আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত।

হে আল্লাহ্! তুমি সেই বাদশাহ যে তুমি ব্যতীত সত্যিকার কোনো মা‘বূদ নেই, তুমি আমার রব্ব এবং আমি তোমার বান্দা, নিজের প্রতি যুলুম করেছি এবং আমার গুনাহ স্বীকার করছি। অতএব তুমি আমার যাবতীয় গুনাহ্ মা‘ফ করে দাও আর নিশ্চয় তুমি ছাড়া তো গুনাহ মাফের কেউ নেই। আর তুমি আমাকে উত্তম চরিত্রের দিকে পরিচালিত কর। তুমি ব্যতীত উত্তম চরিত্রের দিকে কেউ পরিচালিত করতে পারে না। আমার চরিত্রের মন্দ গুণাবলী আমার থেকে দূর কর খারাপ গুণাবলী তুমি ব্যতীত কেউ দূরীভূত করতে পারবে না। আমি তোমার ‌আহ্বানে সাড়া দিয়ে তোমার নিকট উপস্থিত। যাবতীয় কল্যাণ তোমার হাতে নিহিত, অকল্যাণ তোমার দিকে সম্পৃক্ত নয়। আমি তোমার জন্য এবং তোমারই দিকে আমার প্রবণতা। তুমি মহিমান্বিত ও অতি উচ্চ, আমি তোমার নিকট ক্ষমা চাই এবং তোমার নিকট তওবা করছি। (মুসলিম)

«اللهم رب جبرائيل، وميكائيل، وإسرافيل فاطر السماوات والأرض، عالم الغيب والشهادة أنت تحكم بين عبادك فيما كانوا فيه يختلفون، إهدني لما اختلف فيه من الحق بإذنك إنك تهدي من تشاء إلى صراط مستقيم» (رواه مسلم)

৪. উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা রব্বা জিবরাঈলা ওয়া মীকাঈলা ওয়া ইসরাফীলা ফাত্বিরাস সামাওয়াতি ওয়ার আরদি আলিমাল গাইবি ওয়াশ্ শাহাদাতি আন্তা তাহকুমু বাইনা ইবা-দিকা ফীমা কা-নূ ফীহি ইয়াখতালিফূনইহদিনী লিমা উখতুলিফা ফীহি মিনাল হাক্বি বিইযনিকাইন্নাকা তাহদী মানতাশা-ঊ ইলা সিরাতিম মুস্তাক্বীম। (মুসলিম)

অর্থ: হে আল্লাহ! জিব্রাঈল, মীকাঈল ও ইস্রাফীলের রব, আকাশসমূহ ও পৃথিবীর স্রষ্টা, গায়েব ও উপস্থিত সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ। তোমার বান্দাগণ যে সব বিষয়ে মতভেদ করে তুমি তার মীমাংসা কর, সত্য থেকে দূরে সরে যে সব বিষয়ে মতভেদ করা হয় সেগুলিতে তোমার সহায়তায় আমাকে সঠিক নির্দেশনা দাও। নিশ্চয় তুমি যাকে ইচ্ছা  সঠিক পথ প্রদর্শন কর। (মুসলিম)


 রুকুর দো‘আ ও যিক্‌র কি কি?..


«سبحان ربي العظيم» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: ‘‘সুবহানা রব্বীয়াল আযীম’’

অর্থ: আমার মহান রব্বের পবিত্রতা বর্ণনা করছি। (মুসলিম)

তিনবার বা তার চেয়ে বেশি বলবে।

«سبحان ربي العظيم وبحمده»

(رواه أحمد وأبو داود والدار قطني والطبراني والبيهقي)

উচ্চারণ: ‘‘সুবহানা রব্বীয়াল আযীম ওয়া বিহামদিহি’’

অর্থ: আমার মহান রব্বের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করছি। (আহমাদ, আবু দাউদ, দারাকুতুনী, ত্ববারানী এবং বায়হাকী)

কেউ যদি বেশি বলতে চায় তো বলবেঃ

«سبحانك اللهم ربنا وبحمدك اللهم اغفر لي» (متفق عليه)

উচ্চারণ: ‘‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা রব্বানা ওয়াবিহামদিকা আল্লাহুম্মাগ ফিরলী।’’

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাদের রব্ব তোমার সকল প্রশংসা বর্ণনা করছি এবং সকল দোষ হতে পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমাকে তুমি ক্ষমা কর। (বুখারী-মুসলিম)

এবং বলবেঃ

«سبوح قدوس رب الملائكة والروح» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: ‘‘সুব্বূহুন কুদ্দূ-সুন রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহ।’’

অর্থ: ফেরেশতামণ্ডলী ও জিবরাঈলের রব্ব সকল দোষত্রুটি থেকে পবিত্র। (মুসলিম)

«اللهُمَّ لَكَ رَكَعْتُ، وَبِكَ آمَنْتُ، وَلَكَ أَسْلَمْتُ، خَشَعَ لَكَ سَمْعِي، وَبَصَرِي، وَمُخِّي، وَعَظْمِي، وَعَصَبِي»

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা রাকাতুওয়া বিকা আ-মান্তু ওয়া লাকা আসলামতুখাশা‘য়া লাকা সাম‘ঈ ওয়া বাসারী ওয়া মুখখী ওয়া ‘আজমী ওয়া ‘আসাবী।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার জন্যই রুকু করি, তোমার প্রতি ঈমান এনেছি এবং তোমার নিকটেই আত্মসমর্পণ করছি, আমার কান, দৃষ্টি, মস্তিষ্ক, হাড় ও মাংশপেশী সকল বস্তু তোমার ভয়ে অবনত হল। (মুসলিম)

«سبحان ذي الجبروت، والملكوت، والكبرياء، والعظمة» (رواه أبو داود والنسائي)

উচ্চারণ: সুবহানা জীল জাবারূতি ওয়াল মালাকূত ওয়াল কিবরিয়ায়ি ওয়াল ‘আজমাহ্।

অর্থ: সকল দোষ হতে পবিত্র যিনি মহাপরাক্রমশালী, বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী, অসীম গৌরব-গরিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। (আবু দাউদ ও নাসায়ী)

 রুকু হতে উঠার দো‘আ কি কি?

(সোজা হয়ে দাঁড়ানো অবস্থায়)

«ربنا ولك الحمد»

উচ্চারণ: রব্বানা ওয়ালাকাল হামদ

«ربنا لك الحمد»

অথবাঃ রব্বানা লাকাল হামদু

«اللهم ربنا لك الحمد»

অথবাঃ রব্বানা লাকাল হামদু

উল্লেখিত সবগুলিই বুখারী-মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।

তবে একেকবার একেকটি পড়বে, যদিও উত্তম হলো নিম্নরূপে বলাঃ

 

«ربنا ولك الحمد حمدا كثيرا طيّبا مباركا فيه ملء السماوات وملء الأرض وملء بينهما وملء ما شئت من شيء بعد أهل الثناء والمجد أحق ما قال العبد وكلنا لك عبد لا مانع لما أعطيت ولا معطي لما منعت ولا ينفع ذا الجد منك الجد» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: রব্বানা ওয়া লাকাল হামদু হামদান কাসীরান ত্বইয়্যিবান মুবারাকান ফীহিমিলয়াস সামাওয়াতি ওয়া মিলয়ালারদি ওয়া মিলয়া মা বায়নাহুমা ওয়া মিলয়া মা-শিতা মিন শাইয়িন বাদুআহলাস সানায়ি ওয়াল মাজদি- আহাক্কু মাক্বলাল আবদু ওয়া কুল্লুনা লাকা আবদুনলা মা-নি‘য়া লিমা আত্বাইতা ওয়ালা মুত্বিয়া লিমা মানাতা ওয়ালা ইয়ানফা‘উ যাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দু। (মুসলিম)

অর্থ: হে আল্লাহ্! তোমারই জন্য সর্ববিধ উত্তম ও বরকতপূর্ণ প্রশংসা যা আকাশসমূহ, পৃথিবী ও উভয়ের মধ্যে যত কিছু রয়েছে সব কিছু পরিপূর্ণ, এগুলি ছাড়াও তুমি যত চাও সমস্ত পরিপূর্ণ প্রশংসা, তুমি সকল স্তুতি ও মর্যাদার অধিকারী। তোমার বান্দা যে প্রশংসা করে তার চেয়ে তুমি অধিক প্রাপ্য, আমরা প্রত্যেকেই তোমার বান্দা, তুমি যা দান কর তা বন্ধ করার কেউ নেই। আর তুমি যা বন্ধ রাখ তা দানকারী কেউ নেই। কোনো সম্মানিত ব্যক্তি সম্মান কাজে আসবে না তোমার নিকট থেকেই প্রকৃত সম্মান। (মুসলিম)

সিজদার দো‘আ ও যিক্‌র

«سبحان ربي الأعلى»

উচ্চারণ: সুবহানা রাব্বিয়াল আলা। (মুসলিম)

«سبحان ربي الأعلى وبحمده»

(رواه أحمد وأبو داود والدار قطني والطبراني والبيهقي)

উচ্চারণ: সুবহানা রবিবয়াল আলা ওয়া বিহামদিহি। (আবু দাউদদারা কুতুনীআহমাদত্ববারানী ও বাইহাকী)

অর্থ: আমার মহান রব্বের প্রশংসাপূর্ণ পবিত্রতা বর্ণনা করছি।

অথবা চাইলে নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বেঃ

«سبحانك اللهم وبحمدك اللهم اغفرلي»

(رواه البخاري ومسلم)

উচ্চারণ: ‘‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা রব্বানা ওয়াবিহামদিকা আল্লাহুম্মাগ্ ফিরলী।’’

অর্থ: হে আল্লাহ! তোমার সকল প্রশংসা বর্ণনা করছি এবং সকল দোষ হতে পবিত্রতা ঘোষণা করছি, আমাকে তুমি ক্ষমা কর। (বুখারী-মুসলিম)

«سبّوح قدّوس رب الملائكة والروح» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: ‘‘সুববূহুন কুদ্দূসুন রব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহ।’’

অর্থ: ফেরেশতামণ্ডলী ও জিবরাঈলের রব্ব সকল দোষত্রুটি থেকে পবিত্র। (মুসলিম)

«سبحان ذي الجبروت، والملكوت، والكبرياء، والعظمة» (رواه أبو داود والنسائي)

উচ্চারণ: সুবহানা যিল জাবারূতি ওয়াল মালাকুত ওয়াল কিবরিয়ায়ি ওয়াল ‘আজামাহ্।

অর্থ: সকল দোষ হতে পবিত্র যিনি মহাপরাক্রমশীল, বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী, অসীম গৌরব-গরিমা ও শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। (আবু দাউদ ও নাসায়ী)

«اللهم إني أعوذ برضاك من سخطك، وبمعافاتك من عقوبتك وأعوذ بك منك لا أحصى ثناء عليك أنت كما أثنيت على نفسك» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযু বিরিদ্বা-কা মিন সাখাতিকাওয়া বিমু‘য়া-ফাতিকা মিন উকূবাতিকাওয়া আউযু বিকা মিনকা লা উহসী সানায়ান ‘আলাইকাআন্তা কামা আসনাইতা আলা নাফসিকা।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার সন্তুষ্টির মাধ্যমে তোমার অসন্তুষ্টি হতে আশ্রয় চাই এবং তোমার ক্ষমার বিনিময়ে তোমার শাস্তি হতে আশ্রয় চাই, তোমার মাধ্যমেই তোমার নিকট হতে আশ্রয় চাই, তোমার গুণগান গেয়ে শেষ করতে পারবো না, তুমি যেভাবে নিজের স্তুতি বর্ণনা করেছে। (মুসলিম)

 «اللهم اغفرلي ذنبي كله، دقّه وجلّه وأوّله وآخره وعلانيّته وسره» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী যাম্বী কুল্লাহু দিক্কাহু ওয়া জিল্লাহু ওয়া আউয়ালাহু ওয়া আখিরাহু ও আলানিয়্যাতাহু ওয়া সির্রাহু।

অর্থ: হে আল্লাহ্! ছোট ও বড় গুনাহ পূর্বের ও পরের গুনাহ এবং প্রকাশ্য ও গোপনীয় সকল গুনাহ খাতা মাফ করে দাও। (মুসলিম)

«اللهم لك سجدت وبك آمنت، ولك أسلمت، سجد وجهي للذي خلقه وصوره وشق سمعه وبصره، تبارك الله أحسن الخالقين» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা লাকা সাজাদতু ওয়া বিকা আ-মানতু ওয়ালাকা আসলামতুসাজাদা ওয়াজহিয়া লিল্লাযী খালাকাহু ওয়া সাওয়ারাহু ওয়া শাক্কা সাম‘য়াহু ওয়া বাসারাহু, তাবারাকাল্লাহু আহসানুল খালিক্বীন।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমাকেই সিজদা করি, তোমার প্রতি ঈমান এনেছি, তোমার নিকটই আত্মসমর্পণ করছি, আমার মুখমণ্ডল তাঁর জন্য সিজদায় অবনমিত যিনি উহা সৃষ্টি করেছেন, প্রতিরূপ দিয়েছেন এবং তার কর্ণ ও চক্ষু আলাদা করে সজ্জিত করেছেন, তিনি মহিমান্বিত আল্লাহ, সর্বোত্তম স্রষ্টা। (মুসলিম)

দুই সিজদার মাঝে বসার দো‘আ কি কি?

«رب اغفرلي، رب اغفرلي»

উচ্চারণ: রব্বিগফিরলীরব্বিগফিরলী।

অর্থ: হে আল্লাহ্! তুমি আমাকে ক্ষমা কর, হে আল্লাহ্ তুমি আমাকে ক্ষমা কর। (আবু দাউদ-ইবনে মাজাহ্)

«اللهم اغفرلي، وارحمني، وعافني واهدني، وارزقني» (رواه أبو داود والترمذي)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলী ওয়ার হামনী ওয়া আফিনী ওয়াহদিনী ওয়ারযুকনী।

অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা কর, আমার প্রতি রহম কর, আমাকে সুস্থতা দান কর, সঠিক পথে পরিচালিত কর এবং রিযিক দান কর। (আবু দাউদ, তিরমিযী)

একটি বর্ণনায় বেশি রয়েছেঃ

«واجبرني» (ওয়াজবুরনী)

অর্থ: আমার ক্ষতিপূরণ কর।

অন্য বর্ণনায় রয়েছেঃ

«وارفعني» (ওয়ারফানী)

অর্থ: আমার মর্যাদা বৃদ্ধি কর। (ইবনে মাজাহ)

 তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু)

তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু)

«التحيات لله والصلوات والطيبات والسلام عليك أيها النبي ورحمة الله وبركاته، السلام علينا وعلى عباد الله الصالحين، أشهد أن لا إله إلا الله وأشهد أن محمدا عبده ورسوله»

«اللهم صل على محمد وعلى آل محمد كما صليت على إبراهيم وعلى آل إبراهيم إنك حميد مجيد، اللهم بارك على محمد وعلى آل محمد كما باركت على إبراهيم وعلى آل إبراهيم إنّك حميد مجيد» (رواه البخاري ومسلم)

উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্ব ত্বাইয়্যিবাতু আস্‌সালামু আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিইয়্যু ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহুআসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস্ সালিহীন। আশহাদু আল্-লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসূলুহু।

আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদ কামা সাল্লাইতা ‘আলা ইবরাহীমা ওয়া আলা আ-লি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।

আল্লাহুম্মা বারিক ‘আলা মুহাম্মাদিন ওয়া ‘আলা আ-লি মুহাম্মাদিন, কামা বা-রাকতা আ-লা ইবরাহীমা ওয়াআলা আ-লি ইবরাহীমা ইন্নাকা হামীদুম্ মাজীদ।

(বুখারী-মুসলিম, এছাড়া অন্য বর্ণনায় কাছাকাছি এভাবেই বর্ণিত হয়েছে।)

অর্থ: সকল সম্মান-সম্ভাষণ, সকল সালাত ও সকল পবিত্রতা আল্লাহ্ তা‘আলার জন্য। হে নবী! আপনার প্রতি শান্তি, রহমত ও বরকত অবতীর্ণ হোক, আমাদের ও নেক বান্দাদের উপর শান্তি অবতীর্ণ হোক, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে ‘‘মুহাম্মাদ’’ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল।

হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি রহমত অবতীর্ণ কর, যেমনভাবে রহমত অবতীর্ণ করেছিলে ইবরাহীম আলাইহিস্ সালাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসনীয় ও মর্যাদাবান।

আত্তাহিয়্যাতু-দরূদের পর সালামের পূর্ব মুহূর্তের দো‘আ কি কি ?

«اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ»

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন আযাবি জাহান্নাম ওয়া মিন আযাবিল ক্বাবরি ওয়ামিন ফিতনাতিল মাহইয়া-ওয়াল মামাত ওয়া মিন শাররি ফিতনাতিল মাসীহিদ্ দাজ্জাল। (বুখারী-মুসলিম)

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি জাহান্নাম ও কবরের আযাব হতে তোমার নিকট আশ্রয় কামনা করছি এবং আশ্রয় কামনা করছি জীবিত অবস্থার ও মৃত্যুর ফিতনা হতে এবং মসীহ দাজ্জালের অনিষ্টকর ফিতনা থেকে।

অন্য বর্ণনায় বেশি রয়েছেঃ

اللهم إني أغوذ بك من المأثم والمغرم (رواه البخاري ومسلم)

উচ্চারণ: ‘‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল মা-সামি ওয়াল মাগরামি’’

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় কামনা করছি পাপকর্ম ও ঋণ থেকে।

اللهم إني ظلمت نفسي ظلما كثيرا ولا يغفر الذنوب إلا أنت فاغفرلي مغفرة من عندك وارحمني إنّك أنت الغفور الرحيم"

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী যালামতু নাফসী যুলমান কাসীরান, ওয়ালা ইয়াগফিরুযযুনূবা ইল্লা আন্তা, ফাগফিরলী মাগফিরাতাম মিন ‘ইনদিকা, ওয়ার হামনী ইন্নাকা আন্তাল গাফূরুর রহীম।

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি নিজের উপর অনেক জুলুম করেছি, আর তুমি ব্যতীত গুনাহ খাতা কেউ ক্ষমাকারী নেই। অতএব তুমি নিজ গুণে আমাকে ক্ষমা করে দাও এবং আমার প্রতি রহম কর কেননা তুমি অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়ালু।

«اللهم اغفرلي ما قدمت، وما أخّرت، وما أسررت، وما أعلنت، وما أسرفت، وما أنت أعلم به مني - أنت المقدم، وأنت المؤخر لا إله إلا أنت» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফিরলি মা ক্বাদ্দামতু ওয়ামা আখ্খারতা ওয়ামা আসরারতু ওয়ামা আলানতু ওয়ামা আন্তাল মুআখ্খিরু লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা। (মুসলিম)

অর্থ: হে আল্লাহ! তুমি আমার সকল গুনাহখাতা ক্ষমা করে দাও যা পূর্বে ও পরে, গোপনে ও প্রকাশ্যে করেছি, যা সীমা লঙ্ঘনজনিত গুনাহ এবং যে সম্পর্কে তুমি আমার চেয়ে অধিক জ্ঞাত। তুমি যা চাও অগ্রগামী কর ও যা চাও পশ্চাতে নিয়ে যাও আর তুমি ব্যতীত প্রকৃত মা‘বূদ বা উপাস্য নেই।

«اللهم إني أعوذ بك من البخل، وأعوذ بك من الجبن، وأعوذ بك أن أرد إلى ارذل العمر، وأعوذ بك من فتنة الدنيا وعذاب القبر» (رواه البخاري)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি আউযুবিকা মিনাল বুখলিওয়া আউযুবিকা মিনাল জুবনিওয়া আউযুবিকা আন উরাদ্দা ইলা আরযালিল উমরেওয়া ফিতনাতিদ দুনিয়া ওয়া আ‘উযু বিকা মিন আযবিল কাবরি। (বুখারী)

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকটে আশ্রয় চাই কৃপণতা, কাপুরুষতা ও আশ্রয় চাই চরম বার্ধক্যে উপনীত হয়ে যাওয়ার এবং আপনার নিকট আশ্রয় চাই পৃথিবীর ফিতনা থেকে ও কবরের আযাব হতে।

«اللهم أعني على ذكرك، وشكرك، وحسن عبادتك» (رواه أبو داؤد والنسائي)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা আয়িন্নী আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা। (আবু দাঊদ-নাসায়ী)

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে তোমার যিক্‌র ও শুকরিয়া জ্ঞাপন এবং উত্তমরূপে ইবাদত করার তাওফীক দাও।

«اللهم إني أسألك الجنة وأعوذ بك من النار» (رواه إبن ماجه وأبو داود)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আ‘ঊযুবিকা মিনান্নার। (ইবনে মাজাহ - আবু দাউদ)

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে জান্নাত প্রার্থনা করছি এবং জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাচ্ছি।


সালামের পর বর্ণিত যিক্‌রসমূহ কি কি?

সালামের পর বর্ণিত যিক্‌র

«استغفر الله استغفر الله استغفر الله»

«اللهم أنت السلام ومنك السلام تباركت يا ذا الجلال والإكرام» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ (তিনবার)

অর্থ: আল্লাহুম্মা আন্তাস সালামু ওয়া মিনকাস সালামুতাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম। (মুসলিম)

অর্থ: আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি। (তিনবার)

হে আল্লাহ! তুমি শান্তিময়, আর তুমিই শান্তির উৎস। হে মহামহিম ও সম্মানের অধিকারী মহিমান্বিত তুমি।

«لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيءٍ قدير»

উচ্চারণ: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহুলাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদীর। (তিনবার) (বুখারী - মুসলিম)

অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্যিকার ইলাহ বা উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা ও রাজত্ব আর তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

«لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيئ قدير، اللهم لا مانع لما أعطيت، ولا معطي لما منعت، ولا ينفع ذا الجد منك الجد» (رواه البخاري ومسلم)

উচ্চারণ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওলাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বদীর। আল্লাহুম্মা লা মানি‘য়া লিমা আ‘ত্বইতা ওয়ালা মুত্বিয়া লিমা মানাতা ওয়ালা ইয়ানফা‘উ যাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দু। (বুখারী - মুসলিম)

অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্যিকার ইলাহ বা উপাস্য নেই। তিনি এক তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা ও রাজত্ব আর তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

হে আল্লাহ্! তুমি যে দান কর তা বন্ধ করার কেউ নেই আর তুমি যা বন্ধ রাখ তা দানকারী কেউ নেই। কোনো সম্মানিত ব্যক্তির সম্মান কাজে আসবে না, তোমার নিকটেই প্রকৃত সম্মান।

«لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك، وله الحمد وهو على كل شيء قدير، لا حول ولا قوّة إلا بالله، لا إله إلا الله، ولا نعبد إلا إيّاه، له النعمة وله الفضل وله الثناء الحسن، لا إله إلا الله مخلصين له الدين ولو كره الكافرون» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহুলাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদীর। লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিলা ইলাহা ইল্লাল্লাহুওয়ালা নাবুদু ইল্লা ইয়্যাহুলাহুন নিমাতু ওয়ালাহুল ফাদলু ওয়ালাহুস সানাউল হাসানুলা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুখলিসীনা লাহুদদ্বীনা ওয়ালাউ কারিহাল কাফিরূন। (মুসলিম)

অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্যিকার ইলাহ বা উপাস্য নেই। তিনি এক তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা ও রাজত্ব আর তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

আল্লাহ তা‘আলার সাহায্য ব্যতীত স্বীয় অবস্থা থেকে পরিবর্তনের ক্ষমতা কারো নেই। আল্লাহ্ ব্যতীত সত্যিকার মা‘বূদ নেই, আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি, তাঁর পক্ষ থেকে যাবতীয় নেয়ামত ও অনুগ্রহ তাই তাঁর জন্যই সকল উত্তম প্রশংসা। আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্রিকার মা‘বূদ নেই, তাঁর দ্বীন আমরা একনিষ্ঠভাবে মান্য করি যদিও কাফেরগণ তা অপছন্দ করে।

«سبحان الله»

‘‘সুবহানাল্লাহ’’ ৩৩ বার

অর্থ: আমি আল্লাহর জন্য যাবতীয় দোষ হতে পবিত্রতা ঘোষণা করছি।

الحمد لله

‘‘আহামদু লিল্লাহ’ ৩৩ বার

অর্থ: সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

الله أكبر

‘‘আল্লাহু আকবার’’ ৩৩ বার

অর্থ: আল্লাহ্ সবার বড়। অতঃপর বলবেঃ

"لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير" (رواه البخاري و مسلم)

উচ্চারণ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহুলাহুল মুলক ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদীর। (তিনবার) (বুখারী - মুসলিম)

অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্যিকার ইলাহ বা উপাস্য নেই। তিনি এক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা ও রাজত্ব আর তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।

অথবাঃ সুবহানাল্লাহ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ ৩৩ বার ও আল্লাহু আকবার ৩৪ বার। (তিরমিযী, নাসায়ী ও ইবনে মাজাহ)

 

 আয়াতুল কুরসী

﴿ ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُۚ لَا تَأۡخُذُهُۥ سِنَةٞ وَلَا نَوۡمٞۚ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيۡءٖ مِّنۡ عِلۡمِهِۦٓ إِلَّا بِمَا شَآءَۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۖ وَلَا يَ‍ُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ ٢٥٥ ﴾ [البقرة: ٢٥٥] 

উচ্চারণ: (আল্লা-হু লা ইলা-হা ইল্লা হুওয়াল হাইয়্যূল কাইয়্যূমু লা তাখুযুহু সিনাতুঁও ওয়ালা নাউম। লাহূ মা-ফিসসামা-ওয়া-তি ওয়ামা ফিল আরদ্বি। মান যাল্লাযী ইয়াশফা‘উ ইনদাহূ ইল্লা বিইযনিহী। ইয়া‘লামু মা বাইনা আইদীহিম ওয়ামা খালফাহুম। ওয়ালা ইয়ুহীতূনা বিশাইইম মিন্ ইলমিহী ইল্লা বিমা শাআ। ওয়াসি‘আ কুরসিয়্যুহুস সামা-ওয়া-তি ওয়াল আরদ্ব। ওয়ালা ইয়াউদুহূ হিফযুহুমা ওয়া হুয়াল ‘আলিয়্যূল ‘আযীম)।

অর্থ: “আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও যমীনে যা রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পিছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর ‘কুরসী’ আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।”

ফরয নামাযের পর উক্ত আয়াতুর কুরসী পড়বে কেননা হাদীসে বর্ণিত হয়েছেঃ ‘‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয নামাযের শেষে আয়াতুল কুরসী পড়বে তার জন্য মৃত্যু ব্যতীত জান্নাতে যাওয়ার আর কোনো বাধা নেই। (নাসায়ী)

‘‘কুল হুয়াল্লাহু আহাদ’’, ‘‘কুল আঊযু বিরাবিবল ফালাক’’ ও ‘‘কুল আঊযু বিরাবিবন্ নাস’’ প্রত্যেক নামাযের শেষে পড়বে।

(আবু দাঊদ, নাসায়ী ও তিরমিযী)

সূরা ইখলাস:


70-(5) بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ      ۝ ﴿قُلْ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ    Ǻ۝ۚ اَللّٰهُ الصَّمَدُ   Ą۝ۚ لَمْ يَلِدْ ڏ وَلَمْ يُوْلَدْ   Ǽ۝ وَلَمْ يَكُنْ لَّهٗ كُفُوًا اَحَدٌ   Ć۝ۧ﴾،

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (ক্বুল হুওয়াল্লা-হু আহাদ। আল্লাহুস্ সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ। ওয়া লাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ)।

রহমান, রহীম আল্লাহর নামে। “বলুন, তিনি আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়। আল্লাহ্ হচ্ছেন ‘সামাদ’ (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী)। তিনি কাউকেও জন্ম দেন নি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয় নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।”

সূরা ফালাক:


بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ      ۝  ﴿قُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ   Ǻ۝ مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ  Ą۝ وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ اِذَا وَقَبَ   Ǽ۝ وَمِنْ شَرِّ النَّفّٰثٰتِ فِي الْعُقَدِ    Ć۝  وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ اِذَا حَسَدَ   Ĉ۝﴾،

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (ক্বুল আ‘উযু বিরব্বিল ফালাক্ব। মিন শাররি মা খালাক্ব। ওয়া মিন শাররি গা-সিক্বিন ইযা ওয়াক্বাব। ওয়া মিন শাররিন নাফফা-সা-তি ফিল ‘উক্বাদ। ওয়া মিন শাররি হা-সিদিন ইযা হাসাদ)।

রহমান, রহীম আল্লাহর নামে। “বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি  ঊষার রবের। তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে। ‘আর অনিষ্ট হতে রাতের অন্ধকারের, যখন তা গভীর হয়। আর অনিষ্ট হতে সমস্ত নারীদের, যারা গিরায় ফুঁক দেয়। আর অনিষ্ট হতে হিংসুকের, যখন সে হিংসা করে।”

সূরা নাস:


بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ   ۝ ﴿قُلْ اَعُوْذُ بِرَبِّ النَّاسِ  Ǻ۝ مَلِكِ النَّاسِ  Ą۝ اِلٰهِ النَّاسِ  Ǽ۝ مِنْ شَرِّ الْوَسْوَاسِ ڏ الْخَنَّاسِ  Ć۝ الَّذِيْ يُوَسْوِسُ فِيْ صُدُوْرِ النَّاسِ   Ĉ۝ مِنَ الْجِنَّةِ وَالنَّاسِ    Č۝ۧ﴾

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (ক্বুল ‘আউযু বিরাব্বিন্না-স। মালিকিন্না-সিইলা-হিন্নাসিমিন শাররিল ওয়াসওয়া-সিল খান্না-সআল্লাযি ইউওয়াসউইসু ফী সুদূরিন না-সিমিনাল জিন্নাতি ওয়ান্না-স।)।

রহমান, রহীম আল্লাহর নামে। “বলুন, আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের, মানুষের অধিপতির, মানুষের ইলাহের কাছে, আত্মগোপনকারী কুমন্ত্রণাদাতার অনিষ্ট হতে; যে কুমন্ত্রণা দেয় মানুষের অন্তরে, জিনের মধ্য থেকে এবং মানুষের মধ্য থেকে।”

«اللهم إنّي أسألك علما نافعا، ورزقا طيبا، وعملا متقبلا» (رواه إبن ماجه)

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নী আসয়ালুকা ইলমান নাফিয়ান ওয়া রিযকান ত্বইয়্যিবান ওয়া আমালান মুতাকাব্বালান। (ইবনে মাজাহ)

অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকটে উপকারী বিদ্যা, পবিত্র রিযিক এবং গ্রহণযোগ্য আমল কামনা করি।

«رب قني عذابك يوم تبعث عبادك» (رواه مسلم)

উচ্চারণ: রব্বি ক্বিনী আযাবাকা ইয়াওমা তুব‘য়াসু ইবাদুকা। (মুসলিম)

অর্থ: হে আল্লাহ! আমাকে তুমি তোমার আযাব হতে বাঁচাও যেদিন তোমার বান্দারা উত্থিত হবে।

ফজর ও মাগরিবের নামাযের পর হলে বলবেঃ

«لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كلّ شيء قدير» (رواه البخاري و مسلم)

উচ্চারণ: লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারীকালাহুলাহুল মুলক ওয়ালাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলাকুল্লি শাইয়্যিন কাদীর। (১০ বার)

অর্থ: আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্যিকার ইলাহ বা উপাস্য নেই। তিনি এক তাঁর কোনো অংশীদার নেই, তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা ও রাজত্ব আর তিনি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান। (তিরমিযী, আহমাদ ও নাসায়ী)

যে সব বিষয় নামাযকে বাতিল করে দেয়

যে সব বিষয় নামাযকে বাতিল করে দেয়:

  1. ইচ্ছাকৃত কথা বলা
  2. সম্পূর্ণ শরীর ক্বিবলার দিক থেকে সরে যাওয়া।
  3. পেশাব-পায়খানার রাস্তা দিয়ে কিছু বের হওয়া।
  4. বিনা প্রয়োজনে অধিক নড়াচড়া করা।
  5. অট্টহাসি দেয়া।
  6. ইচ্ছাকৃত রুকু সিজদা বেশী করা।
  7. ইচ্ছা করে ইমামের আগে যাওয়া।

সুবাহানাল্লাহ, খুব সুন্দর একটি বাণী। 

শেয়ার করতে ভূলবেন না দ্বীনি ভাই ও বোনেরা।


DT--08-04-2014


মুসলিম হওয়ার অপরাধে সুদানে পুড়িয়ে মারা হতভাগা মুসলমানদের লাশের সারি !!
কিভাবে আমি সহ্য করবো এই করুন দৃশ্য ??
ছবি গুলো দেখে মনে হচ্ছে মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত প্রত্যেকটি ভাই-বোন সেজদারত অবস্থায় ছিল !

হে রহিম, রহমান, পরোয়ারদেগার, মহাবিশ্বের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন,...

মুসলিম হওয়ার অপরাধে সুদানে পুড়িয়ে মারা হতভাগা মুসলমানদের লাশের সারি !!
 কিভাবে আমি সহ্য করবো এই করুন দৃশ্য ??
 ছবি গুলো দেখে মনে হচ্ছে মৃত্যুর ঠিক আগে পর্যন্ত প্রত্যেকটি ভাই-বোন সেজদারত অবস্থায় ছিল ! 

হে রহিম, রহমান, পরোয়ারদেগার, মহাবিশ্বের একমাত্র মালিক মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন,
 তুমি আমার এই প্রত্যেকটি মুসলিম ভাই-বোনদের জান্নাতের সর্বোচ্চ আসন দান করো । 
আমীন ।।

শেয়ার করে সবাইকে দেখার সুযোগ করে দিন।


নামাজ প্রসঙ্গ 

৪৪৯ । ইউনুস ইবনু আবদুল আ’লা (রহঃ) -আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) এবং ইবনু হায্‌ম (রহঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ্‌ পাক আমার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেন। আমি ঐ পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট ফিরে আসলাম। তখন মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে জিজ্ঞাসা করেন যে, আপনার প্রতিপালক আপনার উম্মতের উপর কি ফরয করেছেন? তখন আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে বললেন যে, আপনি আবার আপনার প্রতিপালকের নিকট হাযির হোন। কারণ আপনার উম্মত পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায় করতে সক্ষম হবে না। তারপর আমি আমার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত হলাম। আল্লাহ্‌ পঞ্চাশ ওয়াক্ত থেকে কিছু কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে তাঁকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি বললেন, আপনি আবার হাযির হোন। কেননা আপনার উম্মত তা আদায় করতে সক্ষম হবে না। পরে আমি আবার আমার প্রতিপালকের নিকট উপস্থিত হলাম। তখন আল্লাহ্‌ পাক বললেন, এটা (গণনার) পাঁচ কিন্তু (প্রতিদানে) এ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতই পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান এটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। আমার সিদ্ধান্তের পরিবর্তন হয় না। তারপর আমি মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট ফিরে যাই। মূসা (আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আবার আপনার প্রতিপালকের নিকট হাযির হোন। তখন আমি বললাম, আমি আমার মহান প্রতিপালকের নিকট এ বিষয় নিয়ে আবার উপস্থিত হতে লজ্জাবোধ করছি।

সহিহ, তিরমিজি হাঃ ৩৩৪৩, বুখারি হাঃ ৩৪৯, মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার) হাঃ ৩২৩  

সবর (ধৈর্যের) বিবরণ 

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱصۡبِرُواْ وَصَابِرُواْ ﴾ [ال عمران: ٢٠٠] 

অর্থাৎ “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর।” (সূরা আলে ইমরান ২০০ আয়াত)

তিনি আরও বলেন,

﴿وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَيۡءٖ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٥﴾ [البقرة: ١٥٥] 

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধনপ্রাণ এবং ফলের (ফসলের) নোকসান দ্বারা পরীক্ষা করব; আর তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।” (সূরা বাকারাহ ১৫৫ আয়াত)

তিনি আরও বলেন,

﴿ إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ﴾ [الزمر: ١٠] 

অর্থাৎ “ধৈর্যশীলদেরকে তো অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে।” (সূরা যুমার ১০ আয়াত)

তিনি অন্যত্র বলেন,

﴿ وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ٤٣ ﴾ [الشورا: ٤٣] 

অর্থাৎ “অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে, নিশ্চয় তা দৃঢ়-সংকল্পের কাজ।” (সূরা শুরা ৪৩ আয়াত)

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱلصَّبۡرِ وَٱلصَّلَوٰةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٣ ﴾ [البقرة: ١٥٣] 

অর্থাৎ “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন।” (সূরা বাকারাহ ১৫৩ আয়াত)

 তিনি আরো বলেন,

﴿ وَلَنَبۡلُوَنَّكُمۡ حَتَّىٰ نَعۡلَمَ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰبِرِينَ وَنَبۡلُوَاْ أَخۡبَارَكُمۡ ٣١ ﴾ [محمد: ٣١] 

 অর্থাৎ “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে জেনে নিই এবং আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করি।” (সূরা মুহাম্মাদ ৩১ আয়াত)

আয়াতসমূহে ধৈর্যের আদেশ এবং তার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে তার সংখ্যা অনেক ও প্রসিদ্ধ।

 

১/২৬। আবূ মালিক হারিস ইবনে ‘আসেম আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘পবিত্রতা অর্ধেক ঈমান। আর ‘আলহামদু লিল্লাহ’ (কিয়ামতে নেকীর) দাঁড়িপাল্লাকে ভরে দেবে এবং ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আলহামদু লিল্লাহ’ আসমান ও যমীনের মধ্যস্থিত শূন্যতা পূর্ণ করে দেয়। নামায হচ্ছে জ্যোতি। সাদকাহ হচ্ছে প্রমাণ। ধৈর্য হল আলো। আর কুরআন তোমার স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল। প্রত্যেক ব্যক্তি সকাল সকাল সবকর্মে বের হয় এবং তার আত্মার ব্যবসা করে। অতঃপর সে তাকে (শাস্তি থেকে) মুক্ত করে অথবা তাকে (আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত ক’রে) বিনাশ করে।’’[1]


DT--09-04-2014


মুসলিম বিশ্বের ২ নক্ষত্র- কাবা শরীফের ইমাম 

ড. আব্দুর রহমান সুদাইস ও
ড. খালিদ গামদি। 

এই মহান ২ জন ব্যক্তিকে কে কে পছন্দ করেন ??


হে আল্লাহ আমাদের সবাইকে ৫ ওয়াক্ত
নামায পরার তাওফিক দাও । আমিন , আমিন ।

হে আল্লাহ আমাদের সবাইকে ৫ ওয়াক্ত
নামায পরার তাওফিক দাও । আমিন , আমিন ।

  কুতায়বা (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মদ পান করে চল্লিশ ভোর (দিন) পর্যন্ত তার সালাত (নামায) কবুল হয় না। সে তওবা করলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। সে যদি পুনরায় তা পান করে তবে আল্লাহ তা‘আলা চল্লিশ ভোর পর্যন্ত তার সালাত (নামায) কবুল করবেন না। যদি তওবা করে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। আবার যদি সে তা পান করে তবে চল্লিশ ভোর পর্যন্ত তার সালাত (নামায) কবুল করবেন না। কিন্তু সে যদি তওবা করে তবে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। চতুর্থবার আবার সে যদি তা পান করে তবে চল্লিশ ভোর পর্যন্ত তার সালাত (নামায) কবুল করবেন না এবং তওবা করলেও আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন না। পরন্তু তাকে’‘নাহরে খাবাল’’ থেকে পান করাবেন। ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহ-কে বলা হয়ল, হে আবূ আবদুর রহমান,’নাহরে খাবাল’ কি? তিনি বললেন, জাহান্নামীদের পূজের নহর।

এ হাদীসটি হাসান। আবদুল্লাহ ইবন আমর এবং ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহ সূত্রেও নাবী (সাঃ) থেকে অনুরূপ হাদীস বর্ণিত আছে।

DT--10-04-2014


আপুরা, 

নখ পলিশ ব্যবহার করবেন না। 

পোষ্টটি share করলে অনেক বোনের উপকার হবে.




বিষয়/প্রশ্নঃ আমাদের লাইলাতুল ক্বাদ্‌র কিভাবে পালন করা উচিৎ? তা কি সালাত আদায় করার মাধ্যমে নাকি কুরআন তিলাওয়াহ, রাসূলের সীরাহ পাঠ, আদেশ উপদেশ দেওয়া/শোনা ও মাসজিদে অনুষ্ঠান উদযাপন করার মাধ্যমে পালন করতে হবে?

বিবরণ/উত্তরঃ


ফাত্‌ওয়া নং - 36832
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।

প্রথমত: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশদিন এমনভাবে সালাত  আদায়, কুরআন তিলাওয়াহ ও দো‘আ পাঠের মাধ্যমে মনোনিবেশ করতেন যা অন্য সময়ে করতেন না। ‘আয়েশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে ইমাম আল-বুখারী এবং মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে (রমযানের) শেষ দশরাত্রি শুরু হলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে জাগতেন এবং তাঁর পরিবারবর্গকেও জাগাতেন এবং স্ত্রী-মিলন থেকে বিরত থাকতেন। আহমাদ এবং মুসলিম বর্ণনা করেছেন যে :

“তিনি শেষ দশদিন এমনভাবে মনোনিবেশ করতেন যা অন্য সময়ে করতেন না।”

দ্বিতীয়ত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল ক্বাদরে ঈমান সহকারে ও প্রতিদানের আশায় রাত জেগে ‘ইবাদাত করতে উৎসাহিত করেছেন। আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন :

«من قام ليلة القدر إيماناً واحتساباً غفر له ما تقدم من ذنبه»

“ঈমানের সাথে ও প্রতিদানের আশায় যে ব্যক্তি লাইলাতুল ক্বাদরে জেগে ক্বিয়াম করবে, তার অতীতের সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।” [সহীহ  আল-বুখারী ও মুসলিম]

আর এই হাদীসে লাইলাতুল ক্বাদরে রাত জেগে ক্বিয়াম করার শারী‘আতসম্মত হওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা রয়েছে।

তৃতীয়ত: লাইলাতুল ক্বাদরে সবচেয়ে ভালো দো‘আসমূহের মধ্যে একটি পাঠ করা যায় যা ‘আয়েশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিক্ষা দিয়েছিলেন। আত-তিরমিযী এটি ‘আয়েশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণনা করেছেন এবং একে সহীহ  বলে চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন :

আমি বললাম, “হে রাসূলুল্লাহ যদি আমি জানি কোন রাতে লাইলাতুল ক্বাদ্‌র তবে আমি সেই রাতে কি বলব?”

তিনি বললেন, বল:

«اللهم إنك عفو تحب العفو فاعف عني »

“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা ‘আফুউউন তুহিব্বুল ‘আফওয়া ফা ‘ফুউ ‘আন্নী”

(হে আল্লাহ আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমাকে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।)”[1]

চতুর্থত: রমযানে লাইলাতুল ক্বাদরের রাত ঠিক কোনটি, এটি জানার জন্য বিশেষ সাক্ষ্য প্রমাণের প্রয়োজন আছে, কিন্তু শেষ দশদিনের বিজোড় রাতগুলো অন্যান্য রাতের চেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় এবং সাতাশতম রাত (শেষ দশদিনের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে) লাইলাতুল ক্বাদ্‌র হওয়ার ব্যাপারে বেশি সম্ভাবনাময়। যেমনটি আমরা এ ব্যাপারে নির্দেশ করে এমন হাদীসগুলো উল্লেখ করেছি।

পঞ্চমত: আর বিদ‘আত (দ্বীনের মধ্যে নতুন প্রবর্তিত বিষয়) কাজসমূহ, তা কখনই রমযান বা রমযানের বাইরে কোনো সময়েই জায়েয নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন :

«من أحدث في أمرنا هذا ما ليس فيه فهو رد»

“যে আমাদের এই বিষয়ে (শারী‘আতে) নতুন কিছু প্রবর্তন করল যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”[2]

অন্য এক বর্ণনায় আছে,

«من عمل عملاً ليس عليه أمرنا فهو رد»

“যে কোন কাজ করল যা আমাদের বিষয়ের (শারী‘আতের) অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।[3]”

আর রমযানের কিছু নির্দিষ্ট রাতে অনুষ্ঠান উদযাপনের ব্যাপারে কোন ভিত্তি আমাদের জানা নেই। সবচেয়ে ভালো পথ-নির্দেশনা হচ্ছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথ এবং সবচেয়ে খারাপ বিষয় হচ্ছে (শারী‘আতে) নতুন প্রবর্তিত বিষয়সমূহ (বিদ‘আত)।

আর আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।

গবেষণা ও ফাত্‌ওয়া ইস্যুকারী আল-লাজ্‌নাহ আদ-দা’ইমাহ (১০/৪১৩)


[1] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৫১৩। [সম্পাদক]
[2] বুখারী, হাদীস নং ২৬৯৭; মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮। তবে মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছেما ليس منه [সম্পাদক]
[3] মুসলিম, হাদীস নং ১৭১৮।


DT-11-04-2014

সবাইকে জুমআ মোবারক। 

আসুন সবাই এই দিনে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।

প্লিজ সবাই কমেন্ট করে বলুনঃ আমিন



টাইটানিক যিনি বানিয়েছিলেন,
 তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো জাহাজটা কতটুকু
নিরাপদ?

উত্তরে তিনি পরিহাসের সুরে বলেছিলেনঃ
 "এমন কি খোদাও এটাকে ডুবাতে পারবেন না", 
পরের ইতিহাস সবাই জানে।

ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী টেনক্রেডো নেভেস নির্বাচনী প্রচারণার সময় বলেছিলেনঃ "আমার দলের জন্য পাঁচ লাখ ভোট নিশ্চিত। এমন কি খোদাও তো আমাকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরাতে পারবেন না"।

নেভেস ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন বটে কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন
এবং প্রেসিডেন্ট হওয়ার ঠিক একদিন আগে মারা যান।

ব্রাজিলিয়ান কবি-গায়ক এগনোর মিরান্ডা কাজুজা এক বার শো করার
সময় সিগারেটে সুখটান দিয়ে বাতাসে ধোঁয়া ছেড়ে বলেছিলেনঃ "খোদা এটা তোমার জন্য"। 

কাজুজা বত্রিশ বছর বয়সে ফুসফুস ক্যান্সারে ভয়ংকর ও বিভৎস অবস্থায়
মারা যান।

বন্ধুগণ আমি আপনি অনেক সময় আল্লাহকে উপহাস করে রং ডং করে কথা বলে থাকি। তাই এখনি সাবধান হয়ে যান। কারণ তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন তিনিই আমাদের মৃত্যু দিবেন।

পোষ্টটি ভাল লাগলে শেয়ার করবেন।


আল হামদুলিল্লাহ ( Alhamdulillah )'s photo.

  মুহাম্মদ ইবন বাশশার ও মাহমূদ ইবন গায়লান (রহঃ) আসমা বিনত ইয়াযীদ রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনটি ক্ষেত্র ব্যাতিত অসত্য বলা হালাল নয়,

১। স্ত্রীকে সন্তুষ্ট করতে যেয়ে কিছু বলা
২। যুদ্ধের প্রয়োজনে অসত্য বলা
৩। এবং পরস্পর সুসম্পর্ক স্থাপন করতে গিয়ে কিছু অসত্য বলা।

মাহমূদ (রহঃ)  তার বর্ণনায় বলেন, তিনটি ক্ষেত্র ভিন্ন অসত্য বলা ঠিক নয়।

এ হাদীসটি হাসান। ইবন খুছায়মের সূত্র ছাড়া আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহ বর্ণিত এ হাদীসটি সম্পর্কে আমরা অবহিত নই। দাউদ ইবন আবূ হিন্দ (রহঃ)  এ হাদীসটিকে শাহ ইবন হাওশাব-নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূত্রে বর্ণনা করেছেন। এতে আসমা রাদিয়াল্লাহু আনহ-এর উল্লেখ নেই। আবূ কুরায়ব, ইবন আবূ যাইদা-দাউদ ইবন আবূ হিন্দ (রহঃ)  সূত্রে আমার নিকট রিওয়ায়াতটি এরূপ বর্ণনা করেছেন।

এ বিষয়ে আবূ বাকর রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে।

জুম‘আর সুন্নাত:-----

জুম‘আর পূর্বে নির্দিষ্ট কোন সুনণাত ছালাত নেই। মুছল্লী কেবল ‘তাহিইয়াতুল মাসজিদ’ দু’রাক‘আত পড়ে বসবে। অতঃপর সময় পেলে খত্বীব মিম্বরে বসার আগ পর্যন্ত যত খুশী নফল ছালাত আদায় করবে।

জুম‘আর ছালাতের পরে মসজিদে চার রাক‘আত অথবা বাড়ীতে দু’রাক‘আত সুন্নাত আদায় করবে। তবে মসজিদেও চার বা দুই কিংবা দুই ও চার মোট ছয় রাক‘আত সুন্নাত ও নফল পড়া যায়।[মুসলিম, মিশকাত হা/১১৬৬ ‘সুন্নাত ছালাত সমূহ ও তার ফযীলত’ অনুচ্ছেদ-৩০; তিরমিযী হা/৫২২-২৩ ‘জুম‘আ’ অধ্যায়-৪, অনুচ্ছেদ-২৪; মির‘আত ২/১৪৮; ঐ, ৪/১৪২-৪৩।]

ইবনু ওমর (রাঃ) চার রাক‘আত সুন্নাত এক সালামে পড়তেন। তবে দুই সালামেও পড়া যায়।[মির‘আত ৪/২৫৭-৫৮।]

জুম‘আর (খুৎবার) পূর্বে এক সালামে চার রাক‘আত পড়ার হাদীছটি ‘যঈফ’। [ইবনু মাজাহ হা/১১২৯ ‘ছালাত’ অধ্যায়-২, ‘জুম‘আর পূর্বে ছালাত’ অনুচ্ছেদ-৯৪।]


আল্লাহ হাফেজ    কিছু দিন পর আবার দেখা হবে.....


DT-14-04-2014


পহেলা বৈশাখ: ইতিহাস ও বিধি-বিধান


এপ্রিল মাসে আমরা বাংলাদেশীরা একটি উৎসব করে থাকি, তা হলো ১৪ই এপ্রিল। অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ পালন করা। আমাদের দেশে প্রচলিত বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন মূলত ইসলামী হিজরী সনেরই একটি রূপ। ভারতে ইসলামী শাসনামলে হিজরী পঞ্জিকা অনুসারেই সকল কাজকর্ম পরিচালিত হতো। মূল হিজরী পঞ্জিকা চান্দ্র মাসের উপর নির্ভরশীল। চান্দ্র বৎসর সৌর বৎসরর চেয়ে ১১/১২ দিন কম হয়। কারণ সৌর বৎসর ৩৬৫ দিন, আর চান্দ্র বৎসর ৩৫৪ দিন। একারণে চান্দ্র বৎসরে ঋতুগুলি ঠিক থাকে না। আর চাষাবাদ ও এজাতীয় অনেক কাজ ঋতুনির্ভর। এজন্য ভারতের মোগল সম্রাট আকবারের সময়ে প্রচলিত হিজরী চান্দ্র পঞ্জিকাকে সৌর পঞ্জিকায় রূপান্তরিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সম্রাট আকবার তার দরবারের বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লাহ শিরাজীকে হিজরী চান্দ্র বর্ষপঞ্জীকে সৌর বর্ষপঞ্জীতে রূপান্তরিত করার দায়িত্ব প্রদান করেন। ৯৯২ হিজরী মোতাবেক ১৫৮৪ খৃস্টাব্দে সম্রাট আকবার এ হিজরী সৌর বর্ষপঞ্জীর প্রচলন করেন। তবে তিনি ঊনত্রিশ বছর পূর্বে তার সিংহাসন আরোহনের বছর থেকে এ পঞ্জিকা প্রচলনের নির্দেশ দেন। এজন্য ৯৬৩ হিজরী সাল থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু হয়। ইতোপূর্বে বঙ্গে প্রচলিত শকাব্দ বা শক বর্ষপঞ্চির প্রথম মাস ছিল চৈত্র মাস। কিন্তু ৯৬৩ হিজরী সালের মুহাররাম মাস ছিল বাংলা বৈশাখ মাস, এজন্য বৈশাখ মাসকেই বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং ১লা বৈশাখকে নববর্ষ ধরা হয়।

তাহলে বাংলা সন মূলত হিজরী সন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হিজরত থেকেই এ পঞ্জিকার শুরু। ১৪১৫ বঙ্গাব্দ অর্থ রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হিজরতের পর ১৪১৫ বৎসর। ৯৬২ চান্দ্র বৎসর ও পরবর্তী ৪৫৩ বৎসর সৌর বৎসর। সৌর বৎসর চান্দ্র বৎসরের চেয়ে ১১/১২ দিন বেশি এবং প্রতি ৩০ বৎসরে চান্দ্র বৎসর এক বৎসর বেড়ে যায়। এজন্য ১৪৩৩ হিজরী সাল মোতাবেক বাংলা ১৩১৮-১৯ সাল হয়।

মোগল সময় থেকেই পহেলা বৈশাখে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে কিছু অনুষ্ঠান করা হতো। প্রজারা চৈত্রমাসের শেষ পর্যন্ত খাজনা পরিশোধ করতেন এবং পহেলা বৈশাখে জমিদারগণ প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং কিছু আনন্দ উৎসব করা হতো। এছাড়া বাংলার সকল ব্যবসায়ী ও দোকানদার পহেলা বৈশাখে ‘হালখাতা’ করতেন। পহেলা বৈশাখ এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এটি মূলত: রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক বিভিন্ন নিয়ম-কানুনকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে কাজ-কর্ম পরিচালনার জন্য নির্ধারিত ছিল। এ ধরনের কিছু সংঘটিত হওয়া মূলত ইসলামে নিষিদ্ধ বলার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।

কিন্তু বর্তমানে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে এমন কিছু কর্মকান্ড করা হচ্ছে যা কখনোই পূর্ববর্তী সময়ে বাঙালীরা করেন নি; বরং এর অধিকাংশই বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে প্রচণ্ডভাবে সাংঘর্ষিক। পহেলা বৈশাখের নামে বা নববর্ষ উদযাপনের নামে যুবক-যুবতী, কিশোর-কিশোরীদেরকে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। আজ থেকে কয়েক বছর আগেও এদেশের মানুষেরা যা জানত না এখন নববর্ষের নামে তা আমাদের সংস্কৃতির অংশ বানানো হচ্ছে।

বাংলার প্রাচীন মানুষেরা ছিলেন দ্রাবিড় বা সম্মানিত রাসূল নূহ আলাইহিস সালাম-এর বড় ছেলে সামের বংশধর। খৃস্টপূর্ব ১৫০০ সালের দিকে ইয়াফিসের সন্তানদের একটি গ্রুপ আর্য নামে ভারতে আগমন করে। ক্রমান্বয়ে তারা ভারত দখল করে ও আর্য ধর্ম ও কৃষ্টিই পরবর্তীতে ‘‘হিন্দু’’ ধর্ম নামে প্রসিদ্ধি লাভ করে। ভারতের দ্রাবিড় ও অর্নায ধর্ম ও সভ্যতাকে সর্বদা হাইজ্যাক করেছে আর্যগণ। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো ‘‘বাঙালী’’ সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে হাইজ্যাক করা। আর্যগণ বাংলাভাষা ও বাঙালীদের ঘৃণা করতেন। বেদে ও পুরাণে বাংলাভাষাকে পক্ষীর ভাষা ও বাঙালীদেরকে দস্যু, দাসের ভাষা ইত্যাদি বলা হয়েছে। মুসলিম সুলতানগণের আগমনের পরে তারা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। বাঙালী সংস্কৃতি বলতে বাংলার প্রাচীন লোকজ সংস্কৃতি ও মুসলিম সংস্কৃতির সংমিশ্রণ বুঝানো হতো। কিন্তু ক্রমান্বয়ে আর্যগণ ‘‘বাঙালীত্ব’’ বলতে হিন্দুত্ব বলে মনে করেন ও দাবি করেন। ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদিগণ Hindutva অর্থাৎ ভারতীয়ত্ব বা ‘‘হিন্দুত্ব’’ হিন্দু ধর্মত্ব বলে দাবি করেন এবং ভারতের সকল ধর্মের মানুষদের হিন্দু ধর্মের কৃষ্টি ও সভ্যতা গ্রহণ বাধ্যতামূলক বলে দাবি করেন। তেমনিভাবে বাংলায় আর্য পণ্ডিতগণ বাঙালীত্ব বলতে হিন্দুত্ব ও বাঙালী জাতীয়তাবাদ বলতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এবং বাঙালী সংস্কৃতি বলতে হিন্দু সংস্কৃতি বলে মনে করেন। এজন্যই তারা মুসলিমদের বাঙালী বলে স্বীকার করেন না। শরৎচন্দ্রের শ্রীকান্ত গল্পে আমরা দেখেছি যে বাঙালী বলতে শুধু বাঙালী হিন্দুদের বুঝানো হয়েছে এবং মুসলিমদেরকে তাদের বিপরীতে দেখানো হয়েছে। এ মানসিকতা এখনো একইভাবে বিদ্যমান। পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদেরকে ‘‘বাঙালী’’ পরিচয় দিলে বা জাতিতে ‘‘বাঙালী’’ লিখলে ঘোর আপত্তি করা হয়। এ মানসিকতার ভিত্তিতেই ‘‘পহেলা বৈশাখে’’ বাঙালী সংস্কৃতির নামে পৌত্তলিক বা অশ্লীল কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে প্রচার করা হচ্ছে।

এক সময় বাংলা বর্ষপঞ্জি এদেশের মানুষের জীবনের অংশ ছিল। তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য কৃষি ও কর্ম এ পঞ্জিকা অনুসারেই চলত। এজন্য পহেলা বৈশাখ হালখাতা বা অনুরূপ কিছু অনুষ্ঠান ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু বর্তমানে আমাদের জীবনের কোথাও বঙ্গাব্দের কোনো প্রভাব নেই। কাগজে কলমে যাই লেখা হোক, প্রকৃতপক্ষে আমরা নির্ভর করছি খৃস্টীয় পঞ্জিকার উপর। যে বাংলা বর্ষপঞ্জি আমরা বছরের ৩৬৪ দিন ভুলে থাকি, সে বর্ষপঞ্জির প্রথম দিনে আমরা সবাই ‘‘বাঙালী’’ সাজার চেষ্টা করে এ নিয়ে ব্যাপক হইচই করি। আর এ সুযোগে দেশীয় ও বিদেশী বেনিয়াগণ ও আধিপত্যবাদীগণ তাদের ব্যবসা বা আধিপত্য প্রসারের জন্য এ দিনটিকে কেন্দ্র করে বেহায়াপনা, অশ্লীলতা ও অনৈতিকতার প্রচার করে।

পাশ্চাত্য সভ্যতার অনেক ভাল দিক আছে। কর্মস্পৃহা, মানবাধিকার, আইনের শাসন ইত্যাদি অনেক গুণ তাদের মধ্যে বিদ্যমান। পাশাপাশি তাদের কিছু দোষ আছে যা তাদের সভ্যতার ভাল দিকগুলি ধ্বংস করে দিচ্ছে। এ দোষগুলির অন্যতম হলো মাদকতা ও অশ্লীলতা। আমরা বাংলাদেশের মানুষের পাশ্চাত্যের কোনো ভালগুণ আমাদের সমাজে প্রসার করতে পারি নি বা চাই নি। তবে তাদের অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও মাদকতার ধ্বংসাত্মক দিকগুলি আমরা খুব আগ্রহের সাথে গ্রহণ করতে ও প্রসার করতে চাচ্ছি। এজন্য খৃস্টীয় ক্যালেন্ডারের শেষ দিনে ও প্রথম দিনে থার্টিফার্স্ট নাইট ও নিউ-ইয়ারস ডে বা নববর্ষ উপলক্ষ্যে আমাদের বেহায়পনার শেষ থাকে না।

পক্ষান্তরে, আমাদের দেশজ সংস্কৃতির অনেক ভাল দিক আছে। সামাজিক শিষ্টাচার, সৌহার্দ্য, জনকল্যাণ, মানবপ্রেম ইত্যাদি সকল মূল্যবোধ আমরা সমাজ থেকে তুলে দিচ্ছি। পক্ষান্তরে দেশীয় সংস্কৃতির নামে অশ্লীলতার প্রসার ঘটানো হচ্ছে।

বেপর্দা, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, মাদকতা ও অপরাধ একসূত্রে বাধা। যুবক-যুবতীদেরকে অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার সুযোগ দিবেন, অথচ তারা অশ্লীলতা, ব্যভিচার, এইডস, মাদকতা ও অপরাধের মধ্যে যাবে না, এরূপ চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। অন্যান্য অপরাধের সাথে অশ্লীতার পার্থক্য হলো কোনো একটি উপলক্ষ্যে একবার এর মধ্যে নিপতিত হলে সাধারণভাবে কিশোর-কিশোরী ও যুবক-যুবতীরা আর এ থেকে বেরোতে পারে না। বরং ক্রমান্বয়ে আরো বেশি পাপ ও অপরাধের মধ্যে নিপতিত হতে থাকে। কাজেই নিজে এবং নিজের সন্তান ও পরিজনকে সকল অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করুন।

আল্লাহ বলেছেন: ‘‘তোমরা নিজেরা জাহান্নাম থেকে আত্মরক্ষা কর এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর। যার ইন্দন হবে মানুষ ও পাথর; যার উপর নিয়োজিত রয়েছেন কঠোর হৃদয় সম্পন্ন ফিরিশতাগণ, তারা আল্লাহ যা নির্দেশ করেন তা বাস্তবায়নে অবাধ্য হোন না, আর তাদের যা নির্দেশ প্রদান করা হয়, তা-ই তামিল করে’’। [সূরা আত-তাহরীম: ৬]

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘‘তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বপ্রাপ্ত এবং তোমাদের প্রত্যেককেই তার দায়িত্বাধীনদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে, রাষ্ট্রনেতা তার প্রজাদের সম্পর্কে দায়িত্বশীল আর তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পুরুষ লোক তার পরিবারের ব্যাপারে দায়িত্বশীল, তাকে তাদের পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন মহিলা তার স্বামীর ঘরের সার্বিক ব্যাপারে দায়িত্বশীলা, তাকে সেটার পরিচালনার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। একজন পরিচারক তার মালিকের সম্পদের সংরক্ষক, আর তাকে সেটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।” (বুখারী : ৮৯৩; মুসলিম: ১৮২৯)

প্রিয় পাঠক ! পহেলা বৈশাখ বা অন্য কোনো উপলক্ষ্যে ছেলেমেয়েদেরকে বেপর্দা ও বেহায়পনার সুযোগ দিবেন না। তাদেরকে বুঝান ও নিয়ন্ত্রণ করুন। আপনি মসজিদে নামায আদায় করছেন আর আপনার ছেলেমেয়ে পহেলা বৈশাখের নামে বেহায়াভাবে মিছিল বা উৎসব করে বেড়াচ্ছে। আপনার ছেলেমেয়ের পাপের জন্য আপনার আমলনামায় গোনাহ জমা হচ্ছে। শুধু তাই নয়। অন্য পাপ আর অশ্লীলতার পার্থক্য হলো, যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-সন্তানদের বেহায়াপনা ও অশ্লীলতার সুযোগ দেয় তাকে ‘‘দাইউস’’ বলা হয় এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বারংবার বলেছেন যে, “তিন ব্যক্তি আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাত হারাম করেছেন, মাদকাসক্ত, পিতা-মাতার অবাধ্য এবং দাইউস, যে তার পরিবারের মধ্যে ব্যভিচারকে প্রশ্রয় দেয়” (মুসনাদে আহমাদ: ২/৬৯)

নিজেকে এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করার পাশাপাশি মুমিনের দায়িত্ব হলো সমাজের মানুষদেরকে সাধ্যমত ন্যায়ের পথে ও অন্যায়ের বর্জনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। কাজেই পহেলা বৈশাখ ও অন্য যে কোনো উপলক্ষ্যে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার ক্ষতি, অন্যায় ও পাপের বিষয়ে সবাইকে সাধ্যমত সচেতন করুন। যদি আপনি তা করেন তবে কেউ আপনার কথা শুনুক অথবা না শুনুক আপনি আল্লাহর কাছে অফুরন্ত সাওয়াব লাভ করবেন। আর যদি আপনি তা না করেন তবে এ পাপের গযব আপনাকেও স্পর্শ করবে। কুরআন ও হাদীসে বিষয়টি বারংবার বলা হয়েছে।

ব্যবসায়িক, প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক কোনো স্বার্থে অনেক মুসলিম পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে ছেলেমেয়েদের অবাধ মেলামেশা ও বেহায়াপনার পথ খুলে দেওয়ার জন্য মিছিল, মেলা ইত্যাদির পক্ষে অবস্থান নেন। আপনার দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য এরচেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছুই হতে পারে না। অশ্লীলতা প্রসারের ভয়ঙ্কর পাপ ছাড়াও ভয়ঙ্কর শাস্তির কথা শুনুন:

‘‘যারা চায় যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রচার ঘটুক তাদের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আর আল্লাহ জানেন, তোমরা জান না।’’ (সূরা নূর: ১৯)

সাবধান হোন! সতর্ক হোন! আপনি কি আল্লাহর সাথে পাল্লা দিবেন? আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে আপনি কি জয়ী হবেন? কখন কিভাবে আপনার ও আপনার পরিবারের জীবনে ‘‘যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি’’ নেমে আসবে তা আপনি বুঝতেও পারবেন না। আপনার রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়িক বা অন্য কোনো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য অন্য পথ দেখুন। অন্য বিকল্প চিন্তা করুন। তবে কখনোই অশ্লীলতা প্রসার ঘটে এরূপ কোনো বিষয়কে আপনার স্বার্থ উদ্ধারের বাহন বানাবেন না।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে হেফাযত করুন। আমীন!!
লেখকঃ আ.স.ম শো‘আইব আহমাদ | সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া


বর্ষবরণ নয়, এ এক সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক যুদ্ধ:

বর্ষবরণ নয়, এ এক সুস্পষ্ট সাংস্কৃতিক যুদ্ধ:

সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার প্রভাবশালী সদস্য ফতেহ্‌উল্লাহ্‌ সিরাজ বাংলা সনের প্রবর্তক ছিলেন। সেই সনের প্রথম দিনটি বর্ষ বরণের নামে যা করা হয়, তার সকল আয়োজনের উৎপত্তি হল মন্দির। আমি বাঙ্গলাভাষাভাষী হওয়ায় যেমন বাঙ্গালী, ইসলামের অনুসারী হিসেবে মুসলিমও। বাঙ্গালিত্ব টেকানোর সাথে (বিজাতীয়) কৃষ্টি অনুকরণের কোন সম্পর্ক নেই, বরং মুসলমানিত্ব রক্ষার জন্য ভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের অনুকরণ না করাও অপরিহার্য।

বাঙালি উৎসবের লেবাস পরিয়ে হিন্দুদের নানা পূজা-অর্চনাকে সার্বজনীন রূপ দেয়ার অপর নাম হল পহেলা বৈশাখ উদযাপন বা বাংলা নববর্ষ বরণ। ইসলাম বৈরীদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার বদৌলতে ইতোমধ্যে হিন্দুদের বহুমাত্রিক পূজা এখন মুসলিম বাঙালীদের কাছেও নিছক বর্ষবরণ অনুষ্ঠান!!
নিন্মে বাঙলা বর্ষবরণের নামে পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতি বর্জনের ৬টি কারণ উল্লেখ করা হল:

পহেলা বৈশাখ পালনের নমূনা!

প্রথম কারণ হলতথাকথিত বাঙ্গালী চেতনার নামে প্রচারিত পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতির আগাগোড়া হিন্দু ধর্মের

আচার অনুষ্ঠানের নকল বা ফটোকপি। গণেশ পূজার ‘মঙ্গল যাত্রা’ থেকে নেওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা, ‘চৈত্র সংক্রান্তি পূজা’ থেকে নেওয়া চৈত্রসংক্রান্তি, হিন্দু-বৌদ্ধদের ‘উল্কি পূজা’ থেকে নেওয়া উল্কি উৎসব, বিভিন্ন হিংস্র-অহিংস্র জীব-জন্তু পূজা থেকে নেওয়া রাক্ষস-খোক্কসের মুখোশ ও পশু-পাখীর প্রতিমা নিয়ে উৎসব, হিন্দুদের ‘আশ্বিনে রান্না কার্তিকে খাওয়া’ প্রথার আদলে চৈত্রের শেষদিনে রান্না করা অন্নে জল ঢেলে পহেলা বৈশাখের সকালে পান্তা খাওয়ার প্রথা এবং পুজোর অপরিহার্য আইটেম ঢোল-তবলা, কুলা ও হিন্দু রমণীর লাল সিঁদুরের অবিকল লাল টিপ-পুজোর লেবাস শাদা শাড়ী ইত্যাদি হল পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রধান উপাদান!! অথচ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- যে ব্যক্তি কোন ধর্মের মানুষের (ধর্মীয় আচারের) অনুকরণ বা সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে। -সুনানে আবু দাঊদ
দ্বিতীয় কারণ-উল্কি অঙ্কন। নাসাঈর বর্ণনা মতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- “উল্কি অঙ্কনকারিনী ও যার গায়ে অঙ্কন করা হয়- উভয়ের প্রতি আল্লাহর লা’নত বর্ষণ হয়।” তাছাড়া এতে আল্লাহর সৃষ্টির পরিবর্তন করা হয়, যা কুরআনের নির্দেশনা মতে হারাম। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতেও উল্কি অঙ্কন ত্বকের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। আর ইচ্ছাকৃত স্বাস্থ হানী করাও ইসলামে নিষিদ্ধ।

নব বর্ষ পালনের প্রস্তুতি চলছে!!

তৃতীয় কারণ-গান-বাদ্য। গান ও ঢোল তবলা ছাড়া পহেলা বৈশাখ হয় না। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- আমার উম্মতের কিছু লোক এমন হবে, যারা যেনা, (পুরুষদের জন্য) সিল্ক, মদ ও বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।–বোখারী। তাছাড়া পুজোর অন্যতম উপাদান হল গান ও ঢোল তবলা বাজানো।
চতুর্থ কারণ-নির্লজ্জতা ও অশ্লীলতা চর্চা। শালীন মেয়েরাও পহেলা বৈশাখের নামে অর্ধ নগ্ন হয়ে বের হয়। গরমের দিনে তথাকথিত পহেলা বৈশাখের সাদা শাড়ি ঘামে ভিজে শরীরে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অত্যন্ত নোংরা ভাবে প্রকাশিত হয়। তাছাড়াও নারী পুরুষ ঢলাঢলির মাধ্যমে ব্যভিচারের সবচে বড় ক্ষেত্র তৈরি হয় পহেলা বৈশাখের সংস্কৃতিতে। পান্তা-ইলিশের সাথে ইদানীং যোগ হয়েছে, যুবতী মেয়েদের হাতে খেয়ে মনের নোংরা চাহিদা মেটানো। উল্কি অঙ্কনের ক্ষেত্রেও বিপরীত লিঙ্গের হাত ব্যবহার করা হয়।, যা প্রকাশ্য অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতা।
পঞ্চম কারণ-পহেলা বৈশাখকে ঈদের মতো মর্যাদা দিয়ে জাতীয়ভাবে নতুন পোশাক ও আকর্ষণীয় খাবার গ্রহণের কালচার সৃষ্টি করা হয়। এমনকি এও বলা হয় যে, এটা নাকি বাঙালীর সবচে বড় জাতীয় উৎসব। তাহলে ঈদ কতো নাম্বার সিরিয়ালে? অথচ মুসলমানের জাতীয় জীবনে দু’টি উৎসব দেওয়া হয়েছে।হিন্দুদের বারো মাসে ১৩ পূজার আদলে কোন মুসলমানের জন্য পহেলা বৈশাখকে আরেকটি বাৎসরিক উৎসবের দিন ধার্য করা জায়েজ নেই। বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের অতি তোড়জোড় দেখে মনে হয়, তারা এটাকে এদেশের মানুষের প্রধান উৎসব হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে এবং আজকাল প্রকাশ্যে ঘোষণাও করছে।
ষষ্ঠ কারণ-জীবন থেকে একটি বছর খসে পড়ার মহামূল্যবান ক্ষণে আত্ম জিজ্ঞাসা না করে ফুর্তি করে প্রকারান্তরে পরকালকে ভুলে বসা। আল্লাহকে না ডেকে মুশরিকদের মতো হাস্যকর ভাবে বৈশাখকে ডাকতে থাকা। যার ফলে প্রতিবছরই বৈশাখ আগমন করে কাল বৈশাখের ঝড় নিয়ে। বৈশাখকে আমরা না ডাকলেও সে আসবে। তবুও বৈশাখের রবকে না ডেকে অযথা বৈশাখকে ডাকার ফলে প্রতি বছরই বৈশাখ আসে কাল বৈশাখীর ঝড় নিয়ে! আল্লাহ আমাদের সুবোধ দান করুন। -আহমাদুল্লাহ


ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা নববর্ষ উদযাপন: মুসলিমদের করণীয় -১


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

ভূমিকা: নববর্ষ, বর্ষবরণ, পহেলা বৈশাখ – এ শব্দগুলো বাংলা নতুন বছরের আগমন এবং এ উপলক্ষে আয়োজিত উৎসব-অনুষ্ঠানাদিকে ইঙ্গিত করে। এই উৎসবকে প্রচার মাধ্যমসমূহে বাঙালির ঐতিহ্য হিসেবে রঞ্জিত করা হয়ে থাকে। তাই জাতিগত একটি ঐতিহ্য হিসেবে এই উৎসবকে এবং এর সাথে সম্পৃক্ত কর্মকান্ডকে সমর্থন যোগানোর একটা বাধ্যবাধকতা অনুভূত হয় সবার মনেই – এ যে বাঙালি জাতির উৎসব! তবে বাংলাদেশে বসবাসরত বাঙালি জাতির শতকরা ৮৭ ভাগ লোক আবার মুসলিমও বটে, তাই স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে: নববর্ষ উদযাপন এবং সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানাদি যেমন: রবীন্দ্রসংগীতের মাধ্যমে বর্ষবরণ, বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূলে পান্তা-ইলিশের ভোজ, জীবজন্তু ও রাক্ষস-খোক্কসের প্রতিকৃতি নিয়ে গণমিছিল – এবং এতদুপলক্ষে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, হাসিঠাট্টা ও আনন্দ উপভোগ, সাজগোজ করে নারীদের অবাধ বিচরণ ও সৌন্দর্যের প্রদর্শনী, সহপাঠী সহপাঠিনীদের একে অপরের দেহে চিত্রাংকন(যেমন এখানে দেখুন) এসবকিছু কতটা ইসলাম সম্মত? ৮৭ ভাগ মুসলিম যে আল্লাহতে বিশ্বাসী, সেই আল্লাহ কি মুসলিমদের এইসকল আচরণে আনন্দ-আপ্লুত হন, না ক্রোধান্বিত হন? নববর্ষকে সামনে রেখে এই নিবন্ধে এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে

ইসলাম ধর্মে উৎসবের রূপরেখা:

আমরা অনেকে উপলব্ধি না করলেও, উৎসব সাধারণত একটি জাতির ধর্মীয় মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত হয়। উৎসবের উপলক্ষগুলো খোঁজ করলে পাওয়া যাবে উৎসব পালনকারী জাতির ধমনীতে প্রবাহিত ধর্মীয় অনুভূতি, সংস্কার ও ধ্যান-ধারণার ছোঁয়া। উদাহরণস্বরূপ খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন তাদের বিশ্বাসমতে স্রষ্টার পুত্রের জন্মদিন। মধ্যযুগে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নববর্ষ পালিত হতো ২৫শে মার্চ, এবং তা পালনের উপলক্ষ ছিল এই যে, ঐ দিন খ্রীস্টীয় মতবাদ অনুযায়ী মাতা মেরীর নিকট ঐশী বাণী প্রেরিত হয় এই মর্মে যে, মেরী ঈশ্বরের পুত্রের জন্ম দিতে যাচ্ছেন। পরবর্তীতে ১৫৮২ সালে গ্রেগরীয়ান ক্যালেন্ডারের সূচনার পর রোমক ক্যাথলিক দেশগুলো পয়লা জানুয়ারী নববর্ষ উদযাপন করা আরম্ভ করে। ঐতিহ্যগতভাবে এই দিনটি একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই পালিত হত। ইহুদীদের নববর্ষ ‘রোশ হাশানাহ’ ওল্ড টেস্টামেন্টে বর্ণিত ইহুদীদের ধর্মীয় পবিত্র দিন সাবাত হিসেবে পালিত হয়। এমনিভাবে প্রায় সকল জাতির উৎসব-উপলক্ষের মাঝেই ধর্মীয় চিন্তা-ধারা খুঁজে পাওয়া যাবে। আর এজন্যই ইসলাম ধর্মে নবী মুহাম্মাদ (সা.) পরিষ্কারভাবে মুসলিমদের উৎসবকে নির্ধারণ করেছেন, ফলে অন্যদের উৎসব মুসলিমদের সংস্কৃতিতে প্রবেশের কোন সুযোগ নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:

“প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।” (বুখারী, মুসলিম)

বিখ্যাত মুসলিম পণ্ডিত ইমাম ইবনে তাইমিয়া এ সম্পর্কে বলেন:

“উৎসব-অনুষ্ঠান ধর্মীয় বিধান, সুস্পষ্ট পথনির্দেশ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরই একটি অংশ, যা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন:

‘তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটি নির্দিষ্ট বিধান এবং সুস্পষ্ট পথ নির্ধারণ করেছি।’ (সূরা আল-মায়িদাহ, ৫:৪৮)

‘প্রতিটি জাতির জন্য আমি ধর্মীয় উপলক্ষ নির্দিষ্ট করে দিয়েছি যা তাদেরকে পালন করতে হয়।’ (সূরা আল-হাজ্জ্ব, ২২:৬৭)

যেমনটি কিবলাহ, সালাত এবং সাওম ইত্যাদি। সেজন্য তাদের [অমুসলিমদের] উৎসব-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়া আর তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। এই উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের সাথে একমত পোষণ করা। আর এসবের একাংশের সাথে একমত পোষণ করা অর্থ কুফরের শাখাবিশেষের সাথে একমত হওয়া। উৎসব-অনুষ্ঠানাদি স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের অধিকারী যার দ্বারা ধর্মগুলোকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায়।…নিঃসন্দেহে তাদের সাথে এসব অনুষ্ঠান পালনে যোগ দেয়া একজনকে কুফরের দিকে নিয়ে যেতে পারে। আর বাহ্যিকভাবে এগুলোতে অংশ নেয়া নিঃসন্দেহে পাপ। উৎসব অনুষ্ঠান যে প্রতিটি জাতির স্বকীয় বৈশিষ্ট্য, এর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.) ইঙ্গিত করেছেন, যখন তিনি বলেন: ‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব ঈদ রয়েছে, আর এটা আমাদের ঈদ।’ (বুখারী, মুসলিম)”

এছাড়া আনাস ইবনে মালিক(রা.) বর্ণিত:

“রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন [মদীনায়] আসলেন, তখন তাদের দুটো উৎসবের দিন ছিল। তিনি (সা.) বললেন, ‘এ দুটো দিনের তাৎপর্য কি?’ তারা বলল, ‘জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ দুটো দিনে উৎসব করতাম।’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে এদের পরিবর্তে উত্তম কিছু দিয়েছেন: ইয়াওমুদ্দুহা ও ইয়াওমুল ফিতর ।’” (সূনান আবু দাউদ)

এই হাদীস থেকে দেখা যাচ্ছে যে, ইসলাম আগমনের পর ইসলাম বহির্ভূত সকল উৎসবকে বাতিল করে দেয়া হয়েছে এবং নতুনভাবে উৎসবের জন্য দুটো দিনকে নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই সাথে অমুসলিমদের অনুসরণে যাবতীয় উৎসব পালনের পথকে বন্ধ করা হয়েছে।

ইসলামের এই যে উৎসব – ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এগুলো থেকে মুসলিম ও অমুসলিমদের উৎসবের মূলনীতিগত একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্পষ্ট হয়, এবং এ বিষয়টি আমাদের খুব গুরুত্বসহকারে লক্ষ্য করা উচিৎ, তা হচ্ছে:

অমুসলিম, কাফির কিংবা মুশরিকদের উৎসবের দিনগুলো হচ্ছে তাদের জন্য উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দিন, এদিনে তারা নৈতিকতার সকল বাঁধ ভেঙ্গে দিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়, আর এই কর্মকান্ডের অবধারিত রূপ হচ্ছে মদ্যপান ও ব্যভিচার। এমনকি খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের বহুলোক তাদের পবিত্র বড়দিনেও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে মদ্যপ হয়ে ওঠে, এবং পশ্চিমা বিশ্বে এই রাত্রিতে বেশ কিছু লোক নিহত হয় মদ্যপ অবস্থায় গাড়ী চালানোর কারণে।

অপরদিকে মুসলিমদের উৎসব হচ্ছে ইবাদতের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই বিষয়টি বুঝতে হলে ইসলামের সার্বিকতাকে বুঝতে হবে। ইসলাম কেবল কিছু আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়, বরং তা মানুষের গোটা জীবনকে আল্লাহর সন্তুষ্টি অনুযায়ী বিন্যস্ত ও সজ্জিত করতে উদ্যোগী হয়। তাই একজন মুসলিমের জন্য জীবনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ইবাদত, যেমনটি কুরআনে আল্লাহ ঘোষণা দিচ্ছেন:

“আমি জ্বিন ও মানুষকে আমার ইবাদত করা ছাড়া অন্য কোন কারণে সৃষ্টি করিনি।” (সূরা আয যারিয়াত, ৫১:৫৬)

সেজন্য মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়, বরং তা নিহিত হচ্ছে আল্লাহর দেয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে, কেননা মুসলিমের ভোগবিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়, বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখিরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালবাসা।

তাইতো দেখা যায় যে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা – এ দুটো উৎসবই নির্ধারণ করা হয়েছে ইসলামের দুটি স্তম্ভ পালন সম্পন্ন করাকে কেন্দ্র করে। ইসলামের চতুর্থ স্তম্ভ সাওম পালনের পর পরই মুসলিমরা ঈদুল ফিতর পালন করেন, কেননা এই দিনটি আল্লাহর আদেশ পালনের পর আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার ও ক্ষমার ঘোষণা পাওয়ার দিন বিধায় এটি সাওম পালনকারীর জন্য বাস্তবিকই উৎসবের দিন – এদিন এজন্য উৎসবের নয় যে, এদিনে আল্লাহর দেয়া আদেশ নিষেধ কিছুটা শিথিল হতে পারে, যেমনটি বহু মুসলিমদের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, তারা এই দিনে আল্লাহর আদেশ নিষেধ ভুলে গিয়ে অশ্লীল কর্মকান্ডে লিপ্ত হন, বরং মুসলিমের জীবনে এমন একটি মুহূর্তও নেই, যে মুহূর্তে তার ওপর আল্লাহর আদেশ নিষেধ শিথিলযোগ্য। তেমনিভাবে ঈদুল আযহা পালিত হয় ইসলামের পঞ্চম স্তম্ভ হাজ্জ পালনের পর পর। কেননা ৯ই জিলহজ্জ হচ্ছে ইয়াওমুল আরাফা, এদিনটি আরাফাতের ময়দানে হাজীদের ক্ষমা লাভের দিন, আর তাই ১০ই জিলহজ্জ হচ্ছে আনন্দের দিন – ঈদুল আযহা। এমনিভাবে মুসলিমদের উৎসবের এ দুটো দিন প্রকৃতপক্ষে আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করার দিন, তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন এবং শরীয়তসম্মত বৈধ আনন্দ উপভোগের দিন – এই উৎসব মুসলিমদের ঈমানের চেতনার সাথে একই সূত্রে গাঁথা।

নতুন বছরের সাথে মানুষের কল্যাণের সম্পর্ক:

নতুন বছর নতুন কল্যাণ বয়ে আনে, দূরীভূত হয় পুরোনো কষ্ট ও ব্যর্থতার গ্লানি – এধরনের কোন তত্ত্ব ইসলামে আদৌ সমর্থিত নয়, বরং নতুন বছরের সাথে কল্যাণের শুভাগমনের ধারণা আদিযুগের প্রকৃতি-পুজারী মানুষের কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান-ধারণার অবশিষ্টাংশ। ইসলামে এ ধরনের কুসংস্কারের কোন স্থান নেই। বরং মুসলিমের জীবনে প্রতিটি মুহূর্তই পরম মূল্যবান হীরকখন্ড, হয় সে এই মুহূর্তকে আল্লাহর আনুগত্যে ব্যয় করে আখিরাতের পাথেয় সঞ্চয় করবে, নতুবা আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত হয়ে শাস্তির যোগ্য হয়ে উঠবে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বছরের প্রথম দিনের কোন বিশেষ তাৎপর্য নেই। আর তাই তো ইসলামে হিজরী নববর্ষ পালনের কোন প্রকার নির্দেশ দেয়া হয়নি। না কুরআনে এর কোন নির্দেশ এসেছে, না হাদীসে এর প্রতি কোন উৎসাহ দেয়া হয়েছে, না সাহাবীগণ এরূপ কোন উপলক্ষ পালন করেছেন। এমনকি পয়লা মুহাররামকে নববর্ষের সূচনা হিসেবে গণনা করা শুরুই হয় নবীর (সা.) মৃত্যুর বহু পরে উমার ইবনুল খাত্তাবের (রা.) শাসন আমলে। এ থেকে বোঝা যায় যে, নববর্ষ ইসলামের দৃষ্টিতে কতটা তাৎপর্যহীন, এর সাথে জীবনে কল্যাণ-অকল্যাণের গতিপ্রবাহের কোন দূরতম সম্পর্কও নেই, আর সেক্ষেত্রে বাংলা নববর্ষের কিই বা তাৎপর্য থাকতে পারে ইসলামে?

কেউ যদি এই ধারণা পোষণ করে যে, নববর্ষের প্রারম্ভের সাথে কল্যাণের কোন সম্পর্ক রয়েছে, তবে সে শিরকে লিপ্ত হল, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থির করল। যদি সে মনে করে যে, আল্লাহ এই উপলক্ষ দ্বারা মানবজীবনে কল্যাণ বর্ষণ করেন, তবে সে ছোট শিরকে লিপ্ত হল। আর কেউ যদি মনে করে যে নববর্ষের আগমনের এই ক্ষণটি নিজে থেকেই কোন কল্যাণের অধিকারী, তবে সে বড় শিরকে লিপ্ত হল, যা তাকে ইসলামের গন্ডীর বাইরে নিয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই শিরক এমন অপরাধ যে, শিরকের ওপর কোন ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে চিরতরে হারাম করে দেবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন:

“নিশ্চয়ই যে কেউই আল্লাহর অংশীদার স্থির করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিয়েছেন, আর তার বাসস্থান হবে অগ্নি। এবং যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” (আল-মায়িদাহ, ৫:৭২)

বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সাথে মঙ্গলময়তার এই ধারণার সম্পর্ক রয়েছে বলে কোন কোন সূত্রে দাবী করা হয় , যা কিনা অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। মুসলিমদেরকে এ ধরনের কুসংস্কার ঝেড়ে ফেলে ইসলামের যে মূলতত্ত্ব সেই তাওহীদ বা একত্ববাদের ওপর পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।

নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি: শয়তানের পুরোনো কূটচালের নবায়ন:

আমাদের সমাজে নববর্ষ যারা পালন করে, তারা কি ধরনের অনুষ্ঠান সেখানে পালন করে, আর সেগুলো সম্পর্কে ইসলামের বক্তব্য কি? নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে রয়েছে: বৈশাখী মেলা, যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান প্রভৃতি বিভিন্ন লোকসঙ্গীতের ব্যবস্থা, প্রভাতে উদীয়মান সূর্যকে স্বাগত জানান, নতুন সূর্যকে প্রত্যক্ষকরণ, নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে শিল্পীদের সংগীত, পান্তা-ইলিশ ভোজ, চারুশিল্পীদের শোভাযাত্রা, রমনার বটমূলে ছায়ানটের উদ্যোগে রবীন্দ্রনাথের আগমনী গান “এসো হে বৈশাখ…”, এছাড়া রেডিও টিভিতে বিশেষ অনুষ্ঠান ও পত্রপত্রিকার বিশেষ ক্রোড়পত্র।

এবারে এ সকল অনুষ্ঠানাদিতে অনুষ্ঠিত মূল কর্মকান্ড এবং ইসলামে এগুলোর অবস্থান সম্পর্কে পর্যালোচনা করা যাক:

সূর্যকে স্বাগত জানানো ও বৈশাখকে সম্বোধন করে স্বাগত জানানো: এ ধরনের কর্মকান্ড মূলত সূর্য-পূজারী ও প্রকৃতি-পূজারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুকরণ মাত্র, যা আধুনিক মানুষের দৃষ্টিতে পুনরায় শোভনীয় হয়ে উঠেছে। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী সমাজের অনেকেরই ধর্মের নাম শোনামাত্র গাত্রদাহ সৃষ্টি হলেও প্রকৃতি-পূজারী আদিম ধর্মের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের নকল করতে তাদের অন্তরে অসাধারণ পুলক অনুভূত হয়। সূর্য ও প্রকৃতির পূজা বহু প্রাচীন কাল থেকেই বিভিন্ন জাতির লোকেরা করে এসেছে। যেমন খ্রীস্টপূর্ব ১৪ শতকে মিশরীয় “অ্যাটোনিসম” মতবাদে সূর্যের উপাসনা চলত। এমনি ভাবে ইন্দো-ইউরোপীয় এবং মেসো-আমেরিকান সংস্কৃতিতে সূর্য পূজারীদেরকে পাওয়া যাবে। খ্রীস্টান সম্প্রদায় কর্তৃক পালিত যীশু খ্রীস্টের তথাকথিত জন্মদিন ২৫শে ডিসেম্বরও মূলত এসেছে রোমক সৌর-পূজারীদের পৌত্তলিক ধর্ম থেকে, যীশু খ্রীস্টের প্রকৃত জন্মতারিখ থেকে নয়। ১৯ শতাব্দীর উত্তর-আমেরিকায় কিছু সম্প্রদায় গ্রীষ্মের প্রাক্কালে পালন করত সৌর-নৃত্য এবং এই উৎসব উপলক্ষে পৌত্তলিক প্রকৃতি পূজারীরা তাদের ধর্মীয়-বিশ্বাসের পুনর্ঘোষণা দিত। মানুষের ভক্তি ও ভালবাসাকে প্রকৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টির প্রতি আবদ্ধ করে তাদেরকে শিরক বা অংশীদারিত্বে লিপ্ত করানো শয়তানের সুপ্রাচীন “কাসিকাল ট্রিক” বলা চলে। শয়তানের এই কূটচালের বর্ণনা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কুর’আনে তুলে ধরেছেন:

“আমি তাকে ও তার জাতিকে দেখেছি, তারা আল্লাহকে ছেড়ে সূর্যকে সিজদা করছে এবং শয়তান তাদের কার্যাবলীকে তাদের জন্য শোভনীয় করেছে…” (সূরা আল নামল, ২৭:২৪)

আজকের বাংলা নববর্ষ উদযাপনে গান গেয়ে বৈশাখী সূর্যকে স্বাগত জানানো, কুরআনে বর্ণিত প্রাচীন জাতির সূর্যকে সিজদা করা, আর উত্তর আমেরিকার আদিবাসীদের সৌর-নৃত্য – এগুলোর মধ্যে চেতনাগত কোন পার্থক্য নেই, বরং এ সবই স্রষ্টার দিক থেকে মানুষকে অমনোযোগী করে সৃষ্টির আরাধনার প্রতি তার আকর্ষণ জাগিয়ে তোলার শয়তানী উদ্যোগ।

(চলবে ইনশাআল্লাহ)


ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা নববর্ষ উদযাপন: মুসলিমদের করণীয়-শেষ পর্ব


বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

নববর্ষের অনুষ্ঠানাদি: শয়তানের পুরোনো কূটচালের নবায়ন

নববর্ষে মুখোশ নৃত্য, গম্ভীরা গান ও জীবজন্তুর প্রতিকৃতি নিয়ে মিছিল: গম্ভীরা উৎসবের যে মুখোশ নৃত্য, তার উৎস হচ্ছে কোচ নৃগোষ্ঠীর প্রাচীন কৃত্যানুষ্ঠান এবং পরবর্তীতে ভারতীয় তান্ত্রিক বৌদ্ধগণ এই নৃত্য আত্তীকরণ করে নিজস্ব সংস্করণ তৈরী করে। জন্তু-পূজার উৎস পাওয়া যাবে প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতার কিছু ধর্মীয় মতবাদে, যেখানে দেবতাদেরকে জন্তুর প্রতিকৃতিতে উপস্থাপন করা হয়েছে। এমনিভাবে নববর্ষের কিছু অনুষ্ঠানে প্রাচীন পৌত্তলিক ধর্মীয় মতবাদের ছোঁয়া লেগেছে, যা যথারীতি ইসলামবিদ্বেষীদের নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয়, এগুলো তাদের আধ্যাত্মিক আবেগ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর জন্য সত্য ধর্মের বিকল্প এক বিকৃত পথ মাত্র। ইসলামের মূল লক্ষ্য হচ্ছে সকল প্রকার মিথ্যা দেবতার অবসান ঘটিয়ে একমাত্র প্রকৃত ইলাহ, মানুষের স্রষ্টা আল্লাহর ইবাদতকে প্রতিষ্ঠিত করা, যেন মানুষের সকল ভক্তি, ভালবাসা, ভয় ও আবেগের কেন্দ্রস্থলে তিনি আসীন থাকেন। অপরদিকে শয়তানের ষড়যন্ত্র হচ্ছে বিবিধ প্রতিকৃতির দ্বারা মানুষকে মূল পালনকর্তার ইবাদত থেকে বিচ্যুত করা। আর তাই তো ইসলামে প্রতিকৃতি কিংবা জীবন্ত বস্তুর ছবি তৈরী করাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসুদ(রা.) থেকে বর্ণিত যে রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেছেন:

“কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে [জীবন্ত বস্তুর] ছবি তৈরীকারীরা।” (বুখারী ও মুসলিম)

ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীস থেকে জানা যায়, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“যে কেউই ছবি তৈরী করল, আল্লাহ তাকে [কিয়ামতের দিন] ততক্ষণ শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে এতে প্রাণ সঞ্চার করে, আর সে কখনোই তা করতে সমর্থ হবে না।” (বুখারী ও মুসলিম)

নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন অশ্লীলতা: শিরকপূর্ণ আচার-অনুষ্ঠানের পরেই নববর্ষের অনুষ্ঠানাদির মধ্যে সমাজ-বিধ্বংসী যে বিষয়গুলো পাওয়া যাবে, তা হচ্ছে নারীকে জড়িয়ে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীলতা। বৈশাখী মেলা, রমনার বটমূল, চারুকলার মিছিল, এর সবর্ত্রই সৌন্দর্য প্রদর্শনকারী নারীকে পুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশায় লিপ্ত দেখা যাবে। পৃথিবীতে আল্লাহ মানুষকে যে সকল আকষর্ণীয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করে থাকেন, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে নারী। রাসূলুল্লাহ(সা.) বলেন:

“আমি পুরুষের জন্য নারীর চেয়ে বড় কোন ফিতনা রেখে যাচ্ছি না।” (বুখারী ও মুসলিম)

সমাজ নারীকে কোন অবস্থায়, কি ভূমিকায়, কি ধরনের পোশাকে দেখতে চায় – এ বিষয়টি সেই সমাজের ধ্বংস কিংবা উন্নতির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত অতীব গুরুত্বপূর্ণ এক বিষয়। নারীর বিচরণক্ষেত্র, ভূমিকা এবং পোশাক এবং পুরুষের সাপেক্ষে তার অবস্থান – এ সবকিছুই ইসলামে সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ দ্বারা নির্ধারিত, এখানে ব্যক্তিগত বা সামাজিক প্রথা, হালের ফ্যাশন কিংবা ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের কোন গুরুত্বই নেই। যেমন ইসলামে নারীদের পোশাকের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা দেয়া আছে, আর তা হচ্ছে এই যে একজন নারীর চেহারা ও হস্তদ্বয় ছাড়া দেহের অন্য কোন অঙ্গই বহিরাগত পুরুষেরা দেখতে পারবে না। বহিরাগত পুরুষ কারা? স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীদের পুত্র, ভাই, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নীপুত্র, মুসলিম নারী, নিজেদের মালিকানাধীন দাস, যৌনকামনাহীন কোন পুরুষ এবং এমন শিশু যাদের লজ্জাস্থান সম্পর্কে সংবেদনশীলতা তৈরী হয়নি, তারা বাদে সবাই একজন নারীর জন্য বহিরাগত। এখানে ব্যক্তিগত শালীনতাবোধের প্রশ্ন নেই। যেমন কোন নারী যদি বহিরাগত পুরুষের সামনে চুল উন্মুক্ত রেখে দাবী করে যে তার এই বেশ যথেষ্ট শালীন, তবে তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হলেও ইসলামে গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা শালীনতা-অশালীনতার সামাজিক মাপকাঠি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়, আর তাই সমাজ ধীরে ধীরে নারীর বিভিন্ন অঙ্গ উন্মুক্তকরণকে অনুমোদন দিয়ে ক্রমান্বয়ে এমন পর্যায়ে নিয়ে আসতে পারে যে, যেখানে বস্তুত দেহের প্রতিটি অঙ্গ নগ্ন থাকলেও সমাজে সেটা গ্রহণযোগ্য হয় – যেমনটা পশ্চিমা বিশ্বের ফ্যাশন শিল্পে দেখা যায়। মার্কিন-যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা ভারতবর্ষে যা শালীন, বাংলাদেশে হয়ত এখনও সেটা অশালীন –তাহলে শালীনতার মাপকাঠি কি? সেজন্য ইসলামে এধরনের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়কে মানুষের কামনা-বাসনার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি, বরং তা কুরআন ও হাদীসের বিধান দ্বারা নির্ধারণ করা হয়েছে। তেমনি নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা এই অবাধ মেলামেশা ও অবাধ কথাবার্তাই ব্যভিচারের প্রথম ধাপ। যিনা-ব্যভিচার ইসলামী শরীয়াতের আলোকে কবীরাহ গুনাহ, এর পরিণতিতে হাদীসে আখিরাতের কঠিন শাস্তির বর্ণনা এসেছে। এর প্রসারে সমাজ জীবনের কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে, ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি ও সন্ত্রাস এবং কঠিন রোগব্যাধি। আল্লাহর রাসূলের হাদীস অনুযায়ী কোন সমাজে যখন ব্যভিচার প্রসার লাভ করে তখন সে সমাজ আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হয়ে ওঠে। আর নারী ও পুরুষের মাঝে ভালবাসা উদ্রেককারী অপরাপর যেসকল মাধ্যম, তা যিনা-ব্যভিচারের রাস্তাকেই প্রশস্ত করে। এ সকল কিছু রোধ করার জন্য ইসলামে নারীদেরকে পর্দা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, নারী ও পুরুষের বিচরণ ক্ষেত্র পৃথক করা এবং দৃষ্টি অবনত রাখার বিধান রাখা হয়েছে। যে সমাজ নারীকে অশালীনতায় নামিয়ে আনে, সেই সমাজ অশান্তি ও সকল পাপকাজের কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়, কেননা নারীর প্রতি আকর্ষণ পুরুষের চরিত্রে বিদ্যমান অন্যতম অদম্য এক স্বভাব, যাকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই সামাজিক সমৃদ্ধির মূলতত্ত্ব। আর এজন্যই ইসলামে সুনির্দিষ্ট বৈবাহিক সম্পর্কের বাইরে যে কোন প্রকার সৌন্দর্য বা ভালবাসার প্রদর্শনী ও চর্চা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ব্যাপারে শৈথিল্য প্রদর্শনের ফলাফল দেখতে চাইলে পশ্চিমা বিশ্বের দিকে তাকানোই যথেষ্ট, গোটা বিশ্বে শান্তি, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ঝান্ডাবাহী খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি ছয় মিনিটে একজন নারী ধর্ষিত হয় । মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মত তথাকথিত সভ্য দেশে মানুষের ভিতরকার এই পশুকে কে বের করে আনল? অত্যন্ত নিম্নবুদ্ধিসম্পন্ন লোকেও সহজেই বুঝতে পারে যে স্রষ্টার বেঁধে দেয়া শালীনতার সীমা যখনই শিথিল করা শুরু হয়, তখনই মানুষের ভিতরকার পশুটি পরিপুষ্ট হতে শুরু করে। পশ্চিমা বিশ্বের অশালীনতার চিত্রও কিন্তু একদিনে রচিত হয়নি। সেখানকার সমাজে নারীরা একদিনেই নগ্ন হয়ে রাস্তায় নামেনি, বরং ধাপে ধাপে তাদের পোশাকে সংপ্তিতা ও যৌনতা এসেছে, আজকে যেমনিভাবে দেহের অংশবিশেষ প্রদর্শনকারী ও সাজসজ্জা গ্রহণকারী বাঙালি নারী নিজেকে শালীন বলে দাবী করে, ঠিক একইভাবেই বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে দেহ উন্মুক্তকরণ শুরু হয়েছিল তথাকথিত “নির্দোষ” পথে।

নারীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাল-চলন নিয়ে ইসলামের বিধান আলোচনা করা এই নিবন্ধের আওতা বহির্ভূত, তবে এ সম্পর্কে মোটামুটি একটা চিত্র ইতিমধ্যেই তুলে ধরা হয়েছে। এই বিধি-নিষেধের আলোকে চিন্তা করলে দেখা যায় যে, নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারীর যে অবাধ উপস্থিতি, সৌন্দর্য প্রদর্শন এবং পুরুষের সাথে মেলামেশা – তা পরিপূর্ণভাবে ইসলামবিরোধী, তা কতিপয় মানুষের কাছে যতই লোভনীয় বা আকর্ষণীয়ই হোক না কেন। এই অনুষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের মুসলিম সমাজের ধ্বংসের পূর্বাভাস দিচ্ছে। ৫ বছরের বালিকা ধর্ষণ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মত বিদ্যাপীঠে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন, পিতার সম্মুখে কন্যা এবং স্বামীর সম্মুখে স্ত্রীর শ্লীলতাহানি – বাংলাদেশের সমাজে এধরনের বিকৃত ঘটনা সংঘটনের প্রকৃত কারণ ও উৎস কি? প্রকৃতপক্ষে এর জন্য সেইসব মা-বোনেরা দায়ী যারা প্রথমবারের মত নিজেদের অবগুন্ঠনকে উন্মুক্ত করেও নিজেদেরকে শালীন ভাবতে শিখেছেন এবং সমাজের সেইসমস্ত লোকেরা দায়ী, যারা একে প্রগতির প্রতীক হিসেবে বাহবা দিয়ে সমর্থন যুগিয়েছে।

ব্যভিচারের প্রতি আহবান জানানো শয়তানের কাসিকাল ট্রিকগুলোর অপর একটি, যেটাকে কুরআনে “ফাহিশাহ” শব্দের আওতায় আলোচনা করা হয়েছে, শয়তানের এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন:

“হে মানুষ! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র বস্তু আছে তা থেকে তোমরা আহার কর আর শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। সে তো তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু । সে তো তোমাদের নির্দেশ দেয় মন্দ ও অশ্লীল কাজ [ব্যভিচার, মদ্যপান, হত্যা ইত্যাদি] করতে এবং আল্লাহ সম্বন্ধে এমন সব বিষয় বলতে যা তোমরা জান না।” (সূরা বাক্বারাহ্, ২:১৬৮-১৬৯)

এছাড়া যা কিছুই মানুষকে ব্যভিচারের দিকে প্রলুব্ধ ও উদ্যোগী করতে পারে, তার সবগুলোকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে কুরআনের নিম্নলিখিত আয়াতের দ্বারা:


“তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না। অবশ্যই এটা অশ্লীল কাজ ও নিকৃষ্ট পন্থা।” 
(সূরা আল ইসরা, ১৭:৩২)

ব্যভিচারকে উৎসাহিত করে এমন বিষয়, পরিবেশ, কথা ও কাজ এই আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে।

বিভিন্ন সাজে সজ্জিত পর্দাবিহীন নারীকে আকর্ষণীয়, প্রগতিশীল, আধুনিক ও অভিজাত বলে মনে হতে পারে, কেননা, শয়তান পাপকাজকে মানুষের দৃষ্টিতে শোভনীয় করে তোলে। যেসব মুসলিম ব্যক্তির কাছে নারীর এই অবাধ সৌন্দর্য প্রদর্শনকে সুখকর বলে মনে হয়, তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের বক্তব্য:

ক. ছোট শিশুরা অনেক সময় আগুন স্পর্শ করতে চায়, কারণ আগুনের রং তাদের কাছে আকর্ষণীয়। কিন্তু আগুনের মূল প্রকৃতি জানার পর কেউই আগুন ধরতে চাইবে না। তেমনি ব্যভিচারকে আকর্ষণীয় মনে হলেও পৃথিবীতে এর ধ্বংসাত্মক পরিণতি এবং আখিরাতে এর জন্য যে কঠিন শাস্তি পেতে হবে, সেটা স্মরণ করলে বিষয়টিকে আকর্ষণীয় মনে হবে না।

খ. প্রত্যেকে নিজেকে প্রশ্ন করে দেখি, একজন নারী যখন নিজের দেহকে উন্মুক্ত করে সজ্জিত হয়ে বহু পুরুষের সামনে উপস্থিত হয়ে তাদের মনে যৌন-লালসার উদ্রেক করে, তখন সেই দৃশ্য দেখে এবং সেই নারীকে দেখে বহু-পুরুষের মনে যে কামভাবের উদ্রেক হয়, সেকথা চিন্তা করে এই নারীর বাবার কাছে তার কন্যার নগ্নতার দৃশ্যটি কি খুব উপভোগ্য হবে? এই নারীর সন্তানের কাছে তার মায়ের জনসম্মুখে উন্মুক্ততা কি উপভোগ্য? এই নারীর ভাইয়ের কাছে তার বোনের এই অবস্থা কি আনন্দদায়ক? এই নারীর স্বামীর নিকট তার স্ত্রীর এই অবস্থা কি সুখকর? নিশ্চয়ই নয়। তাহলে কিভাবে একজন ব্যক্তি পরনারীর সৌন্দর্য প্রদর্শনকে পছন্দ করতে পারে? এই পরনারী তো কারও কন্যা কিংবা কারও মা, কিংবা কারও বোন অথবা কারও স্ত্রী? এই লোকগুলোর কি পিতৃসুলভ অনুভূতি নেই, তারা কি সন্তানসুলভ আবেগশূন্য, তাদের বোনের প্রতি ভ্রাতৃসুলভ স্নেহশূন্য কিংবা স্ত্রীর প্রতি স্বামীসুলভ অনুভূতিহীন? নিশ্চয়ই নয়। বরং আপনি-আমি একজন পিতা, সন্তান, ভাই কিংবা স্বামী হিসেবে যে অনুভূতির অধিকারী, রাস্তার উন্মুক্ত নারীটির পরিবারও সেই একই অনুভূতির অধিকারী। তাহলে আমরা আমাদের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য যা চাই না, তা কিভাবে অন্যের কন্যা, মাতা, ভগ্নী কিংবা স্ত্রীদের জন্য কামনা করতে পারি? তবে কোন ব্যক্তি যদি দাবী করে যে সে নিজের কন্যা, মাতা, ভগ্নী বা স্ত্রীকেও পরপুরুষের যথেচ্ছ লালসার বস্তু হতে দেখে বিচলিত হয় না, তবে সে তো পশুতুল্য, নরাধম। বরং অধিকাংশেরই এধরনের সংবেদনশীলতা রয়েছে। তাই আমাদের উচিৎ অন্তর থেকে এই ব্যভিচারের চর্চাকে ঘৃণা করা। এই ব্যভিচার বিভিন্ন অঙ্গের দ্বারা হতে পারে, যেমনটি নবীজী(সা.) বর্ণনা করেছেন:

“…চোখের যিনা হচ্ছে তাকানো, জিহ্বার যিনা হচ্ছে কথা বলা, অন্তর তা কামনা করে এবং পরিশেষে যৌনাঙ্গ একে বাস্তবায়ন করে অথবা প্রত্যাখ্যান করে।”(বুখারী ও মুসলিম)

দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার দ্বারা সংঘটিত যিনাই মূল ব্যভিচার সংঘটিত হওয়াকে বাস্তব রূপ দান করে, তাই জাহান্নাম থেকে বাঁচার জন্য প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য সে সকল স্থান থেকে শতহস্ত দূরে থাকা, যে সকল স্থানে দৃষ্টি, স্পর্শ, শোনা ও কথার ব্যভিচারের সুযোগকে উন্মুক্ত করা হয়।


সঙ্গীত ও বাদ্য:
 নববর্ষের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত থাকে সংগীত ও বাদ্য। ইসলামে নারীকন্ঠে সংগীত নিঃসন্দেহে নিষিদ্ধ – একথা পূর্বের আলোচনা থেকেই স্পষ্ট। সাধারণভাবে যেকোন বাদ্যযন্ত্রকেও ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া, যেমন বিশেষ কিছু উপলক্ষে দফ নামক বাদ্যযন্ত্র বাজানোর অনুমতি হাদীসে এসেছে। তাই যে সকল স্থানে এসব হারাম সংগীত উপস্থাপিত হয়, যেমন রমনার বটমূল, বৈশাখী মেলা এবং নববর্ষের অন্যান্য অনুষ্ঠানাদি, সে সকল স্থানে যাওয়া, এগুলোতে অংশ নেয়া, এগুলোতে কোন ধরনের সহায়তা করা কিংবা তা দেখা বা শোনা সকল মুসলিমের জন্য হারাম। কিন্তু কোন মুসলিম যদি এতে উপস্থিত থাকার ফলে সেখানে সংঘটিত এইসকল পাপাচারকে বন্ধ করতে সমর্থ হয়, তবে তার জন্য সেটা অনুমোদনযোগ্য। তাছাড়া অনর্থক কথা ও গল্প-কাহিনী যা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, তা নিঃসন্দেহে মুসলিমের জন্য বর্জনীয়। অনর্থক কথা, বানোয়াট গল্প-কাহিনী এবং গান-বাজনা মানুষকে জীবনের মূল লক্ষ্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখার জন্য শয়তানের পুরোনো কূটচালের একটি, আল্লাহ এ কথা কুরআনে স্পষ্ট করে দিয়েছেন:

 

“‘এবং তাদের মধ্যে যাদেরকে পার পর্যায়ক্রমে বোকা বানাও তোমার গলার স্বরের সাহায্যে, … ” (সূরা আল ইসরা, ১৭:৬৪)

যে কোন আওয়াজ, যা আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে আহবান জানায়, তার সবই এই আয়াতে বর্ণিত আওয়াজের অন্তর্ভুক্ত। (তফসীর ইবন কাসীর)

আল্লাহ আরও বলেন:

“এবং মানুষের মাঝে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর পথ থেকে [মানুষকে] বিচ্যুত করার জন্য কোন জ্ঞান ছাড়াই অনর্থক কথাকে ক্রয় করে, এবং একে ঠাট্টা হিসেবে গ্রহণ করে, এদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” (সূরা লুকমান, ৩১:৬)

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“আমার উম্মাতের মধ্যে কিছু লোক হবে যারা ব্যভিচার, রেশমী বস্ত্র, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল বলে জ্ঞান করবে।” (বুখারী)

এছাড়াও এ ধরনের অনর্থক ও পাপপূর্ণ অনুষ্ঠান সম্পর্কে বহু সতর্কবাণী এসেছে কুরআনের অন্যান্য আয়াতে এবং আল্লাহর রাসূলের হাদীসে। উপরন্তু নববর্ষ উপলক্ষে যে গানগুলো গাওয়া হয়, সেগুলোর কোন কোনটির কথাও শিরকপূর্ণ, যেমনটি আগেই বর্ণনা করা হয়েছে।

যেসকল মুসলিমদের মধ্যে ঈমান এখনও অবশিষ্ট রয়েছে, তাদের উচিৎ এসবকিছুকে সর্বাত্মকভাবে পরিত্যাগ করা।

আমাদের করণীয়

সুতরাং ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলা নববর্ষ সংক্রান্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এজন্য যে এতে নিম্নোলিখিত চারটি শ্রেণীর ইসলাম বিরোধী বিষয় রয়েছে:

১. শিরকপূর্ণ অনুষ্ঠানাদি, চিন্তাধারা ও সংগীত

২. নগ্নতা, অশ্লীলতা, ব্যভিচারপূর্ণ অনুষ্ঠান

৩. গান ও বাদ্যপূর্ণ অনুষ্ঠান

৪. সময় অপচয়কারী অনর্থক ও বাজে কথা এবং কাজ

এ অবস্থায় প্রতিটি মুসলিমের দায়িত্ব হচ্ছে নিজে এগুলো থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থাকা এবং বাঙালি মুসলিম সমাজ থেকে এই প্রথা উচ্ছেদের সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো নিজ নিজ সাধ্য ও অবস্থান অনুযায়ী। এ প্রসঙ্গে আমাদের করণীয় সম্পর্কে কিছু দিকনির্দেশনা দেয়া যেতে পারে:

- এ বিষয়ে দেশের শাসকগোষ্ঠীর দায়িত্ব হবে আইন প্রয়োগের দ্বারা নববর্ষের যাবতীয় অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ ঘোষণা করা।

- যেসব ব্যক্তি নিজ নিজ ক্ষেত্রে কিছুটা ক্ষমতার অধিকারী, তাদের কর্তব্য হবে অধীনস্থদেরকে এ কাজ থেকে বিরত রাখা। যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান এই নির্দেশ জারি করতে পারেন যে, তার প্রতিষ্ঠানে নববর্ষকে উপলক্ষ করে কোন ধরনের অনুষ্ঠান পালিত হবে না, নববর্ষ উপলক্ষে কেউ বিশেষ পোশাক পরতে পারবে না কিংবা শুভেচ্ছা বিনিময় করতে পারবে না।

- মসজিদের ইমামগণ এ বিষয়ে মুসল্লীদেরকে সচেতন করবেন ও বিরত থাকার উপদেশ দেবেন।

- পরিবারের প্রধান এ বিষয়টি নিশ্চিত করবেন যে তার পুত্র, কন্যা, স্ত্রী কিংবা অধীনস্থ অন্য কেউ যেন নববর্ষের কোন অনুষ্ঠানে যোগ না দেয়।

- এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকে তার বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন, সহপাঠী, সহকর্মী ও পরিবারের মানুষকে উপদেশ দেবেন এবং নববর্ষ পালনের সাথে কোনভাবে সম্পৃক্ত হওয়া থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করবেন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তাঁর আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার তাওফীক দান করুন, এবং কল্যাণ ও শান্তি বর্ষিত হোক নবীজী(সা.) – এঁর ওপর, তাঁর পরিবার ও সাহাবীগণের ওপর।

“এবং তোমরা তোমাদের রবের ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে দ্রুত ধাবিত হও, যার পরিধি আসমান ও জমীনব্যাপী, যা প্রস্তুত করা হয়েছে আল্লাহভীরুদের জন্য।” (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৩৩)

-সমাপ্ত-

DT-17-04-2014


   হুমরান (রহঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি ‘উসমান ইব্‌নু আফ্‌ফান (রাঃ)-কে দেখেছেন যে, তিনি পানির পাত্র আনিয়ে উভয় হাতের তালুতে তিনবার ঢেলে তা ধুয়ে নিলেন। অতঃপর ডান হাত পাত্রের মধ্যে ঢুকালেন। তারপর কুলি করলেন ও নাকে পানি দিয়ে নাক পরিস্কার করলেন। তারপর তাঁর মুখমন্ডল তিনবার ধুয়ে এবং দু’হাত কনুই পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। অতঃপর মাথা মাস্‌হ করলেন। অতঃপর দুই পা টাখনু পর্যন্ত তিনবার ধুলেন। পরে বললেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি আমার মত এ রকম উযূ করবে, অতঃপর দু’রাক’আত সালাত আদায় করবে, যাতে দুনিয়ার কোন খেয়াল করবে না, তার পূর্বের গুনাহ্ ক্ষমা করে দেয়া হবে।

হাদিসের মানঃ  সহিহ (Sahih)

ইমাম ও ইমামতি- ১ম পর্ব
লেখক: আব্দুর রাকীব (মাদানী)
সম্পাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী

আল্ হাল হামদুলিল্লাহ, ওয়াস্ সালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ্, আম্মা বাদ:
ইমাম ও ইমামতি ইসলাম ধর্মের এবং মুসলিম সমাজের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং বহুল প্রয়োজনীয় বিষয়। একটি দেশ থেকে নিয়ে একটি গ্রাম পর্যন্ত এমনকি একটি পরিবারেও এই পদের প্রয়োজনীয়তা লক্ষণীয়। তাই এই বিষয়টির সম্পর্কে আমাদের সমাজের প্রত্যেক ইমামকে বিশেষ ভাবে এবং অন্যান্য মুসলিমদের সাধারণ ভাবে জ্ঞান রাখা আবশ্যক। উক্ত কারণে বিষয়টির অবতারণা। আল্লাহ যেন সঠিক লেখার এবং তার প্রতি আমল করার তাওফীক দেন। আমীন।
ইমাম শব্দের আভিধানিক অর্থ:
আরবী ভাষার বিশিষ্ট অভিধান ‘লিসানুল আরবে’ উল্লেখ হয়েছে, ‘মানুষ যার অনুসরণ করে, তাকে ইমাম বলে’।

ইবনু সীদাহ বলেন: ‘প্রধান ব্যক্তি কিংবা মানুষের অনুকরণীয় ব্যক্তিকেই ইমাম বলা হয়। এর বহুবচন হচ্ছে, ‘আইম্মাহ’-ইমামগণ। [লিসানুল আরব, ইবনে মনজুর,১২/২৪]
ফিকাহ বিশ্বকোষে বলা হয়েছে, ইমাম তাকেই বলা হয় কোন সম্প্রদায় যার অনুসরণ করে। সেই সম্প্রদায় সঠিক পথের অধিকারী হোক অথবা পথ ভ্রষ্ট হোক হোক।

সঠিক পথের অধিকারী অর্থে আল্লাহ বলেছেন: “আর তাদের বানিয়েছিলাম ইমাম (নেতা) তারা আমার নির্দেশে মানুষকে সঠিক পথ দেখাত।” [আম্বিয়া/৭৩]

পথ ভ্রষ্ট অর্থে: আল্লাহ বলেন: “আমি তাদের ইমাম (নেতা) করেছিলাম। তারা জাহান্নামের দিকে আহ্বান করত, কিয়ামতের দিন তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে না।” [কাসাস/৪১] [ ফিকহ্ বিশ্বকোষ,৬/২১৬-২১৭]
আর ইমামাহ্-প্রচলিত ভাষায় যাকে আমরা ইমামতি বলি- তা আরবী আম্মা-ইয়াউম্মু শব্দের মাসদার বা উৎস, যার আভিধানিক অর্থ ইচ্ছা করা। শব্দটি অগ্রবর্তী হওয়ার অর্থে ব্যবহৃত হয়। আরবী ভাষায় বলা হয়, আম্মাহুম এবং আম্মা বিহিমঃ অর্থাৎ যখন সে অগ্রবর্তী হয়। [ঐ, ৬/২০১]
ইমামতির পারিভাষিক অর্থ:
ফকীহ তথা ইসলামী বিদ্বানগণের পরিভাষায় ইমামত দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়। যথা:

  • ইমামা কুবরা (বড় ইমামত)
  • ইমামা সুগরা (ছোট ইমামত)।

ইসলামী পরিভাষায় বড় ইমামত হচ্ছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতিনিধি হিসাবে দ্বীন ও দুনিয়ার সাধারণ নেতৃত্ব প্রদানকরা। [প্রাগুক্ত,৬/২১৬] যাকে খলীফা, রাষ্ট্রপ্রধান বা দেশের প্রধান নেতা বলা যেতে পারে।
আর ছোট ইমামত হচ্ছে নামাযের ইমামত। যে ব্যক্তি নামাযের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেয় আর নামাযীরা তাঁর অনুকরণ করে থাকে। যেহেতু তিনি অনুকরণীয় এবং অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী সেহেতু তাঁকে ইমাম বলা হয়।
অবশ্য ইমাম শব্দটি আরও ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। শব্দটির আভিধানিক অর্থকে কেন্দ্র করে এমন ব্যক্তিকেও ইমাম বলা হয়, যে বিশেষ জ্ঞানে পারদর্শী এবং সেই জ্ঞানে সে অনুকরণীয় । তাই হাদীস শাস্ত্রে বুখারী (রহ) কে ইমাম বুখারী বলা হয়। ফিকাহ শাস্ত্রে আবু হানীফা, মালেক, শাফেয়ী ইত্যাদি উলামাগণের নামের শুরুতে ইমাম লেখা হয়। এ সবই এই শব্দের ব্যাপক ব্যবহারের উদাহরণ। তবে আলোচ্য বিষয়ে আমরা ছোট ইমামত তথা নামাযের ইমামতের আলোচনা করব। ইনশাআল্লাহ।
নামাযের ইমামতের গুরুত্ব ও ফযীলতঃ
১- ইমামতি করা দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ যা স্বয়ং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সারা জীবন করে গেছেন। অতঃপর তাঁর মৃত্যুর পর চার খলীফা তা সম্পাদন করেছেন এবং এখনও মুসলিম সমাজের উত্তম ব্যক্তিরাই সাধারণত: সেই উত্তম কাজটি পালন করে থাকেন।
২- পাঁচ ওয়াক্ত নামায সম্পাদন করা ইসলামের দ্বিতীয় রোকন এবং ইসলামের স্পষ্ট প্রতীক যা মহান আল্লাহ জামাআতবদ্ধ ভাবে আদায় করার আদেশ করেছেন। আর সেই আদেশ ইমাম ব্যতীত বাস্তবায়িত হয় না।
৩- নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইমাম ও মুয়াযযিনের জন্য এই বলে দুয়া করেন:

“الإمام ضامن والمؤذن مؤتمن، اللهم أرشد الأئمة واغفر للمؤذنين” أخرجه أبوداود والترمذي

“ইমাম হচ্ছে জিম্মাদার আর মুয়াজ্জিন আমানতদার, হে আল্লাহ! তুমি ইমামদের সঠিক পথ দেখাও কর এবং মুয়াজ্জিনদেরকে ক্ষমা কর”। [আবু দাউদ, নং৫১৭ / তিরিমিযী, নং ২০৭/ সহীহ সুনান আবুদাঊদ, ১/১০৫]
ইমামতীর অধিক হকদার কে?
এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

يَؤمُّ القومَ أقرئهم لكتابِ اللهِ، فإن كانوا في القراءةِ سواء فأعلمهم بالسنة فإن كانو في السنة سواء فأقدمهم هجرة، فإن كانوا في الهجرة سواء فأقدمهم سلما، ولا يؤَمَّنَّ الرجلُ الرجلَ في سلطانه، و لا يقعد في بيته على تكرمته إلا بإذنه” [رواه مسلم]

“লোকদের ইমামতি করবে ঐ ব্যক্তি যে তাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব সব চেয়ে বেশী পাঠ করতে পারে। যদি তারা পাঠ করার ক্ষেত্রে সমমানের হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যে সুন্নতের অধিক জ্ঞানী হবে সে ইমামতি করবে। যদি সুন্নতের জ্ঞানে সকলে বরাবর হয়, তাহলে তাদের মধ্যে যে সর্বপ্রথম হিজরতকারী সে ইমামতি করবে। যদি তারা সকলে হিজরতের ক্ষেত্রেও বরাবর হয় তবে তাদের মধ্যে আগে ইসলাম গ্রহণ করেছে সে তাদের ইমাতি করবে। কোন ব্যক্তি যেন কোন ব্যক্তির অধীনস্থ স্থানে তার অনুমতি ব্যতীত ইমামতী না করে এবং কোন ব্যক্তির জন্য নির্ধারিত আসনে যেন তার অনুমতি ব্যতীত না বসে”। [মুসলিম, অধ্যায়, মাসাজিদ এবং নামাযের স্থান সমূহ, হাদীস নং ৬৭৩]
সহীহ মুসলিমে এই বর্ণনার ঠিক পরের বর্ণনায় আগে ’ইসলাম গ্রহণের স্থানে বয়সে বড় শব্দটি এসেছে।
উপরের বর্ণনানুযায়ী ইমামতির বেশী হকদার ব্যক্তিবর্গের ধারাবাহিকতা এইরূপ:

  • ১- কুরআন সব চেয়ে বেশী পাঠকারী। এখানে সব চেয়ে বেশী পাঠকারী বলতে যার কুরআন সব চাইতে বেশী মুখস্থ আছে তাকে বুঝানো হয়েছে। কারণ আমর বিন সালমার হাদীসে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর আদেশ এই ভাবে উল্লেখ হয়েছে, “যখন নামাযের সময় হবে, তখন তোমাদের মধ্যে কেউ আযান দিবে এবং তোমাদের মধ্যে যার অধিক কুরআন মুখস্থ আছে সে ইমামতি করবে’’। [বুখারী, অধ্যায়, মাগাযী, হাদীস নং ৪৩০২]
  • ২- সকলে কুরআন মুখস্থের ক্ষেত্রে সমান হলে সুন্নতের ব্যাপারে অধিক জ্ঞানী।
  • ৩- সুন্নতের জ্ঞানেও সকলে বরাবর হলে যে ব্যক্তি কুফরের দেশ হতে ইসলামের দেশে আগে হিজরতকারী।
  • ৪- হিজরতের ক্ষেত্রে সকলে বরাবর হলে, যে ইসলাম গ্রহণে অগ্রবর্তী।
  • ৫- আর ইসলাম গ্রহণে সবাই বরাবর হলে, যে বয়সে বড়। যেমন সহীহ মুসলিমের পরের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
  • উপরে বর্ণিত পাঁচটি বৈশিষ্ট্যের তরতীব নির্ণয়ে বিভিন্ন উলামা ও মাজহাবের কিছু মতভেদ থাকলেও হাদীসে বর্ণিত ধারাবাহিকতা প্রাধান্য পাবে। তবে চতুর্থের স্থানে পঞ্চম হওয়ার সম্ভাবনা হাদীস দ্বারা স্বীকৃত। অর্থাৎ হিজরতের দিক দিয়ে সকলে বরাবর হলে বয়সে বড় বেশী হকদার না ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামী হকদার? এ বিষয়ে হাদীসের শব্দের ধারাবাহিকতায় পার্থক্য দেখা যায়। তাই কেউ বয়সে বড়কে প্রাধান্য দিয়েছে আর কেউ ইসলাম আগে গ্রহণকে প্রাধান্য দিয়েছে। [শারহু মুসলিম,৫ম খণ্ড, ১৭৫-১৭৭/ আর রাওযা আন নাদিয়্যাহ, মুহাম্মদ সিদ্দীক হাসান খান, ১/৩২০/ মুগনী, ইবনু কুদামাহ, ৩/১১১৬]

উপরোক্ত বিষয়ে আরো কিছু তথ্য:

  • ক- উপরোক্ত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আদেশ মোস্তাহাব আদেশ, শর্ত নয় আর না ওয়াজিব। তাই অগ্রাধিকার প্রাপ্তের উপস্থিতিতে অনগ্রাধিকার প্রাপ্তের ইমমতি ফুকাহাদের সর্বসম্মতিক্রমে বৈধ। [আল্ মাওসূআহ আল ফিকহিয়্যাহ, ৬/২০৯]
  • খ- এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা তখন প্রযোজ্য হবে, যখন মসজিদে নির্ধারিত ইমাম থাকবে না। আর যদি মসজিদে ইমাম নির্ধারিত থাকে তাহলে সেই ইমামতি করার বেশী অধিকার রাখে; যদিও তার থেকে বেশী কুরআন পাঠকারী ও সুন্নত তথা অন্যান্য গুণের লোক উপস্থিত থাকে। কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: ‘‘কোন ব্যক্তি যেন কোন ব্যক্তির অধীনস্থ স্থানে কখনো ইমামতি না করে।” [শারহু মুসলিম,৫/১৭৭]
  • গ- হ্যাঁ, তবে সেই স্থানে যদি বড় ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান) উপস্থিত হন, তাহলে নির্ধারিত ইমামও আর ইমামতি করার বেশী হোকদার হবে না; বরং সেই বড় ইমাম তখন ইমামতি করার বেশী হকদার হবেন। কারণ তাঁর কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা ব্যাপক। [নায়লুল আউতার,৩/২০২/ শারহু মুসলিম,৫/১৭৭]
  • ঘ- হাদীসে বর্ণিত উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যে যদি সকলে সমান হয়, তাহলে কী করতে হবে? এ বিষয়ে সেই হাদীসে আরো কিছু বলা হয় নি। তবে অন্যান্য দলীলের আলোকে ইসলামী পণ্ডিতদের অনেকে মনে করেন, তাহলে তাদের মধ্যে অধিক পরহেজগার ব্যক্তি অগ্রাধিকার পাবে। কারণ আল্লাহ বলেন: “অবশ্যই আল্লাহ নিকট তোমাদের মধ্যে অধিক আল্লাহ ভীরুই বেশী সম্মানীয়।” [আল হুজুরাত/১৩] এর পরেও সকলে বরাবর হলে তাদের মাঝে লটারি করতে হবে। সাহাবী সাআ’দ বিন অক্কাস (রাযিঃ) একদা আযানের ব্যাপারে লটারি করেন। তাই আযানের ক্ষেত্রে এমন করা বৈধ হলে ইমামতির ক্ষেত্রে বেশী বৈধ হবে। [মুগনী,৩/১৬]

উল্লেখ্য যে, হানাফী মাজহাবের বিভিন্ন ফিকহের বইতে উপরে বর্ণিত হাদীসের ৪-৫ টি পদ্ধতির শুধু ধারাবাহিকতাই রক্ষা করা হয় নি; বরং তারা রায় ও কিয়াসের আশ্রয় নিয়ে ২০টিরও অধিক পদ্ধতি বর্ণনা করেছেন, যাতে এমন কিছু বিষয় লিখেছেন যা রহস্যময়, লজ্জা জনক এবং অযৌক্তিক। যেমন দররে মুখতারের লেখক সেই সকল বৈশিষ্ট্যের মধ্যে চেহারা-ছবি সুন্দর হওয়া, স্ত্রী সুন্দরী হওয়া এমন কি মাথা বড় হওয়া এবং যৌনাঙ্গ ছোট হওয়ার মত অযৌক্তিক ও লজ্জা জনক গুণাগুণকেও ইমামতির অগ্রাধিকারের কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। [দুররে মুখতার,২য় খণ্ড, পৃঃ ৯৫, যাকারিয়া বুক ডিপো দেওবন্দের ছাপা/ ত্বরীকে মুহাম্মদী, মুহাম্মদ জুনাগড়ী,১৬২-১৬৮/ সালাফিয়্যাত কা তাআ’রুফ, ড.রোযাউল্লাহ,২৭২-২৭৭]
ইমামের বেতন-ভাতা:
ইমামের অবস্থা হিসাবে এ বিষয়ের বিধান প্রযোজ্য হবে। একজন ইমামের সাথে মোটামুটি নিন্মের অবস্থাগুলি সংশ্লিষ্ট থাকতে পারে।
১- যদি ইমাম কেবল পার্থিব উদ্দেশ্যেই ইমামতি করে, তাহলে তা হারাম ও বড় গুনাহ। মনে রাখা উচিৎ যে, ইমামতি করা এবং আযান দেওয়া, উভয় শারয়ী কাজ এবং তা নিঃসন্দেহে ইবাদত। আর ইবাদত কবুলের প্রথম শর্তই হচ্ছে, ইখলাস। অর্থাৎ যে কোন ইবাদত তা যেন কেবল আল্লাহর উদ্দেশ্যে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই হয়, অর্থ পাবার উদ্দেশ্যে কিংবা পদ লাভের উদ্দেশ্যে কিংবা নিজের সুন্দর কণ্ঠের মাধ্যমে লোকের প্রশংসা পাওয়ার উদ্দেশ্য থাকলে, তাতে আর ইখলাস থাকে না। যার ফলে ইবাদতটি কবুল হয় না এবং তা ছোট শিরকে পরিণত হয় । কারণ ইবাদত, যা কেবল আল্লাহর জন্যই খাঁটি ভাবে হওয়া কাম্য, তাতে সে পার্থিব উদ্দেশ্য অংশী করেছে। তাই আক্বীদার পণ্ডিতগণ বলেন: মূল ইবাদতের মাধ্যমে কেবল দুনিয়া অর্জনের উদ্দেশ্য, যেমন হজ্জ করা পয়সার জন্য, জিহাদ করা গনিমতের সম্পদ পাওয়ার জন্য, অনুরূপ [ইমামতি করা বেতনের জন্য], যাতে আল্লাহর কোন সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য থাকে না। এই প্রকারের আমল বাতিল, হারাম, বড় গুনাহ এবং ছোট শিরক। [দেখুন, তাসহীলুল আক্বীদা,ড.জিবরীন, পৃঃ৩৭৬]
আল্লাহ বলেন:

“যারা এ দুনিয়ার জীবন আর তার শোভা সৌন্দর্য কামনা করে, তাদেরকে এখানে তাদের কর্মের পুরোপুরি ফল আমি দিয়ে দেই, আর তাতে তাদের প্রতি কোন কমতি করা হয় না। কিন্তু আখেরাতে তাদের জন্য আগুন ছাড়া কিছুই নাই। এখানে যা কিছু তারা করেছে তা নিষ্ফল হয়ে গেছে, আর তাদের যাবতীয় কাজ-কর্ম ব্যর্থ হয়ে গেছে।) [হূদ,১৫-১৬]

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “অবশ্যই আমল সমূহ নির্ভর করে নিয়তের উপরে এবং প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পায়, যার সে নিয়ত করে থাকে।”। [বুখারী, নং১, মুসলিম, নং১৯০৭]
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরও বলেন: “ যে ইলম আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে অর্জন করা হয় কেউ যদি তা কেবল পার্থিব উদ্দেশ্যে তা করে তবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না”। [আহমদ,২/৩৩৮, আবু দাঊদ, নং (৩৬৬৪) ইবনু হিব্বান নং (৭৮)]
উপরোক্ত দলীল-প্রমাণের আলোকে একথা সুস্পষ্ট যে, ইমামতির উদ্দেশ্য যদি শুধু বেতন হয় কিংবা শুধু কোন পার্থিব লাভ হয়, তাহলে সেই ইমামতি বাতিল ও হারাম। তাই আমাদের ঐসকল ইমামদের চিন্তা করা প্রয়োজন যারা বেতন ছাড়া ইমামতি করেন না বা বেতনের চুক্তি করেই ইমামতি করেন; নচেৎ করেন না।
২- মূলত: ইমাম যদি সওয়াবের আশায় ইমামতি করে অতঃপর সরকার তাকে বায়তুল মাল থেকে ভাতা প্রদান করে, কিংবা কোন সংস্থা তাকে ভাতা দেয় কিংবা কোন ব্যক্তি তাকে এ কারণে সাহায্য দেয়, তাহলে তা গ্রহণে কোন অসুবিধা নেই বরং তা জায়েজ। [ইসলামের শুরু যুগে যাকে বায়তুল মাল বলা হত, বর্তমান যুগে তা অর্থ মন্ত্রণালয় বলা যেতে পারে।]
সউদী ইফতা বোর্ডকে ঐ ইমামের পিছনে নামায পড়া বৈধতা বা অবৈধতার বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, যে এর ফলে সরকারী মজুরি নেয়। উত্তরে বোর্ড তাদের পিছনে নামায পড়া বৈধ বলে ফাতওয়া দেন এবং সেই ইমামের বেতন গ্রহণকেও বৈধ বলেন। বোর্ডের উত্তরটি নিন্মে উল্লেখ করা হল:
ফাতওয়া নং (৩৫০২) সরকারি মজুরি পায় এমন ইমামের পিছনে নামায আদায় বৈধ কি?
উত্তর: ‘হ্যাঁ। এমন ব্যক্তির পিছনে নামায পড়া বৈধ। কারণ সে মুসলিমদের সাধারণ দায়িত্ব পালন করে থাকে। তাই মুসলিমদের বায়তুল মালে তার অধিকার রয়েছে, যা থেকে তার মজুরি প্রদান করা হবে। যেমন খুলাফা, আমীর, কাজী , শিক্ষক এবং এই রকম অন্যান্যদের তাদের দায়িত্ব পালন করার জন্য দেওয়া হয়। এই নিয়ম নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর যুগ থেকে এখন পর্যন্ত চলে আসছে। অনুরূপ ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের তাদের দায়িত্ব পালনের কারণে আওকাফের পক্ষ থেকে দেওয়া শস্য গ্রহণও বৈধ।’ [সউদী স্থায়ী ফতোয়া কমিটি,৭/৪১৭]
ফিকাহ বিশ্বকোষে বর্ণিত হয়েছে, ‘এমন কাজে বায়তুল মাল থেকে অনুদান নেওয়া বৈধ, যার মাধ্যমে সকল মুসলিম উপকৃত হয়, যেমন বিচার বিভাগ, ফাতওয়া বিভাগ, আযান, ইমামত, কুরআন শিক্ষা এবং হাদীস ফিকাহ এর মত উপকারী বিদ্যা শিক্ষা ইত্যাদি। কারণ এ গুলো সাধারণ জনকল্যাণের অন্তর্ভুক্ত’। [মাওসূআ ফিকহিয়্যাহ,২২/২০২]
পূর্বসূরি উলামাগণ বায়তুল মালের অনুদানকে ‘বিনিময়’ (ইওয়ায) কিংবা ‘মজুরী’ (উজরাহ) বলেন নি বরং তাঁরা এটাকে ‘রায্ক’ অর্থাৎ জীবিকা বা দান বলেছেন।

ইবনে তায়মিয়্যাহ (রহঃ) বলেন: ‘আর যা বায়তুল মাল থেকে নেওয়া হয়, তা বিনিময় ও মজুরি নয়; বরং তা আনুগত্যের কাজে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে অনুদান। আর সৎ কাজে অনুদান গ্রহণ কাজটিকে নৈকট্য থেকে বের করে না আর না ইখলাসে ব্যাঘাত ঘটায়; ব্যাঘাত ঘটলে গনিমতের হকদার হত না’। [প্রাগুক্ত,২২/২০২]
৩- বায়তুল মাল বা সরকারি ব্যবস্থাপনার অবর্তমানে যদি কোন সংস্থা বা মসজিদ কমিটি ইমামদের মাসিক সাহায্য বা অনুদান দেয়, তাহলে তা বায়তুল মালেরই স্থলাভিষিক্ত হিসাবে গণ্য হবে।
৪- ইমাম যদি অর্থশালী হয় তবে ইমামতির জন্য বেতন-ভাতা না নেওয়াই উত্তম। কিন্তু ইমাম যদি অভাবী হয় এবং ইমামতীর দায়িত্ব পালনের কারণে নিজস্ব প্রয়োজন ও তার সংসারের প্রয়োজনীয় অর্থ যোগান দিতে অক্ষ হয় তবে তার জন্য এতখানি মাসিক বেতন বা সাহায্য নেওয়া বৈধ, যার মাধ্যমে তার ও তার সাংসারিক অভাব পূরণ হয়। আল্লাহ তাআ’লা ইয়াতীমের অভিভাবকদের আদেশ করেন:

“আর যে অভাব মুক্ত সে যেন বিরত থাকে আর যে অভাবগ্রস্ত সে যেন ন্যায়সঙ্গত ভাবে ভোগ করে।” [আন্ নিসা/৬]

তাই অনেকে অভাবী ইমামদের সাহায্য নেওয়াকে এই আদেশের উপর কেয়াস করত: বৈধ বলেছেন। তাছাড়া অভাবীর অভাব দূরীকরণ ইসলামের একটি সুন্দর মৌলিক বিধান।
উল্লেখ থাকে যে, ইমাম, মুয়াজ্জিন, দ্বীনের দাঈ এবং মক্তবের শিক্ষক যারা তাদের সময়ের অধিকাংশ এই রকম দ্বীনই কাজে ব্যায় করে থাকেন তাদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা সরকারকে বায়তুল মাল থেকে করা উচিৎ। সরকারি ব্যবস্থা না থাকলে ইসলামী সংস্থাগুলো করা প্রয়োজন। যদি এমন সংস্থাও না থাকে তাহলে এসব কাজের কমিটি এমনকি ব্যক্তি বিশেষকেও করা দরকার। কারণ উপরোক্ত সৎ কাজ সমূহ দ্বীনের ও মুসলিম সমাজের মৌলিক ও সাধারণ জনকল্যাণের কাজ, যা শূণ্য হয়ে গেলে বা হ্রাস পেলে ইসলাম ও মুসলিম সমাজের অপুরণীয় ক্ষতি সাধিত হবে।
৫- কোন অমুসলিম সরকার যদি ইমাম ভাতার ব্যবস্থা করে এবং এর বিনিময়ে সরকার যদি তাদের উপর কোন অবৈধ কাজের শর্তারোপ না করে, তাহলে সাধারণত: সেই ভাতা গ্রহণ বৈধ হবে। কারণ লেনদেনের মূলনীতি হচ্ছে, বৈধতা। তাছাড়া মজুরি গ্রহণের ক্ষেত্রে মজুরিদাতার মুসলিম হওয়া শর্ত নয়। [ওয়াল্লাহু আ’লাই]
ইমামতি ছাড়া ইমামের কিছু পছন্দনীয় কাজ:
এতে কোন সন্দেহ নেই যে, একজন ইমামের মূল দায়িত্ব হচ্ছে ইমামতি করা। সে একজন আমানতদার হিসাবে নিষ্ঠার সাথে তার দায়িত্ব পালন করবে। কিন্তু যেহেতু সে মুসাল্লীদের দৃষ্টিতে আদর্শ, সেহেতু তাকে এই দায়িত্বকে গনিমত ভেবে সুযোগের সদ্ব্যবহার করা দরকার এবং তাকে এমন কিছু দ্বীনী ও সামাজিক কাজ আঞ্জাম দেওয়া প্রয়োজন, যার মাধ্যমে সেই মসজিদের মুসল্লীবর্গ সহ সেই গ্রাম ও মহল্লার লোকেরা যেন সঠিক দ্বীন জানতে পারে, ইসলামি আদর্শে আদর্শবান হতে পারে এবং সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারে।

সম্মানিত ইমাগণের উদ্দেশ্যে নিন্মে কিছু ভাল কাজের সূচী প্রদত্ত হল:

  • ১- মুসাল্লীদের সংখ্যা ও উপযুক্ত সময়ের দিকে খেয়াল রেখে দৈনন্দিন কোন নামায শেষে সংক্ষিপ্ত ৮-১০ মিনিট বিভিন্ন আলোচনার ব্যবস্থা করা। এই ক্ষেত্রে সুন্দর নিয়ম হল, কোন যোগ্য আলেমের বই ধারাবাহিক ভাবে পাঠ করা। আক্বীদা, পাক-পবিত্রতা, নামাযের নিয়ম-পদ্ধতি, ইসলামি শিষ্টাচার, হালাল-হারাম ও এই ধরনের বিষয়াদিকে প্রাধান্য দেওয়া দরকার।
  • ২- মৌসুম অনুযায়ী বিষয় পরিবর্তন করা এবং সে হিসাবে আলোচনা করা। যেমন রামাযান মাসে রোযার বিভিন্ন মাসায়েল, কুরবানী ও হজ্জের সময় সে সব মাসায়েল, ফসলাদি কাটার সময় উশর-যাকাতের মাসায়েল। বর্তমান সউদী আরবের বেশীর ভাগ মসজিদে এই নিয়ম লক্ষ্য করা যায়।
  • ৩- মক্তব-মাদ্রাসার ব্যবস্থা থাক কিংবা না থাক, কুরআন শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এ ক্ষেত্রে শিশুদের সাথে সাথে বড়দের জন্যও আলাদা ভাবে ব্যবস্থা করা।
  • ৪- মসজিদে মহিলাদের নামায পড়ার ব্যবস্থা না থাকলে, ব্যবস্থা করতে মুসাল্লীদের উদ্বুদ্ধ করা।
  • ৪- পর্দার ব্যবস্থা করে মহিলাদের জন্য মাসিক বা পাক্ষিক দ্বীন শিক্ষা ও দাওয়াতের ব্যবস্থা করা।
  • ৫- মাঝে মাঝে মসজিদে সকাল সন্ধ্যা ও নামায শেষে পঠনীয় দুয়া ও যিকির শিক্ষার ব্যবস্থা করা।
  • ৬- নিজের সম্মান বজায় রেখে অন্যের পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসায় অংশ নেওয়া।
  • ৭- ধীরে ধীরে মসজিদ লাইব্রেরী গঠন করা। মসজিদ লাইব্রেরী বলতে সেই গ্রন্থ সমাহারকে বুঝায় যা ইসলামের মৌলিক গ্রন্থ হিসাবে পরিচিত এবং যা মসজিদে পঠন-পাঠনের জন্যই নির্দিষ্ট। যেমন কুরআন, কুরআনের তাফসীর, বুখারী মুসলিম সহ অন্যান্য হাদীস গ্রন্থ এবং কুরআন-সুন্নাহ ভিত্তিক ফিকাহ গ্রন্থ। এর মাধ্যমে যেমন ইমাম স্বয়ং উপকৃত হয়, তেমন মুসাল্লীরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বচক্ষে দলীল-প্রমাণ দেখতে পায়।
  • ৮- আগ্রহ ও ইখলাসের সহিত অসুস্থ মুসল্লীদের যিয়ারত করা এবং তাদের জানাযায় শরীক হওয়া; কারণ এটা যেমন নেকীর কাজ, তেমন এক মুসলিম ভাইর প্রতি অপর মুসলিম ভায়ের অধিকার ও ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধির বিরাট বড় উপায়।
  • ৯- মাঝে মাঝে ভাল আলেমকে নিয়ে এসে বিশেষ আলোচনার ব্যবস্থা করা।
  • ১০- মাঝে মাঝে মসজিদের আয়োজনে ও তত্ত্বাবধানে প্রতিযোগিতার আয়োজন করা।

যে সব কাজ থেকে ইমামকে বিরত থাকা উচিৎ:
যেহেতু ইমামতি একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীনই পদ, সেহেতু ইমামকে যেমন এই কাজের যোগ্য হতে হবে, তেমন তাকে আরো কিছু মহৎ গুণের অধিকারী হওয়া উচিৎ যেমন, সততা, সত্যবাদিতা, চরিত্রবান এবং এই ধরনের অন্যান্য ভাল গুণ। এই সব আনুষঙ্গিক গুণ থাকলে তার কথার ও আদেশ-উপদেশের সমাজে সহজে প্রভাব পড়বে এবং তা গ্রহণীয় হবে। কিন্তু কারো মধ্যে উপরে বর্ণিত ইমামতির হকদারের গুণগুলি থাকলেও যদি এই আনুষঙ্গিক গুণগুলি না থাকে, তাহলে সেই ইমাম সাধারণত: তার সমাজে কামিয়াব ইমাম বিবেচিত হয় না। তাই প্রত্যেক ইমামকে তার সমাজে প্রচলিত কিছু এমন কাজ-কর্ম ও অভ্যাস থেকে বিরত থাকা উচিৎ, যা করলে স্বয়ং সে দ্বীনের দিক থেকে লাভবান হতে পারবে, তার কথা ও কাজ অধিক গৃহীত হবে এবং] সে আত্মমর্যাদার জীবন-যাপন করবে। ইনশাআল্লাহ।

  • ১- গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণত: কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত না থাকা। কারণ তিক্ত হলেও সত্য যে, আমাদের সমাজের অধিকাংশ লোক কোন না কোন ভাবে রাজনীতির সাথে জড়িত কিংবা প্রভাবিত। যার ফলে তারা ইসলামের দৃষ্টিতে নয়; বরং রাজনীতির নীতিতে একে অপরকে ভাল-মন্দ বিবেচনা করে থাকে। তাই ইমাম কোন দলের সাথে সম্পৃক্ত হলে প্রথমেই সে মুসাল্লীদের একটি বড় অংশের অন্তর থেকে বাদ পড়ে যাবে এবং তার মূল উদ্দেশ্য বিফল হয়ে যাবে। অতঃপর তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হবে। পরিশেষে হয়ত: ইমামতি হারাতে হবে, বেইজ্জত হতে হবে, সমাজ ভেঙ্গে যাবে আর অনেক সময় মসজিদ ভেঙ্গে আরো একটি মসজিদ নির্মাণ হবে, যা খুবই দুঃখজনক ও নিন্দনীয়।
  • ২- আত্মমর্যাদার সবসময় খেয়াল রাখা। নিজের অভাব-অনটন ও মুখাপেক্ষিতা সবার কাছে পেশ না করা তার হাবভাবে প্রকাশ না করা। কারণ এর ফলে ইমাম তার মুসাল্লীদের ও গ্রামবাসীদের নজরে ছোট হয়ে যায়, মর্যাদা হারিয়ে ফেলে। ফলস্বরূপ তার আদেশ-উপদেশও তাদের কাছে হাল্কা হয়ে যায়। অনেক সময় লোক তাকে মর্যাদা দেয়া তো দূরের কথা তাকে দেখলেই উপহাসের ছলে কথা বলে।
  • ৩- কুরআন ও দ্বীনই শিক্ষার দায়িত্ব থাকলে ছেলে ও মেয়েদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পড়ার ব্যবস্থা করা। সম্ভব না হলে ছেলেদের সাথে শুধু নাবালিকা মেয়েদের পড়ার দায়িত্ব ভার নেওয়া। কারণ এটা যেমন দ্বীনই বিধান তেমন অনেক শয়তানী চক্রান্ত ও বদনাম থেকে বাঁচার উপায়।
  • ৪- কেবল প্রয়োজনে বৈধ ঝাড়-ফুঁক করা। কিন্তু এটাকে নিজের পেশা বা স্বভাবে পরিণত না করা। কারণ একাজ সাধারণত: বৈধ দিয়ে শুরু হয় এবং পরে বিভিন্ন কারণে হারামে পরিণত হয়। (যেমন, তাবিজ ব্যবসা)
  • ৫- মহল্লা বা গ্রামের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে দাওয়াত পাওয়া ছাড়া অংশ না নেওয়া এবং এ বিষয়ে ধনী ও দরিদ্রের পার্থক্য না করা। এসব অনুষ্ঠানের ফলে কিছু পাওয়ার লোভ না করা আর না কিছু চুক্তি করা। তবে না চাইতে কেউ কিছু দান করলে তা গ্রহণ করা অবৈধ নয়।
  • ৬- বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্বন্ধে শারিয়ার বিধান স্পষ্ট করে বলে দেওয়া এবং নিজের জন্য এ সম্পর্কে সেই বিধান অনুযায়ী একটি সঠিক অবস্থান নির্ণয় করা, যেন আপনার কোথাও অংশ নেওয়া বা না নেওয়া সেই শারঈ কারণে হয়। যার ফলে আপনি বলতে সক্ষম হবেন যে, আপনি কোন অনুষ্ঠানে কেন যান আর অন্য অনুষ্ঠানে কেন উপস্থিত হন না।


ইমাম ও ইমামতি (পর্ব-২)
লেখক: আব্দুর রাকীব মাদানী
দাঈ, দাওয়াহ সেন্টার খাফজী (সউদী আরব)

১-যার অবস্থা অজ্ঞাত, এমন ইমামের পিছনে নামাযঃ
কোথাও অপরিচিত ইমামের পিছনে নামায আদায় করার সময় মুসাল্লীকে ইমামের দ্বীনী অবস্থা সম্পর্কে জানা বা খোঁজ নেওয়া জরূরী নয়; বরং তার বাহ্যিক অবস্থাই গ্রহণীয়। আবুল্ ইয্ শারহু আক্বীদাতিত্ ত্বাহাবিয়ায় বলেনঃ ‘মুক্তাদীর জন্য ইমামের আক্বীদা জানা শর্ত নয় আর না তাকে পরীক্ষা করবে এই বলে যে, তোমার আক্বীদা কি? বরং সে অবস্থা অজ্ঞাত এমন ইমামের পিছনে নামায আদায় করবে’। [শারহুল্ আক্বীদা আত্ ত্বাহাবিয়্যাহ,২/৫৬৮]
সউদী স্থায়ী উলামা পরিষদকে জিজ্ঞাসা করা হয়, যে ব্যক্তি কোন শহরে বা গ্রামে অবস্থান করে, তার উপর জরূরী কি যে, সে নামায আদায়ের পূর্বে তার ইমামের অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবে?
উত্তরে পরিষদ বলেনঃ ‘তার উপর এটা জরূরী নয় এবং অজ্ঞাত ইমামের পিছনে তার নামায পড়া বৈধ কিন্তু যদি তার মধ্যে এমন কিছু দেখে যা দ্বীনে মন্দ। কারণ মুসলিমের অবস্থা সম্পর্কে নীতি হল, তাদের সম্পর্কে সুধারণা রাখা, যতক্ষণে এর বিপরীত প্রকাশ না পায়’। [ফাতাওয়াল্ লাজনা,৭/৩৬৩]
২-শির্ককারী ইমামের পিছনে নামাযঃ
মুসলিম হিসাবে পরিচিত কিন্তু সে আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট দুআ-প্রার্থনা করে, নবী, অলী ও সৎ লোকদের আল্লাহর নৈকট্যকারী মনে করে, মৃত কথিত অলীদের উদ্দেশ্যে কুরবানী করে, মানত করে, কবরস্থ সৎ দরগাহ বাসীকে কল্যাণকারী বা ক্ষতি সাধনকারী বিশ্বাস করে, এমন ইমামের পিছনে নামায বৈধ কি? এ বিষয়ে উপরোক্ত সউদী ফাতাওয়া বোর্ডকে জিজ্ঞাসা করা হলে, তারা তার পিছনে নামায অবৈধ বলেছেন। কারণ এসব ইবাদত বা এর কোন অংশ আল্লাহ ব্যতীত অন্যের জন্য করা শির্ক, যা মানুষকে ইসলামের গোণ্ডী থেকে বের করে দেয়। [দেখুন, ফাতাওয়াল্ লাজনা আদ্দায়িমাহ,৭/৩৫৩-৩৫৯, বিষয়ঃ মুশরিকের পিছনে নামায]
৩-ফাসেক এবং বিদআতী ইমামের পিছনে নামাযঃ [ফাসেক, বড় গুনাহকারী বা বারংবার ছোট গুনাহকারী ব্যক্তি। আর এখানে বিদআতী বলতে ঐ বিদআতকে বুঝানো হয়েছে যা, কুফর নয়।]
ক-উপরোক্ত মন্দ গুণের অধিকারী ইমামের পিছনে নামায সহীহ। বিশেষ করে সেই ইমাম যদি রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক নির্ধারিত হয় এবং তাকে অপসারণ করার ক্ষমতা না থাকে কিংবা তাকে সরাতে গিয়ে যদি ফেতনা-ফাসাদের আশংকা থাকে, তাহলে তার পিছনে নামায শুদ্ধ। এটা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের একটি আক্বীদাও। ইমাম ত্বাহাবী বলেনঃ ‘আমরা আহলে কিবলার প্রত্যেক পরহেযগার এবং গুনাহগার ব্যক্তির পিছনে নামায জায়েয মনে করি’। [শারহুল আক্বীদা আত্ ত্বাহাবিয়া,২/৫৬৬]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “লোকদের ইমামতি করবে, তাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অধিক পাঠকারী” ।
[মুসলিম, নং (৬৭৩)] এখানে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ আম/ব্যাপক।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক প্রকার ইমামের সম্পর্কে বলেনঃ “তারা (ইমামেরা) তোমাদের নামায পড়াবে, যদি তারা সঠিক করে, তাহলে তোমাদের নামাযের সওয়াব তোমাদের জন্যে আর যদি সে ভুল করে তাহলে তোমাদের সওয়াব তোমাদের জন্যে এবং তাদের ভুল তাদের জন্যে”। [বুখারী, আযান অধ্যায়, নং ৬৯৪]
সাহাবাগণের মধ্যে ইবনে উমার যিনি সুন্নতের প্রতি সদা আগ্রহী হিসাবে পরিচিত, তিনি অত্যাচারী গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসেূফের পিছনে নামায সম্পাদন করতেন। [বুখারী, হজ্জ অধ্যায়, নং ১৬৬০]
ইমাম আহমদ সহ তাঁর যুগের উলামাগণ মুতাযেলীর পিছনে জুমআ ও ঈদের নামাযে হাজির হতেন। [মুগনী, ইবনু কুদামাহ,৩/২২]
সউদী স্থায়ী উলামা পরীষদের ফাতওয়ায় বিদআতী ইমামের পিছনে নামায সম্পর্কে বলা হয়, যদি বিদআত কুফর ও শির্ক পর্যায়ের হয়, তাহলে তার পিছনে নামায অশুদ্ধ আর বিদআতকারীর বিদআত যদি কুফরী পর্যায়ের না হয়, যেমন মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত পড়া, তাহলে তার নিজের নামায শুদ্ধ এবং তার পিছনে নামায আদায়কারীর নামাযও শুদ্ধ। [ফাতওয়া নং (১২০৮৭),৭/৩৬৪-৩৬৫]
এ বিষয়ে একটি মূলনীতি হচ্ছে, ‘যার নিজের নামায শুদ্ধ তার ইমামতীও শুদ্ধ’। [আশ্ শারহুল্ মুমতি, ইবনে উসাইমীন, ৪/২১৭]
এসব বিধান ও নিয়মের মূল কারণ হচ্ছে, ইসলামী ঐক্য ও সংহতি রক্ষা। ইসলাম সদা ঐক্যের আদেশ দেয় এবং মতভেদ থেকে সতর্ক করে। তাই দেখা যায়, যেখানে মানুষ ইমামদের সাধারণ ভুল-ত্রুটি নিয়ে মতভেদ করে, সেখানে লোকেরা দলে দলে বিভক্ত হয়, এক পর্যায় একাধিক মসজিদ তৈরি হয়, এমনকি গ্রাম ও মহল্লা ভেঙ্গে আপসে ঘোর শত্রুতায় লিপ্ত হয়।
কিন্তু বিদআতী ও ফাসেক ইমামের বর্তমানে যদি মুআহ্হিদ ও মুত্তাকী ইমামের পিছনে নামায পড়া সম্ভব হয়, তাহলে পরহেযগার ও সহীহ আক্বীদা পোষণকারী ইমামের পিছনে নামায পড়া উত্তম। কারণ, অবশ্যই ফাসেক থেকে মুত্তাক্বী উত্তম এবং বিদআত থেকে সুন্নত উত্তম। আল্লাহ বলেনঃ “তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই বেশী সম্মানীয় যে ব্যক্তি বেশী মুত্তাক্বী।” [সূরা হুজুরাত/১৩]
উদাহারণ স্বরূপ যদি কারো বাড়ির পার্শে দুটি মসজিদ থাকে, একটির ইমাম সুন্নাহ ও তাক্বওয়ার অধিকারী আর অপরটির ইমাম বিদআত ও ফিসকে লিপ্ত, তাহলে সে প্রথমটির পিছনে নামায আদায় করবে; যদিও সেই মসজিদটি দূরে অবস্থিত হয়।
৪-নাবালেগের ইমামতীঃ
বালেগ এর বিপরীত নাবালেগ। শরীয়ার দৃষ্টিতে নিম্নের তিনটি বিষয়ের যে কোন একটির প্রকাশ পাওয়া বালেগ হওয়া বুঝায়।

  • ১-পনের বছর বয়স পূরণ হওয়া।
  • ২-গুপ্তাঙ্গের চতুর্পার্শে লোম উদগত হওয়া।
  • ৩-যৌন চেতনার সাথে জাগ্রত বা নিদ্রাবস্থায় বীর্যপাত হওয়া।

আর মহিলাদের ক্ষেত্রে আর একটি বিষয় যোগ হবে, তা হচ্ছে মাসিক স্রাব আসা। মাসিক স্রাব প্রকাশ মহিলাদের বালেগা হওয়ার আলামত। [শারহুল্ মুমতি, ইবনে উসায়মীন,৪/২২৪]
ছয়-সাত বছরের নাবালেগ ছেলে যদি নামাযীদের মধ্যে অধিক কুরআন মুখস্থকারী হয়, তাহলে তার ইমামতি সিদ্ধ। আমর বিন সালামাহ বলেনঃ আমাকে তারা (গোত্রের সাহাবারা) ইমাম বানিয়ে দেয়। সেই সময় আমার বয়স ছয় কিংবা সাত বছর ছিল। কারণ তারা নিজেদের মাঝে খোঁজে দেখে যে, আমারই সর্বাধিক কুরআন মুখস্থ রয়েছে। [বুখারী, অধ্যায়, মাগাযী, অনুচ্ছেদ নং ৫৩, হাদীস নং ৪৩০২]
৫-অন্ধ ব্যক্তি ও দাসের ইমামতিঃ
অন্ধ ব্যক্তির ইমামতি নিঃসন্দেহে বৈধ। আনাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে মাকতূমের পূত্রকে মদীনায় দুইবার স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। তিনি তাদের ইমামতি করতেন এবং তিনি অন্ধ ছিলেন। [আবু দাঊদ, সালাত অধ্যায়, নং৫৯৫/আহমাদ,৩/১৯২]
ইবনে উমার থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পূর্বে মদীনার কুবার নিকট হিজরতকারীদের আবু হুযায়ফার (রাযিঃ) দাস সালেম ইমামতি করতেন কারণ তিনি বেশী কুরআন মুখস্থকারী ছিলেন। [বুখারী, অধ্যায়ঃ আযান, নং৬৯২]
ইমাম বুখারী উক্ত হাদীসের অনুচ্ছেদ যেই শিরোনামে রচনা করেন, তা হলঃ ‘দাস ও স্বাধীনকৃত দাসের ইমামতি’।
আয়েশা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত হয়েছে, তারঁ জনৈক দাস তাঁর ইমামতি করতো। [মুগনী,৩/২৬]
৬-বোবা ও বধির ব্যক্তির ইমামতিঃ
বোবা ব্যক্তি, সে জন্মগত বোবা হোক কিংবা পরে কোন কারণে বোবা হোক, তার ইমামতি জায়েয নয়; কারণ সে নামাযের রুকন ও ওয়াজিব উচ্চারণ করতে অক্ষম। যেমন তকবীরে তাহরীমা বলা, সূরা ফাতিহা পাঠ করা, তাশাহ্হুদ পাঠ করা ইত্যাদি। তবে তার নিজের নামায সহীহ। [মুগনী,৩/২৯,শারহুল মুমতি,৪/২২৬-২২৭]
বধির ব্যক্তির ইমামতির সম্পর্কে কিছু উলামা বলেনঃ যেহেতু তার মাধ্যমে নামাযের কাজ ও শর্ত সমূহের ব্যাঘাত ঘটে না, তাই তার অবস্থা অন্ধ ব্যক্তির ন্যায়। আর যেমন অন্ধের ইমামতি জায়েয তেমন তারও জায়েয। কিন্তু কিছু উলামা এই বলে বধির ব্যক্তির ইমামতি অশুদ্ধ বলেছেন যে, যেহেতু সে ভুল করলে তাকে সুবহানাল্লাহ বলে ভুলের সংকেত দেওয়া অনর্থক, তাই তার ইমামতি সিদ্ধ নয়। [মুগনী,৩/২৯]
মূলতঃ বোবা ও বধির ব্যক্তির ইমামতি সম্পর্কে স্পষ্ট কোন দলীল বর্ণিত হয় নি, তাই উলামাগণের মধ্যে এই মতভেদ।
৭-মহিলার ইমামতিঃ
মহিলার জন্য মহিলার ইমামতি বৈধ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মু অরাকা (রাযিঃ) কে আদেশ করেন, তিনি যেন তার বাড়ির সদস্যদের ইমামতি করেন। [আবু দাঊদ, সালাত অধ্যায়, অনুচ্ছেদঃ মহিলার ইমামতি,নং ৫৯১, ইবনু খুযায়মা বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন]
আয়েশা (রাযিঃ) হতে প্রমাণিত, তিনি মহিলাদের ইমামতি করতেন এবং লাইনের মাঝে দাঁড়াতেন। [মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক,নং৫০৭৬, দারাকুত্বনী/বায়হাক্বী]
তবে তারা ইমামতির সময় পুরুষের মত লাইন থেকে আগে বেড়ে পৃথক স্থানে দাঁড়াবে না; বরং লাইনের মাঝেই অবস্থান করতঃ ইমামতি করবে। এটা কিছু সাহাবিয়ার আমল দ্বারা প্রমাণিত। [আর রাওদা আন নাদিয়্যাহ, সিদ্দীক হাসান খাঁন,১/৩২২]
কিন্তু মহিলার জন্য বৈধ নয় যে, তারা পুরুষের ইমামতি করবে। [প্রাগুক্ত,৩১২-৩১৩] এ বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমল, খুলাফায়ে রাশেদীনের আমল এবং ধারাবাহিক মুসলিম উম্মার আমলই বড় প্রমাণ, যে তাঁরা কেউ মহিলাকে পুরুষের ইমাম নিযুক্ত করেন নি আর না তাদের যুগে এমন কোন নজীর ছিল।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘‘ঐ সম্প্রদায় কখনো সফলকাম হতে পারে না, যারা কোন মহিলাকে তাদের বিষয়াদির নেতা নিযুক্ত করে”। [বুখারী, অধ্যায়ঃ মাগাযী, নং৪৪২৫] যেহেতু ইমামতি এক প্রকারের নেতৃত্ব, তাই তাদের এ পদে নিযুক্ত করা অবৈধ। [দেখুন শারহুল মুমতি,৪/২২২]
৮-রুকু, সাজদা, কিয়াম, কুঊদ করতে অপারগ ব্যক্তির ইমামতিঃ
সাধারণতঃ রুকু, সাজদা, কিয়াম, কুঊদ সহ নামাযের অন্যান্য রুকন পালন করতে অক্ষম ব্যক্তি এ সব পালনে সক্ষম ব্যক্তির ইমামতি করতে পারে না। কারণ এ ক্ষেত্রে ইমামের অবস্থা মুক্তাদী অপেক্ষা দুর্বল, যা ইমামের জন্য বাঞ্ছনীয় নয়। তবে মসজিদের নির্ধারিত সবল ইমাম যদি কোন কারণে নামায পড়ানোর সময় কিয়াম করতে (দাঁড়াতে) অক্ষম হয়ে পড়ে কিংবা অসুস্থতার কারণে শুরু থেকেই দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে অক্ষম হয়, তাহলে সেই ইমাম বসে নামায পড়াতে পারেন। কিন্তু এই সময় দাঁড়াতে সক্ষম মুক্তাদীগণ বসে নামায পড়বে না দাঁড়িয়ে? এ বিষয়ে উত্তম মত হল, ইমাম যদি প্রথমে দাঁড়ানো অবস্থায় নামায শুরু করে থাকেন আর মাঝে বসে পড়ান, তাহলে মুক্তাদীগণ দাঁড়িয়ে নামায সম্পাদন করবেন। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যুর পূর্বে অসুস্থকালে আবু বকর (রাযিঃ) দাঁড়িয়ে নামায শুরু করলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর বাম পার্শে বসে ইমামতি করেন আর আবু বকর সহ অন্যান্য সাহাবাগণ দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে থাকেন। কারণ এখানে প্রথমে আবু বকর (রাযিঃ) দাঁড়িয়ে ইমামতি শুরু করেছিলেন। আর যদি ইমাম শুরু থেকেই বসে নামায পড়ান, তাহলে মুক্তাদীরাও বসে নামায পড়বেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “যখন ইমাম বসে নামায পড়াবে তখন তোমরাও বসে নামায পড়বে”। [বুখারী, আযান অধ্যায়ঃ নং৬৮৯/ মুসলিম, সালাত অধ্যায়, নং৪১১/ বিস্তারিত দেখুন, শারহুল্ মুমতি,৪/২২৮-২৩৬]
৯-উম্মী তথা অজ্ঞ ব্যক্তির পিছনে নামাযঃ
এখানে উম্মী বা অজ্ঞ বলতে ঐ ব্যক্তিকে বুঝানো হয়েছে, যে সূরা ফাতেহা ভাল করে পড়তে পারে না; যদিও সে অন্য সূরা ভাল করে পড়তে সক্ষম হয়। যেমন ‘রা’ কে ‘লা’ পড়ে কিংবা হরকত ভুল পড়ে যেমন, যেরের স্থানে যবার পড়ে বা যবারের স্থানে যের বা পেশ পড়ে, যার ফলে শব্দের অর্থ পরিবর্তন হয়ে যায়। উদাহরণ স্বরূপ (ইহ্ দিনা) অর্থ আমাদের সঠিক পথ দেখাও এর স্থানে পড়ে (আহ্ দিনা) অর্থ আমাদের হাদিয়া-উপহার দাও কিংবা (আন্‌ আম্ তা) অর্থ তুমি অনুগ্রহ করেছো এর স্থানে পড়ে (আন্ আম্ তু) অর্থ আমি অনুগ্রহ করেছি। তাহলে এমন উম্মী ইমামের পিছনে শুদ্ধ সূরা ফাতিহা পাঠকারীর নামায বৈধ নয়। তবে উপস্থিত সকল লোক যদি সূরা ফাতিহা অশুদ্ধ পাঠকারী হয়, তাহলে তাদের একে অপরের ইমামতি বৈধ। কারণ আল্লাহ তাআ’লা সাধ্যের অতিরিক্ত জরূরী করেন না। কিছু উলামার মতে সূরা ফাতিহা অশুদ্ধ পাঠকারীর পিছনে শুদ্ধ সূরা পাঠকারীর নামায বৈধ কিন্তু এটা উচিৎ নয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “লোকদের ইমামতি করবে তাদের মধ্যে আল্লাহর কিতাব অধিক পাঠকারী”। [মুসলিম, অধ্যায়ঃ মাসাজিদ, নং ৬৭৩ এবং ২৯০, আরো দেখুন, আল্ মুগনী,৩/২৯-৩০, শারহুর্ মুমতি,৪/২৪৫-২৪৯, ফতাওয়াল লাজনা,৭/৩৪৮]
১০-কিছু আনুসাঙ্গিক বিষয়ঃ
ক-ইমামতির জন্য বিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। [সউদী স্থায়ী ফাতাওয়া পরিষদ,৭/৩৮২]
খ-ব্যভিচারীর সন্তানের ইমামতি অন্য মানুষের ন্যায়। তার মায়ের পাপের কারণে তার ইমামতি প্রভাবিত হবে না। [প্রাগুক্ত ফাতাওয়া পরিষদ,৭/৩৮৮]
গ-ইমামতির সময় অযু নষ্ট হলে অন্য কোন মুক্তাদীকে ইমাম নিযুক্ত করা বৈধ। [প্রাগুক্ত,৭/৩৯৫]

চলবে ইনশাআল্লাহ.......


গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যা ও সহজ সমাধান!

গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যা ও সহজ সমাধান!

গ্যাস্ট্রিক বা এসিডিটির সমস্যা আমাদের দেশে খুবই স্বাভাবিক ব্যপার। অনেককে বছরের প্রায় সময়ই ভূগতে হয় এ সমস্যায়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে এর প্রতিকার হিসাবে পাওয়া যায় অনেক নামি দামি ওষুধ। কিন্তু আমাদের হাতের কাছের বিভিন্ন প্রকৃতিক জিনিস দিয়ে যদি করা যায় এর নিরাময়, তাহলে বাড়তি টাকা খরচ করার কি দরকার।
আসুন এরকম কিছু উপাদানের কথা জেনে নিই:
লং

যদি আপনি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যায় জর্জরিত হয়ে থাকেন, তবে লং হতে পারে আপনার সঠিক পথ্য। দুইটি লং মুখে নিয়ে চিবাতে থাকুন, যেন রসটা আপনার ভেতরে যায়। দেখবেন এসিডিটি দূর হয়ে গেছে।
জিরা

এক চা চামচ জিরা নিয়ে ভেজে ফেলুন। এবার এটিকে এমন ভাবে গুড়া করুন যেন পাউডার না হয়ে যায়, একটু ভাঙা ভাঙা থাকে। এই গুড়াটি একগ্লাস পানিতে মিশিয়ে প্রতিবার খাবারের সময় পান করুন। দেখবেন কেমন ম্যাজিকের মতো কাজ করে।
গুঁড়

গুঁড় আপনার বুক জ্বালাপোড়া এবং এসিডিটি থেকে মুক্তি দিতে পারে। যখন বুক জ্বালাপোড়া করবে সাথে সাথে একটুকরো গুঁড় মুখে নিয়ে রাখুন যতক্ষণ না সম্পূর্ণ গলে যায়। তবে ডায়বেটিস রোগিদের ক্ষেত্রে এটি নিষিদ্ধ।

মাঠা

দুধ এবং মাখন দিয়ে তৈরী মাঠা একসময় আমাদের দেশে খুবই জনপ্রিয় ছিল। এসিডিটি দূর করতে টনিকের মতো কাজ করে যদি এর সাথে সামান্য গোলমরিচ গুঁড়া যোগ করেন।
পুদিনা পাতা

পুদিনা পাতার রস গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে বহুদিন ধরেই ব্যবহৃত হয়ে আসছে। প্রতিদিন পুদিনা পাতার রস বা পাতা চিবিয়ে খেলে এসিডিটি ও বদহজম থেকে দূরে থাকতে পারবেন।
বোরহানী

বিয়ে বাড়িতে আমাদের বোরহানী না হলে চলেই না। টক দই, বীট লবণ ইত্যাদি নানা এসিড বিরোধী উপাদান দিয়ে তৈরী বলে এটি হজমে খুবই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন ভারী খাবারের পর একগ্লাস করে খেতে পারলে আপনার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে।
তুলসী পাতা

হাজারো গুণে ভরা তুলসী পাতার কথা আপনারা সবাই জানেন। এসিডিটি দূর করতেও এর ভূমিকা অনন্য। যখন গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা হবে ৫-৬ টি তুলসী পাতা চিবিয়ে খেলে দেখবেন এসিডিটি কমে গেছে। তুলসী পাতা যে প্রতিদিন ব্লেন্ড করে পানি দিয়ে খাবেন, তার এসিডিটি হওয়ার প্রবনতা অনেক কমে যাবে।
আঁদা

আঁদাও এমন একটি ভেষজ উপাদান যা আমাদের অনেক কাজে লাগে। প্রতিবার খাদ্য গ্রহনের আধা ঘন্টা আগে ছোট এক টুকরো আঁদা খেলে দেখবেন আপনার গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা গায়েব হয়ে গেছে।
দুধ

দুধের মধ্যে আছে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম, যা পাকস্থলীর এসিড কমাতে সাহায্য করে। রাতে একগ্লাস দুধ ফ্রিজে রেখে দিয়ে পরদিন সকালে খলি পেটে সেই ঠান্ডা দুধটুকু খেলে সারাদিন এসিডিটি থেকে মুক্ত থাকা যাবে। তবে কারো পেট দুধের প্রতি অতিসংবেদনশীল, এদের ক্ষেত্রে দুধ খেলে সমস্যা আরো বাড়তে পারে।
ভ্যানিলা আইসক্রিম

আইসক্রিম খেতে আমরা সবাই পছন্দ করি। কিন্তু আপনি কি জানেন ভ্যানিলা আইসক্রিম শুধু আমাদের তৃপ্তিই যোগায় না, সাথে এসিডিটি দুর করতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে! কি এটা শুনে আইসক্রিম খাওয়া আরো বাড়িয়ে দিলেন নাকি? তবে সাবধান আবার ঠান্ডা লাগিয়ে ফেলবেন না কিন্তু।

উৎস: প্রথম সংবাদ

DT-26-04-2014 


পরিচ্ছদঃ মুসলিমদেরকে মহব্বত ও ভ্রাতৃত্বের প্রতি উদ্বুদ্ধ করা 

৩৭. আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেছেন: “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: হে বনি আদম আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, তুমি আমাকে দেখনি, সে বলবে: হে আল্লাহ আপনাকে কিভাবে দেখব, অথচ আপনি দু’জাহানের রব? তিনি বলবেন: তুমি জান না আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল তুমি তাকে দেখনি, তুমি জান না যদি তাকে দেখতে আমাকে তার নিকট পেতে? হে বনি আদম আমি তোমার নিকট খাদ্য চেয়েছিলাম তুমি আমাকে খাদ্য দাওনি, সে বলবে: হে আমার রব, আমি কিভাবে আপনাকে খাদ্য দিব অথচ আপনি দু’জাহানের রব? তিনি বলবেন: তুমি জান না আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট খাদ্য চেয়েছিল তুমি তাকে খাদ্য দাওনি, তুমি জান না যদি তাকে খাদ্য দিতে তা আমার নিকট অবশ্যই পেতে। হে বনি আদম, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম তুমি আমাকে পানি দাওনি, সে বলবে: হে আমার রব কিভাবে আমি আপনাকে পানি দেব অথচ আপনি দু’জাহানের রব? তিনি বলবেন: আমার অমুক বান্দা তোমার নিকট পানি চেয়েছিল তুমি তাকে পানি দাওনি, মনে রেখ যদি তাকে পানি দিতে তা আমার নিকট অবশ্যই পেতে”। [মুসলিম] হাদিসটি সহিহ।

পরিচ্ছদঃ কোন পরিচ্ছদ নেই 

৩১। আবূল আব্বাস সাহল ইবনুূ সা'দ আস্-সা'ইদী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: "এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে এমন কাজ বলুন যা করলে আল্লাহ্ আমাকে ভালবাসেন, লোকেরাও আমাকে ভালবাসে।
তখন তিনি বললেন: দুনিয়ার প্রতি অনুরাগী হবে না, তাহলে আল্লাহ্ তোমাকে ভালবাসবেন; আর মানুষের কাছে যা আছে তার ব্যাপারে আগ্রহী হবে না, তাহলে মানুষও তোমাকে ভালবাসবে।"

[ইবনুূে মাজাহ্: ৪১০২]

“কসম যুগের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের।”
[আল-কুরআন: সূরা আছর, আয়াত ১-৩]


Photo: “কসম যুগের, নিশ্চয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত; কিন্তু তারা নয়, যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে তাকীদ করে সত্যের এবং তাকীদ করে সবরের।”
[আল-কুরআন: সূরা আছর, আয়াত ১-৩]

সূরা আছরের বিশেষ ফযীলতঃ

হযরত ওবায়দুল্লাহ্ ইবনে হিসন রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সা.-এর দু’জন সাহাবী ছিলেন, তারা পরস্পর মিলে একজন অন্যজনকে সূরা আছর পাঠ করে না শুনানো পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন হতেন না। [তিবরানী]

ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, যদি মানুষ কেবল এ সূরাটি চিন্তা করতো তবে এটাই তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল। [ইবনে-কাসীর]

সূরা আছর কুরাআন পাকের একটি সংক্ষিপ্ত সূরা কিন্তু এমন অর্থপূর্ণ সূরা ইমাম শাফেয়ী রহ.-এর ভাষায় মানুষ এ সূরাটিকেই চিন্তা ভাবনা সহকারে পাঠ করলে তাদের ইহকাল ও পরকাল সংশোধনের জন্যে যথেষ্ট হয়ে যায়। এ সূরায় আল্লাহ্ তাআলা যুগের কসম করে বলেছেন, মানবজাতি অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এবং এই ক্ষতির কবল থেকে কেবল তারাই মুক্ত যারা চারটি বিষয় নিষ্ঠার সাথে পালন করে। এই চারটি বিষয় হচ্ছে- ১. ঈমান ২. সংকর্ম ৩. অপরকে সত্যের উপদেশ ৪. সবরের উপদেশদান। দ্বীন ও দুনিয়ার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং মহাউপকার লাভ করার চার বিষয় সম্বলিত এ ব্যবস্থাপত্রের প্রথম দু’টি বিষয় আত্মসংশোধন সম্পর্কিত এর্বং দ্বিতীয় দু’টি বিষয় মুসলমানদের হেদায়েত ও সংশোধন সম্পর্কিত।

# শেয়ার করে অন্যকে জানার সুযোগ করে দিন #



Photo: যে গোনাহ করে কিংবা নিজের অনিষ্ট করে, অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, পরম দয়ালুরূপে পাবে। 
[আল কুরআন: সূরা আন-নিসা , আয়াত ১১০]

Whoever does wrong or wrongs himself, then seeks forgiveness of Allah, will find Allah Forgiving and Merciful.
[Al Quran: Surah An-Nisa, Verse 110]

DT-03-05-2014


হাদিসের বিবরণঃ

গ্রন্থঃ রিয়াযুস স্বা-লিহীন | অধ্যায়ঃ ১/ বিবিধ | হাদিস নাম্বারঃ 449 | পাবলিশারঃ তাওহীদ পাবলিকেশন


মূল হাদিসঃ وَعَن أَبي سَعِيدٍ الخُدرِيِّ رضي الله عنه: أنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ، قَالَ:« إِذَا وُضِعَتِ الجنازةُ واحْتَمَلَهَا النَّاسُ أَوِ الرِّجَالُ عَلَى أعناقِهِمْ، فَإنْ كَانَتْ صَالِحَةً، قَالَتْ: قَدِّمُونِي قَدِّمُونِي، وَإنْ كَانَتْ غَيْرَ صَالِحَةٍ، قَالَتْ: يَا وَيْلَهَا! أَيْنَ تَذْهَبُونَ بِهَا؟ يَسْمَعُ صَوْتَهَا كُلُّ شَيْءٍ إِلاَّ الإنْسانُ، وَلَوْ سَمِعَهُ صَعِقَ». رواه البخاري
পরিচ্ছদঃ ৫৩: একই সাথে আল্লাহর প্রতি ভয় ও আশা রাখার বিবরণ

২/৪৪৯। আবূ সা‘ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যখন জানাযা খাটে রাখা হয় এবং লোকেরা অথবা পুরুষরা কাঁধে বহন করতে শুরু করে, তখন সে নেককার হলে বলতে থাকে, ‘আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাও। আমাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাও।’ আর বদকার হলে সে বলতে থাকে, ‘হায় ধ্বংস আমার! তোমরা এটিকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?’ মানুষ ছাড়া সবাই তার শব্দ শুনতে পায়। মানুষ তা শুনলে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত। (বা মারা যেত।)’’ (বুখারী) 

৮৮২। কুতায়বা (রহঃ) ওয়ায়িল (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পেছনে সালাত আদায় করেছি। যখন তিনি সালাত আরম্ভ করতেন তখন তাকবীর বলতেন এবং তাঁর উভয় হাত দু-কান পর্যন্ত তুলতেন। এরপর সূরা ফাতিহা পাঠ করা আরম্ভ করতেন। আর তা শেষ করে আমীন বলতেন এবং তা বলার সময় তার স্বর উচু করতেন।

মূল প্রশ্ন/বিষয়ঃপিতামাতা মারা যাওয়ার পর তাদের আত্মার কল্যাণের জন্য কি কি করা যায়?

উত্তর / বিবরণঃ

তাদের জন্য নিম্নলিখিত কাজগুলো করা যায়ঃ-

(১) তাদের জন্য দুয়া করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বলেছেন, “যখন কোন মানুষ মারা যায়, তখন তার কর্ম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু তিনটি জিনিস নয়;  (ক) সাদকাহ জারিয়াহ,  (খ) যে বিদ্যা দ্বারা উপকার পাওয়া যায় অথবা (গ) নেক সন্তান, যে তার জন্য দুয়া করে।” (মুসলিম)

(২) দান খয়রাত করা। এক ব্যক্তি নবী (সঃ) কে বলল, ‘আমার মা হঠাৎ  মারা গেছে। আমার ধারনা যে, সে কথা বলার সুযোগ পেলে সাদকাহ করত। সুতরাং আমি যদি তার পক্ষ থেকে সাদকাহ করি, তাহলে কি সে নেকি পাবে?’ তিনি বললেন, “হ্যাঁ।”  (বুখারি ও মুসলিম)

আল্লাহর রাসুল (সঃ) বলেছেন, “মুমিনের মৃত্যুর পর তার আমল ও পুন্যকর্মসমুহ হতে নিশ্চিতভাবে যা এসে তার সাথে মিলিত হয়, তা হল; সেই ইলম, যা সে শিক্ষা করে প্রচার করেছে অথবা নেক সন্তান, যাকে রেখে সে মারা গেছে, অথবা কুরআন শরীফ, যা সে মিরাসরূপে ছেড়ে গেছে, অথবা মসজিদ, যা সে নিজে নির্মাণ করে গেছে, অথবা মুসাফিরখানা, যা সে মুসাফিরদের সুবিধার্থে নির্মাণ করে গেছে, অথবা পানির নালা যা সে (সেচ ইত্যাদির উদ্দেশ্যে) প্রবাহিত করে গেছে, অথবা সাদকাহ, যা সে নিজের মাল থেকে তার সুস্থ ও জীবিতাবস্থায় বের (দান) করে গেছে। এসব কর্মের সওয়াব তার মৃত্যুর পরও তার সাথে এসে মিলিত হবে।” (ইবনে মাজাহ, বাইহাকি, ইবনে খুজাইমাহ ভিন্ন শব্দে, সহিহ তারগিব ১০৭ নং)

(৩) হজ্জ উমরাহ করা। আব্দুল্লাহ বইন আমর বলেন, আস বিন ওয়াইল সাহমী তার তরফ হতে ১০০ ক্রীতদাস মুক্ত করার অসিয়ত করে মারা যায়। সুতরাং তার ছোট ছেলে হিসাম ৫০ টি দাস মুক্ত করে। অতঃপর তার বড় ছেলে আমর বাকি ৫০ টি দাস মুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে বললেন, ‘(বাপ তো কাফের অবস্থায় মারা গেছে) তাই আমি এ কাজ আল্লাহর রাসুল (সঃ) কে জিজ্ঞাসা না করে করব না।’ সুতরাং তিনি নবী (সঃ) এর নিকট এসে ঘটনা খুলে বলে জিজ্ঞাসা করলেন, “আমি কি বাকি ৫০ টি দাস তার তরফ থেকে মুক্ত করব?” উত্তরে আল্লাহর রাসুল (সঃ) বললেন, “ সে যদি মুসলিম হত এবং তোমরা তার তরফ থেকে দাস মুক্ত করতে, অথবা সাদকাহ করতে অথবা হাজ্জ করতে তাহলে তার সওয়াব তার নিকট পৌঁছত।” আবু দাউদ ২৮৮৩নং, বাইহাকি ৬/২৭৯, আহমাদ ৬৭০৪ নং)

(৪) তাদের কোন অসিয়ত থাকলে তা পালন করুন।

(৫) তাদের কোন বন্ধু থাকলে তার খাতির করুন।

(৬) তাদের সম্পর্কের জোরে সকল আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখুন।

আর কোন বিদআতি কাজ করবেন না বা বিদআতি অসিয়াত পালন করবেন না। যেমন- চালসে চাহারাম, ফাতিহাখানি, কুলখানি, মৌলুদ পাঠ ইত্যাদি করবেন না। কোন ভোজবাজি বা দুয়ার অনুষ্ঠান করবেন না। জেনে রাখবেন, যা আপনি তাদের আত্মার কামনার উদেশ্যে আল্লাহর জন্য করবেন, তাই তাদের উপকারে আসবে। পক্ষান্তরে যা নিজের স্বার্থের জন্য করবেন, সুনাম নেওয়ার জন্য করবেন অথবা বদনাম থেকে বাঁচবার জন্য করবেন, তা কোন উপকার দেবে না। সবচেয়ে বেশি উপকারী হিসেবে আপনি প্রত্যেহ প্রত্যেক ফরয নামাজের শেষাংশে তাদের জন্য দুয়া করুন। তাহলে তাদের হক আদায় করতে পারবেন।

পরিচ্ছদঃ ৫/ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের উপর বাই'আত গ্রহণ করা জরুরি 

৪৬০ । আমর ইবনুূু মানসুর (রহঃ) -- আওফ ইবনুূু মালিক আশজাঈ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট ছিলাম। তিনি বললেনঃ তোমরা কি আল্লাহ্‌র রাসূলের নিকট বায়আত গ্রহন করবে না? এ কথাটি তিনি তিনবার বলেন। আমরা হাত বাড়িয়ে দিলাম এবং তাঁর নিকট বায়আত গ্রহন করলাম। তারপর আমরা বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ্‌! আমরা তো পুর্বেই আপনার নিকট বায়’আত হয়েছি, তবে এ বায়’আত কোন্‌ বিষয়ের উপর? তিনি বললেনঃ এ বায়’আত হল এ কথার উপর যে, তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করবে না। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে। তারপর আস্তে করে মৃদু স্বরে বললেনঃ মানুষের নিকট কিছু চাইবে না।

সহিহ, ইবনুূু মাজাহ হাঃ ২৮৬৭, মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার ) হাঃ ২২৭২ 

DT-13-05-2014

ইখলাস প্রসঙ্গে

১০/১০। আবূ বাক্‌রাহ নুফাই ইবনুূ হারেস সাক্বাফী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যখন দু’জন মুসলিম তরবারি নিয়ে আপোসে লড়াই করে, তখন হত্যাকারী ও নিহত দু’জনই জাহান্নামে যাবে।’’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারীর জাহান্নামে যাওয়া তো স্পষ্ট; কিন্তু নিহত ব্যক্তির ব্যাপার কী?’ তিনি বললেন, ‘‘সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করার জন্য লালায়িত ছিল।’’

[1] সহীহুল বুখারী ৩১, ৬৮৭৫, ৭০৮৩, মুসলিম ২৮৮৮, নাসায়ী ৪১১৭, ৪১২০, ৪১২১, ৪১২২, ৪১২৩, আবূ দাউদ ৪২৬৮, ইবনুূু মাজাহ ৩৯৬৫, আহমাদ ১৯৯১১, ১৯৯২৬, ১৯৯৫৯, ১৯৯৮০, ১৯৯৯৫।

তওবার বিবরণ..

৮/২১। আবূ সাঈদ সা‘দ ইবনুূ মালেক ইবনুূ সিনান খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘তোমাদের পূর্বে (বনী ইস্রাইলের যুগে) একটি লোক ছিল; যে ৯৯টি মানুষকে হত্যা করেছিল। অতঃপর লোকদেরকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। তাকে একটি খ্রিষ্টান সন্নাসীর কথা বলা হল। সে তার কাছে এসে বলল, ‘সে ৯৯ জন মানুষকে হত্যা করেছে। এখন কি তার তওবার কোন সুযোগ আছে?’ সে বলল, ‘না।’ সুতরাং সে (ক্রোধান্বিত হয়ে) তাকেও হত্যা করে একশত পূরণ করে দিল। পুনরায় সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আলেম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। এবারও তাকে এক আলেমের খোঁজ দেওয়া হল। সে তার নিকট এসে বলল যে, সে একশত মানুষ খুন করেছে। সুতরাং তার কি তওবার কোন সুযোগ আছে? সে বলল, ‘হ্যাঁ আছে! তার ও তওবার মধ্যে কে বাধা সৃষ্টি করবে? তুমি অমুক দেশে চলে যাও। সেখানে কিছু এমন লোক আছে যারা আল্লাহ তা‘আলার ইবাদত করে। তুমিও তাদের সাথে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তোমার নিজ দেশে ফিরে যেও না। কেননা, ও দেশ পাপের দেশ।’ সুতরাং সে ব্যক্তি ঐ দেশ অভিমুখে যেতে আরম্ভ করল। যখন সে মধ্য রাস্তায় পৌঁছল, তখন তার মৃত্যু এসে গেল। (তার দেহ-পিঞ্জর থেকে আত্মা বের করার জন্য) রহমত ও আযাবের উভয় প্রকার ফিরিশ্তা উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক আরম্ভ হল। রহমতের ফিরিশ্তাগণ বললেন, ‘এই ব্যক্তি তওবা করে এসেছিল এবং পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর দিকে তার আগমন ঘটেছে।’ আর আযাবের ফিরিশ্তারা বললেন, ‘এ এখনো ভাল কাজ করেনি (এই জন্য সে শাস্তির উপযুক্ত)।’ এমতাবস্থায় একজন ফিরিশ্তা মানুষের রূপ ধারণ করে উপস্থিত হলেন। ফিরিশ্তাগণ তাঁকে সালিস মানলেন। তিনি ফায়সালা দিলেন যে, ‘তোমরা দু’ দেশের দূরত্ব মেপে দেখ। (অর্থাৎ এ যে এলাকা থেকে এসেছে সেখান থেকে এই স্থানের দূরত্ব এবং যে দেশে যাচ্ছিল তার দূরত্ব) এই দুয়ের মধ্যে সে যার দিকে বেশী নিকটবর্তী হবে, সে তারই অন্তর্ভুক্ত হবে।’ অতএব তাঁরা দূরত্ব মাপলেন এবং যে দেশে সে যাওয়ার ইচ্ছা করেছিল, সেই (ভালো) দেশকে বেশী নিকটবর্তী পেলেন। সুতরাং রহমতের ফিরিশতাগণ তার জান কবয করলেন।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

সহীহতে আর একটি বর্ণনায় এরূপ আছে যে, ‘‘পরিমাপে ঐ ব্যক্তিকে সৎশীল লোকদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পাওয়া গেল। সুতরাং তাকে ঐ সৎশীল ব্যক্তিদের দেশবাসী বলে গণ্য করা হল।’’

সহীহতে আরো একটি বর্ণনায় এইরূপ এসেছে যে, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা ঐ দেশকে (যেখান থেকে সে আসছিল তাকে) আদেশ করলেন যে, তুমি দূরে সরে যাও এবং এই সৎশীলদের দেশকে আদেশ করলেন যে, তুমি নিকটবর্তী হয়ে যাও। অতঃপর বললেন, ‘তোমরা এ দু’য়ের দূরত্ব মাপ।’ সুতরাং তাকে সৎশীলদের দেশের দিকে এক বিঘত বেশী নিকটবর্তী পেলেন। যার ফলে তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হল।’’

আরো একটি বর্ণনায় আছে, ‘‘সে ব্যক্তি নিজের বুকের উপর ভর করে ভালো দেশের দিকে একটু সরে গিয়েছিল।’’[1]

 সহীহুল বুখারী ৩৪৭০, মুসলিম ২৭৬৬, ইবনুূু মাজাহ ২৬২৬, আহমাদ ১০৭৭০, ১১২৯০

৯/২২। কা‘ব ইবনুূে মালেকের পুত্র আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, এই আব্দুল্লাহ কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর ছেলেদের মধ্যে তাঁর পরিচালক ছিলেন, যখন তিনি অন্ধ হয়ে যান। তিনি (আব্দুল্লাহ) বলেন, আমি (আমার পিতা) কা‘ব ইবনুূে মালেককে ঐ ঘটনা বর্ণনা করতে শুনেছি, যখন তিনি তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে থেকে যান। তিনি বলেন, ‘আমি তাবূক যুদ্ধ ছাড়া যে যুদ্ধই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন তাতে কখনোই তাঁর পিছনে থাকিনি। অবশ্য বদরের যুদ্ধ থেকে আমি পিছনে রয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বদরের যুদ্ধে যে অংশগ্রহণ করেনি, তাকে ভৎর্সনা করা হয়নি। আসল ব্যাপার ছিল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমগণ কুরাইশের কাফেলার পশ্চাদ্ধাবনে বের হয়েছিলেন। (শুরুতে যুদ্ধের নিয়ত ছিল না।) পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলা তাঁদেরকে ও তাঁদের শত্রুকে (পূর্বঘোষিত) ওয়াদা ছাড়াই একত্রিত করেছিলেন। আমি আক্বাবার রাতে (মিনায়) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে উপস্থিত ছিলাম, যখন আমরা ইসলামের উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিলাম। আক্বাবার রাত অপেক্ষা আমার নিকটে বদরের উপস্থিতি বেশী প্রিয় ছিল না। যদিও বদর (অভিযান) লোক মাঝে ওর চাইতে বেশী প্রসিদ্ধ। (কা‘ব বলেন,) আর আমার তাবূকের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পিছনে থাকার ঘটনা এরূপ যে, এই যুদ্ধ হতে পিছনে থাকার সময় আমি যতটা সমর্থ ও সচ্ছল ছিলাম অন্য কোন সময় ছিলাম না। আল্লাহর কসম! এর পূর্বে আমার নিকট কখনো দু’টি সওয়ারী (বাহন) একত্রিত হয়নি। কিন্তু এই (যুদ্ধের) সময়ে একই সঙ্গে দু’টি সওয়ারী আমার নিকট মউযূ (ওজু/অজু/অযু)দ ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিয়ম ছিল, যখন তিনি কোন যুদ্ধে বের হওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন ‘তাওরিয়া’ করতেন (অর্থাৎ সফরের গন্তব্যস্থলের নাম গোপন রেখে সাধারণ অন্য স্থানের নাম নিতেন, যাতে শত্রুরা টের না পায়)। এই যুদ্ধ এইভাবে চলে এল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীষণ গরমে এই যুদ্ধে বের হলেন এবং দূরবর্তী সফর ও দীর্ঘ মরুভূমির সম্মুখীন হলেন। আর বহু সংখ্যক শত্রুরও সম্মুখীন হলেন। এই জন্য তিনি মুসলিমদের সামনে বিষয়টি স্পষ্ট করে দিলেন; যাতে তাঁরা সেই অনুযায়ী যথোচিত প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ফলে তিনি সেই দিকও বলে দিলেন, যেদিকে যাবার ইচ্ছা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে অনেক মুসলিম ছিলেন এবং তাদের কাছে কোন হাজিরা বহি ছিল না, যাতে তাদের নামসমূহ লেখা হবে। এই জন্য যে ব্যক্তি (যুদ্ধে) অনুপস্থিত থাকত সে এই ধারণাই করত যে, আল্লাহর অহী অবতীর্ণ ছাড়া তার অনুপস্থিতির কথা গুপ্ত থাকবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই যুদ্ধ ফল পাকার মৌসুমে করেছিলেন এবং সে সময় (গাছের) ছায়াও উৎকৃষ্ট (ও প্রিয়) ছিল, আর আমার টানও ছিল সেই ফল ও ছায়ার দিকে। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমরা (যুদ্ধের জন্য) প্রস্তুতি নিলেন। আর (আমার এই অবস্থা ছিল যে,) আমি সকালে আসতাম, যেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে আমিও (যুদ্ধের) প্রস্তুতি নিই। কিন্তু কোন ফায়সালা না করেই আমি (বাড়ী) ফিরে আসতাম এবং মনে মনে বলতাম যে, আমি যখনই ইচ্ছা করব, যুদ্ধে শামিল হয়ে যাব। কেননা, আমি এর ক্ষমতা রাখি। আমার এই গড়িমসি অবস্থা অব্যাহত রইল এবং লোকেরা জিহাদের আয়োজনে প্রবৃত্ত থাকলেন। 

অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুসলিমরা একদিন সকালে জিহাদে বেরিয়ে পড়লেন এবং আমি প্রস্তুতির ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্তেই উপনীত হতে পারলাম না। আমি আবার সকালে এলাম এবং বিনা সিদ্ধান্তেই (বাড়ী) ফিরে গেলাম। সুতরাং আমার এই অবস্থা অব্যাহত থেকে গেল। ওদিকে মুসলিম সেনারা দ্রুতগতিতে আগে বাড়তে থাকল এবং যুদ্ধের ব্যাপারও ক্রমশঃ এগুতে লাগল। আমি ইচ্ছা করলাম যে, আমিও সফরে রওয়ানা হয়ে তাদের সঙ্গ পেয়ে নিই। হায়! যদি আমি তাই করতাম (তাহলে কতই না ভাল হত)। কিন্তু এটা আমার ভাগ্যে হয়ে উঠল না। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চলে যাওয়ার পর যখনই আমি লোকের মাঝে আসতাম, তখন এ জন্যই দুঃখিত ও চিন্তিত হতাম যে, এখন (মদীনায়) আমার সামনে কোন আদর্শ আছে তো কেবলমাত্র মুনাফিক কিংবা এত দুর্বল ব্যক্তিরা যাদেরকে আল্লাহ ক্ষমার্হ বা অপারগ বলে গণ্য করেছেন।

সম্পূর্ণ রাস্তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে স্মরণ করলেন না। তাবূক পৌঁছে যখন তিনি লোকের মাঝে বসেছিলেন, তখন আমাকে স্মরণ করলেন এবং বললেন, ‘‘কা‘ব ইবনুূ মালেকের কী হয়েছে?’’ বানু সালেমাহ (গোত্রের) একটি লোক বলে উঠল, ‘‘হে আল্লাহর রাসূল! তার দুই চাদর এবং দুই পার্শ্ব দর্শন (অর্থাৎ ধন ও তার অহঙ্কার) তাকে আটকে দিয়েছে।’’ (এ কথা শুনে) মু‘আয ইবনুূ জাবাল রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, ‘‘বাজে কথা বললে তুমি। আল্লাহর কসম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা তার ব্যাপারে ভাল ছাড়া অন্য কিছু জানি না।’’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব থাকলেন।

এসব কথাবার্তা চলছিল এমতাবস্থায় তিনি একটি লোককে সাদা পোশাক পরে (মরুভূমির) মরীচিকা ভেদ করে আসতে দেখলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘তুমি যেন আবূ খাইসামাহ হও।’’ (দেখা গেল,) সত্যিকারে তিনি আবূ খাইসামাহ আনসারীই ছিলেন। আর তিনি সেই ব্যক্তি ছিলেন, যিনি একবার আড়াই কিলো খেজুর সদকাহ করেছিলেন বলে মুনাফিকরা (তা অল্প মনে করে) তাঁকে বিদ্রূপ করেছিল।’

কা‘ব বলেন, ‘অতঃপর যখন আমি সংবাদ পেলাম যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূক থেকে ফিরার সফর শুরু করে দিয়েছেন, তখন আমার মনে কঠিন দুশ্চিন্তা এসে উপস্থিত হল এবং মিথ্যা উযূ (ওজু/অজু/অযু)হাত পেশ করার চিন্তা করতে লাগলাম এবং মনে মনে বলতে লাগলাম যে, আগামী কাল যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরবেন, সে সময় আমি তাঁর রোষানল থেকে বাঁচব কি উপায়ে? আর এ ব্যাপারে আমি পরিবারের প্রত্যেক বুদ্ধিমান মানুষের সহযোগিতা চাইতে লাগলাম। অতঃপর যখন বলা হল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমন একদম নিকটবর্তী, তখন আমার অন্তর থেকে বাতিল (পরিকল্পনা) দূর হয়ে গেল। এমনকি আমি বুঝতে পারলাম যে, মিথ্যা বলে আমি কখনই বাঁচতে পারব না। সুতরাং আমি সত্য বলার দৃঢ় সঙ্কল্প করে নিলাম। এদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালে (মদীনায়) পদার্পণ করলেন। তাঁর অভ্যাস ছিল, যখন তিনি সফর থেকে (বাড়ি) ফিরতেন, তখন সর্বপ্রথম তিনি মসজিদে দু’ রাকআত নামায পড়তেন। তারপর (সফরের বিশেষ বিশেষ খবর শোনাবার জন্য) লোকেদের জন্য বসতেন। সুতরাং এই সফর থেকে ফিরেও যখন পূর্ববৎ কাজ করলেন, তখন মুনাফেকরা এসে তাঁর নিকট ওজর-আপত্তি পেশ করতে লাগল এবং কসম খেতে আরম্ভ করল। এরা সংখ্যায় আশি জনের কিছু বেশী ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বাহ্যিক ওজর গ্রহণ করে নিলেন, তাদের বায়আত নিলেন, তাদের জন্য (আল্লাহর কাছে) ক্ষমা প্রার্থনা করলেন এবং তাদের গোপনীয় অবস্থা আল্লাহকে সঁপে দিলেন। অবশেষে আমিও তাঁর খিদমতে হাজির হলাম। অতঃপর যখন আমি তাঁকে সালাম দিলাম, তখন তিনি রাগান্বিত ব্যক্তির হাসির মত মুচকি হাসলেন। অতঃপর তিনি বললেন, ‘‘সামনে এসো!’’ আমি তাঁর সামনে এসে বসে পড়লাম। তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘‘তুমি কেন জিহাদ থেকে পিছনে রয়ে গেলে? তুমি কি বাহন ক্রয় করনি?’’ আমি বললাম, ‘‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর কসম! আমি যদি আপনি ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন লোকের কাছে বসতাম, তাহলে নিশ্চিতভাবে কোন মিথ্যা ওজর পেশ করে তার অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে যেতাম। বাকচাতুর্য (বা তর্ক-বিতর্ক করা)র অভিজ্ঞতা আমার যথেষ্ট রয়েছে। কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি জানি যে, যদি আজ আপনার সামনে মিথ্যা বলি, যাতে আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন, তাহলে অতি সত্বর আল্লাহ তা’আলা (অহী দ্বারা সংবাদ দিয়ে) আপনাকে আমার উপর অসন্তুষ্ট করে দেবেন। পক্ষান্তরে আমি যদি আপনাকে সত্য কথা বলি, তাহলে আপনি আমার উপর অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু আমি আল্লাহর নিকট এর সুফলের আশা রাখি। (সেহেতু আমি সত্য কথা বলছি যে,) আল্লাহর কসম! (আপনার সাথে জিহাদে যাওয়ার ব্যাপারে) আমার কোন অসুবিধা ছিল না। আল্লাহর কসম! আপনার সাথ ছেড়ে পিছনে থাকার সময় আমি যতটা সমর্থ ও সচ্ছল ছিলাম ততটা কখনো ছিলাম না।’’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘‘এই লোকটি নিশ্চিতভাবে সত্য কথা বলেছে। বেশ, তুমি এখান থেকে চলে যাও, যে পর্যন্ত তোমার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা কোন ফায়সালা না করবেন।’’

আমার পিছনে পিছনে বনু সালেমাহ (গোত্রের) কিছু লোক এল এবং আমাকে বলল যে, ‘‘আল্লাহর কসম! আমরা অবগত নই যে, তুমি এর পূর্বে কোন পাপ করেছ। অন্যান্য পিছনে থেকে যাওয়া লোকেদের ওজর পেশ করার মত তুমিও কোন ওজর পেশ করলে না কেন? তোমার পাপ মোচনের জন্য এটাই যথেষ্ট ছিল যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার জন্য (আল্লাহর নিকট) ক্ষমা প্রার্থনা করতেন।’’ কা‘ব বলেন, ‘আল্লাহর কসম! লোকেরা আমাকে আমার সত্য কথা বলার জন্য তিরস্কার করতে থাকল। পরিশেষে আমার ইচ্ছা হল যে, আমি দ্বিতীয়বার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে প্রথম কথা অস্বীকার করি (এবং কোন মিথ্যা ওজর পেশ করে দিই।) আবার আমি তাদেরকে বললাম, ‘‘আমার এ ঘটনা কি অন্য কারো সাথে ঘটেছে?’’ তাঁরা বললেন, ‘‘হ্যাঁ। তোমার মত আরো দু’জন সমস্যায় পড়েছে। (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে) তারাও সেই কথা বলেছে, যা তুমি বলেছ এবং তাদেরকে সেই কথাই বলা হয়েছে, যা তোমাকে বলা হয়েছে।’’ আমি তাদেরকে বললাম, ‘‘তারা দু’জন কে?’’ তারা বলল, ‘‘মুরারাহ ইবনুূে রাবী‘ আমরী ও হিলাল ইবনুূে উমাইয়্যাহ ওয়াক্বেফী।’’ এই দু’জন যাঁদের কথা তারা আমার কাছে বর্ণনা করল, তাঁরা সৎলোক ছিলেন এবং বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন; তাঁদের মধ্যে আমার জন্য আদর্শ ছিল। যখন তারা সে দু’জন ব্যক্তির কথা বলল, তখন আমি আমার পূর্বেকার অবস্থার (সত্যের) উপর অনড় থেকে গেলাম (এবং আমার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা দূরীভূত হল। যাতে আমি তাদের ভৎর্সনার কারণে পতিত হয়েছিলাম)। (এরপর) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদেরকে পিছনে অবস্থানকারীদের মধ্যে আমাদের তিনজনের সাথে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করে দিলেন।’

কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘লোকেরা আমাদের থেকে পৃথক হয়ে গেল।’ অথবা বললেন, ‘লোকেরা আমাদের জন্য পরিবর্তন হয়ে গেল। পরিশেষে পৃথিবী আমার জন্য আমার অন্তরে অপরিচিত মনে হতে লাগল। যেন এটা সেই পৃথিবী নয়, যা আমার পরিচিত ছিল। এইভাবে আমরা ৫০টি রাত কাটালাম। আমার দুই সাথীরা তো নরম হয়ে ঘরের মধ্যে কান্নাকাটি আরম্ভ করে দিলেন। কিন্তু আমি দলের মধ্যে সবচেয়ে যুবক ও বলিষ্ঠ ছিলাম। ফলে আমি ঘর থেকে বের হয়ে মুসলিমদের সাথে নামাযে হাজির হতাম এবং বাজারসমূহে ঘোরাফেরা করতাম। কিন্তু কেউ আমার সঙ্গে কথা বলত না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খিদমতে হাজির হতাম এবং তিনি যখন নামাযের পর বসতেন, তখন তাঁকে সালাম দিতাম, আর আমি মনে মনে বলতাম যে, তিনি আমার সালামের জওয়াবে ঠোঁট নড়াচ্ছেন কি না? তারপর আমি তাঁর নিকটেই নামায পড়তাম এবং আড়চোখে তাঁকে দেখতাম। (দেখতাম,) যখন আমি নামাযে মনোযোগী হচ্ছি, তখন তিনি আমার দিকে তাকাচ্ছেন এবং  যখন আমি তাঁর দিকে দৃষ্টি ফিরাচ্ছি, তখন তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন!

অবশেষে যখন আমার সাথে মুসলিমদের বিমুখতা দীর্ঘ হয়ে গেল, তখন একদিন আমি আবূ ক্বাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর বাগানে দেওয়াল ডিঙিয়ে (তাতে প্রবেশ করলাম।) সে (আবূ ক্বাতাদাহ) আমার চাচাতো ভাই এবং আমার সর্বাধিক প্রিয় লোক ছিল। আমি তাকে সালাম দিলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! সে আমাকে সালামের জওয়াব দিল না। আমি তাকে বললাম, ‘‘হে আবূ ক্বতাদাহ! আমি তোমাকে আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কি জান যে, আমি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ভালবাসি?’’ সে নিরুত্তর থাকল। আমি দ্বিতীয়বার কসম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম। এবারেও সে চুপ থাকল। আমি তৃতীয়বার কসম দিয়ে প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলে সে বলল, ‘‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই বেশী জানেন।’’ এ কথা শুনে আমার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু বইতে লাগল এবং যেভাবে গিয়েছিলাম, আমি সেইভাবেই দেওয়াল ডিঙিয়ে ফিরে এলাম।

এরই মধ্যে একদিন মদীনার বাজারে হাঁটছিলাম। এমন সময় শাম দেশের কৃষকদের মধ্যে একজন কৃষককে---যে মদীনায় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করতে এসেছিল---বলতে শুনলাম, কে আমাকে কা‘ব ইবনুূ মালেককে দেখিয়ে দেবে? লোকেরা আমার দিকে ইঙ্গিত করতে লাগল। ফলে সে ব্যক্তি আমার নিকটে এসে আমাকে ‘গাস্সান’-এর বাদশার একখানি পত্র দিল। আমি লিখা-পড়া জানতাম তাই আমি পত্রখানি পড়লাম। পত্রে লিখা ছিলঃ-

‘--- অতঃপর আমরা এই সংবাদ পেয়েছি যে, আপনার সঙ্গী (মুহাম্মাদ) আপনার প্রতি দুর্ব্যবহার করেছে। আল্লাহ আপনাকে লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত অবস্থায় থাকার জন্য সৃষ্টি করেননি। আপনি আমাদের কাছে চলে আসুন; আমরা আপনার প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করব। পত্র পড়ে আমি বললাম, ‘‘এটাও অন্য এক বালা (পরীক্ষা)।’’ সুতরাং আমি ওটাকে চুলোয় ফেলে জ্বালিয়ে দিলাম। অতঃপর যখন ৫০ দিনের মধ্যে ৪০ দিন গত হয়ে গেল এবং অহী আসা বন্ধ ছিল এই অবস্থায় আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একজন দূত আমার নিকট এসে বলল, ‘‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাকে তোমার স্ত্রী থেকে পৃথক থাকার আদেশ দিচ্ছেন!’’ আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘‘আমি কি তাকে তালাক দেব, না কী করব?’’ সে বলল, ‘‘তালাক নয় বরং তার নিকট থেকে আলাদা থাকবে, মোটেই ওর নিকটবর্তী হবে না।’’ আমার দুই সাথীর নিকটেও এই বার্তা পৌঁছে দিলেন। আমি আমার স্ত্রীকে বললাম, ‘‘তুমি পিত্রালয়ে চলে যাও এবং সেখানে অবস্থান কর---যে পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যাপারে কোন ফায়সালা না করেন।’’ (আমার সাথীদ্বয়ের মধ্যে একজন সাথী) হিলাল ইবনুূ উমাইয়ার স্ত্রী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, ‘‘ইয়া রসূলাল্লাহ! হিলাল ইবনুূ উমাইয়াহ খুবই বৃদ্ধ মানুষ, তার কোন খাদেমও নেই, সেহেতু আমি যদি তার খিদমত করি, তবে আপনি কি এটা অপছন্দ করবেন?’’ তিনি বললেন, ‘‘না, (অর্থাৎ তুমি তার খিদমত করতে পার।) কিন্তু সে যেন তোমার (মিলন উদ্দেশ্যে) নিকটবর্তী না হয়।’’ (হিলালের স্ত্রী) বলল, ‘‘আল্লাহর কসম! (দুঃখের কারণে এ ব্যাপারে) তার কোন সক্রিয়তা নেই। আল্লাহর কসম! যখন থেকে এ ব্যাপার ঘটেছে তখন থেকে আজ পর্যন্ত সে সর্বদা কাঁদছে।’’

(কা‘ব বলেন,) ‘আমাকে আমার পরিবারের কিছু লোক বলল যে, ‘‘তুমিও যদি নিজ স্ত্রীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চাইতে, (তাহলে তা তোমার পক্ষে ভাল হত।) তিনি হিলাল ইবনুূ উমাইয়ার স্ত্রীকে তো তার খিদমত করার অনুমতি দিয়ে দিয়েছেন।’’ আমি বললাম, ‘‘এ ব্যাপারে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট অনুমতি চাইব না। জানি না, যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকটে অনুমতি চাইব, তখন তিনি কী বলবেন। কারণ, আমি তো যুবক মানুষ।’’

এভাবে আরও দশদিন কেটে গেল। যখন থেকে লোকদেরকে আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে নিষেধ করা হয়েছে, তখন থেকে এ পর্যন্ত আমাদের পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হয়ে গেল। আমি পঞ্চাশতম রাতে আমাদের এক ঘরের ছাদের উপর ফজরের নামায পড়লাম। নামায পড়ার পর আমি এমন অবস্থায় বসে আছি যার বর্ণনা আল্লাহ তা‘আলা আমাদের ব্যাপারে দিয়েছেন- আমার জীবন আমার জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল এবং পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও আমার প্রতি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল---এমন সময় আমি এক চিৎকারকারীর আওয়ায শুনতে পেলাম, সে সাল‘আ পাহাড়ের উপর চড়ে উচ্চৈঃস্বরে বলছে, ‘‘হে কা‘ব ইবনুূে মালেক! তুমি সুসংবাদ নাও!’’ আমি তখন (খুশীতে শুকরিয়ার) সিজদায় পড়ে গেলাম এবং বুঝতে পারলাম যে, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) মুক্তি এসেছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের নামায পড়ার পর লোকদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহ আয্যা অজাল্ল্ আমাদের তওবা কবূল করে নিয়েছেন। সুতরাং লোকেরা আমাদেরকে সুসংবাদ দেওয়ার জন্য আসতে আরম্ভ করল। এক ব্যক্তি আমার দিকে অতি দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এল। সে ছিল আসলাম (গোত্রের) এক ব্যক্তি। আমার দিকে সে দৌড়ে এল এবং পাহাড়ের উপর চড়ে (আওয়াজ দিল)। তার আওয়াজ ঘোড়ার চেয়েও দ্রুতগামী ছিল। সুতরাং যখন সে আমার কাছে এল, যার সুসংবাদের আওয়াজ আমি শুনেছিলাম, তখন আমি তার সুসংবাদ দানের বিনিময়ে আমার দেহ থেকে দু’খানি বস্ত্র খুলে তাকে পরিয়ে দিলাম। আল্লাহর কসম! সে সময় আমার কাছে এ দু’টি ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর আমি নিজে দু’খানি কাপড় অস্থায়ীভাবে ধার নিয়ে পরিধান করলাম এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পথে লোকেরা দলে দলে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আমাকে মুবারকবাদ জানাতে লাগল এবং বলতে লাগল, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা তোমার তওবা কবুল করেছেন, তাই তোমাকে ধন্যবাদ।’’ অতঃপর আমি মসজিদে প্রবেশ করলাম। (দেখলাম,) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসে আছেন এবং তাঁর চারপাশে লোকজন আছে। ত্বালহা ইবনুূে উবাইদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু উঠে ছুটে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন এবং আমাকে মুবারকবাদ দিলেন। আল্লাহর কসম! মুহাজিরদের মধ্যে তিনি ছাড়া আর কেউ উঠলেন না।’ সুতরাং কা‘ব ত্বালহা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর এই ব্যবহার কখনো ভুলতেন না। কা‘ব বলেন, ‘যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সালাম জানালাম, তখন তিনি তাঁর খুশীময় উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে আমাকে বললেন, ‘‘তোমার মা তোমাকে যখন প্রসব করেছে, তখন থেকে তোমার জীবনের বিগত সর্বাধিক শুভদিনের তুমি সুসংবাদ নাও!’’ আমি বললাম, ‘‘হে আল্লাহর রাসূল! এই শুভসংবাদ আপনার পক্ষ থেকে, না কি আল্লাহর পক্ষ থেকে?’’ তিনি বললেন, ‘‘না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে।’’

রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন খুশি হতেন, তখন তাঁর চেহারা উজ্জ্বল হয়ে যেত, মনে হত যেন তা একফালি চাঁদ এবং এতে আমরা তাঁর এ (খুশী হওয়ার) কথা বুঝতে পারতাম। অতঃপর যখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে বসলাম, তখন আমি বললাম, ‘‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার তওবা কবুল হওয়ার দরুন আমি আমার সমস্ত মাল আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের রাস্তায় সাদকাহ করে দিচ্ছি।’’ তিনি বললেন, ‘‘তুমি কিছু মাল নিজের জন্য রাখ, তোমার জন্য তা উত্তম হবে।’’ আমি বললাম, ‘‘যাই হোক! আমি আমার খায়বারের (প্রাপ্ত) অংশ রেখে নিচ্ছি।’’ আর আমি এ কথাও বললাম যে, ‘‘হে আল্লাহর রাসূল! নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আমাকে সত্যবাদিতার কারণে (এই বিপদ থেকে) উদ্ধার করলেন। আর এটাও আমার তওবার দাবী যে, যতদিন আমি বেঁচে থাকব, সর্বদা সত্য কথাই বলব।’’ সুতরাং আল্লাহর কসম! যখন থেকে আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে সত্য কথা বলার প্রতিজ্ঞা করলাম আমি জানি না যে, আল্লাহ তা‘আলা কোন মুসলিমকে সত্য কথার বলার প্রতিদান স্বরূপ উৎকৃষ্ট পুরস্কার দিয়েছেন। আল্লাহর কসম! আমি যেদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এ কথা বলেছি, সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমি মিথ্যা কথা বলার ইচ্ছা করিনি। আর আশা করি যে, বাকী জীবনেও আল্লাহ তা‘আলা আমাকে এ থেকে নিরাপদ রাখবেন।’

কা‘ব বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা (আমাদের ব্যাপারে আয়াত) অবতীর্ণ করেছেন, (যার অর্থ), ‘‘আল্লাহ ক্ষমা করলেন নবীকে এবং মুহাজির ও আনসারদেরকে যারা সংকট মুহূর্তে নবীর অনুগামী হয়েছিল, এমন কি যখন তাদের মধ্যকার এক দলের অন্তর বাঁকা হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তারপর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করলেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাদের প্রতি বড় স্নেহশীল, পরম করুণাময়। আর ঐ তিন ব্যক্তিকেও ক্ষমা করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্থগিত রাখা হয়েছিল; পরিশেষে পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও তাদের প্রতি সংকীর্ণ হয়ে উঠেছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে পড়েছিল আর তারা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া আল্লাহর পাকড়াও হতে বাঁচার অন্য কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন, যাতে তারা তওবা করে। নিশ্চয় আল্লাহই হচ্ছেন তওবা গ্রহণকারী, পরম করুণাময়। হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।’’ (সূরাহ তাওবাহ ১১৭-১১৯ আয়াত)

কা‘ব ইবনুূ মালেক বলেন, ‘আল্লাহ আমাকে ইসলামের জন্য হিদায়াত করার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সত্য কথা বলা অপেক্ষা বড় পুরস্কার আমার জীবনে আল্লাহ আমাকে দান করেননি। ভাগ্যে আমি তাঁকে মিথ্যা কথা বলিনি। নচেৎ তাদের মত আমিও ধ্বংস হয়ে যেতাম, যারা মিথ্যা বলেছিল। আল্লাহ তা‘আলা যখন অহী অবতীর্ণ করলেন, তখন নিকৃষ্টভাবে মিথ্যুকদের নিন্দা করলেন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলা তাদের ব্যাপারে বললেন, ‘‘যখন তোমরা তাদের কাছে ফিরে যাবে, তারা তখন অচিরেই তোমাদের সামনে শপথ করে বলবে, যেন তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর; অতএব তোমরা তাদেরকে উপেক্ষা কর; তারা হচ্ছে অতিশয় ঘৃণ্য, আর তাদের ঠিকানা হচ্ছে জাহান্নাম, তা হল তাদের কৃতকর্মের প্রতিফল। তারা এ জন্য শপথ করবে যেন তোমরা তাদের প্রতি রাজী হয়ে যাও, অনন্তর যদি তোমরা তাদের প্রতি রাজী হয়ে যাও, তবে আল্লাহ তো এমন দুষ্কর্মকারী লোকদের প্রতি রাজী হবেন না।’’ (ঐ ৯৫-৯৬ আয়াত)

কা‘ব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘হে তিনজন! আমাদের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে রাখা হয়েছিল তাদের থেকে যাদের মিথ্যা কসম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (অজান্তে) গ্রহণ করলেন, তাদের বায়‘আত নিলেন এবং তাদের জন্য ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের ব্যাপারটা পিছিয়ে দিলেন। পরিশেষে মহান আল্লাহ সে ব্যাপারে ফায়সালা দিলেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘আর ঐ তিন ব্যক্তিকেও ক্ষমা করলেন, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল।’’ পিছনে রাখার যে বিবৃতি দেওয়া হয়েছে তার অর্থ যুদ্ধ থেকে আমাদের পিছনে থাকা নয়। বরং (এর অর্থ) আমাদের ব্যাপারটাকে ঐ লোকদের ব্যাপার থেকে পিছিয়ে দেওয়া হয়েছিল, যারা তাঁর কাছে শপথ করেছিল এবং ওযর পেশ করেছিল। ফলে তিনি তা কবূল করে নিয়েছিলেন।’[1]

আর একটি বর্ণনায় আছে, ‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাবূকের যুদ্ধে বৃহস্পতিবার বের হয়েছিলেন। আর তিনি বৃহস্পতিবার সফরে বের হওয়া পছন্দ করতেন। অন্য এক বর্ণনায় আছে, তিনি সফর থেকে কেবল দিনে চাশ্তের (সূর্য একটু উপরে উঠার) সময় আসতেন এবং এসে সর্বপ্রথম মসজিদে প্রবেশ করে দু’রাকাত নামায পড়তেন অতঃপর সেখানেই বসে যেতেন (এবং লোকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথাবার্তা বলার পর বাসায় যেতেন।)।

[1] সহীহুল বুখারী ২৭৫৮, ২৯৪৭, ২৯৪৮, ২৯৪৯, ২৯৫০, ৩০৮৮, ৩৫৫৬, ৩৮৮৯, ৩৯৫১, ৪৪১৮, ৪৬৭৩, মুসলিম ২৭৬৯, তিরমিযী ৩১০২, নাসায়ী ৩৮২৪, ৩৮২৫, ৩৮২৬, আবূ দাউদ ২২০২, ৩৩১৭, ৩৩১৭, ৩৩২১, ৪৬০০, আহমাদ ১৫৩৪৩, ১৫৩৫৪, ২৬৬২৯, ২৬৬৩৪, ২৬৬৩৭

১১/২৪। ইবনুূে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘যদি আদম সন্তানের সোনার একটি উপত্যকা হয়, তবুও সে চাইবে যে, তার কাছে দুটি উপত্যকা হোক। (কবরের) মাটিই একমাত্র তার মুখ পূর্ণ করতে পারবে। আর যে তওবা করেআল্লাহ তওবা গ্রহণ করেন।’’[1]

১২/২৫। আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘আল্লাহ সুবহানাহু অতা‘আলা ঐ দু’টি লোককে দেখে হাসেন, যাদের মধ্যে একজন অপরজনকে হত্যা করে এবং দু’জনই জান্নাতে প্রবেশ করবে। নিহত ব্যক্তিকে আল্লাহর পথে যুদ্ধ করা অবস্থায় (কোন কাফের কর্তৃক) হত্যা করে দেওয়া হল। পরে আল্লাহ তা‘আলা হত্যাকারী কাফেরকে তওবা করার তাওফীক প্রদান করেন। ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হয়ে যায়।’’[1]

পরিচ্ছদঃ ৩: সবর (ধৈর্যের) বিবরণ

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱصۡبِرُواْ وَصَابِرُواْ ﴾ [ال عمران: ٢٠٠] 

অর্থাৎ “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ধৈর্য ধারণে প্রতিযোগিতা কর।” (সূরা আলে ইমরান ২০০ আয়াত)

তিনি আরও বলেন,

﴿وَلَنَبۡلُوَنَّكُم بِشَيۡءٖ مِّنَ ٱلۡخَوۡفِ وَٱلۡجُوعِ وَنَقۡصٖ مِّنَ ٱلۡأَمۡوَٰلِ وَٱلۡأَنفُسِ وَٱلثَّمَرَٰتِۗ وَبَشِّرِ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٥﴾ [البقرة: ١٥٥] 

অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কিছু ভয় ও ক্ষুধা দ্বারা এবং কিছু ধনপ্রাণ এবং ফলের (ফসলের) নোকসান দ্বারা পরীক্ষা করব; আর তুমি ধৈর্যশীলদেরকে সুসংবাদ দাও।” (সূরা বাকারাহ ১৫৫ আয়াত)

তিনি আরও বলেন,

﴿ إِنَّمَا يُوَفَّى ٱلصَّٰبِرُونَ أَجۡرَهُم بِغَيۡرِ حِسَابٖ﴾ [الزمر: ١٠] 

অর্থাৎ “ধৈর্যশীলদেরকে তো অপরিমিত পুরস্কার দেওয়া হবে।” (সূরা যুমার ১০ আয়াত)

তিনি অন্যত্র বলেন,

﴿ وَلَمَن صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَٰلِكَ لَمِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ٤٣ ﴾ [الشورا: ٤٣] 

অর্থাৎ “অবশ্যই যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে, নিশ্চয় তা দৃঢ়-সংকল্পের কাজ।” (সূরা শুরা ৪৩ আয়াত)

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱسۡتَعِينُواْ بِٱلصَّبۡرِ وَٱلصَّلَوٰةِۚ إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلصَّٰبِرِينَ ١٥٣ ﴾ [البقرة: ١٥٣] 

অর্থাৎ “হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে থাকেন।” (সূরা বাকারাহ ১৫৩ আয়াত)

 তিনি আরো বলেন,

﴿ وَلَنَبۡلُوَنَّكُمۡ حَتَّىٰ نَعۡلَمَ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰبِرِينَ وَنَبۡلُوَاْ أَخۡبَارَكُمۡ ٣١ ﴾ [محمد: ٣١] 

 অর্থাৎ “আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি তোমাদের মধ্যে মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে জেনে নিই এবং আমি তোমাদের অবস্থা পরীক্ষা করি।” (সূরা মুহাম্মাদ ৩১ আয়াত)

আয়াতসমূহে ধৈর্যের আদেশ এবং তার মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে তার সংখ্যা অনেক ও প্রসিদ্ধ।

 

১/২৬। আবূ মালিক হারিস ইবনুূে ‘আসেম আশ‘আরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘পবিত্রতা অর্ধেক ঈমান। আর ‘আলহামদু লিল্লাহ’ (কিয়ামতে নেকীর) দাঁড়িপাল্লাকে ভরে দেবে এবং ‘সুবহানাল্লাহ’ ও ‘আলহামদু লিল্লাহ’ আসমান ও যমীনের মধ্যস্থিত শূন্যতা পূর্ণ করে দেয়। নামায হচ্ছে জ্যোতি। সাদকাহ হচ্ছে প্রমাণ। ধৈর্য হল আলো। আর কুরআন তোমার স্বপক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল। প্রত্যেক ব্যক্তি সকাল সকাল সবকর্মে বের হয় এবং তার আত্মার ব্যবসা করে। অতঃপর সে তাকে (শাস্তি থেকে) মুক্ত করে অথবা তাকে (আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত ক’রে) বিনাশ করে।’’[1]

৪/২৯। আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশী অসুস্থ হয়ে পড়লেন এবং তাকে কষ্ট ঘিরে ফেলল, তখন (তাঁর কন্যা) ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বললেন, ‘হায়! আব্বাজানের কষ্ট!’ তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথা শুনে বললেন, ‘‘আজকের দিনের পর তোমার পিতার কোনো কষ্ট হবে না।’’ অতঃপর যখন তিনি মারা গেলেন, তখন ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা বললেন, ‘হায় আব্বাজান! প্রভু যখন তাঁকে আহ্বান করলেন, তখন তিনি তাঁর ডাকে সাড়া দিলেন। হায় আব্বাজান! জান্নাতুল ফিরদাউস তাঁর বাসস্থান। হায় আব্বাজান! আমরা জিবরীলকে আপনার মৃত্যু-সংবাদ দেব।’ অতঃপর যখন তাঁকে সমাধিস্থ করা হল, তখন ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা (সাহাবাদেরকে) বললেন, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর মাটি ফেলতে কি তোমাদেরকে ভাল লাগল?[1]

[1] সহীহুল বুখারী ৪৪৬২, নাসায়ী ১৮৪৪, ইবনুূু মাজাহ ১৬২৯, ১৬৩০, আহমাদ ১২০২৬, ১২৬১৯, ১২৭০৪, দারেমী ৮৭

৫/৩০। আবূ যায়েদ উসামাহ ইবনুূে যাইদ ইবনুূে হারেসাহ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর স্বাধীনকৃত দাস এবং তাঁর প্রিয়পাত্র তথা প্রিয়পাত্রের পুত্র থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা তাঁর নিকট সংবাদ পাঠালেন যে, ‘আমার ছেলের মর মর অবস্থা, তাই আপনি আমাদের এখানে আসুন।’ ‘তিনি সালাম দিয়ে সংবাদ পাঠালেন যে, ‘‘আল্লাহ তা‘আলা যা নিয়েছেন, তা তাঁরই এবং যা দিয়েছেন তাও তাঁরই। আর তাঁর কাছে প্রতিটি জিনিসের এক নির্দিষ্ট সময় আছে।” অতএব সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং সওয়াবের আশা রাখে।’ রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা পুনরায় কসম দিয়ে বলে পাঠালেন যে, তিনি যেন অবশ্যই আসেন। ফলে তিনি সা‘দ ইবনুূে ‘উবাদাহ, মু‘আয ইবনুূে জাবাল, উবাই ইবনুূে কা‘ব, যাইদ ইবনুূে সাবেত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এবং আরো কিছু লোকের সঙ্গে সেখানে গেলেন। শিশুটিকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তুলে দেওয়া হল। তিনি তাকে নিজ কোলে বসালেন। সে সময় তার প্রাণ ধুক্ধুক্ করছিল। (তার এই অবস্থা দেখে) তাঁর চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। সা‘দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! একি?’ তিনি বললেন, ‘‘এ হচ্ছে দয়া, যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের অন্তরে রেখে দিয়েছেন।’’ অন্য একটি বর্ণনায় আছে, ‘‘যে সব বান্দার অন্তরে তিনি চান তাদের অন্তরে রেখে দিয়েছেন। আর আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে কেবল মাত্র দয়ালুদের প্রতিই দয়া করেন।’’[1]

[1] সহীহুল বুখারী ১২৮৪, ৫৬৫৫, ৬৬০২, ৬৬৫৫, ৭৩৭৭, ৭৪৪৮, মুসলিম ৯২৩, নাসায়ী ১৮৬৮, আবূ দাউদ ৩১২৫, আহমাদ ২১২৬৯, ২১২৮২, ২১২৯২

প্রশ্নঃ ১: মরণাপন্ন ব্যক্তির কাছে উপস্থিত ব্যক্তির করণীয় কি? আর মরণাপন্ন ব্যক্তির নিকট সূরা ইয়াসিন পড়া কি সুন্নাতসম্মত?

বিবরণ/উত্তরঃ

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। সমস্ত প্রশংসা মহান রব্বুল আলামীনের জন্য, দরূদ এবং সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবীর প্রতি, তাঁর পরিবারবর্গের প্রতি এবং সকল ছাহাবীর প্রতি। রোগী দেখতে যাওয়া মুসলিমদের পারস্পরিক অধিকার। আর যে রোগী দেখতে যাবে, তার জন্য উচিৎ হবে রোগীকে তওবা, যরূরী অছিয়ত এবং সর্বদা আল্লাহ্‌র যিক্‌র করার কথা স্বরণ করিয়ে দেওয়া। কেননা রোগী এ সময় এ জাতীয় বিষয়ের খুব বেশী মুখাপেক্ষী থাকে। অনুরূপভাবে রোগী যদি মৃত্যুমুখে পতিত হয় এবং তার কাছে উপস্থিত ব্যক্তি যদি নিশ্চিত হয় যে, তার মৃত্যু এসে গেছে, তাহলে তার উচিৎ তাকে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ পড়ার কথা স্বরণ করিয়ে দেওয়া, যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন।[1]

সে শুনতে পায় এমন শব্দে তার নিকট আল্লাহ্‌র যিকর করবে। ফলে সে স্মরণ করবে এবং আল্লাহ্‌র যিকর করবে। বিদ্বানগণ বলেন, মুমূর্ষু ব্যক্তিকে লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ পড়ার জন্য আদেশ করা উচিৎ নয়। কেননা তার মনটা ছোট হয়ে যাওয়া এবং তার এই কঠিন অবস্থার কারণে সে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ বলতে অস্বীকার করে বসতে পারে। আর অস্বীকার করে বসলেই তার শেষ ভাল হবে না। সেজন্য তার শয্যাপাশে লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ পড়ে তাকে এই কালিমা স্বরণ করাবে। [অর্থাৎ তাকে বলবেনা যে, হে অমুক! লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ পড়]।

এমনকি বিদ্বানগণ বলেছেন, যদি তাকে স্বরণ করিয়ে দেওয়ার পর সে স্বরণ করে এবং ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ পড়ে, তাহলে তখন চুপ হয়ে যাবে এবং তার সাথে আর কোনো কথা বলবে না- যাতে দুনিয়াতে তার সর্বশেষ কথাটি হয় ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’। কিন্তু মুমূর্ষু ব্যক্তি যদি তারপর আবার অন্য কোন কথা বলে ফেলে, তাহলে আবার তাকে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ স্বরণ করাবে- যাতে তার শেষ কালেমাটি হয় ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’।

আর মরণাপন্ন ব্যক্তির নিকট সূরা ইয়াসীন তেলাওয়াতকে অনেক বিদ্বান সুন্নাত বলেছেন। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা মরণাপন্ন ব্যক্তির  নিকট সূরা ইয়াসীন পড়’।[2] তবে কেউ কেউ হাদীছটি যঈফ বলেছেন। সুতরাং যার দৃষ্টিতে হাদীছটি ছহীহ, তার নিকট সুরা ইয়াসীন পড়া সুন্নাত। পক্ষান্তরে যার দৃষ্টিতে হাদীছটি যঈফ, তার নিকট সূরাটি পড়া সুন্নাত নয়।[3]


ফুটনোটঃ[1]. ইমাম মুসলিম আবু সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের মুমূর্ষু রোগীদেরকে ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ স্বরণ করাও’ (‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯১৬)।

[2]. আবু দাঊদ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৩১২১; ইবনু মাজাহ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১৪৪৮; আহমাদ, ৫/২৬, ২৭।

[3]. হাদীছটিকে ইমাম আলবানী ‘যঈফ’ বলেছেন (আলবানী, সুনানে আবূ দাঊদ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৩১২১)। তিনি ‘ইরওয়াউল গালীল’-এ বলেছেন, হাদীছটিতে তিনটি ত্রুটি রয়েছে: ১. (হাদীছটির একজন বর্ণনাকরী) আবূ উছমান ‘মাজহূল’ বা অপরিচিত, ২. তার পিতাও ‘মাজহূল এবং ৩. হাদীছটিতে ‘ইযত্বিরাব’ রয়েছে (৩/১৫১, হা/৬৮৮)। সেজন্য শায়খ ইবনে বায (রহেমাহুল্লাহ)কে এ প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, হাদীছটিতে যেহেতু একজন ‘মাজহূল’ বা অপরিচিত বর্ণনাকারী রয়েছে, সেহেতু মুমূর্ষু ব্যক্তির নিকট সূরা ইয়াসীন তেলাওয়াত করা উত্তম নয়। অবশ্য তার নিকট পবিত্র ক্বুরআন পড়া ভাল। কিন্তু সূরা ইয়াসীনকে নির্দিষ্ট করে নেওয়ার কোন যুক্তি নেই (মাজমূউ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১৩/৯৫)।–অনুবাদক।

প্রশ্নঃ ২: জানাযা পড়ার জন্য সমবেত করার উদ্দেশ্যে কারো মৃত্যু সংবাদ তার আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবকে দিলে কি তা নিষিদ্ধ মৃত্যু সংবাদ ঘোষণার আওতায় পড়বে নাকি তা বৈধ?

বিবরণ/উত্তরঃ

এটি বৈধ মৃত্যু সংবাদ ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজাশীর মৃত্যুর দিনে তাঁর মৃত্যুর খবর দিয়েছিলেন।[1] তাছাড়া যে মহিলা মসজিদ ঝাড়ু দিত, ছাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ না দিয়ে দাফন করে ফেললে তিনি বলেন, ‘তোমরা যদি আমাকে খবরটি দিতে’।[2]

সুতরাং জানাযায় বেশী মানুষ শরীক হওয়ার উদ্দেশ্যে কারো মৃত্যু সংবাদ দিলে কোন সমস্যা নেই। কেননা এ মর্মে হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। তবে মৃত ব্যক্তিকে দাফনের পরে মৃত্যুসংবাদ ঘোষণা শরী‘আত সম্মত নয়; বরং তা নিষিদ্ধ মৃত্যুসংবাদ ঘোষণার অন্তর্ভুক্ত।


ফুটনোটঃ[1]. বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১৩২৭; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫১।
[2]. বুখারী, ‘ছালাত’ অধ্যায়, হা/৪৫৮; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫৬।
 

প্রশ্নঃ ৩: মৃতকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতি কি? এতদ্বিষয়ে এবং মৃতকে গোসল দেওয়ার ব্যাপারে দ্বীনি ছাত্রবৃন্দের জন্য আপনার নছীহত কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

মৃতকে গোসল দেওয়ার পদ্ধতিঃ মৃত ব্যক্তিকে এমন এক ঘেরা জায়গায় নিতে হবে, যেখানে কেউ তাকে দেখতে পাবে না। যারা তাকে গোসল করানোর কাজে সরাসরি অংশগ্রহণ করবে এবং যারা তাদেরকে সহযোগিতা করবে, তারা ছাড়া আর কেউ তার কাছে যাবে না। অতঃপর যে গোসল করাচ্ছে সে সহ অন্য কেউ যাতে তার লজ্জাস্থান দেখতে না পায়, সেজন্য তার লজ্জাস্থানে একটি নেকড়া দিয়ে দেহের কাপড়-চোপড় খুলে ফেলতে হবে। তারপর তাকে পরিষ্কার-পরিছন্ন করতে হবে। অতঃপর ছালাতের অযূর ন্যায় তাকে অযূ করাবে। তবে বিদ্বানগণ বলেন, তার নাক-মুখে পানি প্রবেশ করাবে না। বরং একটা নেকড়া ভিজিয়ে তা দিয়ে মৃতের দাঁত সমূহ এবং নাকের ভেতরে ঘষে পরিষ্কার করে দিবে। এরপর মৃতের মাথা ধুয়ে দিবে। অতঃপর তার সমস্ত শরীর ধুয়ে দিবে। তবে শরীর ধোয়ার সময় মৃত ব্যক্তির ডান অঙ্গ থেকে শুরু করবে। পানিতে বরই পাতা দেওয়া উচিৎ। কেননা তা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় সাহায্য করে। বরই পাতার ফেনা দিয়ে মৃতের মাথা, দাড়ি ধুয়ে দিবে। অনুরূপভাবে শেষ বার ধোয়ার সময় পানিতে একটু কর্পূর মিশানো উচিৎ। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মেয়েকে গোসলদানকারী মহিলাগণকে বলেছিলেন, ‘শেষবার ধোয়ার সময় পানিতে একটু কর্পূর মিশাবে’।[1] অতঃপর মৃতের গায়ের পানি মুছে তাকে কাফনের কাপড় পরাবে।

মৃতকে গোসল দেওয়া ফরযে কেফায়াহ। কেউ তা সম্পন্ন করলে অন্যদের উপর থেকে ফরযিয়াত উঠে যাবে। আমার মতে, যারা মৃত ব্যক্তিকে শর‘ঈ পদ্ধতিতে গোসল দিতে জানে, তারাই মৃতদের গোসলের দায়িত্ব নিবে। দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের সরাসরি গোসল করানোর কাজে অংশ নেওয়া যরূরী নয়। কেননা হতে পারে যে, শিক্ষার্থীরা এর চেয়ে আরো বেশী যরূরী কাজে ব্যস্ত রয়েছে। সেজন্য এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ গোসল দিলেই যথেষ্ট হবে। তবে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মৃতকে কাফন-দাফন করার পদ্ধতি ভালভাবে জেনে রাখা উচিৎ।


ফুটনোটঃ[1]. ইমাম মুসলিম উম্মে আত্বিইয়া (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা) হতে র্বণনা করেন, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৩৯। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ৪: জানাযার ছালাতের পদ্ধতি কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

জানাযা ছালাতের পদ্ধতি: মৃতকে মুছল্লীদের সামনে রাখতে হবে। মৃত পুরুষ হলে ইমাম মাথা বরাবর দাঁড়াবেন আর মহিলা হলে দাঁড়াবেন মাঝ বরাবর। অতঃপর প্রথম তাকবীর দিয়ে সূরা ফাতিহা পড়বেন, দ্বিতীয় তাকবীর দিয়ে দরূদ শরীফ পড়বেন এবং তৃতীয় তাকবীর দিয়ে মৃতের জন্য দো‘আ করবেন।

«اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا وَشَاهِدِنَا وَغَائِبِنَا وَصَغِيرِنَا وَكَبِيرِنَا وَذَكَرِنَا وَأُنْثَانَا، اللَّهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الإِسْلاَمِ، وَمَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَفَّهُ عَلَى الإِيمَانِ, اللَّهُمَّ لاَ تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ، وَلاَ تَفْتِنَّا بَعْدَهُ»

এই সাধারণ দো‘আটি পড়বেন। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত মৃতের জন্য বিশেষ দো‘আ পড়বেন। তা সম্ভব না হলে অন্য যে কোন দো‘আর মাধ্যমে তার জন্য দো‘আ করবেন। মোদ্দাকথাঃ মৃত ব্যক্তির জন্য খাছ কিছু দো‘আ করবেন। কেননা সে দো‘আর খুব বেশী মুখাপেক্ষী। অতঃপর চতুর্থ তাকবীর দিয়ে সামান্য একটু অপেক্ষা করে সালাম ফিরাবেন। কোন কোন বিদ্বান বলেন, চতুর্থ তাকবীরের পরে

﴿رَبَّنَا آتِنَا فِى الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِى الآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ﴾ [سورة البقرة: 136]

দো‘আটি পড়বেন। আর পঞ্চম তাকবীর দিলে কোন  সমস্যা নেই;  বরং সেটিও সুন্নাত সম্মত।[1] সেজন্য মাঝে মাঝে পঞ্চম তাকবীর দেওয়া উচিৎ, যাতে এই সুন্নাতটি বিলুপ্ত না হয়ে যায়। তবে যদি তিনি পঞ্চম তাকবীর দেওয়ার নিয়্যত করেন, তাহলে দো‘আ চতুর্থ ও পঞ্চম তাকবীরে ভাগ করে পড়বেন। আল্লাহই ভাল জানেন।

মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫৭। 

প্রশ্নঃ ৫: মুর্দাকে প্রস্তত করা, তাকে গোসল দেওয়া, কাফন পরানো, তার জানাযার ছালাত পড়া অথবা তাকে দাফন করার ক্ষেত্রে আত্মীয়-স্বজন আসা পর্যন্ত বিলম্ব করার হুকুম কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

মৃতের দাফন সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে বিলম্ব করা সুন্নাত পরিপন্থী এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদেশ বিরোধী। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা তাড়াতাড়ি মৃত ব্যক্তির দাফনকার্য সম্পন্ন করো। কেননা সে যদি পূণ্যবান হয়, তাহলে তার জন্য উত্তম পরিণতি রয়েছে, তাকে তোমরা কল্যাণের দিকে নিয়ে যাচ্ছ। আর যদি সে এর ব্যতিক্রম হয়, তাহলে তার জন্য খারাপ রয়েছে, যাকে তোমরা তোমাদের কাঁধ থেকে (তাড়াতড়ি) নামিয়ে দিচ্ছ’।[1]

সামান্য পরিমাণ বিলম্ব করা যেতে পারে। যেমনঃ কারো জন্য ১/২ ঘন্টা অপেক্ষা করা। মনে রাখতে হবে, দীর্ঘ সময় বিলম্ব করা মৃতের উপর অবিচার করার শামিল। কেননা নেকাত্মাকে যখন তার পরিবার গোরস্থানের উদ্দেশ্যে নিয়ে বের হয়, তখন সে বলে, আমাকে দ্রুত নিয়ে যাও, আমাকে দ্রত নিয়ে যাও।[2] বুঝা গেল, সে দ্রুততা কামনা করে। কেননা তাকে কল্যাণ ও অশেষ ছওয়াবের ওয়াদা করা হয়েছে।


বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১৩১৫; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৪৪।
[2]. বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১৩৮০।
 


বিষয়/প্রশ্নঃ ৬: সবক্ষেত্রে গায়েবানা জানাযা কি শরী‘আত সম্মত?

বিবরণ/উত্তরঃ

বিদ্বানগণের অগ্রাধিকারযোগ্য অভিমত হচ্ছে, যার জানাযা পড়া হয়নি, কেবল তার ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য কারো গায়েবানা জানাযা শরী‘আত সম্মত নয়। যেমনঃ কেউ যদি কাফের রাষ্ট্রে মৃত্যুবরণ করে এবং তার জানাযা পড়া না হয়, তাহলে তার গায়েবানা জানাযা পড়া আবশ্যক। কিন্তু যদি তার জানাযার ছালাত সম্পন্ন হয়, তাহলে সঠিক কথা হল, তার গায়েবানা জানাযা শরী‘আতসম্মত নয়। কেননা বাদশাহ নাজাশী ছাড়া অন্য কারো গায়েবানা জানাযার কথা হাদীছে আসেনি।[1] আর নাজাশীর জানাযার ছালাত তাঁর দেশে সম্পন্ন হয়েছিল না। সে কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে তাঁর গায়েবানা জানাযা আদায় করেছিলেন। অনেক বড় বড় ব্যক্তি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবদ্দশায় মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তিনি তাদের গায়েবানা জানাযা পড়েছেন মর্মে কিছুই বর্ণিত হয় নি।

কোন কোন বিদ্বান বলেন, যার মাল দ্বারা বা ইল্‌ম দ্বারা দ্বীনের উপকার সাধিত হয়, এমন ব্যক্তির গায়েবানা জানাযা পড়া যেতে পারে। পক্ষান্তরে যার অবস্থা এমনটি হবে না, তার গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে না। আবার কেউ কেউ বলেন, সবার গায়েবানা জানাযা পড়া যাবে। কিন্তু এটি অতীব দুর্বল অভিমত।


[1]. বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১৩১৩২৭; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫১। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ৭: জানাযার ছালাত পড়ানোর ক্ষেত্রে কে বেশী উত্তম? ইমাম নাকি মৃতের অভিভাবক?

বিবরণ/উত্তরঃ

যদি কারো জানাযার ছালাত মসজিদে পড়া হয়, তাহলে মসজিদের ইমাম বেশী উত্তম। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কেউ কারো কর্তৃত্বের স্থলে ইমামতি করবে না’।[1] কিন্তু মসজিদ ছাড়া অন্য কোথাও যদি তার জানাযা হয়, তাহলে মৃতের অছিয়ত প্রাপ্ত ব্যক্তিই জানাযা পড়ানোর ক্ষেত্রে উত্তম। তবে যদি তার অছিয়ত প্রাপ্ত কেউ না থাকে, তাহলে তার নিকটতম ব্যক্তি উত্তম হিসাবে বিবেচিত হবে।


ফুটনোটঃ[1]. মুসলিম, ‘মসজিদসমূহ’ অধ্যায়, হা/৬৭৩। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ৮: একই জানাযায় কয়েকজন মুর্দার উপস্থিতিতে আমরা কি তাদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিকে ইমামের নিকটবর্তী করব নাকি তারা সবাই সমান?

বিবরণ/উত্তরঃ

প্রথমে পুরুষদেরকে, তারপর মহিলাদেরকে রাখতে হবে। অনুরূপভাবে বালককে মহিলার আগে রাখতে হবে। যদি একই জানাযায় একজন পুরুষ, একজন অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক বালক, একজন প্রাপ্ত বয়ষ্কা মহিলা এবং একজন অপ্রাপ্ত বয়ষ্কা বালিকা থাকে, তাহলে তাদেরকে সাজাতে হবে এভাবেঃ ইমামের কাছাকাছি পুরুষটিকে, তারপর অপ্রাপ্ত বয়ষ্ক বালকটিকে, তারপর মহিলাটিকে এবং তারপর অপ্রাপ্ত বয়ষ্কা বালিকাটিকে রাখতে হবে।

কিন্তু  যদি তারা সবাই একই লিঙের হয়, যেমনঃ যদি সবাই পুরুষ হয়, তাহলে সর্বাপেক্ষা জ্ঞানী ব্যক্তিকে ইমামের নিকটবর্তী স্থানে রাখতে হবে। কেননা উহুদ যুদ্ধের শহীদগণের কয়েকজনকে যখন একই ক্ববরে দাফন করা হচ্ছিল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কুরআন জানা ছাহাবীকে আগে ক্ববরে রাখার নির্দেশ করেছিলেন।[1] এই হাদীছ প্রমাণ করে যে, আলেম ব্যক্তিকে ইমামের কাছাকাছি রাখতে হবে।


ফুটনোটঃ[1]. সুনানে আবু দাঊদ, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৩১৩৬; তিরমিযী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১০১৬; আলবানী (রহেমাহুল্লাহ) হাদীছটিকে ‘ছহীহ’ বলেছেন। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ৯: একই জানাযায় পুরুষ, মহিলা এবং বাচ্চা থাকলে ইমাম কোথায় দাঁড়াবেন?

বিবরণ/উত্তরঃ

মানুষ বড় হোক অথবা ছোট হোক ইমাম পুরুষের মাথা বরাবর এবং মহিলার মাঝামাঝি স্থানে দাঁড়াবেন। অতএব, মৃত ছোট বালক হলেও ইমাম তার মাথার কাছে দাঁড়াবেন। অনুরূপভাবে ছোট বালিকা হলেও তার মাঝ বরাবর দাঁড়াবেন।


বিষয়/প্রশ্নঃ ১০: মুর্দা অনেকগুলি হলে জানাযার সময় তাদের পুরুষ কিংবা মহিলা হওয়া সম্পর্কে মুছল্লীদেরকে অবহিত করার হুকুম কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

এতে কোন সমস্যা নেই। কেননা মৃত পুরুষ হলে মুছল্লীরা দো‘আয় পুং লিঙ্গের শব্দ ব্যবহার করবে, আর মহিলা হলে স্ত্রী লিঙ্গের শব্দ ব্যবহার করবে। তবে মুছল্লীরা নির্দিষ্ট দো‘আ না পড়লেও কোন সমস্যা নেই। উল্লেখ্য যে, যারা মৃতের লিঙ্গ সম্পর্কে অবহিত হবে না, তারা সাধারণভাবে মুর্দার জানাযা পড়ার নিয়্যত করবে এবং ঐ জানাযাই তাদের জন্য যথেষ্ট হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।

প্রশ্নঃ ১১: বিশেষ করে জুম‘আর দিনে অনেক মুর্দার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়, এমনকি তাদের জন্য ইমামের সামনের জায়গাও সংকুলান হয় না।[1] এক্ষেত্রে কি কয়েক দফায় তাদের জানাযা পড়তে হবে?

বিবরণ/উত্তরঃ

ইমামের সামনে একজনকে আরেকজনের পরে রেখে সবার জানাযা একসাথে পড়তে হবে। এক্ষেত্রে ইমাম এবং মুছল্লী একটু পেছনে সরে দাঁড়াবেন, এমনকি তারা কাতার একটু ঘন করে দাঁড়ালেও কোন সমস্যা নেই। কেননা তাদের রুকূ-সেজদার কোন প্রয়োজন নেই।


ফুটনোটঃ[1]. পবিত্র কা‘বা শরীফ ও মসজিদে নববীসহ সঊদী আরবের অনেক মসজিদে একসাথে অনেক মুর্দা উপস্থিতির দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। আমাদের বাংলাদেশে সাধারণতঃ এমনটি ঘটে না বলে সম্মানিত পাঠকের বুঝতে একটু সমস্যা হতে পারে ভেবে আমরা সঊদী আরবের অবস্থা তুলে ধরলাম। --অনুবাদক। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ১২: জানাযার ছালাতে বেশী মুছল্লী উপস্থিতির বিষয়ে কি কোন বর্ণনা এসেছে? বেশী মুছল্লী শরীক হওয়ার হিকমত কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

হ্যাঁ, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এরশাদ করেন, কোন মুসলিম মারা গেলে যদি তার জানাযায় এমন চল্লিশ জন ব্যক্তি উপস্থিত হয়, যারা আল্লাহ্‌র সাথে কাউকে শরীক করে না; তাহলে তার ব্যপারে তাদের সুপারিশ আল্লাহ ক্ববূল করেন।[1]


ফুটনোটঃ[1]. ইমাম মুসলিম ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৪৮। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ১৩: জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহার পরে অন্য আয়াত বা সূরা মিলানোর হুকুম কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহার পরে ক্বুরআনের অন্য কোন আয়াত বা সূরা পড়লে কোনো সমস্যা নেই। তবে যেন ক্বিরাআত লম্বা না করে। আর শুধু সূরা ফাতিহা পড়লেও তা যথেষ্ট হবে। কেননা জানাযার ছালাত লম্বা না করে খাটো করে পড়তে হয়। সেজন্যই তো এই ছালাতে ছানা পড়তে হয় না; বরং আঊযুবিল্লাহ পড়ে সূরা ফাতিহা পড়তে হয়।


বিষয়/প্রশ্নঃ ১৪: ছোট বাচ্চার জানাযার ছালাতে কোন্‌ দো‘আ পড়তে হয়?

বিবরণ/উত্তরঃ

বিদ্বানগণ বলেন, জানাযার সাধারণ দো‘আ পড়ার পর ছোট বাচ্চার জন্য নিম্নোক্ত দো‘আ পড়বে,

اَللَّهُمَّ اجْعَلْهُ فَرَطاً لِوَالِدَيْهِ وَذُخْراً وَشَفِيْعًا مُجَاباً. اَللَّهُمَّ ثَقِّلْ بِهِ مَوَازِيْنَهُمَا وَأَعْظِمْ بِهِ أُجُوْرَهُمَا وَأَلْحِقْهُ بِصَالِحِ سَلَفِ الْمُؤْمِنِيْنَ, وَاجْعَلْهُ فِيْ كَفَالَةِ إِبْرَاهِيْمَ, وَقِهِ بِرَحْمَتِكَ عَذَابَ الْجَحِيْمِ.  

উক্ত দো‘আও পড়তে পারে অথবা অন্য দো‘আও পড়তে পারে। এক্ষেত্রে হুকুম প্রশস্ত এবং এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোন ছহীহ হাদীছ পাওয়া যায় না। আল্লাহই ভাল জানেন।


বিষয়/প্রশ্নঃ ১৫: জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

সূরা ফাতিহা পাঠ ছালাতের একটি রুকন। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়ে না, তার ছালাত হয় না।[1]

এক্ষেত্রে জানাযার ছালাত এবং অন্য ছালাতের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কেননা জানাযাও এক প্রকার ছালাত। সুতরাং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাধারণ ঘোষণা, ‘যে ব্যক্তি সূরা ফাতিহা পড়বে না, তার ছালাত হবে না’ জানাযার ছালাতকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।


ফুটনোটঃ[1]. ইমাম বুখারী উবাদাহ ইবনে ছামিত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে হাদীছটি বর্ণনা করেন, ‘আযান’ অধ্যায়, হা/৭৫৬; মুসলিম, ‘ছালাত’ অধ্যায়, হা/৩৯৪। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ১৬: কারো জানাযার এক বা একাধিক তাকবীর ছুটে গেলে সে কি তার ক্বাযা আদায় করবে? সে ইমামের সাথে ছালাত শুরু করবেইবা কিভাবে?

বিবরণ/উত্তরঃ

ইমামকে ছালাতের যে অবস্থাতে পাবে, ঠিক সেই অবস্থা থেকেই ইমামের সাথে ছালাত শুরু করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমরা  (ইমামের সাথে) ছালাতের যতটুকু পাও, ততটুকু আদায় কর। আর যতটুকু তোমাদের ছুটে যায়, ততটুকু পূরণ কর’।[1] যদি মুর্দা সেখানে থাকে, তাহলে ইমাম সালাম ফিরালে সে ছালাতের বাক্বী অংশ পূরণ করে নিবে। কিন্তু যদি মুর্দাকে সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়ার আশংকা থাকে, তাহলে আমাদের ফক্বীহগণের মতানুসারে, সে তাকবীর পূরণও করতে পারে অথবা ইমামের সাথে সালামও ফিরাতে পারে। আল্লাহই  ভাল জানেন।


ফুটনোটঃ[1]. বুখারী, ‘আযান’ অধ্যায়, হা/৬৩৫। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ১৭: কোন্‌ কোন্‌ সময়ে জানাযার ছালাত আদায় করা নিষেধ? আর কেনইবা ফজরের পূর্বে এবং আছরের পূর্বে মানুষ জানাযা ছালাত পড়ে না- বিশেষ করে কা‘বা ও মসজিদে নববীতে- অথচ তারা ঐসময় সমবেত থাকে?

বিবরণ/উত্তরঃ

তিনটি সময়ে আমাদেরকে ছালাত আদায় করতে এবং মুর্দা দাফন করতে নিষেধ করা হয়েছেঃ সূর্যোদয়ের সময় থেকে সূর্য্য সামান্য পরিমাণ উপরে উঠা পর্যন্ত, ভরা দুপুর বেলায় অর্থাৎ সূর্য ঢলে যাওয়ার ১০ মিনিট মত আগে এবং সূর্যাস্তের সময়। উক্ত তিন সময় হল নিষিদ্ধ সময়। উক্ববা বিন আমের  রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীছে এসেছে, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তিন সময়ে ছালাত আদায় করতে এবং মুর্দা দাফন করতে নিষেধ করেছেন।[1] অতঃপর তিনি উক্ত তিনটি সময় উল্লেখ করেন।

তবে ফজর ও আছরের পরে যেহেতু জানাযার ছালাত আদায় করতে কোনো নিষেধ নেই, সেহেতু ফজর ও আছরের পূর্বে আগেভাগে জানাযা ছালাত আদায়ের কোনো প্রয়োজন নেই।


ফুটনোটঃ[1]. মুসলিম, ‘মুসাফিরদের ছালাত’ অধ্যায়, হা/৮৩১। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ১৮: জানাযার ছালাতের জন্য মৃতদেহকে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার আগে এবং দাফনের সময় মাটিতে রাখার আগে তার উদ্দেশ্যে দাঁড়ানোর হুকুম কি? আর দাফনের সময় দাঁড়ানোর হুকুমইবা কি? উল্লেখ্য যে, মৃতদেহকে মসজিদে প্রবেশ করানোর সময় মানুষ যখন তার জানাযার জন্য দাঁড়ায়, তখন তারা ছালাতের পরের যিকর-আযকার ছেড়ে দেয়!

বিবরণ/উত্তরঃ

মানুষের পাশ দিয়ে যখন মৃতদেহ অতিক্রম করে, তখন তার জন্য দাঁড়ানো সুন্নাত। এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশ রয়েছে।[1]

আর ইমামের সালাম ফিরানোর পরপরই জানাযা ছালাত শুরু করার বিষয়ে আমরা বলব, যদি ছুটে যাওয়া ছালাত পূরণকারীর সংখ্যা সেখানে অনেক হয়, তাহলে বাক্বীরা তাদের জন্য অপেক্ষা করবে; যাতে তারা জানাযার ছালাতের ফযীলত থেকে বঞ্চিত না হয়ে যায় এবং যাতে জানাযায় মুছল্লীর সংখ্যা বেশী হয়। কিন্তু যদি সেখানে সবাই পূর্ণ জামা‘আত পায় অথবা রাক‘আত ছুটে যাওয়া মুছল্লীর সংখ্যা কম হয়, তাহলে তাড়াতাড়ি পড়ে নেওয়া ভাল; যাতে মানুষ না চলে যায়।


ফুটনোটঃ[1]. আমের ইবনে রবী‘আহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক বর্ণিত মারফূ‘ হাদীছে এসেছে, ‘যখন তোমাদের কেউ মৃতদেহ দেখবে, তখন সে যদি তার সাথে গমনকারী না হয়, তাহলে দাঁড়াবে; যতক্ষণ না সে মুর্দাটিকে পেছনে ফেলে যায় অথবা মুর্দা তাকে পেছনে ফেলে যায় অথবা মুর্দা তাকে পেছনে ফেলে যাওয়ার আগে মুর্দাকে মাটিতে রাখা হয়’ (বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/১৩০৮; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫৮)। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ১৯: মৃতের পরিবার-পরিজন অথবা তাকে বহনকারী ব্যক্তিরা জানাযার ছালাতের সময় সামনে গিয়ে যদি ইমামের ডান পাশে দাঁড়ায়, তাহলে শরী‘আতে এর কোন ভিত্তি আছে কি? এক্ষেত্রে সুন্নাত কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

মৃতের আত্মীয়-স্বজন অথবা তাকে বহনকারী ব্যক্তিরা তাকে নিয়ে সামনে গেলেও তারা ইমামের ডান-বাম কোন পাশেই ছালাত দাঁড়াবে না; বরং সাধারণ মানুষের সাথেই কাতারে দাঁড়িয়ে ছালাত আদায় করবে। কিন্তু যদি তাদের জায়গা না হয়, তাহলে তারা ইমাম ও প্রথম কাতারের মাঝে দাঁড়াবে। কেননা দুই বা ততোধিক মুছল্লী হলে ইমামের পাশে দাঁড়ানো শরী‘আতসম্মত নয়।

তবে যদি তারা দেখে যে, ইমাম ও প্রথম কাতারের মধ্যেও তাদের জায়গা হচ্ছে না, তাহলে তারা ইমামের ডান ও বাম পাশে দাঁড়াবে। মৃতদেহ বহনকারী একজন হলে সে ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে। যেমনঃ মৃত ছোট বালক হলে সাধারণতঃ একজন বহন করে। আর বহনকারী একাধিক হলে ডান ও বাম উভয় পাশে দাঁড়াবে। আল্লাহই ভাল জানেন।



বিষয়/প্রশ্নঃ ২০: অকাল প্রসূত ভ্রূণের (গর্ভচ্যুত অসম্পূর্ণ সন্তান) জানাযা পড়তে হবে কি না?

বিবরণ/উত্তরঃ

অসম্পূর্ণ সন্তানকে রূহ প্রদানের আগেই সে গর্ভচ্যুত হলে তার জানাযা পড়তে হবে না। উল্লেখ্য যে, গর্ভধারণের চার মাসে রূহ বা আত্মা প্রদান করা হয়। ইবনে মাসঊদ  রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, ‘তোমাদের যে কাউকে তার মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিন পর্যন্ত শুক্র অবস্থায় রাখা হয়। তারপরের চল্লিশ দিনে সে রক্তপিণ্ডে পরিণত হয়। তৎপরবর্তী চল্লিশ দিনে মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়। অতঃপর তার কাছে ফেরেশতা পাঠানো হয়, তিনি তাতে আত্মার সঞ্চার করেন এবং তাকে চারটি বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া হয়ঃ তার রিযিক্ব, তার আয়ূ, তার আমল এবং সে সৌভাগ্যবান হবে নাকি দুর্ভাগা’।[1]

কিন্তু গর্ভচ্যুত অপূর্ণাঙ্গ সন্তানের পেটে আসা যদি চার মাস পূর্ণ হয়, তাহলে তাকে গোসল করাতে হবে, কাফন পরাতে হবে। অনুরূপভাবে তার জানাযা ছালাত পড়াতে হবে এবং মুসলিমদের সাথে ক্ববরস্থানে তাকে দাফন করতে হবে। আর চার মাস পূর্ণ না হলে গোসল, কাফন, জানাযা কোনটাই করতে হবে না এবং তাকে যেকোন জায়গায় দাফন করলে চলবে।


ফুটনোটঃ[1]. বুখারী, ‘সৃষ্টির প্রারম্ভ’ অধ্যায়, হা/৩২০৮; মুসলিম, ‘তাক্বদীর’ অধ্যায়, হা/২৬৪৩।

প্রশ্নঃ ২১: জানাযার সময় মৃতের মাথা ইমামের ডান দিকে রাখা কি শরী‘আত সম্মত?

বিবরণ/উত্তরঃ

এ বিষয়ে কোন হাদীছ আছে বলে আমার জানা নেই। সেজন্য ইমামের উচিৎ, মাঝেমধ্যে মৃতের মাথা তাঁর বাম দিকে রাখা; যাতে মানুষের নিকট স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মৃতের মাথা ডান দিকে রাখা ওয়াজিব নয়। কেননা এক শ্রেণীর মানুষ মনে করে, মৃত ব্যক্তির মাথা অবশ্যই ডান দিকে রাখতে হবে; অথচ শরী‘আতে এর কোন ভিত্তি নেই।

প্রশ্নঃ ২২: যদি কেউ ভিড়ের কারণে বা সুন্নাতে রাতেবাহ আদায় করার কারণে অথবা (ছুটে যাওয়া) ফরজ ছালাত পূর্ণ করার কারণে অথবা অন্য কোনো কারণে জানাযার সাথে না যায় কিন্তু দাফনের পূর্বে তার জানাযায় শরীক হয়, তাহলে কি সে মৃতের সাথে ক্ববরস্থানে গমনকারী হিসাবে বিবেচিত হবে? তার কি ক্ববরস্থানে গমনকারীর নেকী হবে?

বিবরণ/উত্তরঃ

কেউ সুন্নাতে রাতেবাহ আদায়ের কারণে জানাযা না পড়লে সে জানাযা পড়ার নেকী থেকে বঞ্চিত হবে। কেননা জানাযার কাজ শেষ করেও সে ঐ সুন্নাত পড়তে পারত। পক্ষান্তরে যদি কেউ ওযর থাকার কারণে জানাযায় শরীক হতে না পারে, অথচ সে আগ্রহ করে মৃতকে দাফন করতে এসেছে কিন্তু বাধাগ্রস্ত হয়েছে অথবা মানুষ আগেভাগে জানাযা পড়ে মুর্দাকে ক্ববরস্থানে নিয়ে গেছে, এমতাবস্থায় তার নেকী লেখা হবে। কেননা সে নিয়্যত করেছিল এবং তারপক্ষে যতটুকু সম্ভব সে চেষ্টা করেছে। আর যে ব্যক্তি নিয়্যত করে এবং নিয়্যত অনুযায়ী আপ্রাণ চেষ্টা করে, তার জন্য পূর্ণ নেকী লেখা হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿وَمَن يَخْرُجْ مِن بَيْتِهِ مُهَاجِرًا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ يُدْرِكْهُ الْمَوْتُ فَقَدْ وَقَعَ أَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ﴾ [سورة النساء: 100]

‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে হিজরত করার উদ্দেশে নিজ গৃহ থেকে বের হয়, অতঃপর মৃত্যুমুখে পতিত হয়, তার ছওয়াব আল্লাহ্‌র কাছে অবধারিত হয়ে যায়’ (নিসা ১০০)

কিন্তু ক্ববরস্থানে যদি তার পক্ষে জানাযার ছালাত পড়ে নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে পড়ে নিবে।


বিষয়/প্রশ্নঃ ২৩: মসজিদে ইমামের সাথে কারো জানাযার ছালাত ছুটে গেলে ক্ববরস্থানে দাফনের পূর্বে অথবা দাফনের পরে ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযা পড়া কি জায়েয?

বিবরণ/উত্তরঃ

হ্যাঁ, জায়েয। যদি দাফনের পূর্বে তাদের পক্ষে জানাযা পড়া সম্ভব হয়, তাহলে পড়বে। কিন্তু দাফনের পরে তারা আসলে ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযা পড়ে নিবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযা পড়েছেন মর্মে প্রমাণিত হয়েছে।[1]


ফুটনোটঃ[1]. ছহীহ বুখারী, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৪৫৮; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫৬ দ্রষ্টব্য। 


বিষয়/প্রশ্নঃ ২৪: ইমামের সাথে ফরয ছালাত পায় নি এমন কেউ জানাযা ছালাতের জন্য মৃতকে সামনে নেওয়া অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করলে সে কি ইমামের সাথে জানাযার ছালাত পড়বে নাকি আগে ফরয ছালাত পড়বে?

বিবরণ/উত্তরঃ

সে ইমামের সাথে আগে জানাযা পড়ে নিবে। কেননা ফরয ছালাত পরে আদায় করে নেওয়া যাবে। কিন্তু জানাযা ছালাত শেষে মৃতকে নিয়ে চলে গেলে সে আর জানাযা পড়ার সুযোগ পাবে না।


বিষয়/প্রশ্নঃ ২৫: মৃত ব্যক্তি ছালাত পরিত্যাগকারী হলে, অথবা সে ছালাত পরিত্যাগকারী বলে সন্দেহ হলে অথবা তার অবস্থা না জানা থাকলে তার জানাযা পড়ার হুকুম কি? জানাযার উদ্দেশ্যে তাকে ইমামের সামনে নিয়ে যাওয়া কি তার অভিভাবকের জন্য জায়েয হবে?

বিবরণ/উত্তরঃ

যার সম্পর্কে নিশ্চিত জানা যাবে যে, সে বেনামাযী হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে, তার জানাযা পড়া জায়েয হবে না। কেননা সে কাফির, মুরতাদ। ক্ববরস্থান বাদে অন্য কোথাও গর্ত করে তাকে সেই গর্তে ফেলে দেওয়া উচিৎ, তার জানাযাই পড়া উচিৎ নয়। এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে কোনো খাতির-সম্মান নেই। কেননা পরকালে ফির‘আঊন, হামান, ক্বারূন ও উবাই ইবনে খালাফের সাথে তার হাশর হবে।

তবে তার অবস্থা সম্পর্কে জানা না থাকলে অথবা সন্দেহ থাকলে তার জানাযা পড়তে হবে। কেননা অমুসলিম প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত সে একজন মুসলিম হিসাবেই গণ্য হবে। অবশ্য ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে কারো সন্দেহ থাকলে সে জানাযার সময় একটু ব্যতিক্রম দো‘আ পড়লে কোনো সমস্যা নেই। দো‘আতে সে বলবে, اَللَّهُمَّ إِنْ كَانَ مُؤْمِنًا فَاغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ ‘হে আল্লাহ! সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে তুমি ক্ষমা কর এবং তার প্রতি রহম কর’। কেননা যারা তাদের স্ত্রীদের বিরুদ্ধে যেনার অভিযোগ তুলে, তাদের ক্ষেত্রে এরূপ ব্যতিক্রম দো‘আ এসেছে। সেজন্য স্বামী যখন তার স্ত্রীকে অভিশাপ করবে, তখন পঞ্চমবার বলবে,

 ﴿أَنَّ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِن كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ﴾ [سورة النور: 7]   ‘যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার উপর আল্লাহ্‌র লা‘নত’ (নূর ৭)। অনুরূপভাবে স্ত্রীও পঞ্চমবার বলবে,

 ﴿أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِن كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ﴾ [سورة النور: 9]  ‘যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে তার নিজের উপর আল্লাহ্‌র গযব নেমে আসবে’ (নূর ৯)


বিষয়/প্রশ্নঃ ২৬: জানাযায় মৃত ব্যক্তির জন্য দো‘আ করার সময় শর্ত জুড়ে দেওয়া কি জায়েয? যেমনঃ হে আল্লাহ! সে যদি ‘লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হ’ এর সাক্ষ্য প্রদানকারী হয়… ইত্যাদি? শরী‘আতে এর কোন ভিত্তি আছে কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

যদি কারো এই মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে খুব বেশী সন্দেহ থাকে, তাহলে اَللَّهُمَّ إِنْ كَانَ مُؤْمِنًا فَاغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ ‘হে আল্লাহ! সে যদি মুমিন হয়, তাহলে তাকে তুমি ক্ষমা কর এবং তার প্রতি রহমত বর্ষণ কর’ বললে কোন সমস্যা নেই। তবে সন্দেহ জোরালো না হলে শর্ত করবে না। কেননা মুসলিমদের আসল অবস্থা হল, তারা ইসলামের উপরেই আছে। দো‘আয় অনুরূপ শর্তারোপের ভিত্তি শরী‘আতে রয়েছে। লি‘আনের ক্ষেত্রে স্বামী যখন তার স্ত্রীকে অভিশাপ করবে, তখন পঞ্চমবার বলবে,

﴿أَنَّ لَعْنَتَ اللَّهِ عَلَيْهِ إِن كَانَ مِنَ الْكَاذِبِينَ﴾ [سورة النور: 7]

‘যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার উপর আল্লাহ্‌র লা‘নত’ (নূর ৭)। অনুরূপভাবে স্ত্রীও পঞ্চমবার বলবে,

 ﴿أَنَّ غَضَبَ اللَّهِ عَلَيْهَا إِن كَانَ مِنَ الصَّادِقِينَ﴾ [سورة النور: 9]  ‘যদি তার স্বামী সত্যবাদী হয়, তবে তার নিজের উপর আল্লাহ্‌র গযব নেমে আসবে’ (নূর ৯)

সা‘দ ইবনে আবু ওয়াক্কাছ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু কর্তৃক অনুরূপ শর্তারোপের ঘটনা ঘটেছে। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগকারী সম্পর্কে বলেন, ‘হে আল্লাহ এই ব্যক্তি যদি লোক দেখানো এবং সুনাম অর্জনের জন্য অভিযোগ করতে দাঁড়ায়, তাহলে তুমি তার চোখ অন্ধ করে দাও, তার বয়স বৃদ্ধি করে দাও এবং তাকে তুমি ফেতনা-ফাসাদের সম্মুখীন কর’।[1] আর তা দুবা‘আহ বিনতে যুবায়ের (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা)-এর উদ্দেশ্যে বলা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উক্তি

«إِنَّ لَكِ عَلَى رَبِّكِ مَا اسْتَثْنَيْتِ»

‘তোমার রব তোমার কৃত শর্ত অনুযায়ীই ফল দিবেন’-এরও অন্তর্ভুক্ত।[2]


ফুটনোটঃ[1]. বুখারী, ‘আযান’ অধ্যায়, হা/৭৫৫।
[2]. দারেমী, ‘মানাসিক’ অধ্যায়, হা/১৮১১; হাদীছটি মূলতঃ বুখারী এবং মুসলিমেও রয়েছে: বুখারী, ‘বিবাহ’ অধ্যায়, হা/৫০৮৯; মুসলিম, ‘হজ্জ’ অধ্যায়, হা/১২০৮।
 


বিষয়/প্রশ্নঃ ২৭: মৃত ব্যক্তিকে কাঁধে করে বহন করা উত্তম নাকি গাড়ীতে? হেঁটে হোক অথবা আরোহী অবস্থায় হোক জানাযার সামনে চলা উত্তম নাকি পেছনে?

বিবরণ/উত্তরঃ

কাঁধে করে মৃত ব্যক্তিকে বহন করা উত্তম। কেননা এতে একদিকে যেমন মৃতকে বহনের সাথে মানুষের সরাসরি সম্পর্ক থাকে, তেমনি উপদেশ গ্রহণের ক্ষেত্রেও তা বেশী কার্যকর। তাছাড়া মৃত ব্যক্তিকে যখন মানুষদের পাশ দিয়ে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়া হবে, তখন তারা তাকে মৃত হিসাবে চিনতে পারবে এবং তার জন্য দো‘আ করবে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, মৃতকে এভাবে কাঁধে বহন করলে গর্ব-অহংকার থেকে অধিকতর দূরে থাকা সম্ভব হবে। তবে কোন জরূরী কারণে গাড়ীতে বহন করতে হলে তাতে কোনো সমস্যা নেই। যেমনঃ বৃষ্টি হলে, প্রচণ্ড গরম পড়লে বা প্রচণ্ড শীত পড়লে অথবা মৃতকে দাফনকার্যে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কম হলে গাড়ীতে বহন করলে কোনো সমস্যা নেই।

আর মৃত ব্যক্তির সাথে চলার ব্যাপারে বিদ্বানগণ বলেন, মৃতের ডান, বাম, পেছন ও সামনে চলার ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। হেঁটে গমনকারীরা মৃতের সামনে এবং আরোহীরা পেছনে থাকবে। আবার কেউ কেউ বলেন, ডানে, বামে, সামনে বা পেছনে যেখান দিয়েই চলা সহজতর হবে, সেখান দিয়েই চলবে।


বিষয়/প্রশ্নঃ ২৮: মৃতকে ক্ববরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় ‘তারবী’ (تربيع)-এর অর্থ কি? শরী‘আতে এর কোন ভিত্তি আছে কি?

বিবরণ/উত্তরঃ

মৃতকে ক্ববরস্থানে নিয়ে যাওয়ার সময় মৃত বহনের খাটলির চার দণ্ডকে চার বার ধরার নাম ‘তারবী’। এক্ষেত্রে প্রথমে মৃত ব্যক্তির ডান পাশের সামনের দণ্ড আগে ধরা হয়। অতঃপর ঐ একই পাশের পেছনের দণ্ড ধরা হয়। এরপর মৃত ব্যক্তির বাম পাশের সামনের দণ্ড, অতঃপর পেছনের দণ্ড ধরা হয়।

এমর্মে কতিপয় আছার বর্ণিত হয়েছে এবং আলেমগণ ইহাকে উত্তম গণ্য করেছেন। তবে ভিড়ের সময় নিজেকে এবং অন্যকে কষ্ট না দেওয়ার স্বার্থে এমনটি না করে সহজে যেভাবে বহন করা যায়, তা-ই করা উচিৎ।


বিষয়/প্রশ্নঃ ২৯: মৃত ব্যক্তির সাথে ক্ববরস্থানে গমনকারীরা কখন বসবে?

বিবরণ/উত্তরঃ

মৃতব্যক্তিকে যখন ক্ববরে রাখবে অথবা ক্ববর খোঁড়া সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় যখন লাশ মাটিতে রাখবে, তখন তারা বসবে।


বিষয়/প্রশ্নঃ ৩০: মসজিদে মৃতের জানাযা সংঘটিত হওয়ার পর আরও কয়েকজন তার জানাযা পড়তে আসছে হেতু অন্তত দশ মিনিটের জন্য হলেও কি মৃতের দাফনকর্ম বিলম্বিত করা জায়েয?

বিবরণ/উত্তরঃ

দ্রুত মৃতের  দাফন কাজ সম্পন্ন করা সুন্নাত এবং উত্তম। কারো জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। যারা দেরীতে আসবে, তারা মৃত ব্যক্তির দাফনের পরে হলেও তার জানাযা পড়ে নিতে পারবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃতের দাফন সম্পন্ন হওয়ার পর তার ক্ববরকে কেন্দ্র করে জানাযার ছালাত আদায় করেছেন মর্মে প্রমাণিত হয়েছে।[1]


ফুটনোটঃ[1]. বুখারী, ‘আযান’ অধ্যায়, হা/৮৫৭; মুসলিম, ‘জানাযা’ অধ্যায়, হা/৯৫৪। 


সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য

.. প্রথমত : সম্মানিত ভাই, আপনি প্রশ্নটি করে বেশ ভাল করেছেন। কারণ আপনি রমযান মাসের প্রস্তুতি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছেন যখন সিয়ামের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে বহু মানুষের ধ্যান ধারণা বিকৃত হয়েছে। তারা এই মাসকে খাদ্য, পানীয়, মিষ্টি-মন্ডা, রাত জাগা ও স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর মৌসুম বানিয়ে ফেলেছে। আর এ জন্য তারা রমযান মাসের বেশ আগ থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে এই আশংকায় যে কিছু খাদ্য দ্রব্য কেনা বাদ পড়তে পারে বা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই তারা খাদ্য দ্রব্য কিনে, হরেক রকম পানীয় প্রস্তুত করে এবং কী অনুষ্ঠান দেখবে আর কী দেখবে না তা জানতে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর গাইড খোঁজ খবর করে প্রস্তুতি নেয়। আর এভাবে তারা রমযান মাসের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সত্যিকার অর্থেই অজ্ঞ থেকে গেল। তারা এ মাস থেকে ‘ইবাদাত ও তাক্ব্ওয়া সম্পূর্ণরূপে বিচ্ছিন্ন করে নিল এবং একে তাদের উদরপূর্তি ও চক্ষুবিলাসের সামগ্রীতে পরিণত করল। দ্বিতীয়ত : অপরদিকে অন্যরা রমযান মাসের সিয়ামের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয়ে শা‘বান মাস থেকেই এর প্রস্তুতি নিতে শুরু করে, এমনকি তাদের কেউ কেউ এর আগ থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। রমযান মাস উপলক্ষে প্রস্তুতি নেয়ার কিছু প্রশংসনীয় পদক্ষেপ হল: ১. সত্যিকার তাওবাহ আর এটি সবসময়ের জন্যই ওয়াজিব, তবে যেহেতু এক মহান মুবারাক (বরকতময়) মাসের দিকে সে এগিয়ে যাচ্ছে তাই তার ও তার রবের মাঝে যে গুনাহগুলো আছে এবং তার ও মানুষের মাঝে যে অধিকারসমূহ রয়েছে সেগুলো থেকে দ্রুত তাওবাহ করার জন্য তার আরও বেশি তৎপর হওয়া উচিৎ; যাতে করে সে এই মুবারক (বরকতময়) মাসে পবিত্র মন ও প্রশান্ত হৃদয় নিয়ে প্রবেশ করে আনুগত্য ও ‘ইবাদাতে মশগুল হতে পারে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন : ﴿وَتُوبُوٓاْ إِلَى ٱللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ ٱلۡمُؤۡمِنُونَ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٣١ ﴾ [النور: ٣١]  “আর তোমরা সবাই, হে মু’মিনেরা, আল্লাহ্‌র কাছে তাওবাহ কর যাতে করে সফলকাম হতে পার।” [সূরা আন-নূর: ৩১] আল-আগার ইব্‌ন ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : وعَنْ الأَغَرَّ بن يسار رضي الله عنه عن النبي صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ( يَا أَيُّهَا النَّاسُ تُوبُوا إِلَى اللَّهِ فَإِنِّي أَتُوبُ فِي الْيَوْمِ إِلَيْهِ مِائَةَ مَرَّةٍ) رواه مسلم (2702) “হে লোক সকল, আপনারা আল্লাহ্‌র কাছে তাওবাহ করুন কারণ, আমি দিনে তাঁর কাছে ১০০ বার তাওবাহ করি।” [মুসলিম (২৭০২)] ২. দো‘আ পাঠ কোনো কোনো পূর্বসূরী (সাহাবীগণ, তাবি‘ঈনগণ .....) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তাঁরা ৬ মাস ধরে আল্লাহ্‌র কাছে দো‘আ করতেন যাতে তিনি তাঁদের রমযান মাস পাওয়ার তাওফীক্ব দেন, এরপর (রমযান শেষে) ৫ মাস ধরে এই দো‘আ করতেন যেন (রমযানের আ‘মালসমূহ) তাদের কাছ থেকে কবুল করা হয়। তাই একজন মুসলিম তার রবের কাছে দো‘আ করবে যাতে তিনি তাকে রমযান মাস পাবার তাওফীক্ব দেন সর্বোত্তম দ্বীনি অবস্থা ও শারীরিক সুস্থতার মাঝে এবং তাঁর কাছে এই দো‘আ করবে যাতে তিনি তাকে তাঁর আনুগত্যে সাহায্য করেন এবং তাঁর কাছে এই দো‘আ করবে যাতে তিনি তার আমল কবুল করেন। ৩. এই মহান মাসের আসন্ন আগমনে আনন্দিত হওয়া রমযান মাসের আগমন একজন মুসলিম বান্দার প্রতি আল্লাহ্‌র সুমহান নি‘আমাতগুলোর (অনুগ্রহসমূহের) একটি, কারণ রমযান কল্যাণময় একটি মওসুম। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়, জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয়। এটি হল ক্বুর‘আনের মাস, আমাদের দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ, চূড়ান্ত সংগ্রামের মাস। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন : ﴿قُلۡ بِفَضۡلِ ٱللَّهِ وَبِرَحۡمَتِهِۦ فَبِذَٰلِكَ فَلۡيَفۡرَحُواْ هُوَ خَيۡرٞ مِّمَّا يَجۡمَعُونَ ٥٨ ﴾ [يونس: ٥٨]  “বলুন, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহে ও তাঁর দয়ায়, অতঃপর এর দ্বারা তারা আনন্দিত হোক; তা, তারা যা সঞ্চয় করে তা থেকে উত্তম।” [ইঊনুস : ৫৮] ৪. ওয়াজিব সিয়াম হতে নিজেকে দায়িত্ব মুক্ত করা আবূ সালামাহ হতে বর্ণিত যে তিনি বলেছেন : عَنْ أَبِي سَلَمَةَ قَالَ : سَمِعْتُ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا تَقُولُ : »كَانَ يَكُونُ عَلَيَّ الصَّوْمُ مِنْ رَمَضَانَ فَمَا أَسْتَطِيعُ أَنْ أَقْضِيَهُ إِلا فِي شَعْبَانَ« .  رواه البخاري (1849) ومسلم (1146)    “আবু সালামাহ বলেন, আমি ‘আয়েশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহাকে বলতে শুনেছি, “আমার উপর বিগত রমযানের সাওম বাকি থাকত যার কাযা আমি শা‘বান ছাড়া আদায় করতে পারতাম না।” [বুখারী (১৮৪৯) ও মুসলিম (১১৪৬)] হাফিজ ইব্‌নু হাজার-রাহিমাহুল্লাহ- বলেছেন :‘এ হাদীস দ্বারা আয়েশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা কর্তৃক শা‘বান মাসে রমযানের সিয়াম পালনের চেষ্টা প্রমাণ করে যে, এক রমযান এর কাযা আরেক রমযান প্রবেশ করা পর্যন্ত দেরী করা জায়েয নয়।” [ফাতহুল বারী (৪/১৯১)] ৫. পর্যাপ্ত ‘ইল্‌ম (জ্ঞান) অর্জন করা, যাতে সিয়ামের হুকুম-বিধি-বিধান এবং রমযান মাসের মর্যাদা সম্পর্কে জানা যায়। ৬. রমযান মাসের ‘ইবাদাত থেকে একজন মুসলিমকে বিরত করতে পারে এমন কাজসমূহ দ্রুত সম্পন্ন করে ফেলা। ৭. পরিবারের সদস্যবর্গ যেমন-স্ত্রী ও সন্তানদের সাথে বসে তাদেরকে সিয়ামের বিধি-বিধান শিক্ষা দেয়া এবং ছোটদের সিয়াম পালনে উৎসাহিত করা। ৮. কিছু বই প্রস্তুত করা যা বাড়িতে বসে পড়া সম্ভব বা মাসজিদের ইমামকে উপহার দেয়া, যা তিনি রমযান মাসে লোকদের পড়ে শোনাবেন। ৯. রমযান মাসের প্রস্তুতিস্বরূপ শা‘বান মাস থেকেই সিয়াম পালন শুরু করা। عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا قَالَتْ: كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ حَتَّى نَقُولَ لا يُفْطِرُ وَيُفْطِرُ حَتَّى نَقُولَ لا يَصُومُ، فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلا رَمَضَانَ، وَمَا رَأَيْتُهُ أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ . رواه البخاري ( 1868 ) ومسلم ( 1156 ) ‘আয়েশাহ্‌ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা-থেকে বর্ণিত যে তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনভাবে সিয়াম পালন করতেন যে আমরা বলতাম তিনি আর সিয়াম ভঙ্গ করবেন না এবং এমনভাবে সিয়াম ভঙ্গ করতেন যে আমরা বলতাম, তিনি আর সিয়াম পালন করবেন না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ছাড়া অন্য কোন মাসের গোটা অংশ সাওম পালন করতে দেখি নি এবং শা‘বান ছাড়া অন্য কোনো মাসে অধিক সিয়াম পালন করতে দেখি নি।” [বুখারী (১৮৬৮) ও মুসলিম (১১৫৬)] عَنْ أُسَامَة بْن زَيْدٍ قَالَ : قُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ لَمْ أَرَكَ تَصُومُ شَهْرًا مِنْ الشُّهُورِ مَا تَصُومُ مِنْ شَعْبَانَ ، قَالَ: (ذَلِكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ ، وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِي وَأَنَا صَائِمٌ) . رواه النسائي ( 2357 ) وحسَّنه الألباني في " صحيح النسائي " ‘উসামাহ ইব্‌ন যাইদ হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে শা‘বান মাসের মত অন্য কোনো মাসে এত সাওম পালন করতে দেখিনি। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “এটি রজব ও রমযানের মধ্যবর্তী একটি মাস, যখন মানুষ গাফিল হয় এবং এমন মাস যখন আমলসমূহ রাব্বুল ‘আলামীনের কাছে উঠানো হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে আমার আমল আমি সাওম পালন রত অবস্থায় উঠানো হবে।” [নাসা’ঈ (২৩৫৭) এবং আলবানী একে সহীহ আন-নাসায়ীতে একে হাসান বলেছেন।] শা‘বান মাসের সাওম পালনের হিকমতের বর্ণনায় হাদীসে এসেছে যে এটি এমন মাস যখন আমলসমূহ উঠানো হয়। ‘আলিমগণের মাঝে কেউ কেউ অন্যান্য হিক্‌মাহসমূহ উল্লেখ করেছেন, আর তা হল শা‘বানের সাওম ফরয নামাযের পূর্বের সুন্নাহ্‌র মত যা ফরয আদায়ে মনকে প্রস্তুত করে ও উৎসাহ যোগায়। ঠিক একই বক্তব্য প্রযোজ্য রমযানের পূর্বে শা‘বানের সিয়ামের ক্ষেত্রে। ১০. কুরআন তিলাওয়াত: সালামাহ ইব্‌ন কুহাইল বলেছেন : “শা‘বান মাসকে ক্বারীগণের মাস বলা হত।” আম্‌র ইব্‌ন ক্বাইস, শা‘বান মাস শুরু হলে, তাঁর দোকান বন্ধ করে কুরআন তিলাওয়াতের জন্য অবসর নিতেন। আবূ বাক্‌র আল-বালাখী বলেছেন : “রাজাব মাস হল বীজ বপনের মাস, শা‘বান মাস হল ক্ষেতে সেচ প্রদানের মাস এবং রমযান মাস হল ফসল তোলার মাস।” তিনি আরও বলেছেন : “রাজাব মাসের উদাহরণ হল বাতাসের ন্যায়, শা‘বান মাসের উদাহরণ মেঘের ন্যায়, রমযান মাসের উদাহরণ বৃষ্টির ন্যায় ; তাই যে রাজাব মাসে বীজ বপন করল না, শা‘বান মাসে সেচ প্রদান করল না, সে কীভাবে রমযান মাসে ফসল তুলতে চাইতে পারে?” এখন রাজাব মাস গত হয়েছে, আর আপনি শা‘বান মাসে কি করবেন যদি রমযান মাস পেতে চান? এ হল এই বরকতময় মাসে আপনার নবী ও উম্মাতের পূর্বসূরীগণের অবস্থা। এ সমস্ত আমল ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে আপনার অবস্থান কী হবে? তৃতীয়ত : রমযান মাসে একজন মুসলিমের কী করা উচিৎ সে আমলসমূহ সম্পর্কে জানতে দেখুন (26869) ও (12468) নং প্রশ্নের উত্তর। আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।

TO DAY-10/05/2016-

মীলাদুন্নবী অনুষ্ঠান উদযাপন করা সুন্নাত নাকি বিদ‘আত?

মীলাদুন্নবী অনুষ্ঠান পালন করার কোনো দলীল কুরআন ও সহীহ হাদীসে নেই। কোনো সাহাবী থেকেও এমর্মে কিছুই বর্ণিত হয় নি। এমনকি চার ইমামের কেউও এর পক্ষে কথা বলেন নি। বরং নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর কয়েক যুগ পরে খ্রিষ্টানদের অনুসরণে ফাতেমীরা সর্বপ্রথম এ বিদ‘আত চালু করে। কারণ খ্রিষ্টানরা ঈসা আলাইহিস সালামের জন্ম বার্ষিকী পালন করে থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদ‘আত থেকে হুশিয়ার করে বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের শরী‘আতে নতুন কিছু সৃষ্টি করল, তার সৃষ্ট সেই আমল প্রত্যাখ্যাত’ (বুখারী)।

হঠাহঠাৎ মৃত্যুর বরণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে ..

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘‘কিয়ামতের অন্যতম আলামত হচ্ছে হঠাৎ করে মৃত্যুবরণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে’’।[1] বর্তমানে এরকম ঘটনা প্রায়ই শুনা যায়। দেখা যায় একজন মানুষ সম্পূর্ণ সুস্থ। হঠাৎ শুনা যায় সে মৃত্যু বরণ করেছে। সুতরাং মানুষের উচিৎ মৃত্যু আসার পূর্বেই আল্লাহর কাছে তাওবা করা এবং সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা।


খুব উপকারী কিছু হাদীস...

১. اتَّقِ اللَّه حَيْثُمَا كُنْتَ وَأَتْبِعْ السَّيِّئَةَ الْحَسَنَةَ تَمْحُهَا وخَالِقِ النَّاسَ بِخُلُقٍ حَسَنٍ “আল্লাহকে ভয় কর যেখানেই থাকনা কেন। অন্যায় কাজ হয়ে গেলে পরক্ষণেই ভাল কাজ কর। তবে ভাল কাজ অন্যায়কে মুছে দিবে আর মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার কর।“ (তিরমিযী-সহীহ)

২. ((إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ)) “সব কাজই নিয়তের উপর নির্ভরশীল।“(সহীহ বুখারী)

৩. ((الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ)) “প্রকৃত মুসলিম সে ব্যক্তি যার মুখের ভাষা এবং হাত থেকে অন্য মুসলমানগণ নিরাপদ থাকে।“ (সহীহ বুখারী)

৪. (( مَنْ غَشّنا فَلَيْسَ مِنِّا )) যে আমাদের সাথে প্রতারণা করে সে আমাদের দলভুক্ত নয়। (মুসলিম)

৫. ((مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلَا يُؤْذِ جَارَهُ)) “যে আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।“ (বুখারী)

৬ (( مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ )) “যে আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে।“ (বুখারী)

৭.مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ “যে আল্লাহ এবং আখেরাতের উপর বিশ্বাস রাখে সে যেন ভাল কথা বলে নতুবা চুপ থাকে।“ (বুখারী)

৮.(( مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ)) “একজন মানুষের একটি সুন্দর ইসলামী বৈশিষ্ট্য হল সে অযথা কাজ পরিত্যাগ করে।“ (মুওয়াত্তা মালিক)

৯. مَنْ كَانَ فِي حَاجَةِ أَخِيهِ كَانَ اللَّهُ فِي حَاجَتِهِ “যে তার কোন ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করবে আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করবেন।“ (বুখারী)

১০. ((مَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرُبَاتِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ)) “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের একটি কষ্ট দূর করবে আল্লাহ তায়ালা কিয়ামতের দিন তাকে অনেক বিপদের মধ্য থেকে একটি বিপদ থেকে উদ্ধার করবেন।“ (বুখারী)

১১. ((مَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ اللَّهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ)) “যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি গোপন করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবেন।“ (বুখারী)

১২. ((عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَالْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ)) “সব সময় সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাক। কারণ সত্য কথা ভাল কাজের পথ দেখায়। আর ভাল কাজ জান্নাতের পথ দেখায়।“ (মুসলিম).

১৩. إِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَالْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ “মিথ্যা থেকে দূরে থাক। কারণ মিথ্যা অন্যায় কাজের পথ দেখায় আর অন্যায় কাজ জাহান্নামের পথ দেখায়।“ (মুসলিম)

১৪. الدَّالُّ عَلَى الْخَيْرِ كَفَاعِلِهِ “যে ব্যক্তি ভাল কাজের রাস্তা দেখায় সে ঐ ব্যক্তির মতই সাওয়াব পায় যে উক্ত ভাল কাজ সম্পাদন করে।” (তিরমিযী-সহীহ)

১৫. اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ “মজলুমের বদ দুয়াকে ভয় কর। কারণ, তার বদ দুয়া আর আল্লাহর মাঝে কোন পর্দা নেই।“ (বুখারী) 

rahamat khan.


ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয় দশটি:-

১। আল্লাহর ইবাদতে কোন কিছুকে শরীক করা: আল্লাহ তাআলা বলেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করেন না, তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।” সূরা আন-নিসা: ৪৮ মৃত ব্যক্তির নিকট প্রার্থনা, ফরিয়াদ এবং মৃত ব্যক্তির নামে মানত ও জবেহ করা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

২। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর মাঝে অন্যদেরকে মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে ও তাদের কাছে প্রার্থনা জানায়, তাদের নিকট সুপারিশ কামনা করে এবং তাদের উপর ভরসা করে, সে আলেমদের সর্বসম্মতিক্রমে কাফের।

৩। মুশরিকদেরকে অমুসলিম ও কাফের বলে বিশ্বাস না করা বা তাদের কুফরীতে সন্দেহ পোষণ করা অথবা তাদের ধর্মমতকে সঠিক বলে মন্তব্য করা।

৪। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত ত্বরীকার চেয়ে অন্য ত্বরীকা কে পরিপূর্ণ বলে বিশ্বাস করা অথবা নবীর আনীত বিধান থেকে অন্য বিধানই উত্তম বলে মনে করা। এরূপ আকীদা পোষন কারী ব্যক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে কাফের বলে বিবেচিত। যেমন কোন ব্যক্তি তাঁর আনীত বিধানের উপর তাগুতের (মানব রচিত) বিধানকে অগ্রাধিকার দিল, এবং কোরআন হাদীসের সিদ্ধান্ত বাদ দিয়ে বৈধ জ্ঞানকরে মানব রচিত বিধানে বিচার শাসন করল।

৫। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত কোন বিধানের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা যদিও উক্ত বিধানের উপর আমল করা হয়। যদি কোন মুসলিম এরূপ করে তাহলে সে শরীয়তের সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাফের বলে বিবেচিত হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন: ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأَحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ “এটি এ জন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা অপছন্দ করে, সুতরাং আল্লাহ তাদের কর্মসমূহকে নিষ্ফল করে দেবেন”। সূরা মুহাম্মাদ: ৯

৬। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত কোন সামান্য বিষয় অথবা এর সওয়াব প্রতিদান বা শাস্তির বিধানের প্রতি কোনরূপ ঠাট্টা বিদ্রুপ করা কুফরী। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন: قُلْ أَبِاللَّهِ وَآَيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ ﴿৬৫﴾ لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ “বল! তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নিদর্শন ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রুপ করছিলে? তোমরা আর অজুহাত দাড় করো না, তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরী করেছ।” সূরা আত-তাওবা: ৬৫-৬৬

৭। যাদু করা ও যাদুর প্রতি আকৃষ্ট হওয়া, সুতরাং যে যাদু করল অথবা যাদুর প্রতি সন্তুষ্ট থাকল সে কুফরী করল। কেননা আল্লাহ তাআল বলেন: وَمَا يُعَلِّمَانِ مِنْ أَحَدٍ حَتَّى يَقُولَا إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلَا تَكْفُرْ “তারা কাউকে (যাদু) শিক্ষা দিত না এ কথা না বলে যে, আমরা পরীক্ষা স্বরূপ; সুতরাং তুমি কুফরী কর না।” সূরা আল-বাকারা : ১০২

৮। মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাবত: অমুসলিম তথা ইহুদি, খ্রিস্টান বা মুশরিক প্রমূখদের সাহায্য করা। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ “তোমাদের মধ্যে কেউ তাদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন হবে, নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না”। সূরা আল-মায়িদাহ: ৫১

৯। যে ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে, কিছু লোক আছেন যাদের জন্যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরীয়ত থেকে বের হয়ে যাওয়ার অনুমতি আছে। এরূপ বিশ্বাস পোষন কারী ব্যক্তি শরীয়তের বিবেচনায় কাফের বলে বিবেচিত হবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ “কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন বা ধর্ম গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনও কবুল হবে না এবং সে পরকালে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত”। সূরা আলে ইমরান: ৮৫

১০। আল্লাহ প্রদত্ত দ্বীন, ইসলামকে উপেক্ষা করে চলা। এর বিধি বিধান সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন ও সে অনুযায়ী আমল না করা। কেননা আল্লাহ তাআলা বলেন: وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذُكِّرَ بِآَيَاتِ رَبِّهِ ثُمَّ أَعْرَضَ عَنْهَا إِنَّا مِنَ الْمُجْرِمِينَ مُنْتَقِمُونَ “যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী দ্বারা উপদিষ্ট হয়ে তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে অপেক্ষা অধিক যালিম আর কে? আমি অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে থাকি”। সূরা আস সিজদা: ২২ উল্লেখিত ইসলাম বিনষ্টকারী বিষয় সমূহে স্বেচ্ছায় জড়িত হওয়া আর ঠাট্টা-বিদ্রুপ কিংবা ভয়ভীতির করণে জড়িত হওয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। অবশ্য কেহ জোরপূর্বক বাধ্য করলে অন্য কথা। ক্ষতির দিক থেকে আলোচিত কারণগুলোর প্রত্যেকটিই খুবই ভয়াবহ ও মারাত্মক। আর বিষয়গুলো অনেক মুসলিমের জীবনে অহ-রহ সংঘটিত হয়ে থাকে। অতএব প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ বিষয়গুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখা ও সতর্ক থাকা।

ইসলামে নারীর অধিকারও ও মর্যাদা...

আস সালামু আলাইকুম

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

মূল বক্তব্যে যাবার আগে অধিকার ও মর্যাদা শব্দ দু’টিকে একটু ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন ৷ ‘অধিকার’ শব্দটিকে ইসলামী স্কলাররা সবসময় আরেকটি শব্দের সাথে সম্পৃক্ত বলে সনাক্ত করেছেন – সেটা হচ্ছে ‘দায়িত্ব’৷ ইসলামী জীবনবিধান ও worldview-তে তাই যেখানেই অধিকারের প্রশ্ন উঠেছে, সেখানে স্বাভাবিকভাবেই দায়-দায়িত্বের কথাও এসেছে ! উদাহরণস্বরূপ – একজন পুরুষকে ইসলাম, তার মৃত পিতার সম্পত্তিতে, তার বোনের প্রাপ্য উত্তরাধিকারের চেয়ে দ্বিগুণ লাভ করার ‘অধিকার’ দিয়েছে – কিন্তু সেই সঙ্গে, ঐ বোন বা মা-কে আমৃত্যু দেখাশোনা করার দায়-দায়িত্বও সেই পুরুষের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে ৷ আবার দেখুন, সন্তানের উপর বাবা-মায়ের মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত অধিকার বা হক থাকে, ইসলামী বিশ্বাস মতে বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের যে ঋণ, তা কখনোই শোধ হবার নয় – কিন্তু, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এই অধিকার অর্জিত হয়, সন্তান প্রতিপালনের কঠোর দায়-দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে ৷ এভাবে অন্যান্য সব ব্যাপারের মতই, একজন নারীর বেলায়ও অধিকার ও দায়িত্বের এই “যুগ্ম হিসাব নিকাশ“ প্রযোজ্য ৷ সুতরাং, ইসলাম নারীকে কতটুকু অধিকার দিয়েছে, সেটা সব সময় তার উপর অর্পিত দায়-দায়িত্বের বিপরীতে ওজন করে দেখতে হবে – তা না হলে, হিসাব নিকাশে মারাত্মক ভুলের অবকাশ থেকে যাবে – যেমনটা পশ্চিমা ইসলাম বিশেষজ্ঞদের বেলায় ঘটেছে ৷ পশ্চিমা বিশেষজ্ঞরা তাই মৃতের পুত্র সন্তানের তুলনায়, কন্যা সন্তানের অর্ধেক উত্তরাধিকারের দোষ ধরেছেন – কিন্তু ঐ উত্তরাধিকার থেকে, কন্যা সন্তানদের একটি পয়সাও কারও জন্য খরচ করার দায়-দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি লাভের বিরাট সুবিধাটুকু চোখে দেখেন নি ৷ আমাদের দেশের নাস্তিকতাবাদী আঁতেলরাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, ঐ একই দোষে দুষ্ট – তাদের একজন এ বিষয়ে বলেছিলেন যে, আল্লাহ্‌ নাকি অংকে কাঁচা (নাউযুবিল্লাহ্‌)!! এটা হয়তো তাদের জন্য স্বাভাবিকও ৷ দোষ ধরার পূর্ব-নির্ধারিত মনোভাব নিয়ে যখন কেউ কিছু পর্যবেক্ষণ করবেন, তখন বিষয়টার গুণাগুণ তার চোখ এড়িয়ে যেতেই পারে ৷ ‘মর্যাদা’ শব্দটাও আপেক্ষিক – যা কিনা reference frame বা পটভূমি নির্ভর ৷ যখনি কারো মর্যাদার প্রশ্ন আসবে – তখনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই প্রশ্ন আসবে যে, কোন reference frame-এ মর্যাদার কথা বলা হচ্ছে ৷ আমি একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ্‌ ৷ উদাহরণস্বরূপ দক্ষিণ ভারতের কোন হিন্দু ধর্মাবলম্বী সোনার দোকানদারের ক্যাশ বাক্সের উপর গণেশের যে প্রতিকৃতি থাকে, সেখানে সেটার যে মর্যাদা – মসজিদুল হারাম বা মসজিদ নববীতে নিশ্চয়ই সেই প্রতিকৃতির ঐ মর্যাদা নেই ৷ আবার দেখুন, বাৎসরিক কোন ওয়াজ মহফিলে ড:আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের যে মর্যাদা, Indian idol বা হিন্দুস্থানী মূর্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজিত ‘ঝাঁকানাকা’ কনসার্টে, বলাই বাহুল্য যে, তাঁর সেই মর্যাদা থাকবে না! আমাদের প্রবন্ধের শিরোনামই যদিও বলে দেয় যে, মর্যাদার প্রশ্ন আসছে ইসলামের কাঠামোতে – তবু আজকের এই পৃথিবীতে মর্যাদার নতুন নতুন যে সব নিয়ামকে ও নির্ণায়কে আমরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, তাতে আমরা ভুলেই যাই যে, আজকের মর্যাদার বিষয়গুলোর বেশীরভাগের সাথে, আল্লাহ্‌ ও আল্লাহ্‌র রাসূল (সা.) যে সমস্ত গুণাগুণকে মর্যাদা দিয়েছিলেন, তার কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে! অধিকার ও মর্যাদা দুটো ব্যাপারের সাথেই, আবার আরেকটি বিষয় অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত – তা হচ্ছে এই যে, একটা ইসলামী জীবনব্যবস্থায়, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে নারী ও পুরুষ, কার ভূমিকা কি? এই ভূমিকা কি এক ও অভিন্ন?? অথবা আরো সাধারণ ভাবে – যে কোন সমাজব্যবস্থায়ই এই ভূমিকা কি এক হওয়ার কথা, না ভিন্ন হওয়ার কথা ৷ আপনি যদি মনে করেন যে, আল্লাহ্‌প্রদত্ত পৃথিবীর এই জীবনে, নারী ও পুরুষের ভূমিকা এক ও অভিন্ন – তা হলে তা মনে করার পিছনে আপনার প্রধান যুক্তি হতে হবে এরকম যে, নারী ও পুরুষ ‘মানবতার ইউনিট’ হিসেবে হুবহু এক ও অভিন্ন – যেমন একটা বিল্ডিং এর প্রতিটি ইঁটই মূলত একই এবং প্রতিস্থাপনযোগ্য! কিন্তু আসলে কি তাই?? ইসলাম তা মনে করে না এবং আপনি যদি বিস্মৃত হয়েও থাকেন, তবে শুনে নিন যে, বিজ্ঞানও তা মনে করে না! একই প্রজাতির, অর্থাৎ, মানবসম্প্রদায়ের অভিন্ন সদস্যপদের বিচারে এবং আল্লাহ্‌র সৃষ্টি হিসেবে তারা সমান – কিন্তু একই সময় তারা অত্যন্ত ভিন্নও বটে ৷ একটি বেলী ফুল ও একটি গোলাপ ফুলের কথাই ধরুন – ফুলের একক হিসেবে তারা সমান – অর্থাৎ, আমরা বলবো বেলী ও গোলাপ দু’টোই ফুল, কিন্তু গুণাগুণে তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন – প্রত্যেকে নিজ গুণে বিশেষ ৷ কিন্তু আমি যদি বলি যে, তারা একই ভাবে আমাদের কাছে নিজেদের প্রকাশ করে – তবে কি কথাটা ঠিক হবে? না হবে না ! বরং আমরা বলবো – বেলীফুলের গন্ধটাই তার প্রধান বৈশিষ্ট্য – বহুদূর পর্যন্ত তার গন্ধ ছড়ায়; পক্ষান্তরে গোলাপের নজরকাড়া রং বা অবয়ব আমাদের চোখে সুন্দর দেখায় ৷ দু’টো ফুলেরই নিজস্ব গুণাগুণ রয়েছে – এবং নিজ গুণে তারা বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ৷ ঠিক সেভাবে শরীরের গঠন, কন্ঠস্বর, চোখের চাহনী, ভ্রূর বক্রতা, ত্বকের মসৃণতা বা চলার গতির মত বাহ্যিক গুণাগুণ থেকে শুরু করে, স্নেহ-মায়া, সহিষ্ণুতা, করুণা, সৌন্দর্যজ্ঞান, মেজাজ, আনন্দবোধ, মেধা ইত্যাদির মত সকল অদৃশ্য বিষয়েও – প্রতিটি তন্তুতে ও প্রতিটি কোষে নারী ও পুরুষ ভিন্ন ও স্বতন্ত্র ৷ সেজন্যই এই পৃথিবীতে, নারী ও পুরুষের বিপরীত মেরুধর্মিতা এবং সম্পূরক ও পরিপূরক গুণাগুণের সমন্বয়ে গঠিত – একটা আদর্শ ও সুখী দাম্পত্যজীবন এত সুন্দর এবং এত প্রশান্তিময় ৷ আর এই ভিন্নতা ও স্বাতন্ত্র্যের জন্যই, আল্লাহ্‌ তাদের পালন করবার জন্য ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা নির্ধারণ করে দিয়েছেন ৷ সেজন্য, রণকৌশলে খুবই চৌকস একজন সেনাপতি যদি মনে করেন যে, তিনি বিশাল কৃতিত্বের দাবীদার, – অথচ, তার মা যদি প্রশ্ন তোলেন যে, তাকে ঐ রকম একজন বীর হিসেবে গড়ে তোলার পিছনে তার যে ভূমিকা রয়েছে, সে জন্য তিনিও সমধিক কৃতিত্বের দাবী করতে পারেন – তাহলে আমাদের কি কিছু বলার আছে?? অথবা, ধরুন সকল বিচারে ভীষণ ভাবে সফল কোন একটা পরিবারের, প্রতিপালন ও বিকাশে ঐ পরিবারের বাবা যদি দাবী করেন যে, তিনি মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, একটা সন্তোষজনক উপার্জনের ব্যবস্থা করেছিলেন বলেই না তার পরিবার এমন সফল পরিণতিতে পৌঁছালো – তাহলে ব্যাপারটা কি ঠিক হবে ? যে মা তার জীবনের প্রতিটি দিনের সময় ও সুখ ঐ পরিবারের জন্য ‘ব্যয়’ করেছেন – স্বামী ও সন্তানের জন্য একটা নিবিড় আশ্রয়স্থল হিসেবে ঘর ও সংসারকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন এবং তা আবাদ রেখেছেন – তার অবদানকে কি আমরা ছোট করে দেখতে পারি ? পরিবারের উন্নতির জন্য তিনি যে কাজ করেছেন, তার বিনিময়ে হয়তো দৃশ্যত কোন পয়সা উপার্জন হয়নি সত্যি, কিন্তু তাই বলে কি সমাজ ও জাতি গঠনে তার অবদানকে বা তার মর্যাদাকে খাটো করে দেখা যাবে ? মোটেই না ! ইসলামী ঐতিহ্যে লালিত ও পালিতরা অতি অবশ্যই স্বীকার করবেন যে, কোন পরিবারের সন্তানদের ভালো মুসলিম তথা সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে একজন ভালো মায়ের অবদান অনস্বীকার্য ও তার মর্যাদা অতি অসামান্য ৷ বিশ্বাস হারিয়ে বস্তুবাদী নাস্তিকে রূপান্তরিত হওয়া পশ্চিমা সভ্যতার পন্ডিতেরা, দেরীতে হলেও, তা বুঝতে শুরু করেছেন – যেমনটা দুজন বৃটিশ বিজ্ঞানীকে বলতে দেখা যায়:

Most women do a great amount of work at home, and most men do a different sort of work in the office or on the factory floor, and in truth one sort of work is not necessarily ‘better’ than the other. One happens to be paid, but that should not confer a special sort of honour on the work involved. Prostitutes are paid, but that does not make their work better than that of mothers. ( দেখুন: page#189, Brainsex – Anne Moir & David Jessel )

এটা অনস্বীকার্য যে, কতগুলি পেশায় বা দক্ষতায় পুরুষরা নারীদের চেয়ে শ্রেয় হবে – আর কতগুলি পেশায় বা দক্ষতায় নারীরা পুরুষদের চেয়ে শ্রেয় হবে – যেমন ধরুন ভাষা বিজ্ঞানে বা মানুষের সাথে পারস্পরিক সম্পর্কের পেশাগুলোতে (প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষকতা, নার্সিং বা ফ্যাশন ডিজাইনিং) স্বভাবতই মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ভালো করে থাকে ৷ সুতরাং, সঠিক ভাবে সন্তান প্রতিপালনের পর বা ঘর-সংসার অবহেলা না করে, কারো যদি তেমন বাড়তি সময় থাকে এবং তিনি যদি কোন বিষয়ে বিশেষ দক্ষ হয়ে থাকেন – তবে তিনি সমাজের ও সম্প্রদায়ের উন্নতিকল্পে সে বিষয়ে কাজ করতেই পারেন ৷ উপরে উল্লেখিত অধিকার, দায়িত্ব , মর্যাদা ও ভূমিকার সংজ্ঞায়নের নিরিখে আমরা তাহলে এবার ব্যাপারগুলোকে আবার সুসংহত করতে চেষ্টা করি ৷ ইসলাম আল্লাহ্‌র সৃষ্টি হিসেবে নারী ও পুরুষকে সমান বলে মর্যাদা দিলেও, পৃথিবীর জীবনে তাদের ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা পালন করার জন্য উপযোগী করে সৃষ্টি করা হয়েছে বলে মনে করা হয় ৷ স্বীয় ভূমিকা পালনের ব্যাপারে এবং সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্য কোন কোন অধিকারগুলো সহায়ক হবে – সেই দিকে খেয়াল রেখে তাই অধিকারগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে । সেজন্য অংকের ভাষায়, নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার দেয়া হয়েছে – একথা বলা অর্থহীন ৷ বরং “উভয়কে ‘প্রয়োজনীয়’ সকল অধিকার দেয়া হয়েছে“বলাটা সমীচীন ৷ তাই একজন নারীকে – তিনি কোন পুরুষকে স্বামী হিসেবে গ্রহণ করবেন কি না, তার পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হলেও – একজন পুরুষের মত “আহ্‌লে কিতাবভুক্ত” জীবনসঙ্গী বেছে নেয়ার অধিকার/স্বাধীনতা দেয়া হয়নি ৷ কারণ পিতা মুসলিম না হলে, তার সন্তানকে মুসলিম রূপে বড় করাটা, তার জন্য অসম্ভব হতে পারে ৷ একইভাবে কেবল চেহারা পছন্দ নয় বলে স্বামীর কাছ থেকে বিবাহ বিচেছদ লাভ করার অনুমতি দেয়া হলেও, পুরুষকে যে ভাবে তালাকের অধিকার দেয়া হয়েছে – নারীকে সেভাবে শর্তহীন তালাকের অধিকার দেয়া হয়নি। কারণ, ইসলামী বিধানে বিয়ের সকল আর্থিক দায়-দায়িত্ব পুরুষের এবং স্বভাবজাত ভাবেই একজন নারীর পক্ষে আবেগের বশবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা থাকে ৷ নারীকে সম্পূর্ণ পৃথক ভাবে নিজ ব্যবসায় পরিচালনার অধিকার দেয়া হয়েছে সত্যি, তবে তা স্বামীর কোন হক নষ্ট করার বিনিময়ে নয় ৷ নারীর মসজিদে যাবার অধিকার ও খলিফাকে সরাসরি প্রশ্ন করার অধিকার আজ আমাদের কাছে অনেকটা স্বপ্নের মত মনে হয় – কিন্তু সে অধিকার এমন একটা সময়ে নিশ্চিত করা হয়েছিল যখন চতুষপদ জন্তুর মতই নারীকে একজন পুরুষের মালিকানা থেকে অন্যজনের মালিকানায় স্থানান্তরিত করা যেতো – বাবা মারা গেলে, তার অধিকারভুক্ত নারীরা উত্তরাধিকার সূত্রে ছেলের প্রাপ্য হতো ৷ ইসলামী বিশ্বে নারীকে উত্তরাধিকারের ও সম্পত্তির মালিক হবার অধিকার দেয়ার প্রায় ১৩ শতাব্দী পরে, এই সেদিন, ১৮৭০ সালে Married Women’s Property Act-এর মাধ্যমে, বৃটেন যখন প্রথম মেয়েদেরকে সম্পত্তির মালিকানার সীমিত অধিকার দান করে আইন পাশ করলো, তখন পশ্চিমা কাফির-বিশ্বের গুণিজনেরা shocked হন এবং ঘটনাটাকে বেশ ন্যাক্কারজনক বলে নাক সিঁটকান ৷ আমেরিকান মুসলিমাহ্‌, সদ্য প্রয়াত, আমিনাহ্‌ আস্‌ সিলমিহ্‌ ১৯৯২ সালে MSA আয়োজিত এক বিতর্কে বলেছিলেন (Video:Women’s Rights and Roles in Islam – Sound Vision) যে মাত্র এক বছর আগে (অর্থাৎ ১৯৯১ সালে), যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় এক মহিলা তাঁকে তার সমস্যার কথা বলতে গিয়ে বলছিলেন যে, অর্থের জন্য তার বাড়ীখানা বিক্রী করা খুবই প্রয়োজন, অথচ, তিনি তা করতে পারছিলেন না কারণ, আঞ্চলিক আইন অনুযায়ী তার পরিবারের কোন না কোন পুরুষ সদস্যের দস্তখত অপরিহার্য – কিন্তু তার পরিবারের কোন পুরুষ সদস্যই জীবিত ছিলেন না ৷ এই সেদিন পর্যন্তও বলতে গেলে পশ্চিমা জগতে মেয়েরা সম্পত্তির মালিক হতে পারতো না – নিজের নামে লিখতে বা সাহিত্য প্রকাশ করতে পারতো না – পারতো না নিজ নামে (অন্যের উপর নির্ভর না করে), কোন ব্যবসায় বা ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান চালাতে ৷ (আজ যারা মধ্যযুগীয় ও মৌলবাদী বলে পরিচিত, তাদের বিশ্বে গত প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে নারীরা এই সকল অধিকার ভোগ করে আসছে বলে, আমরা হয়তো মনে করি সারা বিশ্ব সব সময়ই এমনই ছিল বুঝিবা ৷ অথচ, আজকের আলোকিত ও বিশ্বাস হারানো কাফির–বিশ্বে এই সেদিনও – অন্য সব বাদ দিয়ে – পরিচিত হবার মত নারীর একটা নিজস্ব নাম পর্যন্ত ছিল না ৷ তারা হয় বাবার নাম বা স্বামীর নামের পদবীতে পরিচিত হতো ৷ ) মাতৃত্ব ও মা-কে ইসলামে যে আসন দেয়া হয়েছে, তা থেকেই বোঝা যাবে ‘মা’ রূপী নারীকে ইসলাম কোন আসনে অধিষ্ঠিত করেছে ৷ রাসূল(সা.)-এঁর ভাষ্য মতে আল্লাহ্‌র কাছে নারীকুলের মাঝে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব হচেছন: খাদীজা(রা.), ফাতিমা(রা.), ফেরআউনের স্ত্রী আসিয়া এবং ঈসা (আ.)-এর মা মরিয়ম(আ.) – কেন?? তারা কেউ সুন্দরী শ্রেষ্ঠা বা বিজ্ঞানী ছিলেন না – অথবা, স্বনামধন্যা কবি-সাহিত্যিক বা মহাকাশযানের যাত্রীও ছিলেন না ৷ বরং সবাই তাদের নিজ নিজ জীবনে, স্ত্রী ও মা হিসেবে অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন – তাদের কোলে এমন সব সন্তান প্রতিপালিত হয়েছিলেন, যারা আল্লাহ্‌র কাছে বিশেষ মর্যাদাপ্রাপ্ত ৷ এ থেকে বোঝা যায় যে, একজন নারীর সংসার-ধর্ম পালনে মা হিসেবে যে ভূমিকা, ইসলামের দৃষ্টিতে তা অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিকতর মর্যাদাপূর্ণ ৷ ইসলামী চিন্তা-চেতনা ভুলে গিয়ে, পশ্চিমের সাথে তাল মেলানোর অথবা পশ্চিমের মত হবার হাস্যকর প্রচেষ্টায় আমরা যখন ইসলামের আধুনিকতাবাদী সংস্কারকে জরুরী মনে করে এমন বক্তব্য রাখি যে, “পর্দার ভিতর থেকে একজন নারীর পাইলট হতেও বাধা নেই“, তখন আমরা ভুলে যাই যে, কিসের বিনিময়ে একজন নারী পাইলট হবেন ? তাকে যে জন্য আল্লাহ্‌ এমন উচ্চ মর্যাদা দান করেছিলেন যে, সন্তান যত বড় মহাপুরুষই হোক না কেন, মাতা রূপী এই নারীর পায়ের তলায়ই তার জান্নাত নিহিত বলে আমরা জানি – মা হিসেবে পালনীয় তার সেই সম্মানিত ভূমিকা, আংশিক বা সম্পূর্ণ জলাঞ্জলি দিয়ে তবেই নিশ্চয় তাকে পাইলট হতে হবে!! পর্দা সহকারে অথবা পর্দা বিহীন ভাবে – যেভাবেই হোক না কেন, পাইলট হবার ফলে কোন নারীর সংসার তার অনুপস্থিতির জন্য যেটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নিশ্চয় পর্দা দিয়ে পুষিয়ে দেয়ার উপায় নেই!! এই কথাটা আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে সমস্যাটা পর্দায় নয় – পর্দার ব্যাপারটা সব সময়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ! কিন্তু নারী হিসেবে তার জীবনে যে ভূমিকাটা এক নম্বর priority-তে ছিল, সেই মায়ের ভূমিকাকে অবহেলা করে – যে উপার্জনের ব্যাপারে (নিতান্ত অসহায় না হলে) তার কোন দায়-দায়িত্ব নেই বললেই চলে – সেই উপার্জনকে কিছু বাড়তি ভোগ-সুখের যোগান দিতে কোন মা যখন priority-তে নিয়ে আসবেন, তখন, অঠিক কাজটি করার জন্য তিনি নিশ্চয়ই জুলুমকারী বলে প্রতিপন্ন হবেন!! মা হিসেবে অপূর্ণ এসব নারীদের সন্তানরাও অপূর্ণ হবে – দিকনির্দেশনাবিহীন ও উদ্ভ্রান্ত ভাবে ‘বিকৃত কল্পনাসৃষ্ট’ উৎসবে মেতে উঠবে পহেলা বৈশাখের রাস্তায় – অথবা – হিন্দুস্থানী মূর্তির পূজা করতে ছুটে যাবে Indian idol-এর ‘ঝাঁকানাকা’ কনসার্টে ৷ নষ্ট গাছে নষ্ট ফলই ধরবে – তাতে অবাক হবার কোন কারণ নেই ৷ সবশেষে আমরা বলবো – উত্তরাধিকারের অধিকার, সংসার জীবনে একটা একান্ত নিজস্ব পরিসরের অধিকার, ব্যবসায় করার অধিকার অথবা একেবারে উপার্জন না করে ঘরে বসে থাকার অধিকার সহ – আল্লাহ্‌ প্রদত্ত সকল অধিকার ও মর্যাদা আমরা যেন মেয়েদের ফিরিয়ে দিই, যাতে তারা পরিবারে নিজেদের গুরুত্বটুকু এবং সঠিক ভূমিকাটুকু অনুভব করতে পারেন ৷ কেবল ভালো মুসলিম হিসেবে ও সুসন্তান হিসেবে সন্তানদের বড় করাটাই যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানিত একটা কাজ – যা পৃথিবীর সব সম্পদ দিয়েও কেনা যায় না – এই বোধটাও যেন তাদের আমরা দিতে চেষ্টা করি ৷ আমরা যদি আদর্শ মা হিসেবে নিজ ভূমিকা পালন করতে আমাদের মায়েদের শিক্ষিত ও সক্ষম করে তুলি, তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার গ্লানি মোছাটা ইনশাল্লাহ্‌ অনেক সহজ হয়ে উঠবে ৷ সে রকম ভালো মুসলিম সন্তানের একটা প্রজন্ম যখন তারা গড়ে তুলতে পারবেন – তখন সেই প্রজন্ম জানবে যে, তাদের মায়েদের আল্লাহ্‌ প্রদত্ত মর্যাদা কতটুকু এবং সাধারণভাবে নারীকুলের মর্যাদাই বা কতটুকু! তাতে নিঃসন্দেহে আখেরাতের সাথে সাথে, নারীর দুনিয়ার কল্যাণও নিশ্চিত হবে ইনশা’আল্লাহ্!





+ + কিছু সহীই হদীস + +

1.   ‘আবদুল্লাহ ইব্‌নু ‘আমর (রাঃ) থেকে বর্ণিত,রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, প্রকৃত মুসলিম সে-ই যার জিহবা ও হাত থেকে সকল মুসলিম নিরাপদ থাকে এবং প্রকৃত মুহাজির সে-ই,আল্লাহ্‌ যা নিষেধ করেছেন তা যে বর্জন করে।

2.  আবু মুসা (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, তাঁরা (সাহাবায়ে কিরাম) নাবী ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! ইসলামে কোন কাজটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন “ যার জিহবা ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে।

3.  আবদুল্লাহ ইব্‌নু আমর (রাঃ) হতে বর্ণিতঃ এক ব্যক্তি রাসূল ﷺ কে জিজ্ঞাসা করল,ইসলামে কোন্‌ কাজটি উত্তম? তিনি বললেন, তুমি খাদ্য খাওয়াবে এবং পরিচিত অপরিচিত নির্বিশেষে সকলকে সালাম দিবে।

4.  আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। নাবী ﷺ বলেন,তোমাদের কোন ব্যক্তি প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তাঁর ভাইয়ের (অপর মুসলিমদের) জন্য ঠিক তাই পছন্দ করে, যেরূপ সে নিজের জন্য পছন্দ করে।

 5.  আবূ হুরাইরাহ (রাঃ)  হতে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেন, সেই আল্লাহ্‌র কসম,  যার হাতে আমার জান,  তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তাঁর নিকট তাঁর পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক ভালোবাসার পাত্র হই।

 5.1 .. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। রাসূল ﷺ বলেনঃ তোমাদের কেউ প্রকৃত মু’মিন হতে পারবে না যতক্ষণ না আমি তাঁর নিকট তাঁর পিতা,  তাঁর সন্তান ও সব মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত ।

 6. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত,  তিনি বলেন-একদা আল্লাহ্’র রসূল ﷺ  মজলিসে জনসমুক্ষে কিছু আলোচনা করছিলেন। ইতোমধ্যে তাঁর নিকট জনৈক বেদুঈন এসে জিজ্ঞেস করল,  কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে’? আল্লাহ্’র রসূল ﷺ  তাঁর আলোচনায় রত থাকলেন। এতে কেউ কেউ বললেন,  লোকটি যা বলেছে তিনি তা শুনেছেন কিন্তু তার কথা পছন্দ করেননি। আর কেউ কেউ বললেন বরং তিনি শুনতেই পাননি। আল্লাহর রসূল ﷺ  আলোচনা শেষে বললেন-‘কিয়ামাত সম্পর্কে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়’? সে বলল,  ‘এই যে আমি,  হে আল্লাহর রসূল!” তিনি বললে-যখন কোন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়,  তখন তুমি  কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।

 7. আবদুল্লাহ ইবনু ‘আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন-কোন এক সফরে আল্লাহর রসূল ﷺ  আমাদের পিছনে রয়ে গেলেন। পরে তিনি আমাদের নিকট পৌঁছলেন,  এদিকে আমরা (আসরের) সালাত আদায করতে বিলম্ব করে ফেলেছিলাম এবং আমরা উযু করছিলাম। আমরা আমাদের পা কোনমতে পানি দ্বারা ভিজিয়ে নিচ্ছিলাম। তিনি উচ্চস্বরে বললেন-পায়ের গোড়ালিগুলোর (শুকনো থাকার) জন্য জাহান্নামের ‘আযাব রয়েছে। তিনি দু’বার বা তিনবার এ কথা বললেন।

 8. ইবনু ‘উমার (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-আল্লাহর রসূল ﷺ  একদা বললেন-গাছগাছালির মধ্যে এমন একটি গাছ আছে যার পাতা ঝরে না। আর তা মুসলিমের উদাহরণ,  তোমরা আমাকে অবগত কর ‘সেটি কী গাছ’? তখন লোকেরা জঙ্গলের বিভিন্ন গাছ-গাছালির নাম ধারণা করতে লাগল। ‘আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন,  ‘আমার ধারনা হল,  সেটা হবে খেজুর গাছ’। কিন্তু আমি (ছোট থাকার কারণে) তা বলতে লজ্জা পাচ্ছিলাম। অতঃপর সহাবীগণ (রাযিঃ) বললেন,  ‘হে আল্লাহর  রসূল! আপনি আমাদের বলে দিন সেটি কি গাছ’? তিনি বললেন – তা হচ্ছে খেজুর গাছ’।

 9. সালামাহ ইবনু আক্‌ওয়া (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমি নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  -কে বলতে শুনেছি ‘যে ব্যক্তি আমার উপর উপর এমন কথা আরোপ করে যা আমি বলিনি,  সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।

 10. আবূ হুরাইরাহ (রাযিঃ) হতে বর্ণিত যে, নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)   বলেছেন- ‘আমার নামে তোমরা নাম রেখ; কিন্তু আমর উপনামে (কুনিয়াতে) তোমরা নাম রেখ না। আর যে অমাকে স্বপ্নে দেখে সে ঠিক আমাকেই দেখে। কারণ শয়তান আমার আকৃতির ন্যায় আকৃতি ধারণ করতে পারে না। যে ইচ্ছা করে আমার উপর মিথ্যারোপ করে সে যেন জাহান্নামে তার আসন বানিয়ে নেয়।

 11. আবূ তাহির আহমাদ ইবনু আমর ইবনু সারহ ও হারমালা ইবনু ইয়াহইয়া (রহঃ) উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্নিত। তিনি বলেনঃ, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ আল্লাহ তাআলা তোমাদের বাপ-দাদাদের নামে কসম করতে নিষেধ করেছেন। উমার (রাঃ) বলেনঃ আল্লাহর কসম! আমি যখন থেকে রাসুলুল্লাহ ﷺ -কে এ থেকে নিষেধ করতে শুনেছি, আর তখন থেকে কখনও সে নামে কখনি কসম করিনি। নিজের পক্ষ থেকেও নয় অপরের উদ্বৃতি দিয়েও নয়। 11

 12. মুহাম্মাদ ইবনু মূসান্না ও ইবনু বাশশার (রহঃ) মারুর ইবনু সোওয়াইদ (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ, আমি আবূ যার (রাঃ) কে দেখতে পেলাম যে, তাঁর গায়ে একটি চাঁদর এবং তাঁর গোলামের গায়েও অনুরুপ একটি চাঁদর রয়েছে। তখন আমি এ ব্যাপারে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেনঃ যে, জনৈক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর যামানায় এক ব্যক্তিকে গালি দিয়েছিল। তখন সে ব্যক্তি তার মাকে উল্লেখ করে গালি দিল। বর্ণনাকারী বলেনঃ তখন লোকটি নাবী ﷺ -এর কাছে এসে তাঁর কাছে ঐ ঘটনা বর্ণনা করলো, নাবী ﷺ করীমবললেনঃ নিশ্চয়ই তোমার মধ্যে অজ্ঞতা যুগের কর্মকাণ্ড বিদ্যমান। তারা তোমাদের ভাই, তোমাদের গোলাম। আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে তোমাদের অধীনস্হ করে দিয়েছেন। সুতরাং যে ব্যক্তির অধীনে তার কোন ভাই থাকে তার উচিত তাকে এমন খাদ্য দেওয়া যা সে নিজে খায় এবং এমন পরিচ্ছদ দেওয়া যা সে নিজে পরিধান করে। আর তোমরা তাদের উপর এমন কাজের ভার চাপিয়ে দিও না যা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য হয়। আর, যদি তোমরা তাদেরকে সাধ্যতীত কাজ দাও তবে তোমরা তাদেরকে প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগিতাও করো।

 13. মুহাম্মাদ ইবনু রাফি’ (রহঃ) আবূ হুরায়রা (রাঃ) সূত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ থেকে এ ব্যাপারে অনেক হাদীস বর্ণনা করেছেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ ঐ গোলামের জন্য কতইনা উত্তম পূরস্কার রয়েছে, যে উত্তমরুপে ইবাদত করে মৃত্যু বরণ করেছে এবং আপন মনিবের উত্তম সেবা করেছে, তার জন্য কতইনা উত্তম প্রতিদান রয়েছে।

 14.আহমাদ ইবনু হাম্বল ও মুহাম্মাদ ইবনু মূসান্না (রহঃ) আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একদা রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদের মাঝে দাড়িয়ে বললেনঃ সে সত্তার কসম যিনি ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই; এমন কোন মুসঁলিম ব্যক্তিকে হত্যা করা বৈধ নয় যে সাক্ষ্য দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। কিন্তু-তিন প্রকার ব্যক্তি ব্যতীত- ১ যে ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করে এবং মুসলমানদের দল পরিত্যাগকারী হয়। ২ বিবাহিত ব্যভিচারী এবং ৩ জীবনের বিনিময়ে জীবন। অর্থাৎ কিসাস গ্রহন। আমাশ (রহঃ) বলেনঃ যে, আমি ইবরাহীমের নিকট হাদীসটি বর্ণনা করলাম, তিনিও আসওয়াদ (রহঃ) এর সূত্রে আয়িশা (রাঃ) থেকে অনুরুপ বর্ণনা করেন।


মূল হাদিসঃفالأول عن ابن مسعود رضي الله عن النبي صلى الله عليه وسلم قال‏:‏ ‏ "‏إن الصدق يهدي إلى البر وإن البر يهدي إلى الجنة، وإن الرجل ليصدق حتى يكتب عند الله صديقاً، وإن الكذب يهدي إلى الفجور، وإن الفجور يهدي إلى النار، وإن الرجل ليكذب حتى يكتب عند الله كذاباً‏"‏ ‏(‏‏(‏متفق عليه‏)‏‏)‏ ‏.‏

পরিচ্ছদঃ সত্যবাদিতার গুরুত্ব 

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَكُونُواْ مَعَ ٱلصَّٰدِقِينَ ١١٩ ﴾ [التوبة: ١١٩] 

অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যবাদীদের সঙ্গী হও।” (সূরা তাওবাহ ১১৯ আয়াত)

তিনি অন্যত্র বলেন,

﴿ وَٱلصَّٰدِقِينَ وَٱلصَّٰدِقَٰتِ ﴾ [الاحزاب: ٣٥] 

অর্থাৎ “---সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদিনী নারী ---এদের জন্য আল্লাহ ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান রেখেছেন।” (সূরা আহযাব ৩৫ আয়াত)

তিনি আরো বলেন,

﴿ فَلَوۡ صَدَقُواْ ٱللَّهَ لَكَانَ خَيۡرٗا لَّهُمۡ ﴾ [محمد: ٢١] 

অর্থাৎ “সুতরাং যদি তারা আল্লাহর সাথে সত্য বলত, তাহলে তাদের জন্য এটা মঙ্গলজনক হত।” (সূরা মুহাম্মাদ ২১ আয়াত)

এ বিষয়ে উল্লেখনীয় হাদীসসমূহ:

১/৫৫। ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘নিশ্চয় সত্য পুণ্যের পথ দেখায় এবং পুণ্য জান্নাতের দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ (অবিরত) সত্য বলতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর কাছে তাকে খুব সত্যবাদী বলে লিখা হয়। পক্ষান্তরে মিথ্যা পাপের পথ দেখায় এবং পাপ জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। একজন মানুষ (সর্বদা) মিথ্যা বলতে থাকে, শেষ অবধি আল্লাহর নিকটে তাকে মহা মিথ্যাবাদী বলে লিপিবদ্ধ করা হয়।’’[1] 

ঈমানের রুকন কয়টি ও কি কি?

উত্তর / বিবরণঃ

ঈমানের রুকন ৬টি

সেগুলি হচ্ছে, আল্লাহ্‌র প্রতি ঈমান, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলীর প্রতি ঈমান, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান, আখেরাতের প্রতি ঈমান এবং তাক্বদীরের ভাল-মন্দের প্রতি ঈমান। কুরআনুল কারীম এবং সহীহ হাদীসের বক্তব্য অনুযায়ী উক্ত রুকনসমূহের প্রত্যেকটির প্রতি ঈমান না আনা পর্যন্ত কারো ঈমান পূর্ণ হবে না। যে ব্যক্তি এগুলির কোনো একটিকে অস্বীকার করবে, সে ঈমানের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴿ ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ ٢٨٥ ﴾ [البقرة: ٢٨٥]    

“রাসূলের নিকট তাঁর প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যে অহি অবতীর্ণ হয়েছে, তাকে তিনি এবং মুমিনগণ মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছেন। তাঁরা সবাই ঈমান এনেছেন আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলীর প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি। (তাঁরা বলে,) আমরা তাঁর রাসূলগণের মধ্যে কোন তারতম্য করি না। তাঁরা বলে, আমরা শুনেছি এবং মেনে নিয়েছি। হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আপনার কাছে ক্ষমা চাই এবং আপনারই নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে” (বাক্বারাহ ২৮৫)

তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

«أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ وَمَلاَئِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ»

“ঈমান হচ্ছে, আল্লাহ্‌র প্রতি, তাঁর ফেরেশতামণ্ডলীর প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসূলগণের প্রতি এবং তাক্বদীরের ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা” (মুসলিম)

 

আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমার বান্দাদের বলে দিন, তারা যেন যা উত্তম এমন কথাই বলে। শয়তান তাদের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধায়। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। (বনী ইসরাঈল ৫৩) ......


ক্বিয়ামত অবশ্যই আসবে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিকাংশ লোক বিশ্বাস স্থাপন করে না। (মুমিন ৫৯) 

নিশ্চয় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তাঁর সাথে কাউকে শরীক করে। এছাড়া যাকে ইর্চ্ছা, ক্ষমা করেন। যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে সুদূর ভ্রান্তিতে পতিত হয়। (আন নিসা : ১১৬)


: আল্লাহর নির্দেশের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানজনক নির্দেশ কোনটি? আর তার নিষেধের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর নিষেধ কোনটি?

উত্তর: আল্লাহর নির্দেশের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানজনক নির্দেশ হল: ইবাদতের ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক ও অদ্বিতীয় বলে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার নিষেধের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর নিষেধ হল: তার সাথে শির্ক করা। আর তা হলো: আল্লাহর সাথে অন্যকে ডাকা বা ইবাদতের যে কোনো প্রকার আল্লাহ ব্যতীত অন্যের উদ্দেশ্যে করা। কাজেই যে ব্যক্তি ইবাদতের প্রকারগুলোর মধ্যে যে কোনো ইবাদত গাইরুল্লাহর (আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারোর) জন্য করবে অথবা এর দ্বারা অন্যকে উদ্দেশ্য করবে সে যেন গাইরুল্লাহকে রব্ব এবং আল্লাহ বানিয়ে নিল।

 

 
 

Contact Us

 
 
মা-বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সন্তান মা-বাবার জন্য বেশী বেশী দু‘আ করবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কী দু‘আ করবো তাও শিক্ষা দিয়েছেন । আল-কুরআনে এসেছে, رَبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ ﴾ [الاسراء: ٢٤] ‘‘হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’’ [সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪] رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١] ‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’’ [সুরা ইবরাহীমঃ৪১] এছাড়া আলস্নাহ রাববুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দূ‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ رَّبِّ ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيۡتِيَ مُؤۡمِنٗا وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِۖ وَلَا تَزِدِ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا تَبَارَۢا ٢٨ ﴾ [نوح: ٢٨ ‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি যালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না ’[সূরা নুহ: ২৮] । মা-বাবা এমন সন্তান রেখে যাবেন যারা তাদের জন্য দোয়া করবে। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, « إِذَا مَاتَ الإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلاَّ مِنْ ثَلاَثَةٍ إِلاَّ مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ ». অর্থ: মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩ টি আমল বন্ধ হয় না-১. সদকায়ে জারিয়া ২. এমন জ্ঞান-যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় ৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দু‘আ করে [সহিহ মুসলিম: ৪৩১০] আল্লাহর উপর ভরসা...... আল্লাহ্ তাআলার উপর ভরসা ইসলামে একটি বিরাট বিষয়। এর গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। আল্লাহর প্রতি ভরসা ছাড়া কোন বান্দাই কোন মূহুর্ত অতিবাহিত করতে পারে না। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতও বটে। কেননা এর মাধ্যমে আল্লাহর তাওহীদের সাথে সম্পর্ক গাড় ও গভীর হয়। আল্লাহ্ বলেন: وَتَوَكَّلْ عَلَى الْحَيِّ الَّذِي لَا يَمُوتُ “আর ভরসা কর সেই জীবিত সত্বার (আল্লাহর) উপর, যিনি কখনো মৃত্যু বরণ করবেন না।” [সূরা ফুরক্বান-৫৮] এই আয়াতে আল্লাহ্ তাআলা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে তাঁর উপর ভরসা করার আদেশ করেছেন। তিনি ছাড়া অন্য কারো নিকট নিজেকে পেশ করবেন না। কেননা তিনি চিরঞ্জীব, তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি পরাক্রমশালী, কোন কিছুই তাঁকে পরাজিত করতে পারে না। যে ব্যক্তিই তাঁর উপর নির্ভর করবে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট হবেন- তাকে সাহায্য ও সমর্থন করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো উপর ভরসা করবে, সে তো এমন কিছুর উপর ভরসা করল যে মৃত্যু বরণ করবে, বিলীন ও ক্ষয় হয়ে যাবে। দুর্বলতা ও অপারগতা তাকে চারদিক থেকে ঘিরে রয়েছে। এ কারণে তার প্রতি ভরসা কারীর আবেদন বিনষ্ট হয়ে যায়, সে হয়ে যায় দিশেহারা। এ থেকেই বুঝা যায় আল্লাহর উপর ভরসা করার ফযীলত ও মর্যাদা কি?! তাঁর সাথে হৃদয়ের সম্পর্ককে গভীর করার গুরুত্ব কতটুকু?! ‘তাওয়াক্কুল আল্লাহ বা আল্লাহর উপর ভরসা করার অর্থ: দুনিয়া-আখেরাতের যাবতীয় বিষয়ের কল্যাণ লাভ ও ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য সঠিক ভাবে অন্তর থেকে আল্লাহর উপর নির্ভর করা। বান্দা তার প্রতিটি বিষয় আল্লাহর উপর সোপর্দ করবে। ঈমানে এই দৃঢ়তা আনবে যে, দান করা না করা, উপকার-অপকার একমাত্র তিনি ছাড়া আর কারো অধিকারে নেই। আল্লাহ্ তাআলা মুমিন বান্দাদেরকে তাওয়াক্কুলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে পবিত্র কুরআনে অনেক আয়াত উল্লেখ করেছেন। তার মর্যাদা ও ফলাফল উল্লেখ করেছন। তন্মধ্যে: আল্লাহ্ বলেন: وَعَلَى اللَّهِ فَتَوَكَّلُوا إِنْ كُنتُمْ مُؤْمِنِينَ “তোমরা যদি মুমিন হয়ে থাকে তবে আল্লাহর উপরেই ভরসা কর।” [সূরা মায়েদা- ২৩] তিনি আরও বলেন: وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلْ الْمُؤْمِنُونَ “মু’মিনগণ যেন একমাত্র আল্লাহর উপরেই ভরসা করে।” [সূরা তওবা- ৫১] তিনি আরও এরশাদ করেন: وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হবেন।” [সূরা ত্বলাক- ৩] তিনি আরও বলেন: فَإِذَا عَزَمْتَ فَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ “যখন তুমি দৃঢ়ভাবে ইচ্ছা করবে, তখন আল্লাহর উপর ভরসা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ ভরসা কারীদের ভালবাসেন।” [সূরা আল ইমরান- ১৫৯] হাদীছ গ্রন্থ সমূহেও তাওয়াক্কুলের গুরুত্ব ও তার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে অনেক হাদীছ বর্ণিত হয়েছে। ওমার বিন খাত্তাব (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “তোমরা যদি সঠিকভাবে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে তবে তিনি তোমাদেরকে রিযিক দান করতেন- যেমন পাখিকে রিযিক দান করে থাকেন- তারা খালি পেটে সকালে বের হয় এবং পেট ভর্তি হয়ে রাতে ফিরে আসে।” (আহমাদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহ্) হাফেয ইবনু রজব (র:) বলেন, তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে এ হাদীছটিই হল মূল। আর তাওয়াক্কুলই হল জীবিকা পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ “আর যে আল্লাহ্‌কে ভয় করে, আল্লাহ্ তার জন্যে নিষ্কৃতির পথ করে দেবেন। এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” [সূরা ত্বালাক-২,৩] জাবের বিন আবদুল্লাহ্ (রা:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এরশাদ করেন, “কোন প্রাণী তার নির্দিষ্ট রিযিক পরিপূর্ণরূপে না পাওয়া পর্যন্ত সে মৃত্যু বরণ করবে না। সুতরাং তোমরা আল্লাহ্‌কে ভয় কর এবং রিযিক অনুসন্ধানের জন্য সুন্দর (বৈধ) পন্থা অবলম্বন কর। যা তোমাদের জন্য হালাল করেছেন তা গ্রহণ কর,আর যা হারাম করেছেন তা পরিত্যাগ কর।” (ইবনু মাজাহ্, হাকেম ও ইবনু হিব্বান) ওমার (রা:) বলেন, “বান্দা এবং তার রিযিকের মধ্যে একটি পর্দা রয়েছে। সে যদি অল্পে তুষ্ট হয় এবং তার আত্মা সন্তুষ্ট হয় তবে তার রিযিক তার কাছে সহজে আগমন করবে। আর যদি সীমালঙ্ঘন করে এবং উক্ত পর্দাকে ফেড়ে ফেলে, তবে তার নির্দিষ্ট রিযিকের অতিরিক্ত কোন কিছু তার নিকট পৌঁছবে না।” জনৈক বিদ্বান বলেন: “তুমি আল্লাহর উপর ভরসা কর, রিযিক তোমার কাছে ক্লান্তি ও অতিরিক্ত কষ্ট ছাড়া সহজেই এসে যাবে।” এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা স্মরণ রাখতে হবে যে, বিশুদ্ধভাবে আল্লাহর উপর ভরসার সাথে আবশ্যক হল, জীবিকার উপায়-উপকরণ অনুসন্ধান করা ও কাজ করা- ভরসা করে বসে না থাকা। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, وَاتَّقُوا اللَّهَ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلْ الْمُؤْمِنُونَ “তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, আর মু’মিনগণ যেন আল্লাহর উপরই ভরসা করে।” [সূরা মায়েদা-১১] এখানে ভরসা করার সাথে সাথে আল্লাহকে ভয় করার কথা বলা হয়েছে। আর তা নির্দেশিত যাবতীয় বিষয়ের উপকরণকে শামিল করছে। সুতরাং নির্দেশিত উপকরণ অবলম্বন না করে বা কাজ না করে শুধু ভরসা করে বসে থাকা বিরাট ধরণের অপারগতা- যদিও এতে তাওয়াক্কুল পাওয়া যায়। সুতরাং কোন বান্দার জন্য উচিত নয় যে,ভরসাকে অপারগতায় রূপান্তরিত করবে অথবা অপারগতাকে ভরসায় রূপান্তরিত করবে। বরং যে সমস্ত উপকরণ সে অবলম্বন করবে তার মধ্যে ভরসাও শামিল থাকবে। এ অর্থে একটি হাদীছও বর্ণিত হয়েছে। আনাস (রা:) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন: জনৈক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল,হে আল্লাহর রাসূল! উটটিকে বাঁধার পর আল্লাহর উপর ভরসা করব? নাকি আল্লাহর উপর ভরসা করে (না বেঁধেই) ছেড়ে দিব? তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন: “আগে তা বেঁধে দাও,তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।” (তিরমিযী) এক্ষেত্রে একদল লোক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে (প্রয়োজনীয় উপকরণ অবলম্বন না করে, কাজ না করে,পরিশ্রম না করে) নিজেদের অপারগতাকে ভরসা ভেবেছে, আর তাকেই ওযর বা ছুতা হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে নিজের এবং পরিবারের অনেক অধিকার- ওয়াজিব বিষয় বিনষ্ট করেছে। নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “কোন ব্যক্তির পাপী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, যাদের খরচ বহন করা তার উপর আবশ্যক তাদেরকে বিনষ্ট করা তথা তাদেরকে প্রয়োজনীয় খরচ না দেয়া।” (আবু দাউদ) এদের উদ্দেশ্য করে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “শক্তিশালী মুমিন আল্লাহর নিকট দুর্বল মুমিনের চাইতে অধিক উত্তম ও বেশী প্রিয়। অবশ্য উভয়ের মধ্যে কল্যাণ রয়েছে। উপকারী বিষয়ের প্রতি আগ্রহী হবে এবং তা হাসিল করার জন্য আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করবে,অপারগতা প্রকাশ করবে না। যদি কোন ক্ষতি হয়ে যায়,তবে কখনই এরূপ বলবে না যে, ‘যদি’ আমি এটা করতাম তবে এরূপ এরূপ হত। বরং তখন বলবে, আল্লাহ্ যা নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চান তাই করেন। কেননা ‘যদি’শয়তানের দরজা উন্মুক্ত করে।” (ছহীহ্ মুসলিম) উল্লেখ্য যে, ভরসার ক্ষেত্রে মানুষের দুর্বলতা একমাত্র তাক্বদীরের প্রতি ঈমানের দুর্বলতা থেকেই সৃষ্টি হয়। কেননা মানুষ যখন তার যাবতীয় বিষয় আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে, আর তিনি যা ফায়সালা করেন তাতে সন্তুষ্ট হয়ে যায় ও তা পসন্দ করে, তাহলে সে প্রকৃত ভাবে তাওয়াক্কুল বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু সে যদি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো উপর ভরসা করে এবং তার সাথেই স্বীয় হৃদয়কে সংশ্লিষ্ট করে, তবে নি:সন্দেহে সে লাঞ্ছিত হবে, স্বীয় মহান রব থেকে উদাসীন। ইবনু মাসঊদ (রা:) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “কোন ব্যক্তি যদি অভাবী হয়, অত:পর তার অভাবের কথা মানুষের কাছে পেশ করে, তবে তার অভাব দুর করা হবে না। আর যে ব্যক্তি তা আল্লাহর কাছে পেশ করে, অনতিবিলম্বে আল্লাহ্ তাকে অভাব মুক্ত করে দিবেন।” (আবু দাউদ ) শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনু তাইমিয়া (র:) বলেন: কোন মাখলুকের কাছে যে ব্যক্তি আশা করবে এবং তার উপর ভরসা করবে, তার উক্ত ধারণা নি:সন্দেহে বাতিল হবে এবং সে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর সে হবে মুশরিক। আল্লাহ্ বলেন, وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنْ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ “আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করে সে যেন আকাশ থেকে আছড়ে পড়ল, অত:পর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল, কিংবা বায়ু তাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে এক দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করল।” (সূরা হাজ্জ-৩১) শায়খ সুলায়মান বিন আবদুল্লাহ্ বিন আবদুল ওয়াহাব (র:) বলেন: তাওয়াক্কুল দুপ্রকার: ১) এমন বিষয়ে তাওয়াক্কুল করা- যে ব্যাপারে আল্লাহ্ ছাড়া কারো কোন ক্ষমতা নেই। যেমন, কোন কোন মানুষ মৃত ব্যক্তি এবং তাগুতের উপর ভরসা করে এই আশায় যে, তারা তাদেরকে সাহায্য করবে, তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করবে, তাদের জন্য শাফাআত করবে… এগুলো সবই বড় শিরক যা ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দিবে। ২) বাহ্যিক উপায়-উপকরণ ও বস্তুর উপর ভরসা করা। যেমন কোন আমীর বা বাদশার উপর ভরসা করা এমন বিষয়ে যা বাস্তবায়নের ক্ষমতা আল্লাহ্ তাকে দিয়েছেন। যেমন চাকরীর ব্যবস্থা করা বা নির্দিষ্ট কোন বিপদ দূর করা। এটা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। বৈধ ভরসা হল- একজন মানুষ অপরজনকে তার পক্ষ থেকে কোন কাজ আদায় করার দায়িত্ব দেয়া। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি উক্ত বিষয়ে সামর্থ্য রাখবে। এক্ষেত্রেও সে ব্যক্তির উপর পুরাপুরি নির্ভর করবে না। বরং উক্ত বিষয় বাস্তবায়নের জন্য সে নিজে এবং ভারপ্রাপ্ত ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে। তাওয়াক্কুলের বাস্তবায়ন এবং বৈধ উপায়-উপকরণ অবলম্বন করার সাথে সাথে হৃদয়কে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য এ উদাহরণটি উল্লেখযোগ্য: রাসূলুল্লাহ্ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হিজরতের সময় মদিনার দিকে যাওয়ার জন্য মক্কা থেকে উল্টা দিকে গমন করেন। আর তা ছিল রাতের আঁধারে। অত:পর তাঁরা ‘ছওর’নামক গুহায় আত্মগোপন করেন। আবু বকর (রা:) নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর হিজরতের ঘটনা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, আমরা যখন ‘গারে ছওরে’ ছিলাম তখন আমি উপর দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম মুশরেকদের পা আমাদের মাথার ঠিক উপরেই। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের কেউ যদি নিজের পায়ের দিকে তাকায় তাহলেই আমাদেরকে দেখতে পাবে। তখন তিনি আমাকে বললেন, “আমাদের দুজন সম্পর্কে তোমার ধারণা কি হে আবু বকর! আল্লাহ্ আমাদের তৃতীয় জন। অর্থাৎ আমাদের সাহায্যকারী।” (বুখারী ও মুসলিম) যে কথা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ্ এভাবে বর্ণনা করেছেন, إِذْ أَخْرَجَهُ الَّذِينَ كَفَرُوا ثَانِيَ اثْنَيْنِ إِذْ هُمَا فِي الْغَارِ إِذْ يَقُولُ لِصَاحِبِهِ لَا تَحْزَنْ إِنَّ اللَّهَ مَعَنَا “যখন তাকে কাফেররা বহিষ্কার করেছিল, তিনি ছিলেন দুজনের একজন, যখন তারা গুহার মধ্যে ছিলেন। তখন তিনি আপন সঙ্গীকে বললেন, বিষন্ন হয়ো না, আল্লাহ্ আমাদের সাথে আছেন।” (সূরা তওবাহ্-৪০) সুতরাং যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করবে,সে অকল্পনীয় ভাবে তার মর্যাদা লাভ করবে,তার ফলাফল ভোগ করবে। আর সে হবে সর্বাধিক উন্মুক্ত হৃদয়ের মানুষ,সবচাইতে সুখী মানুষ। আল্লাহ্ বলেন, وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ “যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।” (সূরা ত্বালাক-৩) আল্লাহ্ আমাদেরকে তাঁর প্রতি সঠিকভাবে ভরসা করার তাওফীক দান করুন। আমীন॥ কুর’আনের অর্থ না বুঝার কারণে আপনি প্রতিদিন যে ১০টি জিনিস হারাচ্ছেন ! Posted: 18 Feb 2017 06:00 PM PST ১-কুর’আন নাযিলের উদ্দেশ্য বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছেন ! আপনি যদি কুর’আনের অর্থ না বুঝেই কেবল উচ্চারণ করে পড়তে থাকেন, তাহলে কুর’আন নাযিলের মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাবে। আল্লাহ বলেন, “এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি আপনার প্রতি বরকত হিসেবে অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষ এর আয়াতসূহ লক্ষ্য করে এবং বুদ্ধিমানগণ যেন তা অনুধাবন করে”। সূরা সা’দ ২৯ কিভাবে এই উদ্দেশ্য আমাদের দ্বারা বাস্তবায়িত হবে যদি আমরা কুর’আন কি বলছে তা বুঝতে না পারি! কোন ব্যক্তির পক্ষে কি সর্বদা অনুবাদ বহন করা সম্ভব, কিংবা সালাতে যখন কুর’আন তিলাওয়াত করা হয় তখন কি আমাদের পক্ষে কুর’আনের অনুবাদ বহন করা সম্ভব?.   ২- আপনার মন হতে পারতো একটি সজ্জিত উদ্যান !   আমাদের মন যেন একটি সজ্জিত উদ্যান। আর সেই উদ্যানে যদি আমরা কোন গাছ না লাগাই, তাহলে সেখানে জন্মাবে আগাছা। এমনকি যদি আমরা ফুলের গাছ লাগাই, কিন্তু পরিচর্যা না করি তাহলেও সেখানে আগাছা জন্মাতে থাকবে। আমাদেরকে সর্বদাই আগাছা পরিষ্কার করতে হবে, কেবল তখনই আমরা আমাদের উদ্যানের সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারব। মনের ফুল হচ্ছে হেদায়াত,আল্লাহর বাণী,আল্লাহর দেখানো পথ, আর আগাছা হচ্ছে শয়তানের ওয়াসওয়াসা, কুচিন্তাসমূহ। প্রতিবার যখন আমরা কুর’আন তিলাওয়াত শুনি সালাতে কিংবা অন্যত্র তখন আমাদের মনে একটি ভালো অনুভূতি জন্ম নেয়, আমরা যদি সেই আয়াতসমূহের প্রতি মনোযোগ না দেই, কি বলা হচ্ছে তা বুঝার চেষ্টা না করি, আল্লাহর আয়াত-নিদর্শন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা না করি তাহলে তা হবে ফুল গাছ লাগানো বাগানে পানি না দেওয়ার মত, সেখানে জন্মাবে আগাছা আর সেই উদ্যান নষ্ট হয়ে যাবে। ৩- আপনি হারাচ্ছেন তিলাওয়াতের উদ্দেশ্য ! কুর’আন পাঠের পাঁচটি উদ্দেশ্য হতে পারে ১) আল্লাহর কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ ২) ইলম অর্জন ৩) আল্লাহ যা করতে বলছেন তা বাস্তবায়িত করা ৪) আমাদের মন ও অন্তরের আরোগ্য-শিফা ৫) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সাথে কথোপকথন . অর্থ না বুঝার কারণে আপনি এ সকল উদ্দেশ্য থেকে উপকার লাভ করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ৪-আপনি হারাচ্ছেন রুগ্ন ও ব্যধিগ্রস্ত অন্তর থেকে আরোগ্য লাভের সুযোগ ! আমরা সবাই জানি ফযরের সালাত আদায় করা ফরয। কিন্তু এরপরেও খুব অল্প কিছু মানুষ মসজিদের জামাতে অংশ নিতে সক্ষম হয়। কিন্তু কেন? এমন নয় যে, তারা এ বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নয়, মূল কারণ হচ্ছে আমাদের অন্তর রুগ্ন ও ব্যধিগ্রস্ত, মরিচা ধরা । অধিকাংশ লোকের একটি ভুল ধারণা হচ্ছে, কুর’আন শুধুমাত্র একটি আদেশ-নিষেধের কিতাব। কি করা যাবে, আর কি করা যাবে না ; সে বিষয়ের কিতাব। অথচ বিধি-নিষেধের আলোচনা করা হয়েছে এমন আয়াতের সংখ্যা মোট আয়াতের শতকরা ১০ ভাগেরও কম ! বাকি ৯০ ভাগেরও বেশি আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে এমন বিষয় সম্পর্কে যা আমাদের মন ও মস্তিষ্কের খোরাক, এগুলো আমাদের মনকে সতেজ ও পুষ্ট রাখে। আমাদের অন্তর দুর্বল ও রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে আমাদের পাপের কারণে। কাজেই এই মরিচা পড়া অন্তরে ঘষা মাজা এবং মজবুত করতে চাই কুর’আন। আদম আলাইহি সালাম কে নিষেধ করা হয়েছিল তিনি যেন নিষিদ্ধ গাছের নিকটবর্তী না হন। আল্লাহ বলেন, “আমি ইতিপূর্বে আদমকে নির্দেশ দিয়েছিলাম। অতঃপর সে ভুলে গিয়েছিল এবং আমি তার মধ্যে দৃঢ়তা পাইনি”। ত্বহা ১১৫ । আমরা মানুষ, আর আমাদের রয়েছে নানাবিধ দুর্বলতা। আমাদের চারপাশে আছে নানা প্রলোভন ও পরীক্ষা। কাজেই এগুলো থেকে বাঁচতে আমাদের সদা সর্বদা তাযকিরাহ ( এমন উপদেশ যা আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়) ও সতর্কবাণী মনে রাখা প্রয়োজন, যা আমরা লাভ করতে পারি দৈনিক তিলাওয়াত এর মাধ্যমে। আল্লাহ এ কারণেই বলছেন,  “হে মানবকুল, তোমাদের কাছে উপদেশবানী এসেছে তোমাদের পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে এবং অন্তরের রোগের নিরাময়, হেদায়েত ও রহমত মুসলমানদের জন্য”। [ইউনুস ৫৭] “আমি কোরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের জন্য রহমত…”।ইসরা ৮২ অন্তরের ব্যধি থেকে মুক্তির এর চেয়ে ভালো ঔষধ আর কে দিতে পারে, আল্লাহ ছাড়া? ৫– আপনি হারাচ্ছেন অন্তরে দৃঢ়তা লাভের সুযোগ ! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর কুর’আন একবারে নাযিল হয়নি, বরং তা ২৩ বছর সময় ধরে ধীরে ধীরে নাযিল হয়েছে।  “সত্য প্রত্যাখানকারীরা বলে, তাঁর প্রতি সমগ্র কোরআন একদফায় অবতীর্ণ হল না কেন? আমি এমনিভাবে অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেছি আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্যে”। ফুরকান ৩২ অন্তর দৃঢ়তা লাভ করে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ও সতর্কতার খবর লাভ করে, ঈমান বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ বলেন, “আর যখন কোন সূরা অবতীর্ণ হয়, তখন তাদের কেউ কেউ বলে, এ সূরা তোমাদের মধ্যেকার ঈমান কতটা বৃদ্ধি করলো? অতএব যারা ঈমানদার, এ সূরা তাদের ঈমান বৃদ্ধি করেছে এবং তারা আনন্দিত হয়েছে”। তাওবা ১২৪ প্রতিদিন ধারাবাহিকভাবে সালাতে কিংবা কিরাতে অর্থ বুঝে কুর’আন তিলাওয়াত ও আল্লাহর আয়াতসমূহের উপর চিন্তা গবেষণা দ্বারা আমাদের অন্তর দৃঢ়তা লাভ করে। অর্থ বুঝে কুর’আন তিলাওয়াত না করে আপনি এ সু্যোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন । ৬-প্রতিদিন সালাতে আল্লাহর সাথে কথোপকথনের সুযোগ হারাচ্ছেন ! আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুর’আনের আয়াতের সাথে যেন কথা বলতেন ! “আর যখন তিনি এমন আয়াত পড়তেন যেখানে আল্লাহর প্রশংসা করা হয়েছে, তিনি তাঁর প্রশংসা করতেন, আর যখন তিনি এমন আয়াত পাঠ করতেন যেখানে আল্লাহর কাছে কোন কিছু চাওয়ার কথা বলা হয়েছে, তিনি চাইতেন, আর যখন তিনি এমন কোন আয়াত পাঠ করতেন যেখানে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে বলা হয়েছে, তিনি আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন” [মুসলিম] প্রিয় পাঠক ! ভেবে দেখুন, আমরা যখন আমাদের প্রিয়জনদের কাছাকাছি থাকি, তখন কি আমরা মিনিট পাঁচেকের জন্যেও কথা না বলে চুপ করে থাকতে পারি? আর আল্লাহর চেয়ে অধিক আপন আর কে হতে পারে? তিনি আমাদেরকে আমাদের আপন মায়ের চেয়েও সত্তর গুণ বেশি ভালোবাসেন। এরপরও আমরা জানার প্রয়োজন মনে করি না, আজকে সালাতে কি তিলাওয়াত করা হল! আল্লাহ কি বিষয়ে কথা বলেছেন! এমনকি কিছুমাত্র অর্থ না বুঝে আমরা কাটিয়ে দেই পুরো রামাদানের তারাবীহ’র সালাত ! ৭-সরাসরি হেদায়াত ও পথ নির্দেশনা লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ! আমরা যখন কুর’আন পাঠ করি কিংবা এর তিলাওয়াত শুনে থাকি তখন আমরা সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে দিক নির্দেশনা লাভ করতে পারি,পথ চলার বাতি লাভ করি। হেদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া এক অপূরণীয় ক্ষতি। “এবং যে আমার স্মরণ (কুর’আন) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে,  তার জীবিকা সংকীর্ণ হবে এবং আমি তাকে কেয়ামতের দিন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করব।  সে বলবেঃ হে আমার পালনকর্তা আমাকে কেন অন্ধ অবস্থায় উত্থিত করলেন? আমি তো (দুনিয়াতে) চক্ষুমান ছিলাম। আল্লাহ বলবেনঃ এমনিভাবে তোমার কাছে আমার আয়াতসমূহ এসেছিল,  অতঃপর তুমি সেগুলো ভুলে গিয়েছিলে। তেমনিভাবে আজ তোমাকে ভুলে যাব”। ত্বহা ১২৪-১২৬ “…আমি আমার কাছ থেকে আপনাকে দান করেছি পড়ার গ্রন্থ।  যে এ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, সে কেয়ামতের দিন বোঝা বহন করবে”। ত্বহা ৯৯-১০০     ৮-আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ! আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের বিভিন্ন মাত্রা রয়েছে- তাঁর প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিকতা, তাঁর উপর ভরসা করা, আল্লাহকে স্মরণ করা সরাসরি কিংবা যখন আমরা তাঁর কোন আয়াত তথা সৃষ্টি নিদর্শন দেখতে পাই, তাঁর সৃষ্টিকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করা, তাঁর গুণবাচক উত্তম নামসমূহ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় রয়েছে। এই সম্পর্ক কেবল সময়ের সাথে সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হয়। আর এজন্য প্রয়োজন অল্প করে হলেও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে দৈনন্দিন কিছু না কিছু আল্লাহর কালামের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা।   ৯– আপনার চরিত্র হতে পারতো আল-কুর’আন এর মত !  আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, “কুর’আনই হল আল্লাহর রাসূল(সা) এর আখলাক”। কুর’আন যদি হয় তত্ত্বকথা (থিওরি) তাহলে তার ব্যবহারিক হাতে কলমে প্রদর্শনী দিয়েছেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সমগ্র জীবনের মাধ্যমে। আমাদের উচিত নবীজী(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের) জীবনীগ্রন্থ পাঠ করা এবং সেই ঘটনাপ্রবাহের সাথে আয়াতসমূহের মিল খুঁজে বের করা। যেমন, হিজরতের সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একান্ত মনে নিবিষ্ট চিত্তে, নির্ভাবনায় সাথে পাঠ করে যাচ্ছিলেন একটি আয়াত, অপরদিকে সাথী আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন সংগীর নিরাপত্তা চিন্তায় উদ্বিগ্ন। সেটি হল,  “…হে আমার রব! (আমাকে যেখানেই নিয়ে যাও না কেন) তুমি আমাকে সত্যের সাথে নিয়ে যেও এবং (যেখান থেকেই আমাকে বের করো না কেন) সত্যের সাথেই বের করো এবং দান করো আমাকে তোমার কাছ থেকে রাষ্ট্রীয় সাহায্য”। [ইসরা ৮০] ১০- কুর’আনের চোখে বিশ্ব দেখার সুযোগ হারাচ্ছেন ! এ পৃথিবী একটি মায়ার জগত, যেন এক মস্ত কুহেলিকা আর ধোঁকা, যার অন্তরে কুর’আন নেই তার অন্তর একটি শূণ্য ঘরের মত যে ঘরে কোন আসবাব নেই। কুর’আনের শিক্ষা না থাকার কারণে সে দুনিয়ার জগতকেই বড় ও আসল বলে মনে করে, ফলে সে পরকালের প্রতি হয়ে পড়ে উদাসীন। এরূপ ব্যক্তির জীবন যতই সুখকর হোক না কেন তা শুধুই স্বপ্নের মত, যা ঘুম ভেঙ্গে গেলে হারিয়ে যায়। যখন একজন ডাক্তারের কাছে এসে কোন রোগী নিজের সমস্যা ও অসুস্থতার বর্ণনা দিতে থাকে তখন অভিজ্ঞ ডাক্তার সেই লক্ষণসমূহ শুনতে থাকেন এবং রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করেন, পরিশেষে তিনি নিরাময়ের জন্য ঔষধ কিংবা পরামর্শ দান করেন। একইভাবে, আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা বিচিত্র ঘটনার সামনে এসে দাঁড়াই। আমাদের উচিত আমরা যেন সেই সমস্যাগুলোর সমাধান আল্লাহর কালামের কাছ থেকে নেয়ার মত সক্ষমতা অর্জন করি। এটা কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন আমরা নিয়মিতভাবে কুর’আনের অর্থ শিক্ষা লাভ করব এবং সেই শিক্ষার সাথে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের পরিস্থিতির মিল খুঁজে বের করতে পারব।
At-Tahreek August12 Issue (1).pdf At-Tahreek August12 Issue (1).pdf
Size : 1408.629 Kb
Type : pdf

DT ;-27/02/2017..

MD RAHAMAT KHAN...

এক মিনিটে আপনি কি কি আমল করতে পারেন .......

এক মিনিটে আপনি কি কি আমল করতে পারেন.

আমরা অফিসে বা কর্মস্থলে ইবাদত-বন্দেগী ও নেককাজের তেমন কোন সময় পাই না। অফিসের পর বাকী যে সামান্য সময় পাই এর মধ্যে আমরা কি কি আমল করতে পারি এবং এ সময়কে কিভাবে কাজে লাগাতে পারি? উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।সময় মানুষের জীবন। সময়কে কখনো অপচয় হতে বা অকাজে নষ্ট হতে দেয়ার মত নয়। প্রজ্ঞাবান ও বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে তার সময়ের সদ্ব্যবহার করে। তাই বুদ্ধিমান ব্যক্তি সময়কে অহেতুক কাজে বা অর্বাচীন কথায় ব্যয় করে না। বরং তিনি সময়কে প্রশংসনীয় উদ্যোগ ও ভাল কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। যে কাজ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং মানুষের উপকার বয়ে আনে। জীবনের প্রতিটি মিনিটে আপনি একটি করে প্রস্তর স্থাপন করতে পারেন যা আপনার মর্যাদার ভবনকে উচ্চকিত করবে এবং যা দিয়ে আপনার জাতি সৌভাগ্যমণ্ডিত হতে পারবে। আপনি যদি মর্যাদার শিখরে পৌঁছুতে চান এবং আপন জাতিকে সৌভাগ্যমণ্ডিত করতে চান তবে আরাম-আয়েশকে না-বলুন এবং অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করুন। এক মিনিট সময়ের মাঝে অনেক ভাল কাজ করা যেতে পারে এবং বিশাল সওয়াব পাওয়া যেতে পারে। শুধু আপনার জীবনের এক মিনিট সময় ব্যয় করে আপনি আপনার দানের পরিধি বাড়াতে পারেন, কোন কিছু উপলব্ধি করতে পারেন, কোন কিছু মুখস্থ করতে পারেন, যে কোন নেককাজ করতে পারেন। শুধু এক মিনিটেই আপনার ভালো কাজের আমলনামায় এই আমলগুলো লেখা হয়ে যাবে যদি আপনি জানেন কিভাবে এক মিনিট সময়কে কাজে লাগাতে হয় এবং বাস্তবে কাজে লাগান। কবি বলেন: “প্রতিটি মিনিটে বৃহত্তর কল্যাণে প্রবৃত্ত হও। যদি তুমি এক মিনিটকে ভুলে যাও তবে এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও ভুলে যাবে; বরঞ্চ বাস্তবতাকে ভুলে যাবে।” আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় এক মিনিটে আপনি যে যে আমলগুলো করতে পারেন নিম্নে এর কিছু প্রস্তাবনা পেশ করা হলো: (১) এক মিনিটে আপনি সূরা ফাতিহা মনে মনে দ্রুতগতিতে ৩ বার পড়তে পারেন। কেউ কেউ হিসাব কষে দেখিয়েছেন একবার সূরা ফাতিহা পড়লে ৬০০ টিরও বেশি নেকি পাওয়া যায়। তাই আপনি যদি তিনবার সূরা ফাতিহা পাঠ করেন তবে আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় ১৮০০ এর বেশি নেকি হাসিল করবেন। এত নেকী আপনি এক মিনিটেই পাচ্ছেন। (২) এক মিনিটে আপনি সূরা ইখলাস (ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ) মনে মনে দ্রুতগতিতে ২০ বার পড়তে পারেন। এই সূরা একবার পাঠ করলে কুরআন শরীফের এক তৃতীয়াংশ পড়ার সমান সওয়াব পাওয়া যায়। তাই আপনি যদি এ সূরাটি ২০ বার পাঠ করেন তবে তা ৭ বার কুরআন পড়ার সমতুল্য। অতএব আপনি যদি এ সূরাটি প্রতিদিন এক মিনিটে ২০ বার পাঠ করেন তবে মাসে আপনার ৬০০ বার পাঠ করা হয় এবং বছরে ৭২০০ বার পাঠ করা হয়। যার সওয়াব ২৪০০ বার সম্পূর্ণ কুরআন পড়ার সমতুল্য। (৩) এক মিনিটে আপনি আল্লাহর কিতাবের এক পৃষ্ঠা পাঠ করতে পারেন। (৪) এক মিনিটে আপনি আল্লাহর কিতাবের ছোট একটি আয়াত মুখস্থ করতে পারেন। (৫) এক মিনিটে আপনি নিম্নোক্ত দোয়াটি ২০ বার পড়তে পারেন। لَا إِلَهَ إِلا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ এর সওয়াব ইসমাঈল (আঃ) এর বংশের ৮ জন দাসকে আল্লাহর ওয়াস্তে মুক্ত করার সমান। (৬) এক মিনিটে আপনি (سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِه) ১০০ বার পড়তে  পারেন। যে ব্যক্তি একদিনে এই দোয়াটি ১০০ বার পড়ে তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়; যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমান হয় না কেন। (৭) এক মিনিটে আপনি (سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِهِ، ) ও (سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ) ৫০ বার পড়তে পারেন। এ দুটি এমন বাক্য যা পড়তে খুব সহজ; আমলের পাল্লাতে অনেক ভারী হবে; রহমানের নিকটে অতি প্রিয়; যেমনটি বর্ণনা করেছেন ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম। (৮) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সুব্‌হানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আক্‌বার পাঠ করা যা কিছুর উপর সূর্য উদিত হয়েছে সবকিছু থেকে আমার নিকট অধিক প্রিয়।”[হাদিসটি বর্ণনা করেছেন মুসলিম (২৬৯৫)]আপনি এক মিনিটে বাক্যগুলো ১৮ বারের বেশি পড়তে পারেন। এ বাক্যগুলো আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়। এগুলো সর্বোত্তম কথা এবং আমলের পাল্লাতে এগুলোর ওজন অনেক বেশি হবে। যেমনটি এ মর্মে বর্ণিত সহীহ হাদিসসমূহে এসেছে । (৯) এক মিনিটে আপনি (لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ) (অর্থ- কোন উপায়-সামর্থ্য নেই, কোন শক্তি নেই আল্লাহ ছাড়া) ৪০ বারের বেশি পড়তে পারেন। এ বাক্যটির সওয়াব জান্নাতের জন্য সঞ্চিত অমূল্য রত্ন; যেমনটি বর্ণিত হয়েছে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে। একই ভাবে এটি কষ্টসাধ্য দায়িত্ব বহন ও কঠিন কাজসমূহ আঞ্জাম দেয়ার ক্ষেত্রে এক মহৌষধ। (১০) এক মিনিটে আপনি (لاَ إِلَهَ إِلاَّ الله) (অর্থ- আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন উপাস্য নেই) প্রায় ৫০ বার পড়তে পারেন। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য ও তাওহীদের বাণী। এটি কালিমায়ে তাইয়্যেবা (উত্তম বাণী) ও সুদৃঢ় বাক্য। যে ব্যক্তির শেষ কথা হবে এই বাক্য তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। এছাড়াও এর ফজিলত ও মর্যাদার ব্যাপারে আরও অনেক বর্ণনা রয়েছে। (১১) এক মিনিটে আপনি (سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ عَدَدَ خَلْقِهِ، وَرِضَى نَفْسِهِ، وَزِنَةَ عَرْشِهِ، وَمِدَادَ كَلِمَاتِهِ) (আল্লাহর পবিত্রতা ও প্রশংসা তাঁর সৃষ্টিকুলের সংখ্যার সমান, তাঁর সন্তুষ্টির সমান, তাঁর আরশের ওজনের সমান, তাঁর বাক্যমালার কালির সমান) এ দোয়াটি ১৫ বারের বেশি পড়তে পারেন। সাধারণ তাসবীহ ও যিকিরের চেয়ে এ বাক্যগুলো পাঠ করার সওয়াব অনেকগুণ বেশি যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  হতে সহীহ হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে। (১২) এক মিনিটে আপনি আল্লাহর কাছে ১০০ বারের বেশি ইসতিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারেন তথা (أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ) পড়তে পারেন। এর ফজিলত আপনার অজানা নয়। এটি ক্ষমা প্রাপ্তি ও জান্নাতে প্রবেশের উপায়। এটি সুখময় জীবন, শক্তি বৃদ্ধি, বিপদ-আপদ রোধ, সকল কাজ সহজীকরণ, বৃষ্টি বর্ষণ, সম্পদ ও সন্তানের বৃদ্ধি ইত্যাদির মাধ্যম। (১৩) এক মিনিটে আপনি সংক্ষেপে কিছু কথা বলতে পারেন যা দ্বারা আল্লাহ হয়ত এমন কোন কল্যাণের পথ খুলে দিবেন যা আপনি ভাবতেও পারেননি। (১৪) এক মিনিটে আপনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর ৫০ বার দরূদ পাঠ করতে পারেন। শুধু পড়বেন “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম”। এর প্রতিদানে আল্লাহ আপনার উপর ৫০০ বার সালাত (রহমত) পাঠাবেন। কারণ একবার দরুদ পাঠ করলে আল্লাহ ১০ বার এর প্রতিদান দেন। (১৫) এক মিনিটে আপনার মন আল্লাহর কৃতজ্ঞতা, তাঁর ভালবাসা, তাঁর ভয়, তাঁর প্রতি আশা এবং তাঁর প্রেমে উদ্বেল হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে আপনি উবূদিয়্যাহ্‌ (আল্লাহর দাসত্ব) এর স্তরসমূহ অতিক্রম করতে পারেন; হতে পারে সে সময় আপনি হয়ত আপনার বিছানায় শুয়ে আছেন অথবা কোন পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছেন। (১৬) এক মিনিটে আপনি সহজবোধ্য উপকারী কোনো বইয়ের দুই পৃষ্ঠার বেশি পড়তে পারেন। (১৭) এক মিনিটের টেলিফোন যোগাযোগের মাধ্যমে আপনি ‘সিলাতুর রাহেম’ বা আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার আমল পালন করতে পারেন। (১৮) এক মিনিটে আপনি দুই হাত তুলে ব্যাপক অর্থবোধক দোয়াগুলো হতে পছন্দমত যে কোন দোয়া করতে পারেন। (১৯) এক মিনিটে আপনি কয়েকজন ব্যক্তিকে সালাম দিতে পারেন ও তাদের সাথে মুসাফাহা করতে পারেন। (২০) এক মিনিটে আপনি কোন ব্যক্তিকে একটি মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে পারেন। (২১) এক মিনিটে আপনি একটি ভাল কাজের আদেশ করতে পারেন। (২২) এক মিনিটে আপনি একজন ভাইকে নসিহত করতে পারেন। (২৩) এক মিনিটে আপনি একজন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষকে সান্ত্বনা দিতে পারেন। (২৪) এক মিনিটে আপনি পথ থেকে ক্ষতিকর কোন বস্তু অপসারণ করতে পারেন। (২৫) এই এক মিনিটের সদ্ব্যবহার অবহেলায় কাটানো বাকি সময়গুলোর সদ্ব্যবহার করার অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করতে পারে। ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যখন ঘুমন্ত লোকেরা ঘুমিয়ে থাকে তখন আমি আমার চোখের অশ্রু ফেলি এবং শ্রেষ্ঠ কবিতার একটি চরণ বারবার আওড়াতে থাকি। কোন জ্ঞান অর্জন ছাড়া রাতগুলো কেটে যাবে এবং আমার জীবন থেকে হিসেব করা হবে- এটি কি সময়ের অপব্যয় নয়? ” পরিশেষে জানুন আপনার ইখলাস (একনিষ্ঠতা) ও আল্লাহর নজরদারির অনুভূতির ভিত্তিতে আপনার প্রতিদান বাড়বে, আপনার নেকীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। জেনে রাখুন, এই আমলগুলোর বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই আপনাকে তেমন কিছু করতে হবে না। এগুলোর জন্য আপনার পবিত্রতার প্রয়োজন নেই, ক্লান্তি বা কায়িক শ্রম নেই। বরং আপনি এ আমলগুলো করতে পারেন যখন আপনি পায়ে হেঁটে চলছেন অথবা গাড়িতে চড়ে কোথাও যাচ্ছেন অথবা শুয়ে আছেন অথবা দাঁড়িয়ে আছেন অথবা বসে আছেন অথবা কারও জন্য অপেক্ষা করছেন। একইভাবে এ আমলগুলো সুখী হওয়ার উপকরণ, আত্মপ্রশান্তির মাধ্যম, চিন্তা ও দুঃশ্চিন্তা দূর করার উপায়। আল্লাহ আমাদেরকে ও আপনাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করার তাওফিক দিন। আমাদের নবীর প্রতি আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।


আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় আমল –

 সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। যিনি যাবতীয় প্রশংসায় প্রশংসিত এবং সব ধরনের মহত্তর গুণে গুণান্বিত। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর যিনি তার বান্দাদের প্রিয় বস্তুর দিক রাস্তা দেখান এবং প্রিয় বস্তু-গুলোকে বান্দার জন্য সহজ করেন। আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক বিশেষভাবে বাছাইকৃত রাসূলের উপর যিনি আমানতদার। আর আমার প্রভুর সালাত ও সালাম কিয়ামত অবধি সব সময় বর্ষিত হোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর। আমীন। অতঃপর, যে সব আমল আল্লাহ তাঁর বান্দাদের থেকে অধিক পছন্দ করেন এবং অধিক খুশি হন, আল্লাহর গোলামীকে পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করতে একজন বান্দা সে আমলগুলি করতে, যে চেষ্টা ও পরিশ্রম করে তারই ভিত্তিতে আল্লাহর প্রতি বান্দার মহব্বত পূর্ণতা লাভ করে এবং বান্দার প্রতি তার রবের মহব্বত বাস্তব রূপ নেয়। বিষয়টি যেহেতু এমনই, তাহলে একজন বান্দাকে অবশ্যই আল্লাহ্ তা‘আলা যে সব আমল পছন্দ করেন এবং যে সব আমলে তিনি অধিক খুশি হন, তা জানতে হবে। তারপর তাকে অবশ্যই সে আমলগুলো জানার পর তদনুযায়ী আমল করার চেষ্টা করতে হবে ও সেটা বাস্তবায়ণ ও সার্বক্ষনিক সেটার অনুগামী হওয়ার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আর আল্লাহর দরবারে সেসব আমল করার তাওফিক চাইতে হবে। যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দরবারে এ বলে প্রার্থনা করতেন- «اللهم إني أسألك حبك وحب من يحبك، وحب العمل الذي يبلغني حبك، اللهم اجعل حبك أحب إلي من نفسي وأهلي ومن الماء البارد». “হে আল্লাহ, আমি তোমার নিকট তোমার মহব্বত কামনা করি, তোমাকে যে মহব্বত করে, তার মহব্বত কামনা করি এবং যে আমল তোমার মহব্বত পর্যন্ত পৌছায়, সে আমল কামনা করি। হে আল্লাহ! তোমার মহব্বতকে আমার নিকট আমার জান-মাল, পরিবার-পরিজন এবং ঠাণ্ডা পানি হতে অধিক প্রিয় করে দাও”  [1] আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অপার অনুগ্রহ ও হিকমত হল, যে অভীষ্ট লক্ষ্যকে তিনি বান্দার জন্য পছন্দ করেন এবং মহব্বত করেন, তা হাসিল করার জন্যে আল্লাহ্ তা‘আলা এমন একটি মাধ্যম নির্ধারণ করেন, যার দ্বারা বান্দা তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারে। এরই ধারাবাহিকতায় আল্লাহ্ তা‘আলা বান্দার সবচেয়ে মহান উদ্দেশ্য ও সর্বোত্তম লক্ষ্য- আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও তার সন্তুষ্টি অর্জন তা- হাসিলের জন্য কিছু মাধ্যম ও উপকরণ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, আর তা হচ্ছে, আল্লাহর উপর ঈমান এবং সৎ আমল করা; যা আল্লাহ তার বান্দাদের জন্য শরী‘আত হিসেবে প্রদান করেছেন এবং তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন। এমনকি ইসলাম ইসলাম, তার যাবতীয় আকীদা ও বিধান সবই আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্যকে বাস্তবায়িত করে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱتَّقُواْ ٱللَّهَ وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَ وَجَٰهِدُواْ فِي سَبِيلِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تُفۡلِحُونَ ٣٥﴾ [المائ‍دة: ٣٥]  হে মুমিনগণ, আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং তার নৈকট্যের অনসন্ধান কর, আর তার রাস্তায় জিহাদ কর, যাতে তোমরা সফল হও। [সূরা মায়েদা, আয়াত: ৩৫]   আল্লাহর বাণী:  وَٱبۡتَغُوٓاْ إِلَيۡهِ ٱلۡوَسِيلَةَএর অর্থ হল, তোমরা নেক আমল তালাশ কর, যাতে তা দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পার। আর তা হচ্ছে, যাবতীয় নেক আমলসমূহ, যা দ্বারা একজন বান্দা তার রবের নৈকট্য লাভ করতে পারে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি, মহব্বত ও কাছে থাকার সৌভাগ্য লাভে ধন্য হয়। এখানে একটি কথা মনে রাখতে হবে, ইসলামী শরিয়তে যত প্রকার নেক আমলের কথা বলা হয়েছে, সব নেক আমলের ফযিলত ও মর্যাদা এক নয় এবং সমান নয়। যদিও সমস্ত নেক আমলের ক্ষেত্রে মূলনীতি হল, আল্লাহ তা পছন্দ করেন এবং তাতে আল্লাহ সন্তুষ্ট ও খুশি হন, কিন্তু আল্লাহর নিকট প্রিয় ও পছন্দনীয় হওয়ার বিবেচনায় আমলসমূহের মধ্যে পার্থক্য আছে এবং আমলসমূহের বিভিন্ন স্তর আছে। একটি আমল অপর আমলের তুলনায় অধিক গুরুত্বপূর্ণ হওয়া বা আল্লাহর নিকট অধিক পছন্দনীয় হওয়া স্বাভাবিক। এ কারণে দেখা যায়, কোন আমল অধিক উত্তম আবার কোন আমল কম উত্তম আবার কোন আমল শুধু উত্তম। আমলের স্তর ও মর্যাদা অসংখ্য ও অগণিত। আর মানুষও এ সব আমলে প্রবিষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের হয়। প্রত্যেকেই প্রথমত আল্লাহ তা‘আলার কর্তৃক তার প্রতি প্রদত্ত তাওফীক অনুসারে, তারপর আল্লাহর নাম, সিফাত ও কর্মসমূহ সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে তারতম্যের ভিত্তিতে, তারপর শরী‘আত অনুমোদিত নেক আমলসমূহের ফযীলত, সেগুলোর বৈধ সময়, ও অবৈধ সময় সম্পর্কে জানার পার্থক্যের ভিত্তিতে তা নির্ধারিত হয়ে থাকে। কারণ, একই নেক আমল শুধুমাত্র আমল হিসেবে কখনও কখনও আল্লাহর নিকট শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করে থাকে; তখন আল্লাহর নিকট সেটি অন্য আমলের তুলনায় বড় হিসেবে গণ্য হয়, আর সে জন্য আল্লাহ সেটাকে অধিক ভালোবাসেন। যেমন, ঈমান, সালাত ইত্যাদি নেক আমলসমূহ। অনুরূপভাবে সময়ের কারণেও অনেক সময় নেক আমলসমূহের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। ফলে তুলনামূলক কম ফজিলতপূর্ণ আমল তার বৈধ সময়ে আদায় করাতে আমলটির সাওয়াব অধিক ও আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় হয়ে থাকে, ঐ সময়ে তুলনামূলক অধিক ফজিলত-পূর্ণ আমলসমূহ আদায় করার তুলনায়। যেমন, আযানের সময় কুরআন তিলাওয়াত করার তুলনায় মুয়াজ্জিনের সাথে আযানের শব্দগুলো উচ্চারণ করা অধিক উত্তম। অথচ সাধারণত কুরআন তিলাওয়াত করা সামগ্রিক দিক বিবেচনায় সর্বোত্তম যিকির। আবার অনেক সময় আল্লাহ্ তা‘আলা কোনো কোনো আমলকে অন্যান্য আমলের তুলনায় অধিক মহব্বত করেন। কারণ, তার ফায়দা ও প্রভাব অনেক বেশি হয়ে থাকে এবং তা জনকল্যাণমুখী হয়ে থাকে। যেমন, আত্মীয়তা সম্পর্ক বজায় রাখা, আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়া, দান খায়রাত করা ইত্যাদি। এ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করে তুলে ধরেন, মহামান্য দুই ইমাম; শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবন তাইমিয়্যাহ রহ. এবং তার ছাত্র আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ.। তারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেন: শাইখুল ইসলাম ইমাম ইব্‌ন তাইমিয়্যাহ র. মাজমু‘ ফাতওয়ায় [২২/৩০৮] উল্লেখ করেন, “অনেক আলেম বলেন, হাদিস লিপিবদ্ধ করা, নফল সালাত হতে উত্তম। আবার কোন কোন শেখ বলেন, রাতের অন্ধকারে যখন কেউ দেখে না, তখন দুই রাকাত সালাত আদায় করা, একশ হাদিস লিপিবদ্ধ করা হতে উত্তম। অপর একজন ইমাম বলেন, বরং উত্তম হল, এ কাজ করা ও কাজ করা। মানুষের অবস্থার ভিন্নতার কারণে আমলসমূহের উত্তম হওয়ার বিষয়টিও বিভিন্ন হয়ে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, একই আমল কখনো সেটি উত্তম হয়, আবার কখনো তা উত্তম হয় না অথবা তা নিষিদ্ধ হয়ে থাকে। যেমন, সালাত: সালাত আদায় করা কুরআন তিলাওয়াত হতে উত্তম। আর কুরআন তিলাওয়াত যিকির করা হতে উত্তম, আর যিকির করা, দু‘আ করা হতে উত্তম। তারপর নিষিদ্ধ সময়ে সালাত আদায় করা, যেমন ফজরের সালাতের পর, আসরের সালাতের পর এবং জুমার খুতবার সময় সালাত আদায় করা হারাম। তখন কুরআন তিলাওয়াত করা, অথবা যিকির করা অথবা দু’আ করা অথবা (খুতবা) মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করা সালাতের থেকে উত্তম”। আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. ‘মাদারে-জুস সালেকীন’ গ্রন্থে ইবাদতে এই দূরবর্তী ফিকহ সম্পর্কে যা উল্লেখ করেছেন, এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে আমরা তা বর্ণনা করছি। তিনি বলেন, ‘মনে রাখবে, সর্বাবস্থায় এবং সব জায়গায় উত্তম হল, ঐ অবস্থা ও সময়ের মধ্যে কোন কাজটি করলে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও মহব্বত অর্জন করা যায়, তার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখা এবং ঐ সময়ের দাবি ও চাহিদা অনুযায়ী সে আমল করা যে আমলে আল্লাহ্ তা‘আলা রাজি-খুশি ও সন্তুষ্ট হন। আর এরাই হল, প্রকৃত ইবাদতকারী। এর পূর্বে যাদের কথা উল্লেখ করা হয়, তারা হলেন, বিশেষ প্রকৃতির ইবাদতকারী। তাদের মধ্যে কোনো ব্যক্তি যখন কোনো ধরনের ইবাদত, যার সাথে সে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছে, যখন সে তা থেকে নিজেকে পৃথক করে তখন সে মনে করতে থাকে যে, তার ইবাদতে ঘাটতে হয়েছে ও সে ইবাদত করা ছেড়ে দিয়েছে। এতে করে এ লোকটির আল্লাহর ইবাদত একপেশে পদ্ধতিতে হয়। পক্ষান্তরে যে প্রকৃত ইবাদতকারী তার ইবাদত কোনো কিছুকে অন্য কিছুর উপর প্রাধান্য দেওয়ার মত সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য থাকে না। বরং তার উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুসন্ধান করা; তা যেখানেই পাওয়া যাক না কেন। ফলে তার ইবাদতের ভিত্তি হল, সব সময় দাসত্বের বিভিন্ন স্তরে স্থানান্তরিত হতে থাকা। যখনই তার জন্য কোনো একটি ইবাদতের স্থান উদয় হয়, তখন সে তার পিছনে ছুটতে থাকবে এবং তা নিয়েই ব্যস্ত থাকবে, যতক্ষণ না তার জন্য অপর একটি ইবাদতের দ্বার উন্মুক্ত হয়। এ হল, তার চলার পথের পদ্ধতি; এ ভাবেই শেষ হতে থাকে তার গতি। তুমি যখন আলেমদের দেখবে তখন, তাকেও আলেমদের সাথে দেখতে পাবে। আবার যখন তুমি আবেদদের দেখবে, তাকেও তাদের সাথে দেখবে। অনুরূপভাবে যখন তুমি মুজাহিদদের দেখবে, তাকেও তাদের সাথে দেখবে। আর যখন তুমি যিকিরকারীদের দেখবে, তখন তুমি তাকেও যিকিরকারীদের সাথে দেখবে। আর যখন তুমি মুহসিনদের দেখবে, তখন তুমি তাকেও তাদের সাথে দেখবে। এরা হল, প্রকৃত ইবাদতকারী যারা কোনো নির্ধারিত ধরা-বাঁধা নিয়ম নয়, আর যারা কোনো শর্তের বন্ধনেও আবদ্ধ নয়।’ আল্লাহর নিকট প্রিয় আমল কোনটি তার আলোচনা শুরু করার পূর্বে আমাদের জন্য জরুরি হল, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনা করা, যার উপর নেক আমল কবুল হওয়া না হওয়া, সাওয়াব লাভ করা না করা এবং আখিরাতের আমলের দ্বারা উপকার লাভ করা না করা ইত্যাদি জরুরি বিষয়সমূহ নির্ভর করে। আর তা হল:- এক – সমস্ত আমল কেবল আল্লাহর জন্য করা। অর্থাৎ আমল করা দ্বারা উদ্দেশ্য হবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাকে রাজি-খুশি করা, আল্লাহ নিকট বান্দার জন্য যে সব নেয়ামত ও বিনিময় রয়েছে, তার আশা করা। আর অন্তরকে মানুষের দৃষ্টি হতে সম্পূর্ণ খালি করা এবং দুনিয়াতে মানুষ থেকে কি লাভ করবে তার প্রতি কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ না করা। আর অন্তর দ্রুততম যে ফলের আশা করতে থাকে তা থেকেও মুক্ত করা। দুই – ইবাদতে নিয়তের পার্থক্য করা। অনেকে মনে করে, এ শর্ত এবং ইখলাস একই কথা। কিন্তু বাস্তবতা হল, দুটি এক নয়, ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। ইবনুল কাইয়্যেম রহ. বলেন, ‘ইবাদতে নিয়ত করা ইখলাস থেকে আরও একটি বর্ধিত ও অতিরিক্ত বিষয়। কারণ, ইবাদতে ইখলাস হল, অন্যকে বাদ দিয়ে কেবল মা‘বুদেরই ইবাদত করা। আর ইবাদতের নিয়তের দুটি স্তর আছে: ১. ইবাদতকে স্বাভাবিক কাজ-কর্ম থেকে পার্থক্য করা। ২. এক ইবাদতকে অপর ইবাদত থেকে পার্থক্য করা। তিন – ইবাদতে যত্নবান হওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা যেভাবে ইবাদত করাকে পছন্দ করেন এবং বান্দার প্রতি সন্তুষ্ট হন, সেভাবে ইবাদতকে বাস্তবায়ন ও আদায় করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা। এ শর্তের দাবি হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত ও তার সাহাবীগণ যার উপর প্রতিষ্ঠিত তার অনুকরণ-অনুসরণ করা। চার – নেক আমলসমূহের সাওয়াবের হেফাজত ও সংরক্ষণ করা। আর তা হল, আমলকে নষ্ট বা বরবাদ করার কারণ হয়, এমন সব বিষয় হতে বিরত ও সতর্ক থাকা। যেমন, রিয়া বা লোক দেখানোর জন্য আমল করা, মানুষকে খোঁটা দেয়া ও কষ্ট দেয়া, আত্মতৃপ্তিতে ভোগা, গণক ও জাদুকরদের নিকট যাওয়া, ইত্যাদি কর্মকাণ্ড। অনুরূপভাবে একজন আমলকারীকে অবশ্যই এমন সব কিছু থেকে বিরত থাকবে, যেগুলো নিজের আমলের সাওয়াব অন্যের নিকট চলে যাওয়ার কারণ হয়। এটি অনেক সময় দুনিয়াতে কারো উপর জুলুম করার কারণে হয়ে থাকে অথবা কারো হক নষ্ট করা বা কোনো ধরনের কষ্ট দেয়ার কারণে হয়ে থাকে। যেমন, গীবত করা, গালি দেয়া, চুরি করা, মুমিন ভাইকে পরিত্যাগ করা- যে পরিত্যাগ শরী‘আতে নিষিদ্ধ, ইত্যাদি। আমরা এখন আল্লাহর নিকট প্রিয় আমলসমূহের বর্ণনা করব। সে গুলো হল নিম্নরূপ: এক. আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা: যেমন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  «أحبُّ الأعمال إلى الله إيمانٌ بالله» “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা” [2] আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ: তাওহীদের প্রতি ঈমান আনা। অর্থাৎ যাবতীয় ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্য করা। আর তা সংঘটিত হবে, অন্তরের আমলসমূহ কেবল আল্লাহর জন্য করা। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল অন্তরের আমলসমূহের অনুসারী। কারণ, ঈমান অনেকগুলো শাখা প্রশাখা ও অসংখ্য আমলের নাম। তার মধ্যে কিছু আছে অন্তরের আমল, আবার কিছু আছে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল। আর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি হল, অন্তরের আমল। কারণ, অন্তরের আমল সব সময় এবং সর্বাবস্থায় প্রতিটি প্রাপ্ত বয়স্ক নারী-পুরুষের জন্য আবশ্যকীয়। যখন কোনো বান্দা থেকে অন্তরের আমল দূর হয়ে যায়, তখন তার ঈমানও দূর হয়ে যায়। যেমনিভাবে ঈমানের বাহ্যিক আমলসমূহ অর্থাৎ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল, তা বিশুদ্ধ হওয়া ও গ্রহণযোগ্য হওয়া নির্ভর করে অন্তরের ঈমানের উপর; যা মূল বলে স্বীকৃত। এ কারণেই আল্লামা ইবনুল কাইয়্যেম রহ. ‘বাদায়ে‘উল ফাওয়ায়েদ’ কিতাবে লিখেন: ‘সুতরাং অন্তরের বিধান কি তা জানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিধান জানা হতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটিই হচ্ছে আসল, আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বিধি-বিধান এর শাখা-প্রশাখা’।  একজন মুমিনের নিকট দ্বীনের আসল মূলকথা ও মূল ভিত্তি হচ্ছে যে সে তার অন্তরের আমল থেকে শুরু করবে, যার সূচনা হবে ইলমের সৌন্দর্য সম্পর্কে জানা ও তার রবের পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন সংবাদের উপর, যা থেকে অন্তরের সকল আমলের ফলাফল লাভ হয়। যেমন, আল্লাহর প্রতি দৃঢ়-বিশ্বাস, দ্বীন বা আনুগত্যকে একমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করা, আল্লাহর জন্য মহব্বত করা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, আল্লাহর শর‘ঈ ও কাদরী ফায়সালার উপর ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহকে ভয় করা, আল্লাহর নিকট আশা করা, আল্লাহর জন্য বন্ধুত্ব ও দুশমনি করা, আল্লাহর জন্য বিনয়ী হওয়া, আল্লাহর জন্য অপমানিত ও লাঞ্ছিত হওয়া, আল্লাহর ফায়সালায় প্রশান্তি লাভ করা ইত্যাদি বহু আমলকে আবশ্যক করে। ঈমানের প্রকাশ্য ও গোপন আমলসমূহ পালন করার পদ্ধতি ও পরিমানের দিক বিবেচনায় মানুষেরও মর্যাদা ও শ্রেণীর বিভিন্নতা হয়ে থাকে; [সবাই এক পর্যায়ের বা এক স্তরের হয় না।] তাদের মধ্যে কতক মানুষ আছে, যারা তাদের নিজেদের উপর জুলুমকারী। আবার কতক আছে, মধ্যপন্থী, আবার কতক আছে, যারা ভালো কাজে অগ্রসর। এ তিনটি স্তরের মানুষের মধ্যে প্রতি স্তরের মানুষের আরও অসংখ্য শ্রেণী বিন্যাস আছে, যা আয়ত্ত করা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আল্লামা ইবনে রজব রহ.  «ألا وإن في الجسد مضغة .. الحديثَ» “মনে রাখবে দেহের মধ্যে একটি গোস্তের টুকরা আছে” এ হাদিসের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘এখানে এ কথার প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে যে, বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সম্পাদিত যাবতীয় কর্মকাণ্ড সঠিক হওয়া, হারাম থেকে বিরত থাকা এবং সন্দেহযুক্ত বিষয়সমূহ হতে বেঁচে থাকা, ইত্যাদি সবই বান্দার অন্তরের কর্মকাণ্ডের পরিশুদ্ধতা অনুযায়ীই হয়ে থাকে। যখন অন্তর হবে নিরাপদ, তার মধ্যে আল্লাহর মহব্বত এবং আল্লাহ্ তা‘আলা যা মহব্বত করে, তার প্রতি মহব্বত করা ছাড়া আর কোন কিছুর মহব্বত তার অন্তরে স্থান পাবে না বা থাকবে না এবং একমাত্র আল্লাহর ভয় এবং আল্লাহ যা অপছন্দ করে তাতে পতিত হওয়ার ভয় ছাড়া, আর কোন ভয় তার অন্তরে থাকবে না, তখন তার সমগ্র অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল ঠিক হয়ে যাবে। তখন বান্দার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা কোনো নিষিদ্ধ কাজ সংঘটিত হবে না এবং সন্দেহ, সংশয়যুক্ত বিষয়সমূহ থেকে হারামে পতিত হওয়ার আশঙ্কায় বেঁচে থাকবে। ’ এখানে একটি প্রশ্ন যুক্তিসংগত, তা হচ্ছে, ঈমান কেন আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল? উত্তর: কারণ, ঈমানের বাস্তবায়নের মাধ্যমে একজন বান্দা সমস্ত মাখলুকাত থেকে মুখ ফিরিয়ে একমাত্র আল্লাহর মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। বান্দার অন্তর আল্লাহ ছাড়া সব কিছুকে বাদ দিয়ে একমাত্র এক আল্লাহর দিকে ধাবিত হয়। আর এটিই হল, ইবাদতের হাকীকত ও মর্মার্থ; যার জন্য আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষ ও জ্বীন সৃষ্টি করেছেন, কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন, অসংখ্য নবী ও রাসূলকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন এবং সাওয়াব ও শাস্তি নির্ধারণ করেছেন। শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহ. মাজমু‘ ফাতাওয়ায় বলেন, ‘‘মানুষের অন্তর কখনোই সমস্ত মাখলুকাত হতে অমুখাপেক্ষী হবে না, কিন্তু তখন হবে, যখন আল্লাহই হবে তার এমন অভিভাবক যার ইবাদত ছাড়া আর কারো ইবাদত সে করে না, তার কাছে ছাড়া আর কারো কাছে সে সাহায্য চায় না, তার উপর ভরসা করা ছাড়া আর কারো উপর সে ভরসা করে না, আর একমাত্র আল্লাহ যে সব কিছুকে পছন্দ করেন তা ছাড়া অন্য কোন কিছুতে সে খুশি হয় না এবং যে সব কিছুতে আল্লাহ সন্তুষ্ট হন, তা ছাড়া অন্য কোনো কিছুতে স সন্তুষ্ট হয় না। আর আল্লাহ যে সবকে অপছন্দ ও ঘৃণা করেন, সে সব কিছুকে সে অপছন্দ ও ঘৃণা করে। আল্লাহ যাদের সাথে দুশমনি রাখেন তাদের ছাড়া আর কারো সাথে দুশমনি রাখে না। আল্লাহ যাদের সাথে বন্ধুত্ব করেন, তাদের সাথেই বন্ধুত্ব করে। তাদের ছাড়া আর কারো সাথে বন্ধুত্ব করে না। কাউকে বাধা দিতে বা বারণ করতে হলে, আল্লাহর জন্যই বাধা দেয় ও বারণ করে। সুতরাং যখনই একজন বান্দার দ্বীনে আল্লাহর জন্য শক্তিশালী ইখলাস থাকবে, তখনই তার দাসত্ব পরিপূর্ণতা লাভ করবে এবং সৃষ্টিকুল থেকে সে অমুখাপেক্ষী হবে। আর আল্লাহর জন্য দাসত্ব পরিপূর্ণতা লাভ করলেই তা বান্দাকে শিরক ও কুফর থেকে বাঁচাতে পারবে।” এ কারণেই ঈমান, সর্বোত্তম ও সর্বাধিক প্রিয় আমল।  আর এ ছাড়া যত আমল আছে, সব আমল আল্লাহর নিকট ফজিলতের দিক দিয়ে ঈমানের চেয়ে নিম্নপর্যায়ের। দ্বিতীয়: আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল, আত্মীয়তা সম্পর্ক অটুট রাখা: প্রমাণ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أحبُّ الأعمال إلى الله إيمانٌ بالله، ثم صِلَةُ الرحم» “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা তারপর আত্মীয় সম্পর্ক বজায় রাখা” [3] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «إنَّ الله خلق الخَلْقَ حتى إذا فرَغَ من خَلْقه قالتِ الرَّحِمُ: هذا مقامُ العائذ بك من القطيعة، قال: نعم؛ أمَا تَرْضَيْنَ أن أصلَ من وصلَكِ، وأقطعَ من قطعَكِ؟! قالَتْ: بلى يا رب، قال: فهو لَكِ، قال رسولُ الله صلى الله عليه و سلم: فاقرؤوا إن شئتم: ﴿ فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَعَنَهُمُ ٱللَّهُ فَأَصَمَّهُمۡ وَأَعۡمَىٰٓ أَبۡصَٰرَهُمۡ ٢٣ ﴾ [محمد: ٢٢،  ٢٣] » [رواه مسلم]. “আল্লাহ তা‘আলা মাখলুককে সৃষ্টি করেন। মাখলুককে সৃষ্টি করার কাজ সম্পন্ন করার পর আত্মীয়তার-সম্পর্ক বলল, এ (আল্লাহর কাছে) হল, আত্মীয়তা-সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে আশ্রয় প্রার্থনাকারীর স্থান। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তুমি কি খুশি হবে না, আমি সম্পর্ক রাখি যে তোমার সাথে সম্পর্ক রাখে এবং আমি সম্পর্ক কর্তন করি যে তোমার সাথে সম্পর্ক কর্তন করে। সে বলল, হ্যাঁ হে রব! তিনি বললেন, তোমাকে তা দেয়া হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যদি চাও তোমরা এ আয়াত তিলাওয়াত কর- ﴿فَهَلۡ عَسَيۡتُمۡ إِن تَوَلَّيۡتُمۡ أَن تُفۡسِدُواْ فِي ٱلۡأَرۡضِ وَتُقَطِّعُوٓاْ أَرۡحَامَكُمۡ ٢٢ أُوْلَٰٓئِكَ ٱلَّذِينَ لَعَنَهُمُ ٱللَّهُ فَأَصَمَّهُمۡ وَأَعۡمَىٰٓ أَبۡصَٰرَهُمۡ ٢٣﴾ [محمد: ٢٢،  ٢٣]   [رواه مسلم]. “তবে কি তোমরা প্রত্যাশা করছ যে, যদি তোমরা শাসন কর্তৃত্ব পাও, তবে তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং তোমাদের আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে? এরাই যাদেরকে আল্লাহ লা‘নত করেন, তাদেরকে বধির করেন এবং তাদের দৃষ্টি সমূহকে অন্ধ করেন” [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২২, ২৩] [4] অপর একটি হাদিসে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «لعن الله قاطع الرحم».  “আল্লাহ আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট কারীকে অভিশাপ করেন” [5] আলেমগণ বলেন, ‘আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষার মূল কথা হচ্ছে, মেহেরবানী করা ও অনুগ্রহ করা’। আল্লামা কুরতবী রহ. বলেন, ‘রাহেম বা সম্পর্ক বজায় রাখা’ এর-সম্পর্ক দু ধরনের হয়ে থাকে। এক-সাধারণ সম্পর্ক, দুই-বিশেষ সম্পর্ক”। সাধারণ সম্পর্ক: ব্যাপক ও বিস্তৃত: আর এটি হল, দ্বীনি সম্পর্ক। একজন মানুষের সাথে ঈমানী বন্ধনের কারণে, তার সাথে সু-সম্পর্ক রাখা, ঈমানদারদের মহব্বত করা, তাদের সহযোগিতা করা, তাদের কল্যাণে কাজ করা, তাদের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজকে তাদের থেকে প্রতিহত করা, তাদের জন্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা, তাদের লেন-দেন ও যাবতীয় ব্যবহারিক কর্মকাণ্ডে বৈষম্য দূর করা এবং তাদের ন্যায় সংগত অধিকার প্রতিষ্ঠা ও তাদের হকগুলো আদায় করা। যেমন, অসুস্থদের দেখতে যাওয়া, তাদের হক সমূহের ব্যাপারে সচেতন থাকা, তাদের গোসল দেওয়া, তাদের উপর জানাযার সালাত আদায় করা, দাফন-কাফন ইত্যাদিতে শরিক হওয়া। বিশেষ সম্পর্ক: আর তা হল, মাতা-পিতা উভয় দিক থেকে নিকটাত্মীয়তার-সম্পর্ক রক্ষা করা। সুতরাং তাদের হক্কসমূহ, তাদের বিশেষ অধিকারসমূহ ও অতিরিক্ত দায়িত্ব আদায় করা সন্তানের উপর ওয়াজিব। যেমন, মাতা-পিতার খরচ বহন করা, তাদের খোঁজ-খবর নেয়া, প্রয়োজনের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো থেকে বেখবর না থাকা ইত্যাদি। আর যখন বহু আত্মীয়ের অধিকার একত্রিত হয়, তখন যেটি নিকট হওয়ার ভিত্তিতে অগ্রাধিকার পাবে সেটি, তারপর যেটি তুলনামূলক কাছে সেটি প্রদান করবে। আল্লামা ইবনু আবি জামরাহ্‌ বলেন, “আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা অনেক সময় মালামাল বা ধন-সম্পদ দ্বারা হয়, প্রয়োজনের সময় সাহায্য করা দ্বারা হয়, ক্ষতিকে প্রতিহত করা দ্বারা হয়, মানুষের সাথে হাসি-খুশি ব্যবহার দ্বারা হয়, দো‘আ করা দ্বারা হয়, সাধ্য অনুযায়ী কারও কাছে কল্যাণকর কিছু পৌঁছানো দ্বারা হয়, সাধ্য ও সামর্থ্য অনুযায়ী মানুষকে ক্ষতি হতে বাঁচানো দ্বারা এবং তাদের উপকার করা দ্বারা হয়। আর আত্মীয়তার-সম্পর্ক বজায় রাখা তখন কর্তব্য হয়, যখন আত্মীয়গণ ঈমানদার হয়ে থাকে। আর যদি ঈমানদার না হয়ে কাফের অথবা ফাজের হয়, তখন আল্লাহ্র সন্তুষ্টির তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করাই হল সম্পর্ক বজায় রাখা। তবে শর্ত হল, তাদের নসিহত করতে হবে ও জানাতে হবে, তারা যদি আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনে এবং এ অবস্থার উপর অটল থাকে, তাহলে তারা সত্য থেকে অনেক দূরে সরে যাবে এবং তাদের  পিছনে পড়ে থাকতে হবে। তবে তাদের অনুপস্থিতিতে তারা যাতে, ঈমান গ্রহণ করে তার জন্য দোয়া করা দ্বারা তাদের সাথে সু-সম্পর্ক বজায় রাখা যায়”। তিন: আল্লাহর নিকট প্রিয় আমল হচ্ছে, সৎ কাজের আদেশ দেয়া ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা: প্রমাণ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أحبُّ الأعمال إلى الله الإيمانُ بالله، ثم صلةُ الرحم، ثم الأمرُ بالمعروف والنهيُ عن المنكر». “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, তারপর আত্মীয়-সম্পর্ক বজায় রাখা, তারপর ভালো কাজের আদেশ দেয়া এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা” [6] মা‘রুফ: সমস্ত ভালো কাজ ও ইবাদতকে মারুফ বলা হয়ে থাকে। ভালো কাজকে মারূফ (জানা বিষয়) এ জন্য বলা হয়, কারণ, একজন জ্ঞানী লোক বা সঠিক প্রকৃতির অধিকারী লোক বলতেই এটি জানে। আর সর্বপ্রথম ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মারূফ হল, একমাত্র আল্লাহ যার কোনো শরিক নাই তাঁর ইবাদত করা, ইবাদতকে শুধু তাঁর জন্যই একনিষ্ঠ করা এবং  ইবাদতে তাঁর সাথে কাউকে শরিক না করা। তারপর যত ইবাদত বন্দেগী আছে যেমন-ফরয, ওয়াজিব, নফল ইত্যাদি সবই সৎ কাজের অন্তর্ভুক্ত। মুনকার [অগ্রহণযোগ্য কাজ]: যে সব কাজ থেকে আল্লাহ ও তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন, সবই হল, মুনকার। সুতরাং সব ধরনের গুনাহ, তা কবীরা হোক বা সগীরা সবই মুনকার। কারণ, বিশুদ্ধ বিবেক ও সঠিক প্রকৃতি এগুলোকে অগ্রহণযোগ্য বিবেচনা করে। আর সবচেয়ে বড় মুনকার বা অন্যায় হল, আল্লাহর সাথে শরীক করা। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করা মুমিন ও মুনাফেকদের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে দেয়, এটি মুমিনের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করার তিনটি স্তর আছে, যেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদিসে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, «مَنْ رأى منكم منكرًا فليغيِّره بيده، فإنْ لم يستطعْ فبلسانه، فإنْ لم يستطعْ فبقلبه؛ وذلك أضعف الإيمان» [أخرجه مسلم]. “তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কোন অন্যায় সংঘটিত হতে দেখে, তাকে হাত দ্বারা প্রতিহত করবে, যদি তা করা সম্ভব না হয়, মুখের দ্বারা প্রতিহত করবে, আর তাও যদি সম্ভব না হয়, তা হলে অন্তর দ্বারা ঘৃণা করবে। এটি হল, ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর” [7] অনুরূপভাবে তিনটি গুণ আছে, একজন ভালো কাজের আদেশকারী ও অসৎ কাজের নিষেধকারীর মধ্যে এ তিনটি গুণ থাকা অতীব জরুরি। ১- ইলম: যে ভালো কাজটির আদেশ দেবে সে সম্পর্কে তাকে অবশ্যই জানতে হবে এবং যে খারাপ কাজ হতে মানুষকে নিষেধ করবে, তার সম্পর্কেও তার সম্যক জ্ঞান থাকতে হবে। ২- কোমলতা: যে কাজের আদেশ দেবে এবং যে কাজ হতে মানুষকে নিষেধ করবে, সে বিষয়ে তাকে অবশ্যই কোমল হতে হবে। ৩- ধৈর্য: জুলুম নির্যাতনের উপর ধৈর্যশীল হতে হবে। যেমন,  লোকমান হাকিম তার ছেলেকে যে অসিয়ত করেন আল্লাহ্ তা‘আলা কুরআনে তার বর্ণনা দেন, যাতে মানুষ তার অনুকরণ করে এবং তা তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿يَٰبُنَيَّ أَقِمِ ٱلصَّلَوٰةَ وَأۡمُرۡ بِٱلۡمَعۡرُوفِ وَٱنۡهَ عَنِ ٱلۡمُنكَرِ وَٱصۡبِرۡ عَلَىٰ مَآ أَصَابَكَۖ إِنَّ ذَٰلِكَ مِنۡ عَزۡمِ ٱلۡأُمُورِ ١٧﴾ [لقمان: ١٧]  “হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎকাজে নিষেধ কর এবং তোমার উপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এ গুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ”। সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করার পূর্বে ইলম থাকতে হবে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করার সময় কোমল হতে হবে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করার পর ধৈর্য ধরতে হবে।   চার: আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল হচ্ছে, ফরযসমূহ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার স্বীয় রবের পক্ষ হতে বর্ণনা করে বলেন, «مَنْ عادى لي وليًا فقد آذنتُهُ بالحرب، وما تقرَّب إليَّ عبدي بشيءٍ أحبَّ إليَّ مما افترضْتُ عليه» [أخرجه البخاري]. “যে ব্যক্তি আমার কোনো বন্ধুর সাথে দুশমনি করে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। বান্দার উপর আমি যা ফরয করেছি, তা আদায় করার মাধ্যমে আমার বান্দা যতটুকু আমার নৈকট্য লাভ করতে পারে, আর কোন কিছু দ্বারা সে তা করতে পারে না”। [বুখারি] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: «من عادى لي وليًا» এতে আল্লাহর অলি দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যারা আল্লাহ সম্পর্কে জানে, আল্লাহর আনুগত্য করার ব্যাপারে অটুট ও অবিচল এবং আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ঠ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: «مما افترضته عليه» দ্বারা উদ্দেশ্য ফরযসমূহ। ফরযে আইন বা ফরযে কিফায়া  ও প্রকাশ্য ফরযসমূহ সবই এর অন্তর্ভুক্ত। তন্মধ্যে : কর্মগত ফরযসমূহ যেমন, ওযু, সালাত, যাকাত, সদকায়ে ফিতর, রোযা, ইহরাম, হজ, আল্লাহর রাহে জিহাদ ইত্যাদি। তাযকীয়া (আন্তরিক পবিত্রতা): যেমন, যেনা-ব্যভিচার, হত্যা, মদ্যপান, সুদ-ঘোষ, শূকরের গোস্ত খাওয়া, ইত্যাদি হারামসমূহ। অনুরূপভাবে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য যাবতীয় অশ্লীল কর্মসমূহ। তাছাড়া অপ্রকাশ্য ফরযসমূহ: যেমন আল্লাহ সম্পর্কে জানা, আল্লাহর জন্য ভালোবাসা, আল্লাহর উপর ভরসা করা, আল্লাহকে ভয় করা। আর আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভে অধিক শক্তিশালী মাধ্যম হল, ফরযসমূহ আদায় করা। আর ফরযসমূহকে যেভাবে আদায় করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সেভাবে আদায় করার মাধ্যমে মূলত যিনি ফরযসমূহ আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন, তার সম্মান, তা‘যীম ও তার পরিপূর্ণ আনুগত্য, আর রবুবিয়্যাতের বড়ত্ব এবং দাসত্বের হীনতা প্রকাশ পায়। সুতরাং ফরযসমূহ আদায় করা আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মহান আমল। সবচেয়ে পছন্দনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ফরয হচ্ছে, ওয়াক্ত মত সালাত আদায় করা। عن عبد الله بن مسعود – رضي الله عنه – قال: سألتُ النبيَّ صلى الله عليه و سلم: أيُّ العمل أحبُّ إلى الله؟ قال: «الصلاة على وقتها». “আব্দুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল কোনটি? তিনি বলেন, সময়মত সালাত আদায় করা” [8]। আল্লামা ইব্‌ন বাত্তাল রহ. বলেন, সালাতকে সালাতের প্রথম সময়ের মধ্যে আরম্ভ করা, দেরিতে আরম্ভ করা হতে অধিক উত্তম। কারণ, সালাত প্রিয় আমল হওয়ার জন্য সালাতকে মোস্তাহাব সময়ের মধ্যে আদায় করা শর্ত করা হয়েছে। ইমাম তাবারী রহ. বলেন, “যে ব্যক্তি সালাতসমূহ নির্ধারিত সময়ে আদায় করার কষ্ট কম হওয়া এবং সময়মত আদায় করার মহান ফযিলত সম্পর্কে জানা থাকা স্বত্বেও কোনো প্রকার ওযর ছাড়া ফরয সালাতসমূহকে নির্ধারিত সময়ে আদায় করে না, সে অন্যান্য দায়িত্ব সম্পর্কে আরও বেশি উদাসীন”। সুতরাং সালাতকে সালাতের ওয়াক্তের বাইরে আদায় করা হারাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনে এ বিষয়ে বলেন, ﴿ فَوَيۡلٞ لِّلۡمُصَلِّينَ ٤ ٱلَّذِينَ هُمۡ عَن صَلَاتِهِمۡ سَاهُونَ ٥ ﴾ [الماعون: ٤،  ٥]   অতএব সেই সালাত আদায়কারীর জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজদের সালাতে অমনোযোগী। [সূরা মাউন, আয়াত: ৪, ৫] আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বাণী: لِّلۡمُصَلِّينَ  অর্থাৎ ‘সালাত আদায়কারী’ দ্বারা উদ্দেশ্য, যারা সালাত আদায়করার যোগ্য, আর তারা সালাত আদায় করার দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারপর তারা তাদের নিজেদের সালাত আদায় করা হতে অমনোযোগী। এই ‘অমনোযাগী’ কয়েকভাবে হতে পারে। এক- তারা একেবারে সালাত আদায় করা হতে গাফেল বা অমনোযোগী। দুই- তারা শরী‘আত নির্ধারিত সময়ে সালাত আদায় করা হতে অমনোযোগী। ফলে তারা এক ওয়াক্তের সালাতকে অন্য ওয়াক্তের মধ্যে নিয়ে আদায় করে। আব্দুল্লাহ ইব্‌ন আব্বাস রাদিয়াল্লাহ আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা সালাতকে নির্ধারিত সময় থেকে দেরীতে আদায় করে। আবুল আলীয়া হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তারা সালাতকে নির্দিষ্ট সময়ে আদায় করে না এবং সালাতের রুকু ও সেজদা ভালোভাবে আদায় করে না”। সুতরাং﴿عَن صَلَاتِهِمۡ سَاهُونَ﴾ [الماعون: ٥]   “যারা নিজদের সালাতে অমনোযোগী”। [সূরা মাউন, আয়াত: ৪, ৫] এর এক অর্থ, তারা প্রথম সময়ে সালাত আদায় করা থেকে অমনোযোগী। ফলে সে সব সময় অথবা অধিকাংশ সময় সালাতকে দেরীতে আদায় করে। অপর অর্থ, সে সালাতকে যেভাবে সালাতের আরকান ও শর্তসমূহ সহকারে আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সেভাবে আদায় করা থেকে অমনোযোগী। অন্য অর্থ হচ্ছে, সে সালাতে একাগ্রতা এবং সালাতের অর্থ ও গুঢ় কথা সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করা থেকে অমনস্ক ও অমনোযোগী। পাঁচ. আল্লাহ্ তা‘আলা বে-জোড়কে অধিক পছন্দ করেন প্রমাণ: قال رسول الله صلى الله عليه و سلم: «وإن الله وترٌ يحبُّ الوتر» [رواه مسلم]. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা বেজোড়; তিনি বেজোড়কে পছন্দ করেন”  [মুসলিম] [9] وتر  শব্দের অর্থ একা, আর আল্লাহর গুণ হওয়ার ক্ষেত্রে وتر  শব্দের অর্থ, আল্লাহ একক, যার কোনো শরিক নেই ও কোনো দৃষ্টান্ত নাই; তিনি তার সত্ত্বায় একক; সুতরাং তার অনুরূপ কিছু নেই, নেই কোনো সদৃশ। তিনি তার সিফাত সমূহে একক; তার কোনো সাদৃশ্য নেই; নেই কোনো প্রতিমূর্ত্তি। তিনি তার কর্মে একক; তার কর্মে কোনো শরিক নেই। আর নেই কোনো সহযোগী। আবার কেউ কেউ বলেন, «يحب الوتر» -আল্লাহ্ তা‘আলা বে-জোড়কে পছন্দ করেন- এ কথার অর্থ হল, আল্লাহর দরবারে অধিকাংশ ইবাদত বন্দেগী ও আমলের ক্ষেত্রে বে-জোড় আমল ও ইবাদতের ফযিলত বেশি। [ফলে তিনি অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত বে-জোড় নির্ধারণ করেছেন।] যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা সালাতকে পাঁচ ওয়াক্ত নির্ধারণ করেছেন। তাহারাতকে তিনবার করে করা, তাওয়াফ সাতবার, সাঈ সাতবার, পাথর নিক্ষেপ সাতবার, আইয়ামে তাশরিক তিনদিন, ঢিলা-কুলুখ দিয়ে পবিত্রতা হাসিল তিনবার ইত্যাদি। অনুরূপভাবে কাফনসমূহ তিন কাপড়। এছাড়াও আল্লাহ্ তা‘আলা তার অধিকাংশ বড় বড় মাখলুককে বেজোড় সৃষ্টি করেছেন। যেমন, আসমান সাতটি, জমিন সাতটি, সমুদ্র সাতটি, দিন সাতটি ইত্যাদি। আবার কেউ কেউ বলেন, এ কথার অর্থ ঐ বান্দার গুণের সাথে সম্পৃক্ত যে আল্লাহর ইবাদত করে, আল্লাহকে একক ও একা জেনে এবং আল্লাহকে এক জেনে খালেস করে তাঁর জন্য। আবার কেউ কেউ বলেন, এর উপর সাওয়াব দেন এবং বে-জোড় আমলকারীর আমল কবুল করেন। কাজী রহ. বলেন, যে কোনো বস্তু আল্লাহর সাথে সামান্য হলেও মুনাসেবত-সম্পর্ক- রাখে তা আল্লাহর নিকট অন্যান্য বস্তুসমূহ থেকে অধিক পছন্দনীয়, যার মধ্যে এ সম্পর্ক থাকে না। আবার কেউ কেউ এখানে হাদিসটিকে وتر এর সালাত সম্পর্কে বলা হয়েছে বলে দাবি করেন; তাদের প্রমাণ হল, এ হাদিস যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الله وتر يحب الوتر؛ فأوتروا يا أهل القرآن»   “আল্লাহ বে-জোড় তিনি বে-জোড়কে পছন্দ করেন, হে কুরআনের অনুসারী, কুরআন তোমরা ভিত্‌র (বিতির সালাত) আদায় কর ।” [10] তিরমিযি হাদিসটি বর্ণনা করেন। কিন্তু হাদিসটিকে শুধু এ অর্থের উপরই প্রয়োগ করার জন্য খাস বা নির্দিষ্ট করা জরুরি নয়। বরং হাদিসের অর্থটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার করাই সুস্পষ্ট। ছয়: আল্লাহর নিকট সর্ব উত্তম আমল- মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করা। প্রমাণ: عن عبد الله بن مسعود – رضي الله عنه – قال: «سألتُ النبي صلى الله عليه و سلم: أي العمل أحب إلى الله؟ قال: «الصلاة على وقتها»، قلتُ: ثم أي؟ قال: «ثم بر الوالدين» [رواه البخاري]. অর্থ, আব্দুল্লাহ ইব্‌ন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম, আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম আমল কোনটি? তিনি বললেন, “সময় মত সালাত আদায় করা” তারপর আমি বললাম, তারপর কোনটি? উত্তরে তিনি বললেন, “তারপর মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করা” । [বর্ণনায় বুখারি] [11] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জানিয়ে দেন, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ও মহান ইবাদত সালাতের পর আল্লাহর নিকট পছন্দনীয় আমল- মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করা। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে «ثم» শব্দ যা ধারাবাহিকতা বুঝানোর জন্য ব্যবহার হয়ে থাকে তা ব্যবহার করে কোন আমলের পর কোন আমল উত্তম তা বর্ণনা করে দিয়েছেন। মাতা-পিতার গুরুত্ব সম্পর্কে আল্লাহ বলেন- ﴿وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعۡبُدُوٓاْ إِلَّآ إِيَّاهُ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنًاۚ إِمَّا يَبۡلُغَنَّ عِندَكَ ٱلۡكِبَرَ أَحَدُهُمَآ أَوۡ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَآ أُفّٖ وَلَا تَنۡهَرۡهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوۡلٗا كَرِيمٗا ٢٣ وَٱخۡفِضۡ لَهُمَا جَنَاحَ ٱلذُّلِّ مِنَ ٱلرَّحۡمَةِ وَقُل رَّبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤﴾ [الاسراء: ٢٣،  ٢٤]  “আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলবে না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল। আর তাদের উভয়ের জন্য দয়াপরবশ হয়ে বিনয়ের ডানা নত করে দাও এবং বল, হে আমার রব, তাদের প্রতি দয়া করুন যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে লালন-পালন করেছেন”। [সূরা ইসরা, আয়াত: ২৩, ২৪]   আল্লাহ রাব্বুল আলমীন আরও বলেন, ﴿أَنِ ٱشۡكُرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيۡكَ إِلَيَّ ٱلۡمَصِيرُ ١٤ ﴾ [لقمان: ١٤]  সুতরাং, আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই। [সূরা লোকমান, আয়াত:১৪] অর্থাৎ আমরা তাকে বললাম, أَنِ ٱشۡكُرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيۡك ‘আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর’ আয়াতের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, ‘আল্লাহর জন্য শুকরিয়া ঈমানের নেয়ামতের কারণে, আর মাতা-পিতার শুকরিয়া তার লালন-পালনের কারণে’। আলেমগণ বলেন, আল্লাহ তা‘আলার পরে কৃতজ্ঞতা ও সদ্ব্যবহার  (ইহসান ও শুকর) ভালো কাজের সম্পৃক্ততা, আনুগত্য ও মান্যতা পাওয়ার সব চেয়ে উপযুক্ত মাখলুক হল, মাতা-পিতা। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ইবাদত, আনুগত্য ও শুকরিয়া আদায়ের সাথে যাদের সম্পৃক্ত করেন, তারা হলেন, মাতা-পিতা। মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করার অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তাদের সাথে সম্মানের সাথে উত্তম কথার মাধ্যমে তাদের মুখোমুখি হওয়া; আর সেটি হবে তখনই যখন তা হবে সব রকমের দোষ-ত্রুটিমুক্ত। وقد قال صلى الله عليه و سلم: «رغم أنفه، ثم رغم أنفه، ثم رغم أنفه!! قيل: من يا رسول الله؟ قال: من أدرك أبويه عند الكبر أحدهما أو كليهما، فلم يدخل الجنة» [رواه مسلم]. আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “লোকটির নাক কর্দমাক্ত হোক, আবারো লোকটির নাক কর্দমাক্ত হোক, আবারো লোকটির নাক কর্দমাক্ত হোক, জিজ্ঞাসা করা হল, হে আল্লাহর রাসূল লোকটি কে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি তার বৃদ্ধ মাতা-পিতা অথবা তাদের যে কোনো একজনকে জীবিত পেল অথচ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না” [12] সৌভাগ্যবান ব্যক্তি: যে মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, যাতে তাদের মারা যাওয়ার কারণে এ সুযোগ তাদের হাতছাড়া না হয়। অন্যথায় তাদের মারা যাওয়ার কারণে, সে পরবর্তীতে লজ্জিত হবে। আর হতভাগা লোক: যে তার মাতা-পিতার নাফরমানি করে। বিশেষ করে, যার নিকট মাতা-পিতার প্রতি ভালো ব্যবহার করার নির্দেশ পৌঁছেছে। মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার করার অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয় হচ্ছে: তাদের কোনো প্রকার ধমক না দেওয়া, বরং তাদেরকে সব সময় সুন্দর কথা ও বিনম্র ব্যবহার দ্বারা সম্বোধন করবে। যেমন তাদের এ বলে ডাকবে, হে আমার পিতা, হে আমার মাতা। পিতা-মাতাকে তাদের নাম ধরে বা তাদের উপনাম ধরে ডাকবে না। তাদের প্রতি দয়া পরবশ হবে, দাস যেমন তার মনিবের সামনে নমনীয় থাকে তেমনি মাতা-পিতার সামনে তার সন্তানরাও নমনীয় থাকবে। তাদের প্রতি রহমতের দো‘আ করবে। তাদের জন্য দো‘আ করবে। মাতা-পিতা সন্তানের প্রতি যেভাবে দয়া করেছিল, তারা তাদের মাতা-পিতার প্রতি অনুরূপ দয়া করবে। ছোট বেলা মাতা-পিতা তাদের প্রতি যেভাবে দয়া করেছে তারা তাদের মাতা-পিতার প্রতি অনুরূপ দয়া করবে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মাতা-পিতার সাথে ভালো ব্যবহার ও তাদের আনুগত্য করা যেন কোন কবীরা গুনাহে লিপ্ত হওয়ার কারণ না হয় এবং আল্লাহর ফরযসমূহ ছুটে যাওয়ার কারণ না হয়। [চলবে]..

[1] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৯০ ; মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৩৬২১। দুর্বল সনদে। তবে তিরমিযী এর অপর বর্ণনা, «وَأَسْأَلُكَ حُبَّكَ وَحُبَّ مَنْ يُحِبُّكَ، وَحُبَّ عَمَلٍ يُقَرِّبُ إِلَى حُبِّكَ » হাদীস নং ৩২৩৫; এর পক্ষে সমর্থক হাদীস হিসেবে বিবেচিত। যা একটি সহীহ হাদীস। [সম্পাদক] [2] আবু ইয়া‘লা, ১২/২২৯; হাদীস নং ৬৮৩৯। মুনযিরী হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। [3] এর তাখরীজ গত হাদীসের আলোচনায় এসেছে। [4] বুখারী, ৪৮৩০; মুসলিম, হাদীস নং ২৫৫৪। [সম্পাদক] [5] হাদীসটি এ শব্দে কোথাও পাই নি। [সম্পাদক] [6] প্রাগুক্ত হাদীস। [7] মুসলিম, হাদীস নং ৪৯। [8] বুখারী, হাদীস নং ৫২৭। [9] মুসলিম, হাদীস নং ২৬৭৭। [10] তিরমিযী, হাদীস নং ৪৫৩। [11] বুখারী, হাদীস নং ৫২৭। [12] মুসলিম, হাদীস নং ২৫৫১।

 

আল্লাহর নিকট উত্তম আমল হল, আল্লাহর যিকির করা: প্রমাণ: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  «أحب الأعمال إلى الله أن تموت ولسانك رطب من ذكر الله». “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল, তুমি মারা যাবে এ অবস্থায় যে তোমার জিহ্বা আল্লাহর যিকিরে থাকবে তরতাজা। ” [1] আল্লামা তীবী রহ. বলেন, জবান তরতাজা রাখার অর্থ হল, জবানে অতি সহজে আল্লাহর যিকির চলতে থাকা। আর এর বিপরীতে জবান শুষ্ক থাকার অর্থ হল, মুখে যিকির বন্ধ থাকা। তারপর মুখ আল্লাহর যিকির দ্বারা সচল থাকার অর্থ হল, সবসময় আল্লাহর যিকিরে লিপ্ত থাকা। মূলত: যিকির হল, যার যিকির করা হয়, তার বিষয়ে সবসময় অন্তর সতর্ক ও সজাগ থাকা। যিকিরকে যিকির বলে নাম রাখার কারণ, যিকির অর্থ স্মরণ করা। আর মুখের যিকির অন্তরে স্মরণ করার উপর প্রমাণ বহনকারী। কিন্তু যেহেতু মুখের কথার উপর যিকিরের প্রয়োগটা অধিক, তাই মুখের যিকিরকেই যিকির বলে নাম করা হয়েছে এবং যিকির বললে আমরা সাধরণত মুখের যিকিরকেই দ্রুত বুঝি। যিকির: যে সব শব্দাবলীকে অধিক পরিমাণে বলার জন্য হাদিস ও কুরআনে উৎসাহ দেয়া হয়েছে, সে সব শব্দগুলোকে বলা বা উচ্চারণ করাকে যিকির বলা হয়। যেমন, “আল-বাকীয়াতুস সালিহাত” বা স্থায়ী নেক আমলসমূহ, আর সেগুলো হচ্ছে, سبحان الله، الحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر   অনুরূপ আরও যেমন, লা হাওলা…, বিসমিল্লাহ, হাসবুনাল্লাহ…, ইস্তেগফার, ইত্যাদি, এবং দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণের জন্য দোয়া করা। আবার কোনো কোনো সময় ‘যিকির’ শব্দ ব্যবহার করে তার দ্বারা উদ্দেশ্য, ঐ সব নেক আমলসমূহ যেগুলোকে বান্দার উপর ওয়াজিব বা মোস্তাহাব করা হয়েছে, সেগুলোকে সবসময় চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। যেমন, কুরআন তিলাওয়াত করা, হাদিস অধ্যয়ন করা, ইলমি আলোচনা করা ও নফল সালাত আদায় করা। যিকির অনেক সময় মুখ দ্বারা হয়ে থাকে এবং তার উপর উচ্চারণকারীকে সাওয়াব দেয়া হয়। কিন্তু শর্ত হল, তার দ্বারা যেন কেবল শব্দের অর্থই উদ্দেশ্য হয়। আর যদি উচ্চারণের সাথে অন্তরের যিকিরের সাথেও সম্পৃক্ত করা হয়, তা হলে তা হবে, অধিক পরিপূর্ণ যিকির। আর যদি তার সাথে সাথে যিকির দ্বারা যিকিরকৃত শব্দগুলোর অর্থ ও যিকিরের শব্দগুলোর মধ্যে যে আল্লাহর মাহাত্ম্য ও তাঁর থেকে যাবতীয় দোষ-ত্রুটি দূরিকরণ রয়েছে তা উদ্দেশ্য হয়, তবে তার পরিপূর্ণতা আরও বেড়ে যায়। আর যদি যিকিরের শব্দাবলী কোনো নেক আমলের মধ্যে সংঘটিত হয়, তবে তার পরিপূর্ণতা আরও বৃদ্ধি পায়। আর যদি যিকিরের মধ্যে আল্লাহ সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ও ইখলাস সঠিকভাবে সম্পৃক্ত হয়, তবে তা চূড়ান্ত পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। মুখের যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য- ঐসব শব্দাবলী যে সব শব্দাবলী আল্লাহর তাসবীহ-পবিত্রতা, তাহমীদ-প্রসংশা ও তামজীদ-বড়ত্ব এর প্রমাণ বহন করে। আর অন্তরের যিকির দ্বারা উদ্দেশ্য- আল্লাহর সত্ত্বা ও সিফাতসমূহের প্রমাণসমূহের মধ্যে চিন্তা-ভাবনা করা, আল্লাহর তা‘আলা তার বান্দাদের যে সব আদেশ-নিষেধ করেছেন, সে আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত হওয়ার উদ্দেশ্যে তাতে চিন্তা করা, আমলের বিনিময় সংক্রান্ত সংবাদগুলোর উপর চিন্তা করা এবং আল্লাহর মাখলুকাতের সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে চিন্তা করা। বস্তুত: অন্তরের যিকির দুই প্রকার: এক. এ প্রকারের যিকির হচ্ছে, সর্বাধিক উন্নত ও গুরুত্বপূর্ণ যিকির, আর তা হচ্ছে, আল্লাহর মাহাত্ম্য, শান-শওকত, ক্ষমতা, মালিকানা, ও আসমান ও যমীনে তার যে সব নিদর্শন রয়েছে সেগুলো উপলব্ধি করার জন্য নিজের চিন্তা-শক্তিকে নিয়োগ করা। দুই. আদেশ নিষেধসমূহ পালনের সময় অন্তরের যিকির; আল্লাহর নিকট সাওয়াব লাভের আশায় এবং আল্লাহর শাস্তি থেকে বাঁচার ভয়ে, আল্লাহ যা আদেশ করেছেন তা পালন করবে এবং আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা হতে বিরত থাকবে। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের যিকির; আল্লাহর ইবাদত বন্দেগীতে ব্যস্ত থাকা এবং তার আনুগত্যে ডুবে থাকা। এ কারণেই সালাতকে যিকির বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ فَٱسۡعَوۡاْ إِلَىٰ ذِكۡرِ ٱللَّهِ ٩ ﴾ [الجمعة: ٩] “তখন তোমরা আল্লাহর স্মরনের দিকে ধাবিত হও”। [আল-জুমু‘আ, আয়াত: ৯] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ ٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ ذِكۡرٗا كَثِيرٗا ٤١ ﴾ [الاحزاب: ٤١]    “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ কর”। [আল-আহযাব, আয়াত: ৪১] এ আয়াতগুলোতে আল্লাহ্ তা‘আলা তার বান্দাদেরকে আল্লাহর যিকির করা ও তার শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দেন, আরও নির্দেশ দেন যেন অধিকাংশ সময়ে তারা যাতে তাদের জিহ্বাকে আল্লাহর যিকির, তাসবীহ, তাহলীল, আল্লাহ প্রশংসা ও বড়ত্বের বর্ণনায় লিপ্ত রাখেন। আল্লামা মুজাহিদ রহ. বলেন, যিকিরের শব্দগুলো এমনই যেগুলো পবিত্র, সাধারণ অপবিত্র ও বেশী অপবিত্র ব্যক্তিও বলতে পারে। তিনি আরও বলেন, একজন ব্যক্তি ততক্ষণ আল্লাহর যিকির-কারী হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে দাঁড়ানো অবস্থায়, বসা অবস্থায় এবং শোয়া অবস্থায় আল্লাহর যিকির করবে। আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, “আল্লাহ তা‘আলা একমাত্র যিকির ছাড়া আর যত প্রকারের ইবাদত বান্দার উপর ফরয করেছেন, সব ইবাদতের একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করেছেন এবং অপারগতার সময় তার অপারগতাকে গ্রহণ করেছেন। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা যিকিরের এমন কোনো সীমা নির্ধারণ করেন নি যেখানে গিয়ে বান্দা থামবে। অনুরূপভাবে যিকির ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে কারও ওজরকে গ্রহণ করেন নি, যদি না তাকে ছাড়ার ব্যাপারে জোর করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ فَٱذۡكُرُواْ ٱللَّهَ قِيَٰمٗا وَقُعُودٗا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمۡۚ ١٠٣ ﴾ [النساء: ١٠٣] “তখন দাড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ করবে”। [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৩] রাতে-দিনে, জলে-স্থলে, সফরে-আবাসস্থলে, প্রাচুর্য- দারিদ্রতা, অসুস্থতা-সুস্থতা. প্রকাশ্যে-গোপনে সর্বাবস্থায় আল্লাহর যিকির করতে হবে। যখন তোমরা তা করবে, আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর সালাত পেশ করবেন, (তোমাদের কথা তাঁর কাছে যারা আছে তাদের কাছে বর্ণনা করবেন) অনুরূপভাবে ফেরেশতাগণও তা করবেন। মু‘আয ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেন, «ما شيء أنجى من عذاب الله من ذكر الله». “আল্লাহর আযাব হতে মুক্তি দেয়ার জন্য যিকির থেকে অধিক শক্তিশালী আর কিছুই নাই” [2] আল্লাহ্ তা‘আলা যিকির শব্দটি কুরআনের অনেক আয়াতে উল্লেখ করেন। আর যিকিরকারীর জন্য ‘আল্লাহর স্মরণ করা’ আল্লাহ্ তা‘আলা তার বিনিময় বলে আখ্যায়িত করেন। একজন যিকিরকারীকে আল্লাহ স্মরণ করবে, এটি তার জন্য দুনিয়ার সব কিছু হতে উত্তম এবং দুনিয়াতে এর চেয়ে বড় কোনো আমল হতেই পারে না। আর এর মাধ্যমেই নেক আমলসমূহের পরিসমাপ্তি ঘটানোর কথা বলেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «ألا أنبئكم بخير أعمالكم، وأزكاها عند مليككم، وأرفعها في درجاتكم، وخير لكم من إنفاق الذهب والورق، وخير لكم من تلقوا عدوكم فتضربوا أعناقهم، ويضربوا أعناقكم؟! قالوا: بلى! قال: ذكر الله تعالى» [أخرجه الترمذي]. “আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের জন্য সর্ব উত্তম আমলসমূহ সম্পর্কে জানিয়ে দেব? আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মুনিবের নিকট পবিত্র আমল কোনটি তা জানিয়ে দেব? আমি কি তোমাদেরকে তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করে, এমন আমলসমূহ সম্পর্কে জানিয়ে দেব? আমি কি তোমাদেরকে এমন আমল বাতলিয়ে দেব, যা তোমাদের জন্য স্বর্ণ মুদ্রা আল্লাহর রাহে ব্যয় করা থেকে উত্তম? আমি কি তোমাদেরকে এমন আমল বিষয়ে তোমাদের জানিয়ে দেব, যা তোমাদের জন্য দুশমনদের সাথে মুখোমুখি হয়ে তোমরা তাদের হত্যা করবে এবং তারা তোমাদের হত্যা করবে তা হতে উত্তম? সাহাবীগণ বললেন, হ্যাঁ! তিনি বললেন, তা হল, আল্লাহ তা‘আলার যিকির” [তিরমিযি] [3] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «أحب الكلام إلي الله أربع؛ سبحان الله، والحمد لله، ولا إله إلا الله، والله أكبر؛ لا يضرك بأيهن بدأت» [أخرجه مسلم]. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় কালাম চারটি। এক- সুবহানাআল্লাহ দুই- আলহামদু লিল্লাহ-তিন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ চার-আল্লাহু আকবর। যেটি দিয়েই শুরু কর, তাতে কোন অসুবিধা নাই” [মুসলিম] [4] লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর উপকারিতা: বলা হয়ে থাকে যে, এ কালিমার মধ্যে দুটি বৈশিষ্ট্য আছে: এক. এ কালেমার মধ্যে যতটি শব্দ আছে সব কটি শব্দ ‘হুরুফে জাওফিয়া’ অর্থাৎ শব্দগুলোর উচ্চারণের স্থান হল, মুখের মধ্যখান যাকে পেট বলা হয়। এ কালেমার মধ্যে এমন কোনো শব্দ নেই যে শব্দের উচ্চারণের স্থান ঠোট ব্যবহার করতে হয়,  যেমন ‘বা’, ‘মিম’, ‘ফা’, ইত্যাদি। এ দ্বারা ইশারা করা হল, এ কালেমা মানুষ যেন শুধু ঠোটে বা মুখে উচ্চারণ না করে বরং পেট-অন্তর-থেকে উচ্চারণ করে, শুধু ঠোটে -মুখে- উচ্চারণ যথেষ্ট নয়। দুই. এ কালেমার মধ্যে নুকতা বিশিষ্ট কোন শব্দ নাই; বরং সবকটি হরফ বা শব্দ নুকতা হতে খালি। এ দ্বারা উদ্দেশ্য এ কথার দিক ইশারা করা, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নাই। এ কালেমা আল্লাহ ছাড়া যত মা‘বুদ আছে সমস্ত মা‘বুদ হতে খালি। আট. সর্বাধিক প্রিয় আমল উত্তম চরিত্র: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «أحب عباد الله إلى الله أحسنهم خلقًا». “আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় বান্দা হল, যাদের চরিত্র সুন্দর।” [5] ‘খুলুক’ ও ‘খালক’ দুটি শব্দই আরবিতে একত্রে ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন বলা হয়, অমুক حَسَنُ الخُلُقِ والخَلْق؛ অর্থাৎ লোকটি ভিতর ও বাইর উভয় দিক দিয়ে সুন্দর। মানুষ গোস্ত মাংস দ্বারা ঘটিত যা চোখ দ্বারা দেখা যায়, এবং এক রূহ ও আত্মা দিয়ে তৈরি যা চোখ দিয়ে দেখা যায় না; তবে তা মানুষ তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখতে পায়। আর প্রতিটির জন্য একটি অবস্থা ও আকৃতি রয়েছে; তা হয়তো খারাপ অথবা সুন্দর। আর চরিত্র: সে তো এক মজবুত অবস্থার নাম যা মানবাত্মার মধ্যে প্রগাঢ় হয়ে বিদ্যমান; তা থেকে যাবতীয় কর্মগুলো কোন প্রকার চিন্তা-ফিকির ও কষ্ট-ক্লেশ ছাড়া অতি সহজে প্রকাশ পায়। আর কোনো মানুষকে ততক্ষণ পর্যন্ত সৎ চরিত্রবান বলে আখ্যায়িত করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তার আত্মার মধ্যে সুন্দর চরিত্র প্রগাঢ় ও মজবুতভাবে স্থাপিত না হয় এবং সুন্দর চরিত্র ও যাবতীয় কর্ম তার থেকে কোনো প্রকার কৃত্রিমতা ও কষ্ট-ক্লেশ ছাড়া প্রকাশ না পায়। আর যদি কোনো ব্যক্তি ভনিতা করে কোনো ভালো কাজ করে, তাকে এ কথা বলা যাবে না যে, এটি তার চরিত্র। এর দৃষ্টান্ত হল, যে ব্যক্তি কোনো জরুরি প্রয়োজনে ভান করে তার টাকা ব্যয় করলো অথবা অতি কষ্টে রাগের সময় চুপচাপ থাকল, তাকে এ কথা বলা যাবে না, লোক দানশীল বা ধৈর্যশীল। মানুষের বাহ্যিক আকৃতির পরিবর্তন করা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়; কিন্তু মানুষের আখলাক বা চরিত্রের পরিবর্তন করা সম্ভব। মানব চরিত্র পরিবর্তন হয়। এ জন্যই দ্বীনের আগমন ঘটেছে; যা মানুষকে ভালো ও উত্তম চরিত্রের প্রতি আহ্বান করে এবং ভালো কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ হতে নিষেধ করার প্রতি দাওয়াত দেয়। আর এতে অসিয়ত, ওয়ায ও শিক্ষা দেয়ার বিধান পাওয়া যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوۡمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُواْ مَا بِأَنفُسِهِمۡۗ ١١﴾ [الرعد: ١١] “নিশ্চয় আল্লাহ কোন কওমের অবস্থা ততক্ষণ পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে”। [সূরা রা‘আদ, আয়াত: ১১] অনুরূপভাবে নতুন নতুন আখলাক ও চরিত্রসমূহ চেষ্টা ও সাধনা করে অর্জন করা সম্ভব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রভুকে ডাকতেন, যাতে তিনি তাকে সর্বাধিক সুন্দর আমলসমূহের দিকে পথ দেখান  এবং সুন্দর চরিত্রসমূহের প্রতি পথ দেখান, আর তাকে চরিত্রবান হওয়ার তাওফিক দান করেন। তিনি বলে বলেন, «اللهم اهدني لأحسن الأخلاق لا يهدي لأحسنها إلا أنت، واصرف عني سيئها لا يصرف عني سيئها إلا أنت». [أخرجه النسائي]، “হে আল্লাহ! আপনি আমাকে সুন্দর আখলাকসমূহের পথ দেখান। সুন্দর আখলাকের প্রতি আপনি ছাড়া কেউ পথ দেখাতে পারে না। আর আপনি আমার থেকে খারাপ চরিত্রগুলোকে হটিয়ে দিন, আমার থেকে খারাপ চরিত্রগুলো আপনি ছাড়া কেউ দূরে সরাতে পারে না” [বর্ণনায় নাসায়ী] [6] তাছাড়া রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষকে এ বলে অসিয়ত করতেন- «وخالق الناس بخُلُق حسن» তোমরা মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার দ্বারা আচরণ কর [7] কোনো কোনো আলেম সুন্দর চরিত্রের কিছু আলামত একত্র করেছেন। তারা বলেন, সুন্দর আখলাক হল, অধিক লজ্জা করা, মানুষকে কম কষ্ট দেয়া, অধিক যোগ্যতার অধিকারী হওয়া, কথাবার্তায় সত্যবাদী হওয়া, কম কথা বলা, অধিক জ্ঞান রাখা, পদস্খলনমূলক কাজ কম হওয়া, অনর্থক কথা কম বলা বা অনর্থক কথা থেকে বিরত থাকা, সৎকাজে অগ্রণী হওয়া ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা, আত্মসম্মান বজায় রাখা, ধৈর্যশীল হওয়া, কৃতজ্ঞ হওয়া, অল্পে তুষ্ট হওয়া, সহনশীল হওয়া, কোমলতা অবলম্বন, পবিত্র হওয়া, দয়ার্দ্র হওয়া, অভিশাপকারী না হওয়া, গালি-গালাজকারী না হওয়া, ছোগলখুরী না করা, গীবতকারী না হওয়া, তাড়াহুড়া কারি না হওয়া, হিংসুক না হওয়া, কৃপণ না হওয়া, বিদ্বেষ না থাকা, হাসি-খুশি থাকা, আল্লাহর জন্য মহব্বত কারি হওয়া এবং আল্লাহর জন্য দুশমনি করা, আল্লাহর জন্য রাজি-খুশি হওয়া এবং আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করা। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «ما من شيءٍ يوضع في الميزان أثقل من حسن الخلق، وإن صاحب حسن الخلق ليبلغ به درجة صاحب الصوم والصلاة». [أخرجه الترمذي]. “উত্তম চরিত্র হতে আর কোন অধিক ভারি জিনিস কেয়ামতের দিন মিযানে রাখা হবে না। একজন উত্তম চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি তার উত্তম চরিত্র দ্বারা রোযাদার ও সালাত আদায়কারীর মর্যাদায় পৌছতে পারবে।” [তিরমিযি] [8] একজন চরিত্রবান ব্যক্তিকে এত বড় ফযিলত দেওয়ার কারণ হল, একজন রোযাদার ও রাতে সালাত আদায়কারী ব্যক্তি শুধুমাত্র তার নফসের বিরোধিতা করে থাকে, আর যে ব্যক্তি মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে থাকে, সে অনেকগুলো নফস যারা বিভিন্ন প্রকৃতি ও বিভিন্ন চরিত্রের অধিকারী হয়, যেন তাদের বিরুদ্ধে প্রচেষ্টা চালায়। এ কারণে একজন রোযাদার ও তাহাজ্জুদ আদায়কারী যে সাওয়াব পাবে একজন চরিত্রবান লোকও একই সাওয়াব পাবে। ফলে তারা উভয়ে সাওয়াবের দিক দিয়ে বরাবর। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারা অধিক সাওয়াবের অধিকারী হবে। সুন্দর চরিত্রের অনেক ফলাফল রয়েছে, যেগুলো একজন ব্যক্তি চরিত্রবান হওয়ার প্রমাণবাহী নিদর্শন। বলা হয়ে থাকে যে, আল্লাহর সাথে তার জানা-শুনা অত্যধিক থাকার কারণে সে ঝগড়া-বিবাধ করে না। আবার কেউ বলে, মানুষের [বিপদ-আপদ, সুখে-দুখে] কাছা-কাছি হওয়া এবং তাদের মধ্যে অপরিচিত হওয়া বা প্রসিদ্ধ না হওয়া। আবার কেউ কেউ বলে, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া। আবার কেউ কেউ বলে, সর্বনিম্ন পর্যায় হচ্ছে, সহনশীল হওয়া, সমপরিমাণ প্রাপ্তির আশা ত্যাগ করা, যালেমের প্রতি দয়া করা, তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, ও তার প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া। নয়. আল্লাহ তা‘আলা মুত্তাকী, ধনাঢ্য ও আত্মগোপনকারী ব্যক্তিকে পছন্দ করেন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الله يحب العبد التقي الغني الخفي». “নিশ্চয় আল্লাহ তকী, (মুত্তাকী) গনী, (ধনাঢ্য) ও খফী, (আত্মগোপনকারী) বান্দাকে পছন্দ করেন।” [9] তকী বা মুত্তাকী বলা হয়: যে গায়েবের উপর ঈমান আনে, সালাত কায়েম করে, আল্লাহর দেয়া রিযক থেকে আল্লাহর পথে ব্যয় করে, আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন, তা থেকে বেঁচে থাকে, আল্লাহর আনুগত্য করে, যে শরী‘আত নিয়ে আল্লাহ তাঁর রাসূলদের শেষ রাসূল এবং তাদের সরদারকে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন, সে শরী‘আতের অনুসরণ করে। গনী দ্বারা উদ্দেশ্য: আত্মার ধনী। আর আত্মার ধনীই হল, আর সেই ধনীই হচ্ছে আল্লাহর প্রিয়। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «ليس الغنى عن كثرة العرض؛ ولكن الغنى غنى النفس» [أخرجه البخاري]. “ধন সম্পদ অধিক হওয়ার কারণে কেউ ধনী হতে পারে না। তবে সত্যিকার ধনী হল, সে ব্যক্তি যে আত্মার দিক দিয়ে ধনী” [10] [বুখারি] আল্লামা ইবনে বাত্তাল রহ. বলেন, হাদিসে ধনী দ্বারা উদ্দেশ্য অধিক ধন-সম্পদ অধিকারী হওয়া নয়, কারণ, অনেক মানুষ এমন আছে, যাদের আল্লাহ্ তা‘আলা ধন-সম্পদ অধিক পরিমাণে দান করেছেন, কিন্তু সে তাতে সন্তুষ্ট হয় না, সে আরও বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করতে থাকে। কোথায় থেকে সে কামাই করবে তার প্রতি সে কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ করে না। এ ধরনের লোক তার অধিক লোভের কারণে ধনী হলেও ফকীর। আর সত্যিকার ধনী হল, সে ব্যক্তি যার অন্তর ধনী। অর্থাৎ তাকে যা দেয়া হয়েছে, তাতে সে কারও মুখাপেক্ষী হয় না, সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে, বেশির প্রতি সে লোভ করে না এবং পাওয়ার জন্য সে বাড়াবাড়ি করে না। ফলে সেই হল একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি। আর আত্মার ধনী হওয়ার বিষয়টি মনে সৃষ্টি হয় আল্লাহর ফায়সালার প্রতি সন্তুষ্ট হওয়া ও তার নির্দেশকে মেনে নেওয়া দ্বারা। আর এ কথা বিশ্বাস করা দ্বারা যে আল্লাহর নিকট যা কিছু আছে, তা অতি উত্তম ও স্থায়ী। আল্লামা ইবনে হাজার রহ. বলেন, ‘আত্মার ধনী হওয়া, অন্তরের ধনী হওয়ার মাধ্যমে অর্জিত হয়। অর্থাৎ যখন একজন বান্দা যাবতীয় কাজে সে তার রবের মুখাপেক্ষী হয়, তখন তার মধ্যে এ উপলব্ধি হয়, ‘আল্লাহ তিনিই দাতা’ ও ‘নিষেধকারী’। তখন সে তার ফায়সালার উপর রাজি থাকে এবং তার নেয়ামতসমূহের প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তার নেয়ামতসমূহের উপর শুকরিয়া আদায় করে, যাবতীয় মুসিবত দূর করার জন্য সে আল্লাহর নিকটই ছুটে যায়। তখন সব বিষয়ে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষী হওয়ার কারণে তার অন্তরে আত্মার ধনী হওয়া সৃষ্টি হয়, সে আল্লাহ ছাড়া আর কারো প্রতি মুখাপেক্ষী হয় না।’ আর হাদিসে যে ‘খফী’ শব্দটি ব্যবহার হয়েছে, তা দ্বারা উদ্দেশ্য হল, ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহর ইবাদতে লিপ্ত থাকে এবং সে তার নিজের কাজেই ব্যস্ত থাকে; অন্য কোনো দিক সে তাকায় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «رب أشعث مدفوعٍ بالأبواب لو أقسم على الله لأبره» [أخرجه مسلم]. “অনেক ধুলি-মলিন অবিন্যস্ত চুলের অধিকারী লোক রয়েছে, যাদের মানুষ তাদের বাড়ির দরজা হতে তাড়িয়ে দেয়, তারা যদি আল্লাহর শপথ করে কোনো কথা বলে, আল্লাহ তাদের দায় মুক্ত করে” [11]। [বর্ণনায় মুসলিম] আল্লাহ্ তা‘আলা আত্মগোপনকারী মুত্তাকীকে মহব্বত করেন, যে ব্যক্তি অনুপস্থিত হলে তাকে কেউ অনুসন্ধান করে না, আর যদি উপস্থিত থাকে তাকে কেউ চিনে না। সে তার কোনো ভালো কাজ দেখিয়ে বেড়ায় না এবং ইলম ও আমল প্রকাশ করার মানসিকতা পোষণ করে না। মানুষ থেকে ইজ্জত সম্মান তালাশ করে না। স্রষ্টা তার ইবাদত বন্দেগী সম্পর্কে অবগত হওয়াতে সন্তুষ্ট থাকে, মাখলুকের অবগতির কোনো গুরুত্ব তার কাছে নেই। এক আল্লাহর প্রশংসার প্রতি সে সন্তুষ্ট মানুষের প্রশংসার প্রতি কোনো কৌতূহল তার মধ্যে নেই। [এ ধরনের লোককেই বলা হয়, আত্মগোপন কারী] দশ. আল্লাহ দানশীল ব্যক্তিকে পছন্দ করেন: রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الله يحب سمح البيع، سمح الشراء، سمح القضاء» [أخرجه الترمذي]. “আল্লাহ্ তা‘আলা বিক্রয়ে ছাড়-প্রবণ, কেনার সময় ছাড়-প্রবণ এবং ফায়সালার ছাড়-প্রবণতাকে পছন্দ করেন” [তিরমিযী] [12] السماحة [আস-সামাহা]: শব্দের অর্থ হল, সহজ করা ও ছাড় দেয়া বা ক্ষমা করা। আর “سمحاً” এর অর্থ হচ্ছে, সহজ করতে,  ছাড় প্রদান করতে ও ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। বস্তুত: ‘সামাহা’ ঈমানের একটি অংশ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «الإيمان الصبر والسماحة» “ঈমান হল, ধৈর্য ধারণ করা ও ক্ষমা করা [13]।” [বর্ণনায় আহমদ] বেচা-কেনার মধ্যে অনুগ্রহ করার অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো কিছু বিক্রি করে বা খরিদ করে, তখন সে সহজ করে এবং দান করে। আর যখন বিক্রি করে তখন অনেক পাওনাকে সে ছেড়ে দেয়। আর ফায়সালার ক্ষেত্রে ক্ষমাশীল হওয়ার অর্থ হল, সে ব্যক্তি তার হককে অত্যন্ত সহজ, সরল ও নমনীয়তার সাথে আদায় করতে চেষ্টা করে, কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি বা ক্ষতি করার চেষ্টা সে করে না। মোটকথা, ‘সামহ’ ঐ ব্যক্তিকে বলা হয়, যে মানুষের সাথে ক্ষমা ও সহজ আচরণ করে। সে মানুষের সাথে উন্নত আখলাক-চরিত্র প্রয়োগ করে এবং ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করে। আল্লাহ্ তা‘আলা ক্ষমাপ্রবণ ব্যক্তিকে পছন্দ করেন; কারণ সে নিজের পক্ষ থেকে সম্মানিত এবং সে উত্তম চরিত্রের অধিকারী; কারণ এর মাধ্যমে সে তার অন্তর থেকে ধন-সম্পদের মোহ কর্তন করতে সমর্থ হয়েছে, যে ধন-সম্পদ দুনিয়ার চিহ্ন। তাছাড়া সে আল্লাহর বান্দাদের উপর দয়া করতে সক্ষম হয়েছে, তাদের কাছে উপকার পৌঁছাতে পেরেছে। আর এ সবই আল্লাহর মহব্বত লাভকে আবশ্যকীয় করে তুলেছে। এগার. আল্লাহ্ তা‘আলা ক্ষমাকে পছন্দ করেন রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الله يحب العفو» “আল্লাহ ক্ষমাকে পছন্দ করেন”[14] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ خُذِ ٱلۡعَفۡوَ وَأۡمُرۡ بِٱلۡعُرۡفِ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡجَٰهِلِينَ ١٩٩ ﴾ [الاعراف: ١٩٩] “তুমি ক্ষমা প্রদর্শন কর এবং ভালো কাজের আদেশ দাও। আর মূর্খদের থেকে বিমুখ থাক”। [আ‘রাফ, আয়াত: ১৯৯] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, ﴿ وَٱلۡكَٰظِمِينَ ٱلۡغَيۡظَ وَٱلۡعَافِينَ عَنِ ٱلنَّاسِۗ وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلۡمُحۡسِنِينَ ١٣٤ ﴾ [ال عمران: ١٣٤] “আর ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্ম-শীলদের ভালো বাসেন”। [আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন, ﴿ وَأَن تَعۡفُوٓاْ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۚ ٢٣٧ ﴾ [البقرة: ٢٣٧] “আর তোমাদের মাফ করে দেয়া তাকওয়ার অধিক নিকটতর।” [সূরা বাকারাহ, আয়াত: ১৩৭] عفوবা ক্ষমা বলা হয়, গুনাহের কারণে পাকড়াও করা ছেড়ে দেওয়া। আর صفح বা উপেক্ষা করার অর্থ হল, অন্তর থেকে গুনাহের প্রভাব দূর করা। আর ক্ষমা তার থেকেই হতে পারে, যার ধন-সম্পদ ইজ্জত সম্মান ইত্যাদিতে কোনো না কোনো হক বা অধিকার ছিল, কিন্তু সে তার সে অধিকার ছেড়ে দেয় এবং ক্ষমা করে দেয়। আল্লাহ্ তা‘আলা যারা ক্ষোভের সময় ক্ষমা করে দেয়, তাদের প্রশংসা করেছেন এবং তাদের সুনাম তুলে ধরেছেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿وَإِذَا مَا غَضِبُواْ هُمۡ يَغۡفِرُونَ ٣٧ ﴾ [الشورى: ٣٧] “এবং যখন রাগান্বিত হয়, তখন তারা ক্ষমা করে দেয়”। [সূরা আশ-শূরা, আয়াত: ৩৭] العَفُوُّ  ‘ক্ষমাকারী’ এটি আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের মধ্য থেকে একটি গুণবাচক নাম। আর عفو বা ‘ক্ষমা’ আল্লাহর সিফাতসমূহ থেকে একটি সিফাত। আল্লাহ্ তা‘আলা বান্দাদের শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা রাখা স্বত্বেও তাদের ক্ষমা করে দেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿وَلۡيَعۡفُواْ وَلۡيَصۡفَحُوٓاْۗ أَلَا تُحِبُّونَ أَن يَغۡفِرَ ٱللَّهُ لَكُمۡۚ وَٱللَّهُ غَفُورٞ رَّحِيمٌ ٢٢﴾ [النور: ٢٢] “আর তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্রুটি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ কর না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দেন? আর আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা নূর, আয়াত: ২২] আর মানুষের আমলের বিনিময় তার আমলের ধরণ অনুযায়ীই হয়ে থাকে, সুতরাং যেভাবে যে তোমাকে কষ্ট দেয়, তাকে তুমি ক্ষমা করে দেবে, সেভাবে আল্লাহও তোমাকে মাফ করে দেবেন। আর তুমি যখন তোমার অপর ভাইয়ের দোষত্রুটি উপেক্ষা করবে, আল্লাহও তোমার দোষ ত্রুটি উপেক্ষা করবেন। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা, ক্রোধকে হজম করা ও মানুষকে ক্ষমা করার জন্য উম্মতকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর এটি মহান ইবাদত ও নফসের সাথে জিহাদ করার সমতুল্য। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «ما من جرعةٍ أعظم أجرًا عند الله من جرعة غيظ كظمها عبد ابتغاء وجه الله» [أخرجه ابن ماجه]. “এমন কোনো ঢোক সওয়াবের জন্য আল্লাহর নিকট বড় নেই, সে ঢোক হতে যা বান্দা ক্রোধের সময় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে গিলে বা সম্বরণ করে ফেলে”[15]। [ইবনে মাজাহ্] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «من كظم غيظًا وهو يستطيع أن ينفذه، دعاه الله يوم القيامة على رؤوس الخلائق حتى يخيره من أي الحور شاء» [أخرجه الترمذي] “যে ব্যক্তি রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে অথচ তা প্রয়োগ করার মত ক্ষমতা তার আছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে সমস্ত মানুষের সামনে ডেকে বলবেন, তুমি হূরদের থেকে যাকে পছন্দ কর গ্রহণ করতে পার”[16]। [তিরমিযী] অর্থাৎ মানুষের মাঝে আল্লাহ্ তা‘আলা তার সুনাম ছড়াবেন, তার প্রশংসা করবেন এবং তাকে নিয়ে তিনি অহংকার করবেন। যার ফলে তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা যে কোনো হূরকে গ্রহণ করার ব্যাপারে স্বাধীনতা প্রদান করবেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «وما زاد الله عبدًا بعفوٍ إلا عزًا، وما تواضع أحد لله إلا رفعه الله». “ক্ষমা করার কারণে আল্লাহ্ তা‘আলা বান্দার সম্মানকেই বৃদ্ধি করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য বিনয়ী হয়, আল্লাহ্ তা‘আলা তার মর্যাদাকে বৃদ্ধি করেন”[17]। এখানে দুটি দিক রয়েছে: এক- হাদিসটি তার বাহ্যিক অর্থের উপরই রাখা হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ক্ষমা ও উপেক্ষা করা বিষয়ে প্রসিদ্ধ হবে, মানুষের অন্তরসমূহে সে মহান হবে এবং তার ইজ্জত ও সম্মান বৃদ্ধি পাবে। দুই- অথবা হাদিসের অর্থ হল, তার সাওয়াব আখিরাতে আর সম্মান দুনিয়াতে। আবার কোনো সময় উভয় অর্থ এক সাথে হতে পারে। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জাহানে ইজ্জত ও সম্মান দান করবেন।   বার. আল্লাহ্ তা‘আলা কোমলতা পছন্দ করেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الله يحب الرفق في الأمر كله» [أخرجه البخاري]. “আল্লাহ প্রতিটি কাজে কোমলতা পছন্দ করেন”[18]। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «إن الله رفيق يحب الرفق، ويعطي على الرفق ما لا يعطي على العنف، وما لا يعطي على ما سواه» [أخرجه مسلم]. “আল্লাহর তা’আলা নিজে কোমলময়, তিনি  কোমলতাকে পছন্দ করেন। তিনি কোমলতার উপর যে প্রতিদান দেন, জোর বা কঠোরতার উপর তা দেন না, অনুরূপ অন্য কিছুর উপরও এত বেশি প্রতিদান দেন না”[19]। মূলত: কোমলতা যাবতীয় কল্যাণের কারণ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «من يحرم الرفق يحرم الخير» “যে ব্যক্তি কোমলতা থেকে বঞ্চিত হয়, সে যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়”[20]। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: «إن الله رفيق»  ‘আল্লাহ কোমল’ এ কথার অর্থ হল, আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র, তিনি তাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠোরতা করতে চান না। আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষকে তাদের সাধ্যের বাহিরে কোনো দায়িত্ব চাপিয়ে দেন না। আল্লাহ্ তা‘আলা ‘কোমলতা অবলম্বনের উপর প্রদান করার’ অর্থ তিনি সেটার উপর যে সাওয়াব দেন, অন্য কোন আমলের উপর এত বেশি সাওয়াব দেন না। কোমল ব্যবহারের উপর আল্লাহ্ তা‘আলা দুনিয়াতে সুন্দর প্রশংসা কুড়ানোর তাওফিক দেন, উদ্দেশ্য হাসিলে সফলতা দেন, এবং লক্ষ্য অর্জন করা সহজ করে দেন। আর আখিরাতে তার জন্য রয়েছে অধিক সাওয়াব, যা কঠোরতা করার কারণে অর্জন করা সম্ভব হয় না, আর যা অন্য কোনো আমলের কারণে লাভ করা যায় না। বস্তুত: নমনীয়তা ও নরম ব্যবহার উত্তম চরিত্রেরই ফল এবং তারই পরিণতি। বলা হয়ে থাকে যে, সবচেয়ে প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ হচ্ছে, প্রতিটি বস্তুকে যথাস্থানে প্রয়োগ করা। কঠোরতার জায়গায় কঠোরতা এবং কোমলতার স্থানে কোমলতা, যেখানে তলোয়ার উত্তোলন করা দরকার সেখানে তলোয়ার উঠানো, আর যেখানে লাঠি উঠানো দরকার সেখানে লাঠি উঠানো। সুতরাং যাবতীয় চরিত্রে যেমন মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উত্তম, তেমনি কঠোরতা ও কোমলতা উভয়টির মধ্যেও মধ্যম পন্থা অবলম্বন করা উত্তম। কিন্তু যেহেতু মানব স্বভাব কঠোরতার প্রতিই বেশি ধাবিত হয় তাই  মানুষকে কোমলতা অবলম্বন করার প্রতি বেশি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আর এ জন্যই কঠোরতার চেয়ে কোমলতা অবলম্বনের অধিক প্রশংসা করা হয়েছে। সত্যিকার পূর্ণ তো সে-ই, যে ব্যক্তি কোথায় কঠোরতা করতে হবে এবং কোথায় কোমলতা অবলম্বন করতে হবে উভয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে পারে। ফলে যেখানে যা করা দরকার সেখানে সে তাই করে। যদি কোন ব্যক্তির দূরদর্শিতা কম হয়, অথবা কোন ঘটনার পিছনে কি হিকমত আছে, তা না জানে, তাহলে তার জন্য কোমলতা অবলম্বন করা উত্তম। কারণ, অধিকাংশ সময় কোমলতার মধ্যেই সফলতা নিহিত থাকে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الرفق لا يكون في شيء إلا زانه، ولا ينزع من شيء إلا شانه». “যে কোনো কিছুতে কোমলতা অবলম্বন করা সেটার সৌন্দর্যকে নিশ্চিত করে। আর কোন কিছু থেকে কোমলতা তুলে নেয়া সেটাকে কলঙ্কিতই করে থাকে”[21]। তের: আল্লাহ্ তা‘আলা লজ্জা ও গোপন রাখাকে পছন্দ করেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الله عز وجل حليم حيي ستير؛ يحب الحياء والستر؛ فإذا اغتسل أحدكم فليستتر» [أخرجه النسائي]. “আল্লাহ্ তা‘আলা ধৈর্যশীল, গোপনকারী, তিনি লজ্জা ও গোপন রাখাকে পছন্দ করেন। তোমরা যখন গোসল করবে, তখন যেন অবশ্যই ঢেকে রাখে।[22]” [নাসায়ী] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «الإيمان بضع وسبعون شعبة، والحياء شعبة من الإيمان» [أخرجه مسلم]. “ঈমানের সত্তরেরও বেশি (তিন থেকে নয় সংখ্যা পর্যন্ত) শাখা রয়েছে, আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা”[23]। [মুসলিম] «وقد كان النبي صلى الله عليه و سلم أشد حياء من العذراء في خدرها». “আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন নিভৃতে অবস্থানকারী কুমারী নারীর চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন”[24]। লজ্জা অভিধানে حياء [লজ্জা] শব্দটি حياة [হায়াত] থেকে নির্গত। আর বলা হয়ে থাকে, استحيا الرجل যখন তার কাছে জীবনী শক্তি বেশি থাকে। সুতরাং লজ্জা অনুভূতির শক্তি ও সুক্ষ্মতা এবং জীবনী শক্তির কারণেই হয়ে থাকে। আর অন্তরের জীবন অনুসারেই সে মন বা অন্তরে লজ্জা চরিত্রের উদ্ভব ঘটে। আর حياء [লজ্জা] একজন মানুষের মধ্যে তিন কারণে হতে পারে। এক- আল্লাহ থেকে লজ্জা করা। দুই- মানুষ থেকে লজ্জা করা তিন- একজন তার নিজের থেকে লজ্জা করা। আল্লাহ থেকে লজ্জা: তার দাবী হচ্ছে, আল্লাহ্ তা‘আলা যা করার নির্দেশ দিয়েছেন, তা পালন করা, আর যা করা থেকে নিষেধ করেছেন, তা থেকে বিরত থাকা। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «استحيوا من الله حق الحياء، قال: قلنا: يا رسول الله، إنا نستحيي والحمد لله! قال: ليس ذاك؛ ولكن الاستحياء من الله حق الحياء أن تحفظ الرأس وما وعى، والبطن وما حوى، ولتذكر الموت والبلى، ومن أراد الآخرة ترك زينة الدنيا؛ فمن فعل ذلك فقد استحيا من الله حق الحياء» [أخرجه الترمذي]. “তোমরা আল্লাহকে লজ্জা করার মত লজ্জা কর, বর্ণনাকারি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! ‘আলহামদুলিল্লাহ’ আমরা তো লজ্জা করি। তিনি বললেন, এ লজ্জা নয়, আল্লাহকে পরিপূর্ণ লজ্জা করার অর্থ- তুমি তোমার মাথা এবং মাথা যা অন্তর্ভুক্ত করে, তার হেফাজত করবে। আর তুমি তোমার পেট ও পেট যা শামিল করে, তার হেফাজত করবে। আর তুমি মৃত্যু ও মৃত্যুর পরের পরিণতিকে বেশি বেশি স্মরণ করবে। যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে, সে দুনিয়ার সৌন্দর্যকে ছেড়ে দেবে। আর যে ব্যক্তি এ কাজগুলো করবে, সে অবশ্যই আল্লাহকে লজ্জা করার মত লজ্জা করল[25]। [তিরমিযী] এ প্রকারের লজ্জা সাধারণত একজন মানুষের দ্বীনের মধ্যে দৃঢ়তা ও ইয়াকীনের বিশুদ্ধতার কারণেই হয়ে থাকে। আর মানুষের থেকে লজ্জা করা: তার দাবী হচ্ছে, মানুষের দুঃখ, দুর্দশা ও কষ্টকে প্রতিহত করা এবং কোনো অন্যায় ও অশ্লীলতাকে প্রচার করা থেকে বিরত থাকা। এ প্রকারের লজ্জা মানুষ থেকে তখন সংঘটিত হয়, যখন একজন মানুষের মধ্যে মানবতা পুরোপুরি বিদ্যমান থাকে। আর সে মানুষের তিরস্কার ও  দুর্নামকে ভয় করবে। আর নিজের সত্তা থেকে লজ্জা করা: তার দাবী হচ্ছে, সচ্চরিত্র অবলম্বন করা ও একাকীত্বের সময়ে নিজেকে পবিত্র ও সংরক্ষণ করা। রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «الحياء لا يأتي إلا بخير» “লজ্জা মানুষের জন্য কল্যাণই বয়ে আনে”[26]। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «الحياء خير كله» “লজ্জার সবই কল্যাণকর।[27]” অথবা তিনি বলেন, «الحياء كله خير» “লজ্জা, তার সবই কল্যাণকর”[28]। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, «ما كان الحياء في شيء إلا زانه». “যে কোন বস্তুর মধ্যে লজ্জা পাওয়া গেলে তা তার মধ্যে সৌন্দর্য আনয়ন করে”[29]। এখানে «في شيء» শব্দটি মুবালাগা বা অতিরঞ্জন হিসেবে ব্যবহৃত। অর্থাৎ যদি নিষ্প্রাণ বস্তুর মধ্যেও যখন লজ্জা থাকে, আল্লাহ তার সম্মান বাড়িয়ে দেন। সুতরাং যদি একজন মানুষের মধ্যে লজ্জা থাকে তখন তার অবস্থা কেমন হতে পারে?! গোপন করা বা ঢেকে রাখা: আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿يَٰبَنِيٓ ءَادَمَ قَدۡ أَنزَلۡنَا عَلَيۡكُمۡ لِبَاسٗا يُوَٰرِي سَوۡءَٰتِكُمۡ وَرِيشٗاۖ وَلِبَاسُ ٱلتَّقۡوَىٰ ذَٰلِكَ خَيۡرٞۚ ٢٦﴾ [الاعراف: ٢٦] “হে বনী আদম, আমি তো তোমাদের জন্য পোশাক অবতীর্ণ করেছি, যা তোমাদের লজ্জা-স্থান ঢাকবে এবং যা সৌন্দর্যস্বরূপ। আর তাকওয়ার পোশাক তা উত্তম”। [সূরা আরাফ, আয়াত: ২৬] আল্লাহ্ তা‘আলা আদম সন্তানদের লজ্জা-স্থান ও দেহকে ঢেকে রাখার নির্দেশ দেন। কারণ, আল্লাহ্ তা‘আলা পর্দা করাকে পছন্দ করেন এবং উলঙ্গ হওয়াকে ঘৃণা করেন। অনুরূপভাবে  আল্লাহর রাসূলও পর্দা করা এবং সতরকে ডেকে রাখার প্রতি যত্নবান হতে নির্দেশ দেন। আর বিবস্ত্র হওয়া হতে নিষেধ করেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إياكم والتعري» “তোমরা উলঙ্গ হওয়া থেকে বেঁচে থাক”[30]। চৌদ্দ. মুসিবতে আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি জ্ঞাপনকে আল্লাহ পছন্দ করেন: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن عظم الجزاء مع عظم البلاء، وإن الله إذا أحب قومًا ابتلاهم؛ فمن رضي فله الرضا، ومن سخط فله السخط» [أخرجه الترمذي]. “নিশ্চয় বড় পুরষ্কার বড় মুসিবতের বিনিময়ে প্রাপ্ত হয়। আর নিশ্চয় আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন তখন তাদের উপর বিপদাপদ দেন, সুতরাং যে সন্তুষ্ট হবে, তার জন্য সন্তুষ্টি থাকবে, আর যে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করবে, তার জন্য অসন্তুষ্টিই থাকবে[31]।” মুসিবতে সন্তুষ্টচিত্ত থাকে এমন বান্দাকে আল্লাহ্ তা‘আলা মহব্বত করেন, তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা বিভিন্ন ধরনের মুসিবত ও বিপদ-আপদ দিয়ে পরীক্ষা করেন; তখন সে ধৈর্য ধারণ করে ‘ইন্না লিল্লাহ’ পড়ে এবং আল্লাহর দরবারে মুসিবত ও পরীক্ষা অনুযায়ী সাওয়াবের আশা করে। আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে যে সব মুসিবতে আক্রান্ত করেন, তা সে মেনে নেয়। আর তখন তার বিপদের পরিমানে তার জন্য সন্তুষ্টি ও পরিপূর্ণ সওয়াব নির্ধারিত হবে। আর দুনিয়াতে মুমিনদের যে সব মুসিবত হয়ে থাকে, তা শুধু আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণে হয় না, বরং কোনো অন্যায়কে প্রতিহত করা অথবা গুনাহগুলো ক্ষমা করা অথবা সম্মান বৃদ্ধি করার জন্য হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «ما من مسلم يصيبه أذى إلا حاتَّ الله عنه خطاياه؛ كما تحاتُّ ورق الشجر» [أخرجه البخاري]. “কোন মুসলিম যখন কোনো কষ্টের মুখোমুখি হয়, তখন আল্লাহ্ তা‘আলা তার গুনাহসমূহ এমনভাবে ঝেড়ে ফেলে দেন, যেমন গাছের পাতাগুলো ঝরে পড়ে যায়”[32]। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সু-সংবাদ প্রতিটি মুমিনের জন্য। কারণ, অধিকাংশ মানুষ অসুস্থতা, পেরেশানি, দুশ্চিন্তা ইত্যাদিতে লিপ্ত থাকে। বিপদ-আপদ মানুষ থেকে কখনো পৃথক হয় না। [ফলে এ ধরনের সু-সংবাদ তাদের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।] আর মুসিবতের উপর ধৈর্য ধারণ করা, মুসিবতে আক্রান্ত হওয়ার প্রারম্ভেই করতে হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথার প্রতি ইশারা করে বলেন, «إنما الصبر عند الصدمة الأولى» “ধৈর্য তো আঘাতের প্রারম্ভেই”[33]। এ হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ কথার প্রতি ইশারা করেন, মানুষের জন্য কষ্টকর ধৈর্য এবং যে ধৈর্যের উপর তাকে অধিক সাওয়াব দেয়া হবে, তা হল, মুসিবত সংঘটিত হওয়ার শুরুতে ধৈর্য ধারণ করা এবং যখন হঠাৎ মুসিবতের খবর শোনে তখন ধৈর্য ধারণ করা। ঐ সময় যখন একজন মানুষ তা মেনে নেয় এবং ধৈর্য ধারণ করে, তখন প্রমাণিত হয়, লোকটির অন্তর মজবুত, ধৈর্যের স্থানে সে অটল ও অবিচল। কিন্তু যখন মুসিবতের উত্তেজনা কমে যায় এবং প্রশমিত হয়, তখন সবাই ধৈর্য ধারণ করে এবং এ ছাড়া আর কোনো উপায়ও থাকে না। একজন মানুষ এ দুনিয়াতে সব সময় বিপদ-আপদ, ফিতনা-ফাসাদ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদির সম্মুখীন হতেই থাকে। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿وَنَبۡلُوكُم بِٱلشَّرِّ وَٱلۡخَيۡرِ فِتۡنَةٗۖ وَإِلَيۡنَا تُرۡجَعُونَ ٣٥ ﴾ [الانبياء: ٣٥] “আর ভালো ও মন্দ দ্বারা আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমার কাছেই তোমাদেরকে ফিরে আসতে হবে”। [সূরা আম্বিয়া, আয়াত: ৩৫] অর্থাৎ আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের পরীক্ষা করে থাকি, বলা-মুসিবত ও নেয়ামত, তোমাদের কষ্ট ও সুখ, রোগ ও সুস্থতা, ধন-সম্পদ ও অভাব ইত্যাদি দিয়ে। অনুরূপভাবে হালাল ও হারাম, আনুগত্য ও নাফরমানি, হেদায়াত ও গোমরাহি দিয়েও তোমাদের পরীক্ষা করা হয়। শুধু মুখে কালেমা উচ্চারণ করা দ্বারা একজন মানুষ ঈমানের মর্যাদায় পৌঁছুতে পারে না। বরং যে ঈমানের দাবি করে তাকে অবশ্যই পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। এ কথার সমর্থন হচ্ছে আল্লাহর বাণী: ﴿أَحَسِبَ ٱلنَّاسُ أَن يُتۡرَكُوٓاْ أَن يَقُولُوٓاْ ءَامَنَّا وَهُمۡ لَا يُفۡتَنُونَ ٢ وَلَقَدۡ فَتَنَّا ٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِهِمۡۖ فَلَيَعۡلَمَنَّ ٱللَّهُ ٱلَّذِينَ صَدَقُواْ وَلَيَعۡلَمَنَّ ٱلۡكَٰذِبِينَ ٣ ﴾ [العنكبوت: ٢،  ٣] “মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না। আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী”। [সূরা আনকাবুত, আয়াত: ২,৩] আল্লাহ আরও বলেন, ﴿وَلَنَبۡلُوَنَّكُمۡ حَتَّىٰ نَعۡلَمَ ٱلۡمُجَٰهِدِينَ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰبِرِينَ وَنَبۡلُوَاْ أَخۡبَارَكُمۡ ٣١ ﴾ [محمد: ٣١] “আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব যতক্ষণ না আমি প্রকাশ করে দেই তোমাদের মধ্যে কারা জিহাদ-কারী ও ধৈর্যশীল”। [সূরা মুহাম্মদ, আয়াত: ৩১] পরীক্ষার কারণ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ﴿ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلۡمَوۡتَ وَٱلۡحَيَوٰةَ لِيَبۡلُوَكُمۡ أَيُّكُمۡ أَحۡسَنُ عَمَلٗاۚ ٢ ﴾ [الملك: ٢] “যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন যাতে তিনি তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে পারেন যে, কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম”। [সূরা মুলুক, আয়াত: ২] বিপদ-আপদের সম্মুখীন হওয়া আল্লাহর পক্ষ হতে বান্দার জন্য পরীক্ষা। বান্দা কি সন্তুষ্ট হয় নাকি অসন্তুষ্ট হয়, সে কি ধৈর্য ধারণ করে, নাকি চিল্লা-পাল্লা করে, সে কি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে নাকি আল্লাহর নেয়ামতকে অস্বীকার করে? আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শেখান, মুসিবতের সময় আমরা যেন আল্লাহর নিকট দো‘আ করি এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াব ও বিনিময় প্রার্থনা করি এবং যে মুসিবতে নিপতিত হয়েছে তা থেকে উত্তম বিনিময় কামনা করি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «ما من مسلم تصيبه مصيبة فيقول ما أمره الله: إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ، اللهم آجرني في مصيبتي واخلف لي خيرًا منها، إلا أخلف الله له خيرًا منها». “যখন কোন মুসলিম ভাই মুসিবতে আক্রান্ত হয়, তারপর সে আল্লাহ্ তা‘আলা যা বলার নির্দেশ দিয়েছে, তা বলে, অর্থাৎ সে বলে, (إنا لله وإنا إليه راجعون) ‘আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকেই আমাদের প্রত্যাবর্তনকারী। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার মুসিবতে সাওয়াব দান কর, আর আমার জন্য এর চেয়ে উত্তম বদলা দাও!’ তাহলে আল্লাহ্ তা‘আলা তাকে পূর্বের তুলনায় উত্তম প্রতিদান ও বদলা দান করবেন”। অনুরূপভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়ে দেন, আমরা যখন কোনো বিপদে আক্রান্ত লোক দেখি, তখন প্রথমে আল্লাহ্ তা‘আলা আমাকে যে তা থেকে মুক্তি দিয়েছেন, তার উপর আল্লাহর প্রশংসা করি। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «من رأى مبتلى فقال: الحمد لله الذي عافاني مما ابتلاك به، وفضلني على كثير ممن خلق تفضيلاً، لم يصبه ذلك البلاء» [أخرجه الترمذي].  যে ব্যক্তি কোনো আক্রান্ত ব্যক্তিকে দেখে এ দো‘আ পাঠ করে, الحمد لله الذي عافاني مما ابتلاك به، وفضلني على كثير ممن خلق تفضيلاً [অর্থ, সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি তোমাকে যে বিপদে আক্রান্ত করেছেন তা থেকে আমাকে নিরাপদ রেখেছেন এবং আমাকে তিনি তার মাখলুক থেকে অনেক মাখলুকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।] তাকে এ মুসিবত কখনো স্পর্শ করবে না”[34]। [তিরমিযী] পনের: আল্লাহ্ তা‘আলা আমলকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করাকে পছন্দ করেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «إن الله تعالى يحب من العامل إذا عمل أن يحسن» “নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা একজন আমলকারী থেকে সুন্দর আমলকে পছন্দ করে যখন সে আমল করে”[35]। সুন্দর আমল হল, ইখলাস এবং তা ইনসাফের সাথে আদায় করা। আর আল্লাহ্ তা‘আলা একজন আমলকারি যখন কোনো আমল করে, তখন সে যাতে সুন্দর আমল করে, তা তিনি পছন্দ করেন। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি আল্লাহর আমানতকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী যথাস্থানে আদায় করে এবং আল্লাহর ইবাদত হতে বিমুখ হয় না, তাকে পছন্দ করেন। যেমন, আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿رِجَالٞ لَّا تُلۡهِيهِمۡ تِجَٰرَةٞ وَلَا بَيۡعٌ عَن ذِكۡرِ ٱللَّهِ وَإِقَامِ ٱلصَّلَوٰةِ وَإِيتَآءِ ٱلزَّكَوٰةِ يَخَافُونَ يَوۡمٗا تَتَقَلَّبُ فِيهِ ٱلۡقُلُوبُ وَٱلۡأَبۡصَٰرُ ٣٧﴾ [النور: ٣٧] “সে সব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় আল্লাহর যিকির, সালাত কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করা থেকে বিরত রাখে না। তারা সেদিনকে ভয় করে, যেদিন অন্তর ও দৃষ্টিসমূহ উল্টে যাবে”। [সূরা নূর, আয়াত: ৩৭] এখানে আল্লাহ্ তা‘আলা ব্যবসার কথা উল্লেখ করেছেন। কারণ, মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে বিরত রাখার যত উপকরণ আছে, তার মধ্যে ব্যবসাই হল সব চেয়ে বড় উপকরণ। আল্লাহর ইবাদতসমূহ থেকে বড় গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হল সালাত। এ কারণে আল্লাহ্ তা‘আলা ঐসব লোকদের প্রশংসা করেন, যাদেরকে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য তাদের ইবাদত থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে না। নিঃসন্দেহে তারা ভালো কাজ করে এবং সুন্দর আমল করে। তারা তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, ইবাদত-বন্দেগী ও সালাতের সময়ের মাঝে সমন্বয় সাধন করে থাকে। ষোল: আল্লাহর নিকট দুটি ফোটা ও দুটি চিহ্ন সমস্ত বস্তু হতে অধিক প্রিয়: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «ليس شيء أحب إلى الله من قطرتين وأثرين؛ قطرة من دموع في خشية الله، وقطره دم تهراق في سبيل الله، وأما الأثران: فأثر في سبيل الله، وأثر في فريضةٍ من فرائض الله» [أخرجه الترمذي]. “দুটি ফোটা ও দুটি চিহ্ন থেকে অধিক প্রিয় কোনো বস্তু আল্লাহর নিকট নেই। এক- আল্লাহর ভয়ে নির্গত চোখের পানির ফোটা। দুই-আল্লাহর রাস্তায় প্রবাহিত রক্তের ফোটা। আর দুটি চিহ্ন: এক- আল্লাহর রাস্তায় আঘাতের চিহ্ন। দুই-আল্লাহর ফরযসমূহ থেকে কোনো ফরয আদায়ের চিহ্ন[36]।” [তিরমিযি] আল্লাহর ভয়ে ও বড়ত্বের চিন্তায় যে চোখ থেকে অশ্রুর ফোটা নির্গত হয়, তার চেয়ে অধিক প্রিয় বস্তু আল্লাহর নিকট আর কোনো বস্তু নেই। এ দুটি চোখকে কখনোই জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না। বরং যে ব্যক্তি এ ধরনের চোখের অধিকারী হবে, যে চোখ আল্লাহর ভয়ে কান্নাকাটি করে, যেদিন একমাত্র আল্লাহর আরশের ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবে না, সেদিন তাকে আল্লাহর আরশের ছায়া তলে ছায়া দেয়া হবে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, «سبعة يظلهم الله في ظله يوم لا ظل إلا ظله.. ورجل ذكر الله خاليًا ففاضت عيناه» [أخرجه البخاري]. “সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ্ তা‘আলা কিয়ামতের দিন তার ছায়ার তলে ছায়া দান করবেন। সেদিন আল্লাহর ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না… তার মধ্যে এক ব্যক্তি সে, যে নির্জনে আল্লাহর স্মরণ করে এবং তার চক্ষুদ্বয় থেকে অশ্রু প্রবাহিত হয়।”[37] [বুখারি] আল্লাহ্ তা‘আলা যে সব নবীদের বিশেষ নেয়ামত দান করেন, তাদের প্রশংসা করে বলেন, তারা যখন আল্লাহর আয়াতসমূহ শোনেন, তখন তারা সেজদাবনত হন এবং কান্নাকাটি করেন। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿إِذَا تُتۡلَىٰ عَلَيۡهِمۡ ءَايَٰتُ ٱلرَّحۡمَٰنِ خَرُّواْۤ سُجَّدٗاۤ وَبُكِيّٗا۩ ٥٨ ﴾ [مريم: ٥٨] “যখন তাদের কাছে পরম করুণাময়ের আয়াতসমূহ পাঠ করা হত, তারা কাঁদতে কাঁদতে সিজদায় লুটিয়ে পড়ত”। [সূরা মারিয়াম, আয়াত: ৫৮] ওমর রাদিয়াল্লাহ আনহু সূরা মারিয়াম তিলাওয়াত করেন, তারপর তিনি সেজদা করেন এবং বলেন, এ তো সেজদা, কান্না কোথায়? অর্থাৎ অশ্রু। আল্লাহ্ তা‘আলা যাদের ইলম দান করেছেন তাদের প্রশংসা করেন, তাদের নিকট যখন আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয়, তখন তারা কান্না-কাটি করে। আল্লাহ্ তা‘আলা বলেন, ﴿وَيَخِرُّونَ لِلۡأَذۡقَانِ يَبۡكُونَ وَيَزِيدُهُمۡ خُشُوعٗا۩ ١٠٩ ﴾ [الاسراء: ١٠٩] “আর তারা কাঁদতে কাঁদতে লুটিয়ে পড়ে এবং এটা তাদের বিনয় বৃদ্ধি করে।” [সূরা ইসরা, আয়াত: ১০৯] অনুরূপভাবে আল্লাহর ফরযসমূহ আদায়ে যে চিহ্ন পড়ে তার চেয়ে অধিক প্রিয় বস্তু আল্লাহর নিকট আর কিছুই হতে পারে না। যেমন, ঐ ব্যক্তি যে ফরযসমূহ আদায়, তার বাস্তবায়ন করা ও তার জন্য চেষ্টা করতে নিজেকে অনেক কষ্ট দেয়। যেমন শীতের দিনে অজুর পানি ব্যবহার করার কারণে পা ফেটে যাওয়া, রোজাদারের মুখের দুর্গন্ধ, জুমার সালাত আদায় করার উদ্দেশ্যে বা হজের উদ্দেশ্যে হাটার কারণে পায়ে ধুলা-বালির চিহ্ন পড়ে যাওয়া ইত্যাদি। فعن عبايه بن رفاعة قال: أدركني أبو عبس وأنا أذهب إلى الجمعة، فقال: سمعت رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول: «من اغبرت قدماه في سبيل الله، حرمه الله على النار» [أخرجه البخاري] উবায়া ইবন রেফায়া রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি জুমার সালাত আদায়ের জন্য যাচ্ছিলাম, পথিমধ্যে আমার সাথে আবু আব্বাসের দেখা হল, তখন তিনি আমাকে বললেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আল্লাহর রাস্তায় যার পা দুটি ময়লাযুক্ত হল, আল্লাহ্ তা‘আলা জাহান্নামের জন্য তাকে নিষিদ্ধ করে দিল”[38]।[বুখারি] এখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বাণী: «في سبيل الله» দ্বারা উদ্দেশ্য হল, যাবতীয় ইবাদত। এ হল, আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল সমূহের বর্ণনা যেগুলোকে একত্র করা আমার জন্য এ কিতাবে সহজ হয়েছে। অন্যথায় নেক আমলসমূহ যেগুলোর বিশেষ ফযিলত রয়েছে ও আল্লাহর নিকট প্রিয়, তার সংখ্যা এত বেশি যেগুলোর আলোচনা করে শেষ করা এখানে সম্ভব নয়। আমরা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট প্রার্থনা করি আল্লাহ্ তা‘আলা যেন আমাদের আল্লাহর নিকট যে আমলগুলো অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয়, সেগুলো করার তাওফিক দান করেন এবং আমাদের জন্য তার সন্তুষ্টি অর্জনের পথ সুগম করেন। আর আমাদের শেষ পরিণতি যে তার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে সমাপ্ত করেন। আমীন!!....

والحمد لله رب   [1] ইবন হিব্বান, ৩/৯৯; হাদীস নং ৮১৮। [2] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৭। [3] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৩৭৭। [4] মুসলিম, হাদীস নং ২১৩৭। [5] তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর ১/১৮১; হাদীস নং ৪৭১; আল-মু‘জামুল আওসাত্ব, ৬/২৬৮; হাদীস নং ৬৩৮০; ইবন হিব্বান, ২/২৩৬; হাদীস নং ৪৮৬; আল-হাকেম, আল-মুস্তাদরাক, ৪/৪৪৩; হাদীস নং ৮২১৪। [6] মুসলিম, হাদীস নং ৭৭১; আবু দাউদ, হাদীস নং ৭৬০; তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪২১; নাসায়ী, হাদীস নং ৮৯৭। [7] তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৮৭। [8] তিরমিযী, হাদীস নং ২০০৩। [9] মুসলিম, হাদীস নং ২৯৬৫। [10] বুখারী, হাদীস নং ৬৪৪৬। [11] মুসলিম, হাদীস নং ২৬২২। [12] তিরমিযী, হাদীস নং ১৩১৯। [13] মুসনাদে আহমাদ ৪/৩৮৫। [14] আত-তাবারানী, আল-মু‘জামুল কাবীর ৯/১০৯; হাদীস নং ৮৫৭২। [15] ইবন মাজাহ, হাদীস নং ৪১৮৯। [16] তিরমিযী, হাদীস নং ২০২১। [17] তিরমিযী, হাদীস নং ২০২৯। [18] বুখারী, হাদীস নং ৬০২৪। [19] মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৩। [20] মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯২। [21] মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৪। [22] আবু দাউদ, হাদীস নং ৪০১২। [23] মুসলিম, হাদীস নং ৩৫। [24] বুখারী, হাদীস নং ৩৫৬২। [25] তিরমিযী, হাদীস নং ২৪৫৮। [26] বুখারী, হাদীস নং ৬১১৭; মুসলিম, হাদীস নং ৩৭। [27] মুসলিম, হাদীস নং ৩৭। [28] মুসলিম, হাদীস নং ৩৭। [29] তিরমিযী, হাদীস নং ১৯৭৪। [30] তিরমিযী, হাদীস নং ২৮০০। দুর্বল সনদে। [31] তিরমিযী, হাদীস নং ২৩৯৬। [32] বুখারী, হাদীস নং ৫৬৪৭; মুসলিম, হাদীস নং ২৫৭১। [33] বুখারী, হাদীস নং ১৩০২; মুসলিম, হাদীস নং ৯২৬। [34] তিরমিযী, হাদীস নং ৩৪৩২। [35] বাইহাকী, শু‘আবুল ঈমান, ৭/২৩৪; হাদীস নং ৪৯৩২। [হাসান সনদে] [36] তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৬৯। [37] বুখারী, হাদীস নং ৬৬০। [38] বুখারী, হাদীস নং ৯০৭।

dc

আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আলামীন, ওয়াস স্বলাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিহিল কারীম, আম্মাবাদ:..

বর্তমান যুগের মুসলিমদের নামাযের সাথে যে সম্পর্ক ও সম্বন্ধ এবং নামাযীদের যে অবস্থা তাতে যেন স্বলাত আল্লাহর কাছে বহু ফরিয়াদ ও অভিযোগ জানাচ্ছে আর বর্তমান যুগের নামায ও নামাযীর করূণ অবস্থা বর্ণনা করছে। একটু শুনুন সেই অভিযোগ সমূহ কি এবং সে সবের রূপ-রেখা ও ধরণ কি? হে মহান আল্লাহ! তুমি আমাকে এত মর্যাদা দিয়েছ যে স্বয়ং তোমার প্রিয় নবী মুহাম্মদ স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মেরাজের মাধ্যমে সপ্তাকাশের উপরে নিয়ে এসে আমাকে তাঁকে প্রদান করলে কিন্তু আজ লোকেরা মেরাজ ঘটনাকে স্মরণ রেখেছে, তা উদযাপনও করছে কিন্তু আমাকে ভুলে গেছে, আমার কথা স্মরণ করে না, বর্ণনাও করে না! হে মহান আল্লাহ! তুমি আমাকে ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ভ বানালে, ইসলামের দ্বিতীয় খুটি হওয়ার সম্মান দিলে কিন্তু মুসলিমরা তো আজ আমাকে ছেড়েই নিজেকে খাঁটি মুসলিম বলছে, আসল মুসলিম ভাবছে! হে মহান আল্লাহ! তুমি তোমার নবীর মাধ্যমে উম্মতকে জানিয়ে দিলে যে, তোমাদের সন্তানদের বয়স যখন সাত বছর হবে তখন যেন তারা তাদের বাচ্চাদের স্বলাত সম্পাদন করার আদেশ দেয় কিন্তু আজ অবস্থা এমন যে অবিভাবকরাই নামায পড়ে না তারা সন্তানদের আর কি আদেশ করবে! হে মহান আল্লাহ! তুমি আদেশ করলে যেন লোকেরা আমাকে দিবা-রাতে পাঁচ বার আদায় করে কিন্তু লোকেরা আজ আমাকে ৭ দিনে এক বার আদায় করে! হে আমার রব্ব! তুমি আমাকে ৫ টাইম জামাআতের সাথে সংঘবদ্ধভাবে আদায় করার আদেশ করলে কিন্তু এদের অনেকে তো আমাকে তাদের ঘরের কোনে আদায় করে! হে আমার রব্ব! তুমি আদেশ দিলে যে, তারা যেন নামাযের ডাক শুনলে কেনা-বেচা ও কাজ-কাম ছেড়ে মসজিদে যায় কিন্তু এরা তো সেই সময়ই কেনা-বেচা বেশী করে, আড্ডা দেয়, চায়ের আসরে চা খায়, সিগারেট জ্বালিয়ে লম্বা টান দেয়, টিভি দেখে, খবর শুনে, খবরের কাগজ পড়ে আর অনেকে তো তাদের ঘরের জানালা ও দরজা বন্ধ করে দেয় যেন ভিতরে আজানের আওয়াজ না আসে! ইয়া আল্লাহ! তোমার অনেক বান্দা তো দুনিয়াবি জটিল জটিল বড় বড় বিদ্ব্যা অর্জন করেছে উঁচু উঁচু ডিগ্রি নিয়েছে। সেই ডিগ্রির ড. ম. দেখে লোকেরা তাদের মঞ্চের উপরে স্থান দেয়, তাদের কথা মন দিয়ে শুনে কিন্তু আমাকে সম্পাদন করার আগে তাদের দুচারটি দুআ ও কিছু সূরা মুখস্থ করতে হবে, একটু রিডিং পড়তে হবে তো তারা আর পারে না! তাদের জিহব্বা অসাড় হয়ে যায় আর নাকি জিভ নড়ে না! ইয়া আল্লাহ! এরা সবাই নিজের কাজ বুঝে, নিজ কাজের সময়-সূচিও বুঝে, সে যদি অজ্ঞ হয় তবুও নিজের কাজের রুটিন বুঝে। ফজরের সময় উঠে চার দোকানের চুলো জ্বলায়, প্রস্তুতি নেয়। গরু-ছাগল গোয়াল ঘর থেকে বের করে বাইরে বেঁধে দেয়। ফকির হলে আজ কোন্ গ্রামে যেতে হবে তাও স্থীর করে নেয় কিন্তু তাদের সময়-সূচি ও রুটিনে আমাকে স্থান দেয় না, আমার জন্য কোনো সূচি নির্ধারণ করে না! ইয়া আল্লাহ! এদের কিছু লোক বলছে: নামাজ পড়ে কে বড় লোক হয়েছে? এরা বড়লোকি ভাল বুঝে। এরা বড় লোক হতে খুব আগ্রহী তাই নামাজেও বড়লোকি খোঁজে। নামাজ পড়লে বড় লোক হওয়া যায় না এটা বুঝে কিন্তু নামায না পড়ে কতজন বড়লোক হল, তার হিসাব দিতে পারে না। আর নিজে এতদিন ধরে বেনামাযী থেকে কত মাল দৌলত অর্জন করলো, কত বড় ধ্বনি হল তা নিজেও বুঝে না। আসলে এরা বাহানাকারী। ইয়া আল্লাহ! এদের মধ্যে অনেকে এমন কথাও বলে যে, মুসলিম ঘরে জন্ম নিয়েছি, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়েছি, নামায না পড়লেও একদিন না একদিন জান্নাতে অবশ্যই যাব। এরা এমনি এমনি বিনা আমল করেই জান্নাত যেতে চায়। জাহান্নামে কিন্তু যেতে চায় না ! এদের কে বুঝাবে যে, নবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগে মুনাফেকরাও লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলত, নিজেকে মুসলিম হিসাবে পরিচয় দিত তার পরেও তাদের ঠিকানা জাহান্নামের সর্ব নিম্ন স্থানে কেন? ইয়া ইলাহী! আর যারা স্বলাত পড়ে তাদের অনেকের অবস্থা এই রকম যে, যখনই ইমামের সাথে তাকবীরে তাহরীমা ‘আল্লাহুআকবার’ বলে নামায শুরু করে, তখন তার মাথায় দুনিয়ার সব চিন্তা-ফিকর চলে আসে, যত পরিকল্পনা সব কিছুর বাস্তবায়ন এখানেই শুরু হয়ে যায়, অটোম্যাটিক ম্যাশিনের মত নামাযের যাতীয় কাজ করতে থাকে। আর যখন ইমাম আস্ সালামুআলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ বলে নামায সমাপ্ত করে তখন তার হঠাৎ মনে পড়ে যে, যাহ! আমি তো নামাযে ছিলাম! ইয়া ইলাহী! তোমার কিছু নামাযী বান্দা তো এমন যে, নামাযের লাইনে দাঁড়ালে যেন তার কাপড়-চপড় ঠিক করার সময় হয়। নামায শুরুর সাথে সাথে সে তার প্যান্ট-পায়জামা টেনে উপরে তুলে। এই কাজ শেষ হলে পাঞ্জাবী-সার্টের কোনা ধরে টেনে-টেনে সোজা করে। এটা শেষ হলে টুপিটাকে এদিক ওদিক ঘুরিয়ে সঠিক স্থানে বসায়। কাপড়ের ভাঁজ যেন নষ্ট না হয় তাই রুকুতে যাওয়া ও উঠার সময় এবং সাজদা করা ও উঠার সময় একবার করে জামা-কাপড় সোজা করে নেয়। আর এভাবেই নামায সমাপ্ত করে। ইয়া ইলাহী! অনেক নামাযী এমন রয়েছে যে, নামায শুরু করলেই যেন তার যত স্থানের চুলকানি আছে সব শুরু হয়। মাথা চুলকায়, দাড়ি চুলকায়, আগে-পিছে চুলকায়, এমন এমন স্থান চুলকায় যেসব স্থানে মানুষ মানুষের সামনে চুলকাতে লজ্জাবোধ করে কিন্তু আমাকে আদায় করা অবস্থায় লজ্জা করেনা! আর কিছু লোক তো এমনও আছে যে, নামাযে দাঁড়িয়ে নাকে আঙুল ঢুকিয়ে মাথা বেঁকিয়ে নাকের ময়লা সাফ করতে থাকে। আমি কি চুলকানি বা নাক সাফ করার পাত্র!? হে আমার মাবূদ! বলতে লজ্জা লাগে, আজ-কাল কিছু নামাযী আমাকে গান শোনায়, মিউজিক শোনায়, টুংটাং রিং শোনায় (আউযু বিল্লাহ)। তোমার ঘরে প্রবেশ করে তোমার উদ্দেশ্যে বড় ইবাদত করতে আসে কিন্তু মোবাইল বন্ধ করে আসে না। এরা নামাযেও সেই পাপ করতে চায় যা তারা বাইরে করে। নামাযী হয়ে অন্য নামাযী ভাইয়ের খুশু-খুযু ও একাগ্রতায় বিঘ্ন ঘটায়। আর অনেকে তো এই সময় কিছুটা মুবাইলও চালায়। এদিক ওদিক টিপে প্রগ্রাম ও আইকোন খোঁজে বের করে বন্ধ করে! ইয়া রব্ব! কিছু নামাযী নামাযে দাঁড়িয়ে তার দোকান-পাটের হিসাব নিকাশ করে। কত বিক্রয় হল, আর কত হবার সম্ভাবনা আছে, কাকে কত দিয়েছে, কে কত পাবে, কি ওয়াডার দিবে ইত্যাদি। আমি কি অংক কশার স্থান! রাব্বী! কেউ তো এমনও আছে যার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সহীহ সালামত রয়েছে তার পরেও নামাযে দাঁড়ালে বিষেশ এক পশুর মত এক পায়ে ভোর দিয়ে দাঁড়ায় আর এক পা এমনি খাড়া রাখে। এতটুকুও বুঝে না যে, সে কার সামনে দাঁড়িয়েছে! হে আমার মালিক! অনেকে নামাযে আসে কিন্তু এত দ্রুত গতিতে স্বলাত সম্পাদন করে যে, রুকু সাজদায় স্থীর হয় না আধা ঝুকেই উঠে যায়। এত দ্রুত গতিতে দুআ ও যিকর পাঠ করে যে তা স্বাভাবিকরূপে বোধগম্য নয়। সাজদায় কেবল কপাল ঠেকিয়েছে কিন্তু এখনও নাক ঠেকাইনি তার আগেই উঠে যায়। আর সালাম শেষ হলে যেন, মশা মাছিতে কাটছে তাই ঝট-পট বেরিয়ে যায়; অথচ দেখা যায় মসজিদ থেকে বের হয়ে সে বাইরে পরিচিতদের সাথে রাস্তায় গল্প করছে! নামাযে খুশু-খুযু অবলম্বনে সহায়ক বিষয়াদী: ১-নামায শুরু করার পূর্বে দুনিয়াবী কাজ-কর্ম সম্পূর্ণরূপে পরিত্যাগ করে নামাযে মনযোগ দেওয়া। ২-মনে এই অনুভুতি থাকা যে, সে মহিয়ান গরিয়ান সত্ত্বার সামনে দাঁড়াচ্ছে। ৩- নামাযের পরিপূর্ণ সওয়াব হাসিলের ইচ্ছা থাকা। ৪-ভালভাবে অযু করা, কোন অংশ না ছাড়া এবং পানি অপচয় না করা। ৫-নামায শুরু করার পূর্বে প্রস্তুতি নেওয়া। (খাবার-দাবার, পেশাব- পায়খানা সেরে নেওয়া এবং নামাযের জন্য কলাহল মুক্ত স্থান চয়ন করা।) ৬-জামাআতে নামায পড়া থেকে অবহেলা না করা। ৭-নফল নামায বিশেষ করে বিতর ও ফজরের সুন্নত না ছাড়া। ৮-নামাযে পাঠিতব্য আয়াত, দুআ ও যিকরের অর্থ স্মরণ করা ও বুঝার চেষ্টা করা। ৯-নামাযে তাড়াহুড়া না করা। এমন না করা যে, নামাযই যেন আপনার নিকট সবচেয়ে অবহেলার বিষয় কনোরূপে আদায় করলেই হল! ১০-নামাযের আদব রক্ষা করা আর তা হচ্ছে অনর্থক নড়াচড়া সহ ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় কাজ না করা। ১১- নামাযের নিয়ম সমূহ পালন করা এবং নিজের দৃষ্টি সাজদার স্থানে রাখা আর তাশাহ্হুদের সময় তর্জনি আংগুলের দিকে। ১২-সুতরা করার স্থান হলে সুতরা করে নেওয়া। ১৩-দুনিয়াবি কাজকর্ম ও ঝামেলা থেকে মুক্ত হওয়া এবং এমন ভাবা যে, সে সবের মূল্য আল্লাহর নিকট মশার ডানার মতও না। ১৩-এমন স্থানে নামায পড়া থেকে বিরত থাকা যেখানে বাদ্যযন্ত্র, ছবি, শব্দ ও চেঁচামেচি হয়। ১৪-এই অনুভূতি অন্তরে থাকা যে, হতে পারে এটি আমার শেষ নামায। আবার স্বলাত পড় তোমার স্বলাত হয়নি:

عن أبي هُرَيرةَ – رضي الله عنه -: أنَّ رجلاً دخل المسجد فصلَّى ورسولُ الله – صلَّى الله عليه وسلَّم – في ناحية المسجد، فجاءَ فسلَّم عليه، فقال: ((وعليك، ارجع فصلِّ؛ فإنَّك لم تُصلِّ بعدُ))، فرجع فسلَّم عليه، فقال: ((ارجعْ؛ فإنَّك لم تُصلِّ بعدُ))، فقال في الثالثة: فعَلِّمني يا رسولَ الله، فقال: ((إذا قُمتَ إلى الصلاة، فأسْبِغ الوضوء، ثم استقبل القِبلة فكَبِّر، ثم اقرأ بما تيسَّر معك مِن القرآن، ثم اركعْ حتى تطمئنَّ راكعًا، ثم ارفعْ حتى تعتدلَ قائمًا، ثم اسجدْ حتى تطمئنَّ ساجدًا، ثم ارْفعْ حتى تستوي قائمًا – أو قال: قاعدًا – ثم افعلْ ذلك في صلاتك كلِّه. আবু হুরাইরাহ (রাযি:) থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করল এবং নামায আদায় করল। ঐ সময় নবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদের এক প্রান্তে বসে ছিলেন। সে নামায শেষে রাসূল (সা:) কে সালাম করল। রাসূল সা: সালামের উত্তর দিলেন এবং তাকে বললেন: ফিরে যাও এবং স্বলাত পড় কারণ তুমি নামায পড় নি। সেই ব্যক্তি পুনরায় নামায পড়ল ও এসে আবার সালাম দিল। নবী সা: তাকে আবার বলেন: ফিরে যাও এবং স্বালাত পড় কারণ তুমি এখনও স্বলাত পড়নি। সে ব্যক্তি তৃতীয়বারে বলল: আল্লাহর রাসূল আমাকে নামায পড়া শিখিয়ে দিন। তখন নবী (সা:) তাকে বললেন: যখন নামাযে দাঁড়াবে ভালভাবে পূর্ণরূপে অযু করবে। অত:পর কিবলামুখী হয়ে তাকবীর দিবে। অত:পর কুরআন থেকে যা তোমার জন্য সহজ তা পাঠ করবে। অত:পর রুকু করবে ও রুকুতে স্থীর হবে। তারপর বরাবর হয়ে দাঁড়াবে। তারপর সাজদা করবে এবং সাজদায় স্থীর হবে অত:পর বরাবর হয়ে বসবে। সমগ্র নামাযেই এমন করবে।” [বুখারী নং ৭৫৭, ৬২৫১ মুসলিম নং ৩৯৭]

যায়দ বিন অহাব বলেন: “আমরা হুযাইফা (রাযি:) এর সাথে এক মসজিদে বসে ছিলাম ইতিমধ্যে এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে নামায আদায় করতে লাগলো কিন্তু সে রুকু ও সাজদা পূর্ণরূপে করলো না। তার নামায শেষ হলে সাহাবী হুযাইফা তাকে জিজ্ঞাসা করলেন: কত দিন যাবত এই ভাবে স্বলাত পড়ছো? সে বলল প্রায় চল্লিশ বছর ধরে। তিনি বললেন: তুমি চল্লিশ বছর ধরে স্বালাত আদায় করনি। আর এই ধরনের নামায পড়া অবস্থায় যদি তুমি মারা যাও তাহলে তুমি মুহাম্মদ স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রেখে যাওয়া সুন্নাতের উপর মৃত্যু বরণ করবে না।” [বুখারী নং৭৫৮]

নামাযে খুশু-খুযু তথা ইখলাস ও একাগ্রতার জন্য যেমন নামায আদায়ের সময় উপরোক্ত বিষয়গুলির খেয়াল রাখা প্রয়োজন তেমন নামায আদায়ের বাইরে নিম্নোক্ত বিষয়গুলির খেয়াল রাখাও আবশ্যিক। ১-তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা। ২-সুমহান আল্লাহর মর্যাদা ও ইখলাস অন্তরে থাকা এবং প্রকাশ্যে ও গোপনে তাঁর সম্মান করা। ৩-রাসূল স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পূর্ণ অনুসরণ করা। ৪-তাক্বওয়া তথা আল্লাহর আদেশসমূহ পালন করা এবং নিষেধসমূহ হতে বিরত থাকা। ৫-হালাল রুযি ভক্ষণ করা এবং হারাম ও সন্দিহান বিষয় পরিহার করা। ৬-খুশু-খুযু অর্জনে আল্লাহর কাছে দুআ করা। মহান আল্লাহর কাছে দুআ করি তিনি যেন আমাদের সত্যিকারে নামাযী হওয়ার তাওফীক দেন। আমীন।

প্রশ্ন: আমি যদি অলসতা করে নামায না পড়ি আমি কি কাফের হিসেবে গণ্য হব? নাকি গুনাহগার মুসলমান হিসেবে গণ্য হব?

উত্তর: আলহামদুলিল্লাহ। ইমাম আহমাদ এর মতানুযায়ী, অলসতা করে নামায বর্জনকারী কাফের এবং এটাই অগ্রগণ্য মত। কুরআন, হাদিস, সফলে সালেহীন এর বাণী ও সঠিক কিয়াস এর দলিল এটাই প্রমাণ করে।[আল-শারহুল মুমতি আলা-যাদিল মুসতানকি (২/২৬)] কেউ যদি কুরআন-সুন্নাহর দলিলগুলো গবেষণা করে দেখেন তাহলে দেখতে পাবেন যে, দলিলগুলো প্রমাণ করছে যে, বে-নামাযী ইসলাম নষ্টকারী বড় কুফরিতে লিপ্ত। এ বিষয়ে কুরআনের দলিল হচ্ছে- “অতএব তারা যদি তওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয়, তবে তারা তোমাদের দ্বীনি ভাই।”[সূরা তওবা, আয়াত: ১১] দলিলের বিশ্লেষণ হচ্ছে-আল্লাহ্‌ তাআলা মুশরিকদের মাঝে ও আমাদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব সাব্যস্তের জন্য তিনটি শর্ত করেছেন: শির্ক থেকে তাওবা করা, নামায কায়েম করা ও যাকাত আদায় করা। যদি তারা শির্ক থেকে তওবা করে কিন্তু নামায কায়েম না করে, যাকাত প্রদান না করে তাহলে তারা আমাদের ভাই নয়। আর যদি তারা নামাযও কায়েম করে কিন্তু যাকাত আদায় না করে তাহলেও তারা আমাদের ভাই নয়। কেননা কেউ দ্বীন থেকে সম্পূর্ণরূপে বেরিয়ে না গেলে তার দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব রহিত হবে না। পাপের কারণে কিংবা ছোট কুফরির কারণে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব রহিত হয় না। আল্লাহ্‌ তাআলা আরও বলেন: “অতঃপর তাদের পরে এল কিছু অপদার্থ উত্তরাধিকারী, তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল। কাজেই অচিরেই তারা ক্ষতিগ্রস্ততার সম্মুখীন হবে। কিন্তু তারা নয়— যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে। তারা তো জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তাদের প্রতি কোন যুলুম করা হবে না।”[সূরা মারিয়াম, আয়াত: ৫৯] দলিলের বিশ্লেষণ হচ্ছে- নামায নষ্টকারী ও কুপ্রবৃত্তির অনুসারীদের ব্যাপারে আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “কিন্তু তারা নয়— যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে” এতে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, নামায নষ্টকালীন ও কুপ্রবৃত্তির অনুসরণকালীন অবস্থায় তারা ঈমানদার ছিল না। বে-নামাযী কাফের হওয়ার ব্যাপারে সুন্নাহর দলিল: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: “মুমিন ব্যক্তি এবং শির্‌ক-কুফরের মাঝে পার্থক্য নির্ধারণকারী হচ্ছে- নামায বর্জন।” [সহিহ মুসলিমের কিতাবুল ঈমানে জাবের বিন আব্দুল্লাহ্‌ (রাঃ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন] বুরাইদা বিন আল-হাছিব (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি: “আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে প্রতিশ্রুতি হলো নামাযের। সুতরাং যে ব্যক্তি নামায ত্যাগ করল, সে কুফরি করল।”[মুসনাদে আহমাদ, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে তিরমিযি, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ।] এখানে কুফর দ্বারা মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কারকারী কুফর উদ্দেশ্য। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নামাযকে ঈমানদার ও কাফেরদের মাঝে পার্থক্য নির্ধারক বানিয়েছেন। এর ফলে মুসলিম সম্প্রদায় কাফের সম্প্রদায় থেকে আলাদা হয়ে গেল। সুতরাং যে ব্যক্তি এ প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবে না সে কাফের। এ বিষয়ে আওফ বিন মালেক (রাঃ) এর হাদিস রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমাদের নেতাদের মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে তোমরা যাদেরকে ভালোবাস এবং তারাও তোমাদেরকে ভালোবাসে, তারা তোমাদের জন্য দোয়া করে, তোমরাও তাদের জন্য দোয়া কর। আর তোমাদের সর্বনিকৃষ্ট নেতা হচ্ছে তোমরা যাদেরকে অপছন্দ কর এবং তারাও তোমাদেরকে অপছন্দ করে, তোমরা তাদের উপর লানত কর এবং তারাও তোমাদের উপর লানত করে। জিজ্ঞেস করা হল: ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কি তাদের বিরুদ্ধে তরবারী ধারণ করব না। তিনি বললেন: না; যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নামায কায়েম করে।” শাসকবর্গ যদি নামায কায়েম না করে তখন তাদের নেতৃত্ব মেনে না নেওয়া ও তাদের বিরুদ্ধে তরবারী ধারণ করার পক্ষে এ হাদিসে দলিল রয়েছে। শাসকবর্গের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত অস্ত্র ধারণ করা বৈধ নয় যতক্ষণ না তারা সুস্পষ্ট কুফরিতে লিপ্ত হয়; যে কুফরি কুফরি হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে। যেহেতু উবাদা বিন সামেত (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, “রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে দাওয়াত দিলেন। আমরা তাঁর হাতে বাইআত করলাম। তিনি যে যে বিষয়ে আমাদের কাছ থেকে বাইআত বা অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন এর মধ্যে ছিল, সুসময় ও দুঃসময়, আনন্দ ও বিষাদে এবং নিজেদের উপর অন্যদের অগ্রাধিকার প্রদান করলেও শাসকের আদেশ শ্রবণ ও আনুগত্য করব। তিনি আরও অঙ্গীকার নিলেন যে, (রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে) আমরা যেন যোগ্য ব্যক্তির সাথে (গদি নিয়ে) বিবাদে লিপ্ত না হই। তিনি বলেন: তবে তখন লিপ্ত হতে পার যদি দেখতে পাও যে, শাসক সুস্পষ্ট কুফরিতে লিপ্ত হয়েছে এবং এ ব্যাপারে তোমাদের কাছে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দলিল থাকে”[সহিহ বুখারী ও সহহি মুসলিম] এ হাদিসের ভিত্তিতে জানা গেল যে, নামায বর্জন করা সুস্পষ্ট কুফরি; যে ব্যাপারে আমাদের কাছে আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে দলিল রয়েছে; যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শাসকদের সাথে মতভেদ করা ও তাদের বিরুদ্ধে তরবারী ধারণ করাকে নামায বর্জন করার সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। যদি কেউ বলে যে, এই দলিলগুলোকে এই অর্থে ব্যাখ্যা করা যায় কিনা যে, এখানে নামায বর্জন করা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে- নামাযের ফরযিয়তকে বা আবশ্যকতাকে অস্বীকার করে নামায বর্জন করা। উত্তরে আমরা বলব: না; এমন ব্যাখ্যা করা জায়েয নয় দুইটি সমস্যার কারণে: প্রথম সমস্যা: এতে করে শরিয়তপ্রণেতা যে কারণটির সাথে বিধানকে সম্পৃক্ত করেছেন সে কারণটিকে বাতিল করে দিতে হয়। কেননা শরিয়তপ্রণেতা কুফরের হুকুমকে সম্পৃক্ত করেছেন নামায বর্জনের সাথে; নামাযকে অস্বীকার করার সাথে নয়। অনুরূপভাবে দ্বীনি ভ্রাতৃত্বকে সম্পৃক্ত করেছেন নামায কায়েমের সাথে; নামাযের ফরযিয়তে স্বীকৃতি দেয়ার সাথে নয়। আল্লাহ্‌ তাআলা এ কথা বলেননি যে, যদি তারা তওবা করে এবং নামাযের ফরযিয়তের স্বীকৃতি দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেননি যে, “মুমিন ব্যক্তি এবং শির্‌ক-কুফরের মাঝে পার্থক্য নির্ধারণকারী হচ্ছে- নামাযের ফরযিয়তকে অস্বীকৃতি।” কিংবা তিনি এ কথাও বলেননি যে, “আমাদের ও তাদের (কাফেরদের) মধ্যে প্রতিশ্রুতি হলো নামাযের ফরযিয়তের স্বীকৃতি। সুতরাং যে ব্যক্তি নামাযের ফরযিয়তকে অস্বীকার করল, সে কুফরি করল।” যদি এর দ্বারা আল্লাহ্‌ ও আল্লাহ্‌র রাসূলের উদ্দেশ্য হত নামাযের ফরযিয়তের অস্বীকৃতি; তাহলে এভাবে উল্লেখ না করে অন্যভাবে উল্লেখ করায় সেটা স্পষ্ট বিবৃতি হত না; যে স্পষ্ট বিবৃতি নিয়ে কুরআন আগমন করেছে। আল্লাহ্‌ তাআলা বলেন: “আর আমরা আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ।”[সূরা নাহল, আয়াত: ৮৯] আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর নবীকে সম্বোধন করে বলেন: আর আপনার প্রতি আমরা কুরআন নাযিল করেছি, যাতে আপনি মানুষকে যা তাদের প্রতি নাযিল করা হয়েছে তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেন।” [সূরা নাহল, আয়াত: ৪৪] দ্বিতীয় সমস্যা: এমন একটি কারণকে বিধানের সাথে সম্পৃক্ত করা শরিয়তপ্রণেতা যেটাকে বিধানের সাথে সম্পৃক্ত করেননি। যে ব্যক্তি পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের ফরযিয়তকে অস্বীকার করে সে ব্যক্তি যদি অজ্ঞতার কারণে যাদের ওজর গ্রহণযোগ্য এমন শ্রেণীর লোক না হয় তাহলে অস্বীকারের কারণেই তার কুফরী সাব্যস্ত হবে; চাই সে নামায আদায় করুক কিংবা নামায বর্জন করুক। যদি ধরে নিই, এক ব্যক্তি নামাযের যাবতীয় শর্ত, রুকন, ওয়াজিব ও মুস্তাহাব পরিপূর্ণ করে পাঁচ ওয়াক্ত নামায আদায় করেছে; কিন্তু সে কোন প্রকার ওজরগ্রস্ত না হয়েও নামাযের ফরযিয়তকে অস্বীকার করে— সে ব্যক্তি কাফের; অথচ সে নামায বর্জন করেনি। এতে করে জানা গেল যে, এ দলিলগুলোকে নামাযের ফরযিয়তকে অস্বীকার করার অর্থে গ্রহণ করা— সঠিক নয়। সঠিক অভিমত হচ্ছে- নামায বর্জনকারী কাফের; এমন কাফের যে কুফরি ব্যক্তিকে মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কার করে দেয়। ইবনে আবু হাতিম কর্তৃক সংকলিত ‘সুনান’ গ্রন্থে উবাদা বিন সামেত এর হাদিসে তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে ওসিয়ত করে গেছেন আমরা যেন আল্লাহ্‌র সাথে কোন কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত না করি, ইচ্ছাকৃতভাবে নামায বর্জন না করি, কেননা যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে নামায বর্জন করবে সে ব্যক্তি (মুসলিম) মিল্লাত থেকে বেরিয়ে যাবে।” এ ছাড়া আমরা যদি এ দলিলগুলোকে নামাযের ফরযিয়তকে অস্বীকার করার অর্থে গ্রহণ করি তাহলে এ দলিলগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে নামাযকে উল্লেখ করার তো কোন অর্থ থাকল না। কারণ এই হুকুম তো যাকাত, সিয়াম, হজ্জ এগুলোর ক্ষেত্রেও আম। কেউ যদি ফরযিয়তকে অস্বীকার করে এ আমলগুলোর কোন একটিকে বর্জন করে; সে যদি অজ্ঞতার কারণে যাদের ওজর গ্রহণযোগ্য এমন শ্রেণীভুক্ত না হয় তাহলে সে কাফের হয়ে যাবে। নামায বর্জনকারীর কাফের হওয়া যৌক্তিক দলিলেরও দাবী; যেমনটি শ্রুত দলিলের দাবী। কিভাবে কোন ব্যক্তির ঈমান থাকবে যদি সে দ্বীনের মূল ভিত্তি নামাযকেই বর্জন করে। অথচ নামাযের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধকারী এমন কিছু দলিল এসেছে, যেগুলোর দাবী হচ্ছে- প্রত্যেক আকলসম্পন্ন ঈমানদার নামায আদায় করবে, এক্ষেত্রে কোন গড়িমসি করবে না এবং নামায বর্জনের ব্যাপারে এমন কিছু দলিল এসেছে যেগুলোর দাবী হচ্ছে- প্রত্যেক আকলসম্পন্ন ঈমানদার নামায বর্জন করা থেকে বিরত থাকবে। সুতরাং দলিলের এমন দাবী প্রতিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও নামায বর্জন করলে সে বর্জনের সাথে আর ঈমান থাকে না। যদি কেউ বলে: নামায বর্জনকারীর কুফরি দ্বারা নেয়ামতকে কুফর করা তথা নেয়ামতকে অস্বীকার করা উদ্দেশ্য নেয়া যায় না? কিংবা বড় কুফরকে উদ্দেশ্য না নিয়ে ছোট কুফরকে উদ্দেশ্য নেয়া যায় না? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঐ বাণী মত: “মানুষের মাঝে দুইটি কুফরি রয়েছে। একটি হচ্ছে- বংশের উপর অপবাদ দেয়া ও মৃতব্যক্তির জন্য বিলাপ করা” এবং ঐ বাণীর মত: “মুসলমানকে গালি দেয়া পাপের কাজ; আর মুসলমানের সাথে লড়াই করা কুফরি” এবং এ জাতীয় অন্যান্য হাদিস? আমরা বলব, এমন ব্যাখ্যা করা নিম্নোক্ত কারণে সঠিক নয়: ১। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুফর ও ঈমানের মাঝে এবং ঈমানদার ও কাফেরদের মাঝে একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যে সীমারেখার কারণে নির্ধারিত বিষয়ের একটি অপরটি থেকে আলাদা হয়ে গেছে। তাই নির্ধারিত বিষয়ের একটি অপরটির মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না। ২। নামায হচ্ছে ইসলামের অন্যতম একটি রোকন। তাই নামায বর্জনকারীকে কাফের বলার দাবী হচ্ছে এ কুফর ইসলাম নষ্টকারী কুফর। কেননা নামায বর্জনকারী ইসলামের একটি রোকনকে ধ্বংস করেছে। পক্ষান্তরে, কোন ব্যক্তির কুফরি কাজকে কুফরি বলা— এ রকম নয়। ৩। এছাড়া আরও কিছু দলিল রয়েছে যে দলিলগুলো প্রমাণ করে যে, নামায বর্জনকারী কাফের, মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কৃত। যাতে করে, দলিলগুলো একটি অপরটির সাথে খাপ খায়, সাংঘর্ষিক না হয়। ৪। নামায বর্জনকারীর ক্ষেত্রে যখন কুফর বলা হয়েছে তখন كفر শব্দের শুরুতে الْ যুক্ত করে الكفر বলা হয়েছে। ال যুক্ত করে الكفر বলাতে এ প্রমাণ পাওয়া যায় যে, এখানে কুফর দ্বারা এর হাকীকী বা প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য। পক্ষান্তরে, نكرة এর শব্দ হিসেবে এর كُفْرٌ শব্দের ব্যবহার কিংবা فعل হিসেবে كَفَرَ শব্দের ব্যবহার প্রমাণ করে যে, সংশ্লিষ্ট বিষয়টি কুফরি কিংবা সংশ্লিষ্ট কাজটির মাধ্যমে সে ব্যক্তি কুফরি করেছে। কিন্তু, এ কুফরি মুসলিম মিল্লাত থেকে বহিষ্কারকারী কুফরি নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া তাঁর রচিত ‘ইকতিদাউস সিরাতিল মুস্তাকীম’ গ্রন্থে (৭০) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী:  اثنتان في الناس هما بهما كفر (অর্থ- মানুষের মধ্যে দুইটি অভ্যাস রয়েছে; যে দুইটি কুফরি) সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন: তাঁর বাণী: هما بهما كفر এর অর্থ এ দুইটি খাসলত বা অভ্যাস মানুষের মধ্যে বিদ্যমান কুফরি। যেহেতু এ অভ্যাস দুইটি কুফরি যামানার কর্ম; তাই এ অভ্যাসদ্বয় কুফরিকর্ম। এ দুইটি মানুষের মধ্যে বিদ্যমান রয়েছে। তবে, কারো মধ্যে কুফরির কোন একটি শাখা বিদ্যমান থাকলে এর অর্থ এ নয় যে, সে ব্যক্তি ইসলাম থেকে বহিষ্কৃত কাফের; যতক্ষণ পর্যন্ত না তার মধ্যে প্রকৃত কুফরি পাওয়া যায়। অনুরূপভাবে কারো মধ্যে যদি ঈমানের কোন একটি শাখা পাওয়া যায় এর দ্বারা সে ব্যক্তি ঈমানদার হয়ে যাবে না; যতক্ষণ পর্যন্ত না তার মধ্যে ঈমানের মৌলিক বিশ্বাস ও হাকীকত পাওয়া যায়। الكُفْر শব্দটি ال দিয়ে ব্যবহৃত হওয়া যেমন হাদিসে এসেছে-  ” ليس بين العبد وبين الكفر أو الشرك إلا ترك الصلاة”, এবং نكرة হিসেবে হ্যাঁ-বোধক বাক্যে ব্যবহৃত হওয়া এ দুটোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।[উদ্ধৃতি সমাপ্ত] এর মাধ্যমে পরিষ্কার হলো যে, এই দলিলগুলোর দাবী হচ্ছে- কোন ওজর ছাড়া নামায বর্জনকারী ইসলাম ত্যাগকারী কাফের। সুতরাং ইমাম আহমাদের অভিমতই সঠিক এবং ইমাম শাফেয়ির দুই অভিমতের একটি অভিমতও এটা। ইবনে কাছির (রহঃ) তাঁর তাফসির গ্রন্থে আল্লাহ্‌র বাণী: فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ(অর্থ-তাদের পরে এল অযোগ্য উত্তরসূরীরা, তারা নামায নষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল)[সূরা মারিয়াম, আয়াত: ৫৯] এর তাফসির করার সময় এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। ইবনুল কাইয়্যেম তাঁর ‘আস-সালাত’ নামক কিতাবে উল্লেখ করেছেন যে, এটি শাফেয়ি মাযহাবের দুইটি অভিমতের একটি। ইমাম তাহাবি ইমাম শাফেয়ি থেকে এ অভিমতটি উদ্ধৃত করেছেন। জমহুর বা অধিকাংশ সাহাবীর অভিমতও এটাই। বরং কেউ কেউ এ মতের উপর সাহাবায়ে কেরামের ইজমা (ঐকমত্য) বর্ণনা করেছেন। আব্দুল্লাহ বিন শাকিক বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীগণ নামায ছাড়া অন্য কোন আমল বর্জন করাকে কুফরি হিসেবে দেখতেন না।”[সুনানে তিরমিযি, মুসতাদরেক হাকেম এবং হাকেম বলেছেন, এ বাণীটি সহীহাইনের শর্তে উত্তীর্ণ] প্রসিদ্ধ ইমাম ইসহাক বিন রাহুইয়া বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহিহ সনদে সাব্যস্ত হয়েছে যে, নামায বর্জনকারী কাফের। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যামানা থেকে আমাদের সময়কাল পর্যন্ত এটাই হচ্ছে আলেমদের অভিমত যে, কোন ওজর ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে নামায বর্জনকারী; নামাযের ওয়াক্ত পার হয়ে গেলে— কাফের। ইবনে হাযম উল্লেখ করেছেন যে, এ মতটি উমর (রাঃ), আব্দুর রহমান বিন আওফ (রাঃ), মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) ও আবু হুরায়রা (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী থেকে বর্ণিত আছে। তিনি আরও বলেন: আমরা এ সাহাবীদের সাথে মতবিরোধকারী কোন সাহাবীর কথা জানি না। মুনযিরি তাঁর তারগীব ও তারহীব নামক গ্রন্থে এ উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি আরও কিছু সাহাবীর নাম বৃদ্ধি করেন। তাঁরা হচ্ছেন- আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রাঃ), আব্দুল্লাহ্‌ বিন আব্বাস (রাঃ), জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ), আবুদ দারদা (রাঃ)। তিনি আরও বলেন: সাহাবী ছাড়া অন্যদের মধ্যে রয়েছেন, ইমাম আহমাদ (রহঃ), ইসহাক বিন রাহুইয়া (রহঃ), আব্দুল্লাহ্‌ বিন মুবারক (রহঃ), নাখায়ি (রহঃ), আল-হাকাম বিন উতাইবা (রহঃ), আইয়ুব আল-সিখতিয়ানি (রহঃ), আবু দাউদ আত-তায়ালিসি (রহঃ), আবু বকর ইবনে আবু শাইবা (রহঃ) ও যুহাইর বিন হারব (রহঃ) প্রমুখ।[উদ্ধৃত সমাপ্ত] আল্লাহ্‌ই ভাল জানেন।



DT- 01-03-2017

আদর্শ পরিবার গঠনে করণীয় ..

মানব সমাজের ভিত্তি পরিবার। স্বামী-স্ত্রীকে কেন্দ্র করে যা শুরু হয়। আদম-হাওয়া (আঃ)-এর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রথম মানব পরিবার গড়ে ওঠে। সৃষ্টির সূচনাকাল থেকে আজও এ পরিবার প্রথা চালু আছে। সারা দিনের কর্মক্লান্তি, বিভিন্ন কারণে মানব মনে পাওয়া দুঃখ-বেদনায় যেখানে সবাই শান্তি খোঁজে সেটা হ’ল পরিবার। যদি পরিবারে শান্তি-শৃংখলা থাকে তাহ’লে মানব জীবন সুখময় হয়। পক্ষান্তরে পরিবারে কাঙ্ক্ষিত শান্তি না থাকলে জীবন হয়ে ওঠে বিতৃষ্ণ, বিষাদময়। এজন্য দরকার একটি আদর্শ পরিবার। যা হবে মানুষের আরাম-আয়েশ ও সুখ-শান্তির আকর। তাই শান্তি-সুখের ঠিকানা আদর্শ পরিবার গঠনে করণীয় সম্পর্কে এ নিবন্ধের অবতারণা। পরিবার পরিচিতি : স্বামী-স্ত্রী, সন্তান-সন্ততি, পিতা-মাতা ও দাদা-দাদী নিয়ে গঠিত হয় পরিবার। পরিবারের সংজ্ঞায় Oxford ইংরেজী অভিধানে বলা হয়েছে, A group consisting of one or two parents their children. ‘পরিবার হ’ল পিতা বা মাতা অথবা পিতা-মাতা উভয় ও তাদের সন্তান-সন্ততির সমষ্টি’।[1] পরিবারের সূচনাকাল : পৃথিবীর প্রথম মানব হযরত আদম (আঃ) ও প্রথম মানবী হযরত হাওয়া (আঃ)-কে কেন্দ্র করে মানব জাতির প্রথম পরিবার গড়ে উঠেছিল জান্নাতে। এই প্রথম পরিবারের সদস্য স্বামী ও স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহ বলেছিলেন,يَاآدَمُ اسْكُنْ أَنْتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُوْنَا مِنَ الظَّالِمِيْنَ- ‘হে আদম! তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে অবস্থান কর এবং সেখান থেকে যা চাও খুশীমনে খাও। কিন্তু তোমরা দু’জন এই গাছটির নিকটে যেয়ো না। তাহ’লে তোমরা সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (বাক্বারাহ ২/৩৫)। এই প্রথম পরিবার থেকে মানব জাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে। এসম্পর্কে আল্লাহ বলেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوْا رَبَّكُمُ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيْرًا وَنِسَاءً وَاتَّقُوْا اللهَ الَّذِيْ تَسَاءَلُوْنَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ إِنَّ اللهَ كَانَ عَلَيْكُمْ رَقِيْبًا- ‘হে মানব জাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। যিনি তোমাদেরকে একজন মানুষ থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকে তার জোড়া সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর ঐ দু’জন থেকে অগণিত পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাঁর নামে তোমরা একে অপরের নিকট যাচ্ঞা করে থাক এবং আত্মীয়তার বন্ধন সম্পর্কে সতর্ক হও। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের উপর সদা সতর্ক তত্ত্বাবধায়ক’ (নিসা ৪/১)। অন্যত্র আল্লাহ আরো বলেন,يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَّأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوْبًا وَّقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوْا- ‘হে মানুষ! আমরা তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী থেকে। তারপর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে, যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হ’তে পার’ (হুজুরাত ৪৯/১৩)। অনুরূপভাবে সকল নবী-রাসূলের ব্যক্তিগত জীবনে ও সময়কালে পরিবার বিদ্যমান ছিল। যেমন আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلاً مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً ‘তোমার পূর্বেও আমরা অনেক রাসূল প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তানাদি দিয়েছি’ (রা‘দ ১৩/৩৮)। হযরত ইবরাহীম (আঃ) স্বীয় পরিবারের জন্য দো‘আ করেছিলেন,رَبَّنَا وَاجْعَلْنَا مُسْلِمَيْنِ لَكَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِنَا أُمَّةً مُّسْلِمَةً لَكَ وَأَرِنَا مَنَاسِكَنَا وَتُبْ عَلَيْنَا إِنَّكَ أَنْتَ التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ- ‘হে আমাদের পালনকর্তা! আপনি আমাদেরকে আপনার আজ্ঞাবহ করুন এবং আমাদের বংশধরগণের মধ্য হ’তেও আপনার অনুগত একটা দল সৃষ্টি করুন। আর আপনি আমাদেরকে আমাদের হজ্জের নিয়ম-পদ্ধতি বাৎলে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি অধিক তওবা কবুলকারী ও দয়াময়’ (বাক্বারাহ ২/১২৮)। পরিবারের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা : পরিবার মানব সমাজের মূল ভিত্তি। পারিবারিক জীবন ব্যতিরেকে মানব সভ্যতা কল্পনা করা যায় না। মানুষের অস্তিত্বের জন্য পারিবারিক জীবন অপরিহার্য। সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা, উন্নতি-অগ্রগতি ইত্যাদি সুষ্ঠু পারিবারিক ব্যবস্থার উপরে অনেকাংশে নির্ভরশীল। পারিবারিক জীবন অশান্ত ও নড়বড়ে হ’লে, তাতে ভাঙ্গন ও বিপর্যয় দেখা দিলে সমাজ জীবনে নানা অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হ’তে বাধ্য। তাই বলা যায়, পরিবারই হচ্ছে কল্যাণকর সমাজের ভিত্তি। সুতরাং আদর্শ সমাজ গঠনের অপরিহার্য শর্ত আদর্শ পরিবার গঠন। পরিবারের গুরুত্বের বিভিন্ন দিক নিম্নে উলেলখ করা হ’ল।- ১. মানব বংশ বৃদ্ধি : পরিবারের মাধ্যমে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ বলেন,وَاللهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَنِيْنَ وَحَفَدَةً وَّرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ- ‘আর আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তোমাদের জোড়া থেকে তোমাদের পুত্র-পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে পবিত্র বস্ত্তসমূহ হ’তে রূযী দান করেছেন’ (নাহল ১৬/৭২)। এভাবে রাসূলের উম্মতের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। আর উম্মতে মুহাম্মাদীর সংখ্যাধিক্য পরকালে রাসূল (ছাঃ)-এর জন্য গর্বের বিষয় হবে। রাসূল (ছাঃ) বলেন, تَزَوَّجُوْا الْوَدُوْدَ الْوَلُوْدَ فَإِنِّىْ مُكَاثِرٌ بِكُمُ الأُمَمَ ‘তোমরা  অধিক  সোহাগিনী  ও  অধিক সন্তানদায়িনী মহিলাকে বিবাহ কর। কারণ আমি ক্বিয়ামতের দিন তোমাদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে গর্ব করব’।[2] ২. মানববংশ সংরক্ষণ : পরিবারের মাধ্যমে মানববংশ রক্ষা হয়। আল্লাহ বলেন,وَهُوَ الَّذِيْ خَلَقَ مِنَ الْمَاءِ بَشَرًا فَجَعَلَهُ نَسَبًا وَصِهْرًا وَكَانَ رَبُّكَ قَدِيْرًا ‘তিনিই মানুষকে পানি হ’তে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বিবাহগত সম্পর্ক নির্ধারণ করেছেন। আর তোমার প্রতিপালক সর্বশক্তিমান’ (ফুরক্বান ২৫/৫৪)। এ পরিবারের সদস্যদের মাঝে স্নেহ-মায়া-মমতা, সম্প্রীতি-সদ্ভাব তৈরী হয়। তাদের পরস্পরের মধ্যে থাকে সুসম্পর্কের সুদৃঢ় সেতুবন্ধন। কারণ সেখানে থাকে পিতামাতা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি, অনেক ক্ষেত্রে দাদা-দাদী, পৌত্র-পৌত্রী ইত্যাদি সম্পর্কের মানুষ। পরিবারে পিতামাতা সন্তানকে শৈশবে লালন-পালন করেন। তেমনি সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর পিতামাতাকে দেখাশোনা করে। পৌত্ররাও দাদা-দাদীর সেবাযত্ন করে থাকে। এভাবে একে অপরের মাধ্যমে মানব বংশ রক্ষা হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হ’ল এখন মানুষ বিভিন্ন অযুহাতে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও জন্ম নিরোধ করছে। লাইগেশনের মাধ্যমে বা অন্য কোন উপায়ে স্থায়ীভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ বা জন্ম নিরোধ করা হারাম। কেউবা ভ্রূণ হত্যা করে। শারঈ কোন কারণ  ব্যতীত ভ্রূণ হত্যা মানবহত্যার শামিল। এসব থেকে বিরত থাকা অতীব যরূরী। ৩. শিক্ষা প্রদান : পরিবার এক অনন্য শিক্ষাগার। এখানে পিতামাতা সন্তানকে সুশিক্ষিত করে তোলে। পিতামাতার নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করেই সন্তান সুনাগরিক হিসাবে গড়ে ওঠে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,كُلُّ مَوْلُوْدٍ يُوْلَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ، فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ- ‘প্রত্যেক সন্তানই ফিতরাতের (ইসলাম) উপর জন্মগ্রহণ করে থাকে। অতঃপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদী বা খৃষ্টান কিংবা অগ্নিপূজক বানায়’।[3] সুতরাং সৎ ও চরিত্রবান নাগরিক গড়ার প্রথম ভিত্তি হচ্ছে পরিবার। শিশুরা আদর্শবান হয়ে গড়ে ওঠে পরিবার থেকে। তাই পারিবারে যে শিশু সঠিকভাবে গড়ে ওঠে, সে বড় হয়েও সঠিক পথে অবিচল থাকে। পক্ষান্তরে যে শিশু পরিবারে খারাপ শিক্ষা পায়, সে বড় হয়েও খারাপ পথেই চলতে থাকে। এজন্য পিতা-মাতা সন্তানকে আল্লাহভীতি, পরকালীন জবাবদিহিতা, মুসলমানদের দায়িত্ব-কর্তব্য, আল্লাহর হক, বান্দার হক, পারস্পরিক সহমর্মিতা শিখানোর চেষ্টা করবেন। এর পাশাপাশি সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিবেন। যাতে তারা নিজেদের অভিভাবকহীন ভাবতে না পারে এবং সঠিক তত্ত্বাবধায়নের অভাবে বখে না যায়। পাশাপাশি তাদের সার্বিক বিষয়ে খোঁজ-খবর রাখবেন এবং তাদের সঙ্গী-সাথী ও বন্ধু-বান্ধবদের সম্পর্কেও নযর রাখবেন। যাতে অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ না হয়। ৪. শান্তি লাভ ও পারিবারিক মহববত সৃষ্টি : পরিবারেই মানুষ শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে এবং তাদের মধ্যে মহববত-ভালবাসা তৈরী হয়। আল্লাহ বলেন,وَمِنْ آَيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجاً لِتَسْكُنُوْا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِيْ ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُوْنَ، ‘তাঁর নিদর্শনের মধ্যে হ’ল এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হ’তেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি  করেছেন যাতে তোমরা তার কাছে শান্তি লাভ করতে পার আর তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। এর মাঝে অবশ্যই বহু নিদর্শন আছে সেই সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে’ (রূম ৩০/২১)। পরিবারে মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি একত্রে বসবাস করেন। একসাথে থাকার ফলে একে অপরের সুখে সুখী হয়, এক অপরের দুঃখে দুঃখী ও সমব্যথী হয়। এভাবে পরিবারের সদস্যরা পরস্পরকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করে থাকে। পরিবারের এ বন্ধন আমাদের দেশে খুবই পরিচিত চিত্র। কিন্তু দুঃখজনক হ’লেও সত্য যে, বর্তমানে চিরচেনা এ পরিবার প্রথা বিলুপ্তির পথে। একে সামাজিক বিপর্যয় বললেও হয়তো অত্যুক্তি হবে না। পারিবারিক বিপর্যয়রোধে অনেকেই সচেষ্ট। নানাবিধ কলাকৌশল প্রয়োগ করে পারিবারিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যাপৃত। অথচ মানব চিন্তা যতই শাণিত হোক, উন্নত ও আধুনিক বলে দাবী করা হোক না কেন, আল্লাহ প্রদত্ত নির্ভুল জ্ঞানের সহায়তা ব্যতীত প্রকৃত সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়। তাই পারিবারিক বিপর্যয়রোধে ইসলামের বিধান অনুসরণের বিকল্প নেই। এ পথেই রয়েছে সুষ্ঠু সমাধান। ইসলাম আগে ব্যক্তি সংশোধনে গুরুত্বারোপ করেছে। কারণ ব্যক্তি ঠিক হ’লে পরিবার ও সমাজ উভয়ই ঠিক হয়ে যায়। একটি বহুতল ভবন নির্মাণের পূর্বে যেমন ভিত্তি ঠিক করতে হয়, তেমনি পূর্ণাঙ্গ সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন করতে হ’লে একটি আদর্শ পরিবার গঠন করতে হয়। কেননা সমাজবিজ্ঞানী ও মুসলিম মনীষীগণের দৃষ্টিতে মানবসমাজ ও রাষ্ট্রের প্রাথমিক ভিত্তি হচ্ছে পরিবার। সম্প্রতি আমাদের দেশের অনেক মানুষ পারিবারিক বন্ধনের কথা ভুলতে বসেছে। আমাদের মানবিক মূল্যবোধ ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। পরিবারের প্রতি মানুষ বৈষ্যমূলক বিভিন্ন অন্যায়-আচরণ করছে। পরিবারের বড়দের সম্মান এবং ছোটদের প্রতি স্নেহসুলভ আচরণ করা হচ্ছে না। অথচ রাসূল (ছাঃ) বলেন,مَنْ لَمْ يَرْحَمْ صَغِيْرَنَا وَيَعْرِفْ حَقَّ كَبِيْرِنَا فَلَيْسَ مِنَّا، ‘যে ব্যক্তি আমাদের ছোটদেরকে স্নেহ করে না এবং আমাদের বড়দের সম্মান বোঝে না সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়’।[4] ইসলামে পারস্পরিক সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করার জন্য যা কিছু প্রয়োজন, ইসলামে তার সবকিছু বিদ্যমান। সুতরাং সে বিধান মেনে চলার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত। পারিবারিক জীবন যে শুধু দুনিয়াতেই কল্যাণ বয়ে আনে এবং এ বন্ধন যে কেবল পৃথিবীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে তা নয়, বরং সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জন্য এ বন্ধন জান্নাতেও বিদ্যমান থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন,جَنَّاتُ عَدْنٍ يَدْخُلُوْنَهَا وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ وَالْمَلَائِكَةُ يَدْخُلُونَ عَلَيْهِمْ مِنْ كُلِّ بَابٍ، ‘তা হ’ল স্থায়ী বসবাসের জান্নাত। তাতে তারা প্রবেশ করবে এবং তাদের সৎকর্মশীল বাপ-দাদা, স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি। ফেরেশতারা তাদের কাছে আসবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে’ (রা‘দ ১৩/২৩)। ৫. জৈবিক চাহিদা পূরণ ও লজ্জাস্থান হেফাযত : পারিবারিক ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের স্বভাবসিদ্ধ জৈবিক চাহিদা বৈধ পথে পূরণ করার সুযোগ হয়। ফলে লজ্জাস্থান হেফাযত করা যায়। রাসূল (ছাঃ) বলেন,يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যে বিবাহের সামর্থ্য রাখে সে যেন বিবাহ করে। কেননা উহা লজ্জাস্থানকে হেফাযত করে এবং চক্ষুকে অবনমিত রাখে’।[5] আর এই বৈধপন্থায় নারী-পুরুষের জৈবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে উভয়ে নৈতিক স্খলন থেকে বেঁচে যায়, পাপাচার থেকে পরিত্রাণ পায় এবং ছওয়াব লাভ করে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,وَفِىْ بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ، قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ أَيَأْتِىْ أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُوْنُ لَهُ فِيْهَا أَجْرٌ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِىْ حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيْهَا وِزْرٌ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِىْ الْحَلاَلِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ، ‘তোমাদের কারো স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও ছাদাক্বাহ। ছাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের কেউ যদি নিজের কামভাব চরিতার্থ করে তাতেও কি সে ছওয়াব পাবে? উত্তরে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, তোমাদের অভিমত কি যে, কোন ব্যক্তি যদি হারাম উপায়ে কামভাব চরিতার্থ করে তাহ’লে সে কি গুনাহগার হবে? ঠিক এভাবেই হালাল উপায়ে (স্ত্রীর সাথে) কামভাব চরিতার্থকারী ছওয়াব পাবে’।[6] ৬. পারিবারিক জীবন যাপন করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য : মুমিন বান্দাদের অন্যতম গুণ সুন্দর পারিবারিক জীবন যাপন। এজন্য তারা মহান আল্লাহর কাছে দো‘আ করে এই বলে,رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَّاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِيْنَ إِمَامًا- ‘হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি আমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের মাধ্যমে চক্ষুশীতলকারী বংশধারা দান কর এবং আমাদেরকে আল্লাহভীরুদের জন্য আদর্শ বানাও’ (ফুরক্বান ২৫/৭৪)। পারিবারিক জীবনের সুফল : পরিবারের সুফল অনেক মনস্তাত্ত্বিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাদান ইত্যাদি। পরিবারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শিশুকে সামাজিক করে গড়ে তোলা এবং ইসলামী তাহযীব-তামাদ্দুন শিক্ষা দেওয়া। পরিবারের ধারা ও রীতিনীতির উপর ভিত্তি করে শিশুর মনোজগত তৈরী হয় এবং পরিবারে তার দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠে। সুতরাং শিশুর সুষ্ঠু শিক্ষা দিতে পরিবার বিশেষ ভূমিকা রাখে। পরিবার একটি সার্বজনীন পদ্ধতি এবং সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। সারা বিশ্বে পরিবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ভিত্তি হিসাবে গণ্য হয়। পরিবার একজন মানুষের সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ। পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সকলের দায়িত্ব। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও স্নেহ-মায়া-মমতার বন্ধনে আবদ্ধ একেকটি পরিবার বহু হৃদয়ের সমষ্টি, যেখানে আছে জীবনের প্রবাহ, আছে মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালবাসা, মিলেমিশে থাকার প্রবল বাসনা, আছে নিরাপত্তা, সহনশীলতা এবং পরস্পরকে গ্রহণ করার মানসিকতা। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে পারিবারিক বন্ধনের প্রভাব বিস্তৃত। বিশ্বের প্রতিটি দেশে ও জাতির নিকটে পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। মৌলিক মানবাধিকার সংরক্ষণ, সমমর্যাদার নিশ্চয়তা এবং বৈষম্যহীন পরিবেশের মাধ্যমে সামাজিক অগ্রগতি সাধন ও জীবন মান উন্নয়নে পরিবার সমাজের স্তম্ভ ও মৌলিক ভিত্তি হিসাবে কাজ করে। পরিবার এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখান থাকে ভবিষ্যত জীবনের পথ নির্দেশনা। পারিবারিক বন্ধন থেকেই মানব বংশ সম্প্রসারিত হয়েছে। যদি সকল মানুষ পরিবারে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করে তবে সে পরিবার সমাজে উত্তম ও আদর্শ পরিবার হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। যেখানে বইতে থাকে শান্তির ফল্গুধারা। পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জীবন হবে সুখকর ও আনন্দময়। স্মর্তব্য যে, ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে একটি দেশ বা রাষ্ট্র গঠিত হয়। তাই ব্যক্তি ভালো হ’লে পরিবার ভালো হবে, পরিবার ভালো হ’লে সমাজ ভাল হবে। আর সমাজ ভালো হ’লে দেশ বা রাষ্ট্র ভালো চলবে। সমাজে এখনো বহু ভালো মানুষ আছেন, যারা প্রকৃতপক্ষেই চান যে, সমাজে ভালো মানুষই থাকুক, মানবরূপী কোন দানব না থাকুক। ব্যক্তি সংশোধনের মাধ্যমে পরিবার ঠিক করে ঐসব মানবরূপী দানবদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে পারিবারিক শান্তি-শৃঙ্খলা এবং মযবূত করতে হবে পারস্পরিক সম্পর্কের সেতু বন্ধন। এক্ষেত্রে একে অন্যের প্রতি স্নেহ-ভালবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ বজায় রাখা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে সুন্দর পরিবার গঠন ও পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা আমাদের জন্য একান্ত কর্তব্য। পরিবার নামক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একটি শিশু সুনাগরিক হয়ে গড়ে ওঠে। শিশুরা পরিবারে যে শিক্ষা পায় বড় হয়ে সে ঐ শিক্ষানুযায়ী চলে। আর পরিবারে একই সঙ্গে মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তান-সন্ততি মিলেমিশে থাকে। একজনের সুখে অন্যজন আনন্দিত হয় এবং একজনের দুঃখে অন্যজন অশ্রু ঝরায়। এ নিবিড় বন্ধন থাকে কেবল পরিবারের মধ্যে। ফলে সদস্যরা একে অন্যকে নানাভাবে সাহায্য করে। পরিবারের মূল চাবিকাঠি থাকে পিতা-মাতার হাতেই। আর সকল পিতা-মাতাই চান তাদের সন্তান ভালো হোক, ভালোভাবে চলুক এবং নিজের সুন্দর ভবিষ্যত গড়ে তুলুক। তাই সুন্দর একটি পরিবার গড়ে তুলতে পিতামাতার গুরুত্ব অপরিসীম। কারণ পিতা-মাতার সাথে সন্তানদের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও চিরন্তন। সন্তানকে সুপথে চালিত করতে তাদেরকেই ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পরিবারের সদস্যরা যখন আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন থাকবে; স্ত্রী তার অধিকার পূর্ণভাবে লাভ করবে; স্বামী যখন স্ত্রীর নিকট তার অধিকার পাবে, সন্তান পিতা-মাতার ঘনিষ্ঠ সাহচর্য লাভ করবে ও তাদের অধিকার পাবে; আত্মীয়-স্বজন যখন পরস্পরের যথাযথ সম্মান-মর্যাদা পাবে, তখন কোন স্ত্রী অধিকারের দাবীতে প্রকাশ্য রাজপথে বের হবে না, কোন স্বামী ভালোবাসা ও সুনদর জীবন-যাপনের প্রত্যাশায় অন্য নারীর প্রতি আসক্ত হবে না, কোন সন্তানই পিতা-মাতার অবাধ্য হয়ে উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করবে না। বরং পরিবারে সবার মাঝে সুসম্পর্কের কারণে আল্লাহর রহমত, অনুগ্রহ-অনুকম্পা বর্ষিত হ’তে থাকবে। অপরদিকে ইসলাম নির্দেশিত পারিবারিক জীবন হ’ল আল্লাহ তা‘আলার বিশেষ অনুগ্রহ। মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত পারিবারিক জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হ’লে সমাজ থেকে পরকীয়া, লিভটুগেদার, মাদকাসক্তি, ইভটিজিং, এসিড নিক্ষেপ, ধর্ষণ-অপহরণ, ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা ও প্রেমে ব্যর্থদের আত্মহত্যাসহ সকল প্রকার অপরাধ নির্মূল হবে। জীবনের পড়ন্ত বেলায় বৃদ্ধাশ্রমে ঠাঁই নিয়ে নীরবে অশ্রু ঝরাণোর মতো দুঃসহ জীবন-যাপন বন্ধ হবে। তাই একটি সুন্দর ও আদর্শ পরিবার গঠনের লক্ষ্যে আল্লাহ ও রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশ মেনে চলা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য কর্তব্য। পরিবার না থাকার ক্ষতিকর দিকসমূহ : পরিবার মানুষের জন্য যেমন নিরাপদ আশ্রয়স্থল, তেমনি মানসিক প্রশান্তি লাভের স্থান। মানবজীবনে পরিবার তাই এক গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। কিন্তু পরিবার না থাকলে মানুষকে নানা ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হ’তে হয়। তন্মধ্যে কয়েকটি দিক নিম্নে উল্লেখ করা হ’ল।- ক. নিরাপত্তাহীন হওয়া : পরিবার মানুষের জন্য এক সুন্দর আশ্রয়। পার্থিব জীবনে সংঘটিত বিভিন্ন বিপদাপদ, অসুখ-বিসুখ, ব্যথা-বেদনা, দুঃখ-যাতনা ইত্যাদির শিকার হয়ে মানুষ অনেক সময় দিশাহারা হয়ে যায়। এ সময় পরিবারের অন্যান্য সদস্য তার সাহায্যে এগিয়ে আসে। অসুখে সেবা করে, বিপদে সাহায্য করে, দুঃখ-কষ্টে সান্ত্বনা দেয় এবং শোকে সমব্যথী হয়। কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মানুষের জন্য এসব পাওয়ার উপায় থাকে না। ফলে সে হয়ে পড়ে উদ্ভ্রান্ত। তার জীবনের নিরাপত্তা থাকে না। কখনও কখনও সে কোথাও মরে পড়ে থাকলে তার খোঁজ-খবর নেওয়ার বা তাকে কাফন-দাফন করার মত লোকও থাকে না। খ. সহযোগিতা না পাওয়া : অর্থ মানব জীবনের এক আবশ্যিক বিষয়। রক্ত ছাড়া যেমন মানুষ বাঁচে না অর্থ ছাড়া তেমনি জীবন চলে না। তাই বিভিন্ন সময়ে মানুষের অর্থের প্রয়োজন হয়। পরিবারের লোকেরাই সেই প্রয়োজন পূরণে এগিয়ে আসে। তাছাড়া জীবনের সর্বক্ষেত্রে মানুষ কর্মক্ষম থাকে না। জীবনের সূচনাকালে যেমন সে অক্ষম ও পরনির্ভরশীল থাকে, তেমনি জীবনের শেষ বেলায় সে আবার অক্ষম ও পরনির্ভরশীল হয়ে যায়। এ সময়ে পরিবারভুক্ত মানুষ পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাহায্য পায়। তার সার্বিক প্রয়োজন পূরণে তারা এগিয়ে আসে। অথচ পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মানুষের সাহায্যে তেমন কেউ এগিয়ে আসে না। গ. বন্ধনহীন হওয়া : একেকটি পরিবার মূলতঃ কতগুলো হৃদয়ের সমষ্টি, যেখানে আছে জীবনের প্রবাহ, মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা, যত্ন-আত্তি, সেবা-পরিচর্যা, নিরাপত্তা, মিলেমিশে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষা, সহনশীলতা এবং একে অন্যকে গ্রহণ করার মানসিকতা। কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মানুষ এসব সুযোগ-সুবিধা পায় না। উল্লেখ্য যে, দেশ-কাল, সমাজ-পারিপার্শ্বিকতা, ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি, দায়িত্ব-কর্তব্য ও রীতিনীতির কারণে পরিবারের রূপ ভিন্ন হয়। কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হচ্ছে পরিবারের কাঠামো ও এর আকার-আয়তন। বিশ্বায়নের সঙ্গে সঙ্গে যৌথ পরিবার ভেঙ্গে গঠিত হচ্ছে একক পরিবার। দেখা দিচ্ছে এক ধরনের বন্ধনহীনতা। যা কোন জ্ঞানী মানুষের কাম্য নয়। ঘ. নৈতিক অবক্ষয় : বর্তমান সমাজের অবক্ষয় ও সামাজিক ব্যাধি উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে পরিবারকে কেন্দ্র করে অনেক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। ঘরে ঘরে দাউ দাউ করে জ্বলছে অশান্তির আগুন। পরিবারগুলোর অশান্তির প্রভাব পড়ছে সমাজে। ডিস, সিডি, ইন্টারনেট, মোবাইল, সাইবারক্যাফে ইত্যাদির মাধ্যমে পর্ণোছবি দেখা, ব্লাক মেইলিং, ইভটিজিং বাড়ছে মহামারীর ন্যায়। অশালীন পোশাক, রূপচর্চা, ফ্যাশন, অবাধ মেলামেশা, যত্রতত্র আড্ডা, প্রেমালাপ, মাদক, পরকীয়া, অবৈধ যৌনাচার ও সন্ত্রাসের সয়লাব চলছে সমাজের সর্বত্র। এ সকল কাজে যে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়, তা জোগাড় করতে গিয়ে পরিবারের সাথে বাক-বিতন্ডা, মনোমালিন্য, চুরি-ডাকাতি, ছিনতাই-রাহাজানী, কিডন্যাপ ও খুন-খারাবী কিছুই বাদ যাচ্ছে না। এর নেতিবাচক পরিণতি হিসাবে পারিবারিক সহিংসতার বিস্তৃতি ঘটছে। বস্ত্ততঃ এ ধরনের সামাজিক অস্থিরতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় পুরো সমাজকে এক চরম ধ্বংসাত্মক পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। নানা অত্যাচারে অতিষ্ঠ অভিজাত পিতা-মাতা যেন যিম্মী হয়ে আছেন তরুণ-যুবক সন্তান-সন্ততির কাছে। সমাজ ও রাষ্ট্রীয় প্রশাসনও যেন পিতামাতার মতই অসহায়। আর্থিক, নৈতিক, সামাজিক ক্ষতির পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছেন সংশ্লিষ্টরা। সমাজের অবক্ষয়ের কারণে যুব সমাজের কল্যাণময় অবদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সকলে। এজন্য পারিবারিক ব্যবস্থাকে সংস্কারে নযর দেয়া সকলের জন্য যরূরী। বর্তমানে যে সকল পরিবার সন্তানের প্রতি উদাসীন, সন্তানের প্রতি সঠিক দায়িত্ব পালন করেন না, তাদের অধিকাংশের যুবক-তরুণ সন্তান-সন্ততি উচ্ছৃঙ্খল ও অনৈতিক জীবন যাপন করে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সমাজে নানা সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে। এদের মধ্যে অধিকাংশই ধনী ও দরিদ্র শ্রেণী। এদের মাঝে ধর্মীয় অনুশীলন, ইসলামী মূল্যবোধ, ইসলামী সংস্কৃতির চর্চা, পারিবারিক বোঝাপড়া, পারস্পরিক দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ নেই বললেই চলে। ধনী শ্রেণী বৈধ-অবৈধ পন্থায় টাকা উপার্জন করে এবং ভোগ-বিলাসেই মত্ত থাকে অধিকাংশ সময়। সন্তান চাইলেই তারা টাকা-পয়সা দিয়ে এবং পোশাক-পরিচ্ছদ, দামি মোবাইল, গাড়ি ইত্যাদি কিনে দিয়েই দায়মুক্ত হয়। অন্ধস্নেহে সন্তানের কোন ভুল-ত্রুটি অভিভাবকের চোখে ধরা পড়ে না। বর্তমান সময়ের অভিভাবকগণ এসব ব্যাপারে আগের মত সিরিয়াস নন, তারা কেবল অর্থের পিছনে ছুটছেন। সন্তানকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের একমাত্র বা প্রধান লক্ষ্য। ধর্মকর্ম, নীতি-নৈতিকতা তাদের কাছে গৌন হয়ে গেছে। সন্তান-সন্ততিকে সময় দেয়ার মত ফুরসত নেই, সন্তান-সন্ততিও তাই কথা শুনছে না। ছোট-বড় সকলে তথাকথিত প্রগতি বা উন্নয়নের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেয়ায় সমাজ ব্যবস্থা দ্রুত নষ্ট ও দূষিত হয়ে যাচ্ছে। অপর দিকে দরিদ্র শ্রেণীর সন্তানরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে অশিক্ষা-কুশিক্ষা পেয়ে বেড়ে ওঠে। সন্তান একটু বড় হ’লেই তারা অর্থ উপার্জনে লাগিয়ে দেয়। এই দুই শ্রেণী সাধারণত নিজেরাও ধর্মকর্ম করে না, সন্তানকে খুব একটা শিক্ষা দেবারও প্রয়োজন অনুভব করে না। ফলে স্বাভাবিকভাবে এই শ্রেণীর সন্তানদের মাঝে অপরাধ প্রবণতা বেশী থাকে। বলা যায় যে, মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলোই মোটামুটি সমাজের সজাগ ও সচেতন শ্রেণী। এসব পরিবারই সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলার ভারসাম্য ধরে রাখে। এ সকল পরিবারের অভিভাবকগণ সন্তানদেরকে লেখাপড়ার পাশাপাশি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও যত্নের সাথে ধর্ম-কর্ম, আদব-কায়দা, ভদ্রতা-শালীনতা, দায়িত্ব-কর্তব্যবোধ, নৈতিকতা ইত্যাদি শিক্ষা দিয়ে থাকেন। সেজন্য এ অংশে সহজে ফাটল ধরে না। কিন্তু ফাটল সৃষ্টি হ’লে তা হবে অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তাই এ শ্রেণীসহ সমাজের সকল শ্রেণীর পরিবারে নৈতিকতার মানোন্নয়নের মাধ্যমে অবক্ষয় রোধ করার চেষ্টা করতে হবে। ঙ. সংসার বিরাগী হওয়া : সংসার বিরাগী হওয়া বা বৈরাগ্য জীবন যাপন করার অনুমতি ইসলামে নেই। আল্লাহ বলেন, وَرَهْبَانِيَّةً ابْتَدَعُوهَا مَا كَتَبْنَاهَا عَلَيْهِمْ ‘আর বৈরাগ্যবাদ- তা তারা নিজেরাই নতুনভাবে চালু করেছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়। আমরা তাদের উপর এ বিধান অপরিহার্য করিনি’ (হাদীদ ৫৭/২৭)। আয়াতে খ্রীষ্টানদের বৈরাগ্যবাদের কথা বলা হয়েছে। এসব থেকে ইসলাম মানুষকে সাবধান করেছে। হাদীছে এসেছে, সা‘আদ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ (রাঃ) বলেন,رَدَّ رَسُوْلُ اللهِ صلى الله عليه وسلم عَلَى عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُوْنٍ التَّبَتُّلَ، وَلَوْ أَذِنَ لَهُ لاَخْتَصَيْنَا ‘রাসূল (ছাঃ) ওছমান ইবনু মাযঊনকে নিঃসঙ্গ জীবন যাপনের অনুমতি দেননি। তাকে অনুমতি দিলে আমরা নির্বীর্য হয়ে যেতাম’।[7] আয়েশা (রাঃ) বলেন,أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم نَهَى عَنِ التَّبَتُّلِ ‘নিশ্চয়ই রাসূল (ছাঃ) নিঃসঙ্গ জীবন যাপনকে নিষেধ করেছেন’।[8] সুতরাং পারিবারিক জীবন পরিহার করে সংসারত্যাগী হওয়ার কোন সুযোগ ইসলামে নেই। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বর্তমানে এক শ্রেণীর লোক তাবলীগের নামে পরিবার-পরিজনকে ফেলে রেখে এক মাস, তিন মাস, এক বছর বা জীবন চিল্লায় বের হয়। পরিবারের সাথে তাদের যোগাযোগ এবং ক্ষেত্র বিশেষে খোঁজ-খবরও থাকে না। এভাবে দ্বীন প্রচার করা নবী-রাসূলগণের পদ্ধতি নয়। এটা খ্রীষ্টানদের বৈরাগী ও হিন্দুদের সন্ন্যাসী হওয়ার সাথে তুলনীয়। অতএব এসব পরিত্যাজ্য। চ. উদ্দেশ্যহীন জীবন : পরিবার মানুষকে একটি স্থানে ও একটি লক্ষ্যে চলতে সাহায্য করে। কখনও সে লক্ষ্যচ্যুত হ’লে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা তাকে সঠিক পথে চলতে ও নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ফিরে আনতে তৎপর হয়। কিন্তু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকে না। সে যা ইচ্ছা তাই করে, যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে চলে যায়। পারিবারিক বন্ধনহীন এই জীবন যেন হাল বিহিন নৌকার মত। সুতরাং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জীবনকে অশ্চিয়তার দিকে ঠেলে দেওয়া কোন বিবেকবান মানুষের জন্য সমীচীন নয়। [চলবে]

[1]. Oxford Advence Laerners English Dictionary, (New Yeork : Oxford University press, 8th edn, 2010), p-551. [2]. আবুদাঊদ হা/২০৫০; মিশকাত হা/৩০৯১, সনদ ছহীহ। [3]. বুখারী হা/১৩৬৫; মুসলিম হা/২৬৫৮; মিশকাত হা/৯০। [4]. আবু দাউদ হা/৪৯৪৩; তিরমিযী হা/১৯১৯; ছহীহাহ হা/২১৯৬। [5]. বুখারী হা/৫০৬৬; মুসলিম হা/১৪০০; মিশকাত হা/৩০৮০। [6]. মুসলিম হা/১০০৬; মিশকাত হা/১৮৯৮। [7]. বুখারী হা/৫০৭৩; মুসলিম, মিশকাত হা/৩০৮১, ‘বিবাহ’ অধ্যায়। [8]. নাসাঈ হা/৩২১৩; তিরমিযী হা/১০৮২; ইবনু মাজাহ হা/১৮৪৯; ছহীহুল জামে‘ হা/৬৮৬৭।

 hi